সাকিব আল হাসানকে কি এখন তাহলে টেস্ট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার বলে ‘অফিসিয়ালি’ ঘোষণা করে দেওয়া যায়? কেন, কেন, গ্যারি সোবার্সের কী হলো? 

সোবার্সে আসার আগে একটা ব্যাপার বোধ হয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। হঠাৎ এই ঘোষণা দেওয়ার উপলক্ষটা কী? বলছি, বলছি। তার আগে ‘সর্বকালের সেরা’ কথাটা নিয়ে একটু আলাপ করে নেই। 'সর্বকালের সেরা' কাকে বলে বা বলা হবে, এর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা যে নেই, তা তো আপনিও জানেন। ব্যক্তিভেদে একেকজনের চোখে তা একেকজন হতে পারেন। ফুটবলেই যেমন ‘পেলে না ম্যারাডানা’ হয়ে আছে চিরকালীন এক তর্কের নাম। তবে ক্রিকেটে এই অভিধাটা প্রায় প্রশ্নাতীতভাবে সব সময়ই পেয়ে এসেছেন স্যার গ্যারি সোবার্স। ইদানীং অবশ্য অনেকেই পরিসংখ্যান সামনে নিয়ে এসে প্রশ্ন তোলেন, কেন তা জ্যাক ক্যালিস নন? এখন দেখছি, সাকিবও উঠে এসেছেন চ্যালেঞ্জার হিসাবে।

অলরাউন্ডার নিয়ে আলোচনায় একটা যুক্তি সবসময়ই গ্যারি সোবার্সকে বাকিদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। অলরাউন্ডার বলতে যদি আমরা ক্রিকেট মাঠে সবকিছু করতে পারার ক্ষমতা বোঝাই, সোবার্স আক্ষরিক অর্থেই তা করতে পারতেন। বোলিংয়ে পেস-স্পিন দুটোই করতে পারা যার বড় প্রমাণ। ব্যাটসম্যান হিসাবে দুর্দান্ত, বোলার হিসাবে অমন বৈচিত্র্যময়, যেকোনো পজিশনে দারুণ ফিল্ডার–আর কি চাই! কিন্তু প্রশ্ন তো করাই যায়। ব্যাটিং-বোলিং দুটিতেই কি তিনি সমান ভালো ছিলেন? দলের বোলারদের ক্রমতালিকায় কত নম্বরে আসত তাঁর নাম?

ব্যাটিং-বোলিং দুটিতেই প্রায় সমান দক্ষতা যদি মাপকাঠি হয়, তা হলে সাকিবকেই বরং ক্রিকেট ইতিহাসের প্রায় সব অলরাউন্ডারের চেয়ে এগিয়ে রাখতে হয়। একটা সময় বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ইনিংস ও সেরা বোলিং দুটি রেকর্ডই ছিল সাকিবের। টেস্ট ইতিহাসেই কখনো কারও মাথায় এই দ্বিমুকট ওঠেনি। কিন্তু তাতেই কি আমরা ধরে নেব, সাকিব সোবার্সের চেয়েও বড় অলরাউন্ডার? তখন কি আবার এই প্রশ্ন উঠবে না, দুটিতেই সমান ভালো মানে কতটা ভালো? 

অলরাউন্ডারের কথা ভুলে যান, ব্যাটসম্যান হিসাবে গ্যারি সোবার্স সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট দলেও থাকেন। রান আর অ্যাভারেজেই এর প্রমাণ আছে। যাঁরা সোবার্সের ব্যাটিং দেখেছেন, তাঁদের সাক্ষ্যও প্রমাণ হিসাবে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৭২ সালে রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ডের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মেলবোর্নে সোবার্স ২৫৪ রানের যে ইনিংসটি খেলেছিলেন, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের মতো প্রশংসায় মিতব্যয়ী মানুষও সেটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলা সেরা ইনিংস বলে। ইয়ান চ্যাপেলের মতো একটুও বাড়িয়ে না বলার মানুষ পর্যন্ত সেই ইনিংসের কথা উঠলে ভাষা হারিয়ে ফেলেন। 

