কথাটা মজা করেই বলেছিলাম। কুয়ালালামপুর রওনা হওয়ার আগের রাতে বেনজির ভাইকে বলেছিলাম, ‘এত বড় একটা টুর্নামেন্ট কাভার করতে যাচ্ছি, খুব নার্ভাস লাগছে!’ ভোরের কাগজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হেসে বললেন, ‘ভালোই বলেছেন! আপনি বিশ্বকাপ কাভার করে ফেলেছেন আর এই টুর্নামেন্ট কাভার করতে নার্ভাস লাগছে!’

নিছক মজা করে বলা সেই কথাটা কুয়ালালামপুরে প্রায় প্রতিদিনই মনে পড়েছে। তখন আর তা মজার বিষয় হিসেবে নয়। আইসিসি ট্রফির স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তগুলো বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ কাভার করা এর তুলনায় কত সহজ! বিশ্বকাপ ফাইনালে শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া খেলছে, এর মধ্যে কোনো একটি দলের প্রতি আমার পক্ষপাত থাকতেই পারে, কিন্তু তা কখনোই ম্যাচ শেষে আনন্দে উচ্ছ্বসিত বা বেদনায় নিশ্চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নয়। মনে আছে, বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় লাহোরের গাদ্দাফী স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে এমনিতেই চুপচাপ ধরণের এক শ্রীলঙ্কান বন্ধু সাংবাদিক হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠায় তাঁর উদ্দেশে গম্ভীর গলায় প্রেসবক্সে একজন পেশাদার সাংবাদিকের আচরণ কী রকম হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে বেশ দীর্ঘ একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস, রঞ্জন পারানাভিতানা নামের সেই বন্ধু সাংবাদিক কুয়ালালামপুরে ছিলেন না!

কুয়ালালামপুরে থাকলে আমার দেওয়া বক্তৃতা অসংখ্যবার আমাকেই শোনানোর সুযোগ পেত রঞ্জন। অবশ্য আমারও একটা পাল্টা জবাব থাকত, ‘আমি তো তোমাকে প্রেসবক্সে আচরণ সম্পর্কে বলেছিলাম। এখানে প্রেসবক্স কই?’ শুধুমাত্র নিজের দেশ খেলছে, বিশ্বকাপ-স্বপ্ন এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলে শোকে ডুবে যাবে বাংলাদেশ। দলের এই টেনশনের অংশীদার হয়ে যাওয়ার কারণেই নয়, আইসিসি ট্রফিকে সাংবাদিকতা জীবনের কঠিনতম অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করার কারণ আছে আরও। আর কোনো টুর্নামেন্ট কাভার করতে গিয়ে এতসব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হয়নি। মিডিয়ার জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। প্রেসবক্স তো নেই-ই, মাঠে গিয়ে বসার জন্য চেয়ার-টেবিল, মালয়েশিয়ার রাগী সূর্যের তেজ থেকে বাঁচার জন্য একটা ছাতা ম্যানেজ করতেও প্রায় কাকুতি-মিনতি করতে হয়েছে প্রতিটি ম্যচে। শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া গেলে সেগুলো বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে সাংবাদিকদেরই। বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাত ম্যাচে ওই ছাতাটিও জোটেনি, কাজ করতে হয়েছে প্রচণ্ড রোদে পুড়তে পুড়তে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, ম্যাচশেষে সেই কষ্টটুকু ভুলিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।

