দুই যুগের পথচলা তাহলে শেষ হচ্ছে!

মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আজ সেই শেষের শুরুর আগে ওই প্রশ্নটা অবশ্য কেউই তুলছে না, যেটি শুনতে শুনতে যাওয়াটাকেই অবসরের জন্য আদর্শ বলে মেনে এসেছেন সবাই।

অবসর নিয়ে অনেক পুরোনো কথা। যা নানা সময়ে নানাজনের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়ে আসছে। যখন তুমি যাবে, সবাই যেন বলে ‘কেন?’ শচীন টেন্ডুলকারকে কেউ এই প্রশ্নটা করছে না। বরং গত কিছুদিন ক্রিকেট-বিশ্বের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত প্রশ্নটা নিশ্চয়ই তাঁর কানেও গিয়ে থাকবে—আর কত, এখনো কেন যাচ্ছেন না?

বিদায়লগ্নে যখন টেন্ডুলকার-বন্দনার বান ছুটেছে, সৌরভ গাঙ্গুলী অকপট হয়ে সত্যিটা বলে দিয়েছেন। নামের জোরেই টেন্ডুলকারের ক্রিকেট ক্যারিয়ার দুই যুগের মাইলফলক ছুঁতে পেরেছে। গত তিন বছরের পারফরম্যান্সের দিকে ইঙ্গিত করে সৌরভ বলছেন, তিনি টেন্ডুলকার হলে এক বছর আগেই বিদায় বলে দিতেন। সীমান্তের ওপার থেকে জাভেদ মিয়াঁদাদ ‘এক’টাকে ‘দুই’ করে দিচ্ছেন। সঙ্গে স্বীকার করছেন, তিনি নিজেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মোহ কাটাতে একটু বেশি সময়ই নিয়ে ফেলেছিলেন।

শেষ টেস্টের শচীন টেন্ডুলকারকে সামনে রেখে মাঠে নামছে ভারতীয় দল

শচীন টেন্ডুলকারের শেষ টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে আসা সাংবাদিকেরাও কাল দ্রুত একমত হয়ে গেলেন, ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়েই তাঁর বিদায়ের উপযুক্ত মঞ্চ। সেটিই তো হচ্ছে। তা হচ্ছে। তবে বছর আড়াই আগে এই মাঠেই বিশ্বকাপ জিতে কোহলিদের কাঁধে চেপে ল্যাপ অব অনারটাই তাঁর বিদায়ী অভিবাদন হলে ভালো হতো।

২০০৬ সালের দিকেও কথাটা উঠেছিল। পাকিস্তানে শোয়েব আখতারের গতির সামনে একটু নড়বড়ে টেন্ডুলকারকে দেখে ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকার সেই শিরোনাম আজও আলোচিত—‘এন্ডুলকার’! চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে শেষ কথা বলতে নেই, এই সত্যও মনে করিয়ে দিতে খুব বেশি সময় নেননি টেন্ডুলকার। কিন্তু গত বছর তিনেক তো টেন্ডুলকার তাঁর ছায়া হয়েই ছিলেন। ২৭ টেস্টে ৩৬ গড় কি তাঁর নামের পাশে মানায় নাকি! সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরি সেই ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। এরপর ৩৯টি ইনিংসে কাছাকাছি গিয়েছেন বার দুয়েক, কিন্তু সেটি ‘আর কত’ প্রশ্নটাকে চাপা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

সৌরভ-মিয়াঁদাদের কথার সূত্র ধরে ভারতীয় এক পত্রিকা দুই দিন আগে সাম্প্রতিক অতীতের কয়েকজন গ্রেটের শেষের সঙ্গে টেন্ডুলকারের শেষের তুলনা করেছে। বিস্ময়কর হলো, সেখানে একটু দূর অতীতের ইমরান খান-সুনীল গাভাস্কার-ডেনিস লিলি-গ্রেগ চ্যাপেলরা আছেন। সাম্প্রতিক অতীতের আছেন শেন ওয়ার্ন ও গ্লেন ম্যাকগ্রা। অথচ একটা লম্বা সময় ধরে যাঁর সঙ্গে বিশ্বসেরার মুকুটটা নিয়ে টেন্ডুলকারের লড়াই হয়েছে, সেই ব্রায়ান লারাই নেই!