সেমিফাইনাল ও ফাইনালে সাংবাদিকদের জন্য একটা বসার ব্যবস্থা ছিল কিলাত ক্লাবের দোতলায়। টানা কতগুলো চেয়ার, লেখার টেবিল নেই। তার চেয়েও বড় সমস্যা, ঠিক নিচে অনেকটা মাঠ দেখা যায় না সেখান থেকে। ফাইনালের প্রথম দিন আয়োজকদের বলে কাজ না হওয়ার পর আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভ ডেভিড রিচার্ডসকে পর্যন্ত জানানো হলো এই সমস্যার কথা। দুঃখ প্রকাশকে এই সমস্যা সমাধানের উপায় স্থির করলেন রিচার্ডস। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে আর একটা বিচিত্র সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এক পাশে 'মিডিয়া' লেখা থাকলেও দোতলার টানা বারান্দায় বসার ব্যবস্থা ছিল আরও অনেকেরই। মোটামুটি তারা সবাই টুর্নামেন্ট স্পনসরদের জন্য জলজ্যান্ত বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছিলেন। কিলাত ক্লাবের ক্যান্টিনের এই এলাকায় যে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ, সেটি বেশ বড় বড় অক্ষরে লেখা। কিন্তু এর ঠিক ওপরেই এসব নিষেধাজ্ঞার বালাই নেই। সাংবাদিকদের যেখানে বসার জায়গা, তার ঠিক পাশেই কার্লসবার্গ বিয়ার বিক্রি হচ্ছে, দেদারসে তা গিলছে সবাই এবং কিছুক্ষণ পর জগতের সবকিছুই তাদের কাছে মহা আনন্দের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হাতে কাজ না থাকলে হয়তো এসবে মজাই লাগত, কিন্তু স্কোরারের সাহায্য ছাড়া ক্রিকেট রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব পালনের পথে এ ছিল মহা অন্তরায়।

বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা

আইসিসি ট্রফিতে স্কোরারের কাজটা যে নিজেকেই করতে হবে, সেটা অবশ্য প্রথম দিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলা শুরু হওয়ার আগে স্কোরারের সঙ্গে কথা বলতে গেছি, হাঁ হাঁ করে দৌড়ে এলেন এক কর্মকর্তা ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব হার!’ ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব হার!’ স্কোরার ছিলেন একজন তরুণী, আবার ভালোমতো তাকিয়ে দেখলাম অন্য কোনো কারণে ডিস্টার্ব করার মতো আকর্ষণীয় কোনো চেহারা নয়। ওই কর্মকর্তাকেও তা বোঝানোর চেষ্টা করা হলো। স্কোরারের সাহায্য ছাড়া ক্রিকেট রিপোর্টিং করাটা যে প্রায় অসম্ভব, তা বলেও কোনো কাজ হলো না। মালয়েশিয়ার মানুষকে ক্রিকেট শেখানোর জন্য যে টুর্নামেন্টের আয়োজন, স্কোরারেরও হাতেখড়ি হচ্ছে তাতেই। তাই খেলার আগে খেলোয়াড়দের চেয়েও বেশি টেনশনে আছেন স্কোরার, সাংবাদিকদের সাহায্য করবেন কীভাবে?

আয়োজকদের একটা কারণে অবশ্য ধন্যবাদ দিতে হয়। টুর্নামেন্টের প্রথম দিনেই তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সাংবাদিক হিসেবে এই টুর্নামেন্ট হবে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচশেষে টুর্নামেন্ট ভিলেজে পরিণত হওয়া ক্রাউন প্রিন্সেস হোটেলে স্থাপিত মিডিয়া সেন্টারে এসে দেখি স্কোরকার্ড-টার্ড কিছু নেই। টুর্নামেন্টের জন্য বিশাল জায়গা নিয়ে জেঁকে বসা আইসিসি সেক্রেটারিয়েটে গিয়ে স্কোরবোর্ড চাওয়ার পর প্রথমে কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি চলল। এ বলে ওর কাছে যেতে, সেখানে গেলে আবার দেখিয়ে দেওয়া হয় অন্যজনকে। শেষ পর্যন্ত একজন ম্যাচ রিপোর্ট লেখার জন্য স্কোরকার্ডের প্রয়োজনীয়তার কথাটা বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হলো। সে কারণেই শোনা গেল বিশাল এক আশ্বাসবাণী, ‘স্কোরকার্ড ফাইনাল করা হচ্ছে। আপনারা আগামীকাল তা পেয়ে যাবেন।’