যাঁদের কথা বলা হয়েছে, টেন্ডুলকারের সঙ্গে সবারই বড় পার্থক্য—শেষের আগে কেউই এমন বিবর্ণ ছিলেন না। অন্য জায়গায় মিল-অমিল দুই-ই আছে। সুনীল গাভাস্কার বেঙ্গালুরুতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯৬ রানের ইনিংসটি খেলার সময়ই জানতেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই তাঁর শেষচিহ্ন হয়ে রইল। বাকিরা জেনেছে পরে। ইমরানের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ টেস্ট নয়—ওয়ানডে এবং সেটি বিশ্বকাপ ফাইনাল। বিশ্বকাপ হাতে নেওয়ার সময় তিনি জানতেন না, এটাই তাঁর শেষ ছবি হয়ে রইল। মায়ের নামে ক্যানসার হাসপাতালের জন্য টাকা তুলতে যেকোনো মূল্যে ইংল্যান্ড সফরে যেতে চেয়েছিলেন, তাঁকে নেওয়া হয়নি।

ডন ব্র্যাডম্যানের পরই টেন্ডুলকার—এই কথাটা বলার সময় যাঁর ছায়া আশপাশে ঘুরে বেড়ায়, সেই ভিভ রিচার্ডসেরও শেষটা নিজের ইচ্ছায় নয়। অধিনায়কত্ব ছেড়ে শুধুই খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯২ বিশ্বকাপ এবং এর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে যেতে না পারার জন্য রিচি রিচার্ডসনকে তিনি এখনো ক্ষমা করেননি। শুধু নামের জোরেই খেলে যেতে চাননি। ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডে তাঁর শেষ টেস্ট সিরিজে ৮ ইনিংসে ৫টি হাফ সেঞ্চুরি ছিল।

সাম্প্রতিক অতীতে নিজের মাঠে শেষ টেস্ট খেলার সৌভাগ্যের দিক থেকে দুটি নামই মনে পড়ছে—স্টিভ ওয়াহ ও গ্লেন ম্যাকগ্রা। ব্যাটসম্যান হিসেবে হয়তো টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা চলে না, তবে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রভাবের দিক থেকে স্টিভ ওয়াহ একটুও পিছিয়ে নন।

শচীন টেন্ডুলকারকে নিয়েও কথাটা বাতাসে ভাসছে। তাঁর ঘটনা বাকিদের চেয়ে আলাদা। ভারতে এমন এক উচ্চতায় তাঁর অধিষ্ঠান যে, ‘শেষ নাহি যে...’ অনুভূতির পরও সেই প্রশ্ন ছিল—‘শেষ কথা কে বলবে?’ পেছনে ঘটনা যা-ই থাকুক, ইতিহাস জানবে নিজের ব্যাপারে ‘শেষ কথা’ টেন্ডুলকারই নিজেই বলেছেন। ক্রিকেট ইতিহাসে আরও অনেক অমর কীর্তির সঙ্গে এটাকেও বোধ হয় যোগ করে দিতে হয় যে, শুধু একজন ক্রিকেটারের বিদায় উপলক্ষ করেই আয়োজন করা হয়েছে একটা টেস্ট সিরিজের। দেশের মাটিতে যেন শেষ সিরিজটা খেলতে পারেন, শেষ টেস্টটা ঘরের মাঠে—এ কারণেই তো ডেকে আনা হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।

সাম্প্রতিক অতীতে নিজের মাঠে শেষ টেস্ট খেলার সৌভাগ্যের দিক থেকে দুটি নামই মনে পড়ছে—স্টিভ ওয়াহ ও গ্লেন ম্যাকগ্রা। ব্যাটসম্যান হিসেবে হয়তো টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা চলে না, তবে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রভাবের দিক থেকে স্টিভ ওয়াহ একটুও পিছিয়ে নন। অনেকে বলবেন, একটু হয়তো এগিয়েই। কাকতালীয়ভাবে, স্টিভ ওয়াহর বিদায়ী সিরিজটা টেন্ডুলকারের ভারতের বিপক্ষেই। সেই সিরিজ নিয়েও অস্ট্রেলিয়ায় আবেগের প্রদর্শনী কম হয়নি। সেই সিরিজ কাভার করা ভারতীয় সাংবাদিক যেখানে পার্থক্য দেখছেন, তা হলো সেখানে মাঠের ক্রিকেটটাও খুব জমজমাট হয়েছিল। এখানে তো ভারত জিতবে ধরে নিয়েই শুরু হচ্ছে খেলা।

আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীদের জীবনের শেষ টেস্টের সাক্ষী রাখতে পাঁচ শ টিকিট চেয়ে নিয়েছেন টেন্ডুলকার। এই প্রথম মাঠে বসে ছেলের খেলা দেখবেন টেন্ডুলকারের মা। মা কি দেখতে পাবেন সেই টেন্ডুলকারকে, একটা সময় যাঁর কাছে সেঞ্চুরি পরিণত হয়েছিল খাওয়া-ঘুমানোর মতোই একটা অভ্যাসে। স্বপ্নেও যা কেউ ভাবেননি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। এখানেও টেন্ডুলকার বড় কিছু করে ফেলবেন বলে ভাবছেন, এমন কারও দেখা মিলছে না। কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে শেষ কথা কে বলতে পারে!

কে জানে, হয়তো, হয়তো...সত্যি হয়ে যেতেও পারে টেন্ডুলকারপ্রেমীদের চাওয়া—রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো আবার যাবার আগে।

মহানায়কের শেষ টেস্ট-১
মহানায়কের শেষ টেস্ট-৩
মহানায়কের শেষ টেস্ট-৪
মহানায়কের শেষ টেস্ট-৫
মহানায়কের শেষ টেস্ট-৬