সেই সকাল থেকে রোদে পুড়ে খেলা কাভার করার পর কুয়ালালামপুরের ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামে ধুঁকতে ধুঁকতে হোটেল ফেরা বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা এরপরও যে ওই ভদ্রলোককে মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি দৈনিক পত্রিকার কাজ ও রিপোর্টিং সম্পর্কে কিছু জানেন’-এটা তাঁদের অসীম ধৈর্য্যের পরিচায়ক। ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে অবশ্য সময় লাগল না। টুর্নামেন্টের সাংগঠনিক কমিটির কর্মকর্তা ক্রিস সায়েরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাদানুবাদই হলো। কিছুক্ষণ পর মিডিয়া সেন্টারে তাঁর একজন প্রতিনিধি এলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সমস্যা সম্পর্কে জানতে। খুবই মৃদুভাষী ওই শিখ ভদ্রলোক সব সমস্যার কথাই খুব সহানুভুতির সঙ্গে শুনলেন, তারপর বললেন,‘আর কোনো দেশের সাংবাদিক তো এত সব চাচ্ছে না। তবে আমি এগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাব।’

কিন্তু বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা ম্যাচের স্কোরকার্ড পাব কোথায়? না, এ ব্যাপারে আজ তাঁরা কিছু করতে পারবেন না। বাধ্য হয়েই বাংলাদেশ দলের যে নিজস্ব স্কোরবুক আছে, সেটি আনতে ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু লিপু ভাই রুমে নেই। এর মধ্যেই সময় চলে গেছে অনেক, বেলা ৩টায় শেষ হওয়া ম্যাচ নিয়ে ৭টাতেও লিখতে বসতে পারছি না। উদ্ধার করলেন আর্জেন্টিনা দলের ম্যানেজার ক্রিস্টিয়ান নিনো। লিফটের সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা, তাঁর কাছে থেকে আর্জেন্টিনা দলের স্কোরবুক নিয়ে তা ফটোকপি করে কাজ সারা হলো। পরের ম্যাচগুলোয় আর টুর্নামেন্ট কমিটির ভরসায় থাকিনি। বাংলাদেশ দলের স্কোরবুকই বাঁচিয়েছে আমাদের।

প্রেসবক্স বলতে তো কিছু ছিলই না, অনেক সময় চেয়ার-টেবিল টেনে বসার ব্যবস্থা করতে হয়েছে আমাদের নিজেদেরকেই

টুর্নামেন্টের প্রথম দিনই দারুণ উপকরা করা ওই আর্জেন্টাইন ভদ্রলোকের সঙ্গে পরবর্তী দেখাটা হলো বাজে একটা কারণে। আয়ারল্যান্ড-বাংলাদেশ খেলায় ম্যাচ রেফারি ছিলেন এই নিনো। বৃষ্টির পর দুই আম্পায়ার যখন খেলা শুরু করে আবার তা বন্ধ করে দিলেন, তখন নিনোকে গিয়ে বললাম, ‘আমরা বাংলাদেশের মিডিয়া, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ প্রথমে তো তিনি কথা বলতেই রাজি নন। ‘আপনাকে বলতেই হবে, কারণ আমাদের পত্রিকা অফিস পয়সা খরচ করে পাঠিয়েছে, আমাদের দেশের মানুষের জানার অধিকার কাছে কী কারণে খেলা বন্ধ হলো’এই কথাগুলো যেভাবে বলেছিলাম, সাংবাদিক হিসেবে তা আমার অধিকারের আওতায় পড়ে না।

কিন্তু তখন আর সেসব নীতিমালা মনে নেই। বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠে যাচ্ছে, হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে নিছকই একটা প্রদর্শনী ম্যাচএই আনন্দ হঠাৎই নিভে যাওয়ার যন্ত্রণা খেলোয়াড়দের সঙ্গে সঙ্গে তখন সাংবাদিকদেরও সংক্রামিত করেছে। নিনো বেচারা আমার যুদ্ধংদেহী চেহারা দেখে আম্পায়াররা যে আনফিট, সে মন্তব্যে পর্যন্ত একমত পোষণ করে প্রায় দৌড়ে তাঁর রুমে ঢুকে গেলেন। নিনোর আর কী দোষ, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ম্যাচে এমন কঠিন দায়িত্ব পালন করার মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর থাকলে তো!

টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটা ছিল এই নিনোর দেশ আর্জেন্টিনার সঙ্গেই। ইউনিভার্সিটি অফ মালয় মাঠে সেই ম্যাচে খুব বেশি হলে শ’ খানেক দর্শক। সেই ম্যাচশেষে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক গুইলেরমো ক্রিসবাউমের সঙ্গে কথা বলতে ওদের ড্রেসিংরুমে গেছি। ম্যাচ নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ক্রিসবাউম বললেন, তাঁর দলের তরুণ খেলোয়াড়দের খুব সমস্যা হয়েছে। কারণ, এত দর্শকের সামনে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁদের নেই! সেই আর্জেন্টিনা দলের ম্যানেজারের সংখ্যায় তার চেয়ে পাঁচগুণ এবং চিৎকার-চেচাঁমেচিতে দশগুণে রূপ নেওয়া দর্শকদের সামনে তো হকচকিয়ে যাওয়ারই কথা।

নিনোর সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছিলাম, তা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারত রঞ্জন। হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আরও গুরুতর অভিযোগ করার সুযোগ ছিল তাঁর। তবে আমরা ধারণা, সেদিন ম্যাচশেষে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমের আশপাশে থাকলে রঞ্জন নিজেই কাঁদতে শুরু করত। বৃষ্টির পর আবার খেলা শুরু হলে বাকি অংশটুকু বাংলাদেশ দলের সঙ্গে বসেই দেখেছি। পাশে বসে বল বাই বল স্কোরিং করছেন ফিজিওর কাজ চালানো ডাক্তার জাওয়াদ, তাঁর পাশে ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু কখনও কখনও আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন, কখনও হতাশার কালো মেঘ ঢেকে দিচ্ছে তাঁর চোখ-মুখ। পেছনে বসা বুলবুল বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন সারাক্ষণ। ওর চোখমুখ দেখে খুব মায়া হলো, কিন্তু ওকে কী বলব, নিজেরই তখন অবস্থা খারাপ। নিজের পেশার ওপর রাগও হলো খানিকটা। টেনশনে সারা শরীর কাঁপছে, এই অবস্থায় নোট নেওয়া যায়!

আরেকটি দিন, আরেকটি ম্যাচ....

টেনশনটা আস্তে আস্তে দলা পাকাচ্ছিল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেই। হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গিয়েছিলাম। পরদিন খুব ভোরে রওনা হতে হবে, রাবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট মাঠ কুয়ালালামপুর শহর থেকে সবচেয়ে দূরে। তার চেয়েও বড় কথা, সাতটা থেকে কুয়ালালামপুর পরিণত হবে জ্যামের শহরে, তার আগেই বেরিয়ে যেতে হবে শহর ছেড়ে। এই জ্যামের ভয়েই আমরা অধিকাংশ সাংবাদিক সেদিন কাকভোরে মাঠে গিয়ে পৌঁছেছি। মালয়েশিয়ায় সকাল হয় সাতটার পর, তাই মাঠে পৌঁছেও দেখেছি স্ট্রিট লাইট জ্বলছে তখনও, মাত্র ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে সূর্য।

হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগের রাতে খুব তাড়াতাড়ি লাইট-টাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে কোনোই লাভ হলো না। পাশের রুমে থাকা বাংলাদেশের অন্য দুই সাংবাদিকেরও একই অবস্থা। সারা রাত নির্ঘুমই কাটল! রাত শেষ হলো পরের দিনের ম্যাচ নিয়ে আলাপ করেই। রসিকতা করলাম, ‘এই রাতের ঘুম হল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের জন্য মানত করা হলো।’ সেই মানতের জন্য নিশ্চয়ই নয়, বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা অসাধারণ খেলেই ছিনিয়ে এনেছেন অবিস্মরণীয় এক জয়। সাংবাদিকদেরই যদি টেনশনে রাতের ঘুম শেষ হয়ে যায়, ম্যাচের সময় নোট করতে সমস্যা হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের টেনশনটা তো অনুমানই করা যায়। তাঁদেরকে তো খেলতে হচ্ছে! আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের সাফল্যকে এই একটি কারণে আরও ওপরে জায়গা দিতে হবে। আর কোনো দলের ওপর তো প্রত্যাশার এই পর্বতপ্রমাণ চাপ ছিল না।

সেই চাপ আরও বিশাল আকার নিয়ে চেপে বসেছিল আকরাম খানের ওপর। পুরো দেশের ভার কাঁধে নিয়ে কী অসাধারণ এক ইনিংসই না খেললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক! হারিয়ে যেতে বসা স্বপ্ন যখন হঠাৎ ফিরে এসে দারুণ ঔজ্জ্বল্যে চোখ ধাঁধিয়ে দিল, তখন আর কিছু মনে নেই। লিপু ভাইকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, এটা মনে আছে। হয়তো একটু বেশি জোরেই, তবে তাই বলে তাঁর ঘাড়ের ব্যথাটা আমার উচ্ছ্বাসের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে যে ধারণা করছেন তিনি (এখনও নাকি সেই ব্যথাটা আছে!), তাঁর সঙ্গে আমি একমত নই। আমার ধারণা, ক্রাউন প্রিন্সেসের জিমনেসিয়ামে গিয়ে তাঁর শান্ত-জাকিরদের বয়সে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হওয়াটাই এর কারণ। হাসতে হাসতে একদিন লিপু ভাই বলছিলেন,‘জিমনেসিয়ামে ঢুকলে আর বেরুতে ইচ্ছে করে না। এরকম একটা জিমনেসিয়াম পেলে এত তাড়াতাড়ি খেলা ছাড়তে হতো না।’ আরেকটা সম্ভাবনার কথাও মনে হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তোয়ালে দিয়ে মাঠ শুকাতে যে পাগলের মতো পরিশ্রম করেছেন বাংলাদেশ ম্যানেজার, খেলা চলার সময় যেভাবে ছটফট করেছেন উত্তেজনায়তারই কোনো একটা মুহূর্তও চিহ্ন রেখে যেতে পারে লিপু ভাইয়ের ঘাড়ে।

কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকরাম খান ও ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক

ফাইনালটি হয়েছে ক্লাসিক এক ওয়ানডে ম্যাচ। তবে সেটা হারলে এমন কোনো সর্বনাশ হয়ে যেত না, তাই খুব বেশি টেনশন ছিল না সেটিকে ঘিরে। তবে শেষ দিকের কথা আলাদা। সেমিফাইনাল তো দুদিনে গড়িয়ে আনন্দটাকেও দুভাগ করে দেয়। হল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টিতেই ছিল আসলে ক্রিকেট মহাকাব্যের সব উপাদান। লেখার জন্য স্বপ্নের এক ম্যাচ! কিন্তু আবেগের কাছে এত বেশি সমর্পিত হয়ে পড়ার পর ভালো লেখা খুব কঠিন। তারপরও যা লিখলাম, সেদিনই ফ্যাক্সের লাইন সবচেয়ে বেশি শত্রুতা করতে শুরু করল! মিডিয়ার প্রতি আয়োজকদের উদাসীনতার পাশাপাশি এই ফ্যাক্সও বড় ভুগিয়েছে মালয়েশিয়ায়। ঢাকার লাইন পাওয়াটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল রীতিমত সাধানার ব্যাপার।

তবে আইসিসি ট্রফির কথা উঠলে এখন আর এসব কষ্টের কথা মনে পড়ে না। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ দিয়ে সব কষ্টই মুছে দিয়েছেন আমাদের ক্রিকেটাররা। সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার জন্য যে টুর্নামেন্টটিকে দুঃস্বপ্ন বলা চলে, সেটিই এখন অনিঃশেষ এক সুখের অনুভব। এখন স্বপ্ন দেখতে সাহস হয়, একদিন বিশ্বকাপ নিয়ে আকাশ থেকে নামবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। সেদিনের জন্য অপেক্ষাটা এখন আর ক্লান্তিকর মনে হবে না। মাঝের সময়টায় গল্প করার মতো অনেক কিছু জমে গেছে এই একটি টুর্নামেন্টেই। এই গল্পের লেখকদের আরও একবার কৃতজ্ঞতা জানাতে ইচ্ছে করছে!