সোবার্সের সঙ্গে বা বিপক্ষে যাঁরা খেলেছেন, সবাই সোবার্সে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ। বিষেণ সিং বেদির মতো ‘নিন্দুক’ মানুষও সোবার্সকে দেখেন ‘ক্রিকেটে বিধাতার উপহার হিসাবে’। এর চেয়েও অবাক হয়েছিলাম করাচির বাড়িতে হানিফ মোহাম্মদের ইন্টারভিউ করতে গিয়ে। ব্রায়ান লারা তাঁর ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভেঙে ফেলার পর হানিফ কীভাবে সান্ত্বনা খুঁজেছিলেন, জানেন? ‘ব্রায়ান লারা গ্যারি সোবার্সের দেশের লোক’! টেকনিক্যালি কথাটা হয়তো ঠিক নয়, সোবার্স আর লারার দেশ আলাদা। এটা ধরার জন্য ধরা। হানিফ কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা তো পরিষ্কারই। বোঝাতে চেয়েছিলেন, দুজনই ওয়েস্ট ইন্ডিজের। সঙ্গে হানিফ মোহাম্মদ আরেকটা ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছিলেন। গ্যারি সোবার্সের মতো কেউ আর কোনোদিন ক্রিকেটে আসবে না।

শুনতে শুনতে বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, একজন ক্রিকেটারের কী মহিমা থাকলে এত বছর পরও প্রতিপক্ষ দলের একজন খেলোয়াড়, তা-ও আবার যেন-তেন খেলোয়াড় নন, এমন আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পারেন! এটা তো শুধু রান করে আর উইকেট নিয়ে অর্জন করার জিনিস নয়।

শুধু ব্যাটসম্যান হিসাবেই সর্বকালের সেরাদের দলে থাকেন, সঙ্গে বোলিংয়ে পেস-স্পিন দুটিই করতে পারার ক্ষমতা মিলিয়ে অলরাউন্ডার কথাটাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন গ্যারি সোবার্স। ছবি: আইসিসিশুরুতে যে প্রশ্নটা করে তার উত্তরটা ঝুলিয়ে রেখেছি, এবার তা দিয়ে ফেলি। হঠাৎ করে গ্যারি সোবার্স আর সাকিবকে নিয়ে পড়েছি কেন? কারণটা ক্রিকেটের এক নম্বর ওয়েবসাইট ইএসপিএন-ক্রিকইনফোতে পড়া একটা আর্টিকেল। যা পড়ে দারুণ লাগল। শুধু পড়েই না, দেখেও। লেখার সঙ্গে গ্রাফিকসগুলোও যে মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। পুরো জিনিসটাই করা হয়েছে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার কে–এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এজন্য আনন্থা নারায়ণ নামে এক ভদ্রলোক যে কর্মযজ্ঞটা করেছেন, তাতে এক কথায় আমি রীতিমতো চমৎকৃত।  

কে কার সম্পর্কে কী বলেছে, কার কেমন নাম-ডাক এসব ভুলে গিয়ে তিনি উত্তর খুঁজেছেন নির্জলা পরিসংখ্যানে। এছাড়া আর পথই বা কী! প্রাতঃস্মরণীয় নেভিল কার্ডাস যতই বলে গিয়ে থাকুন, 'পরিসংখ্যান একটা আস্ত গাধা'; কিছু তর্কের মীমাংসায় পরিসংখ্যানের দ্বারস্থ হওযা ছাড়া আবার উপায়ও থাকে না। তা-ই হয়েছেন আনন্থা নারায়ণ। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার নির্বাচন করতে যে পদ্ধতিটার আশ্রয় নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। ওই আর্টিকেলটা যদি এরই মধ্যে আপনিও পড়ে/দেখে থাকেন, তাহলে তো জানেনই, তথ্যউপাত্ত-পরিসংখ্যান সবকিছু অভিনব উপায়ে বিশ্লেষণ করে আনন্থা নারায়ণ যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার গ্যারি সোবার্স নন। সোবার্সকে টপকে এক নম্বর আসলে সাকিব আল হাসান।

ক্রিকইনফোর লেখাটা যাঁরা পড়েননি, তাঁদের তো ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করে বলতে হয়। সাকিবই টেস্ট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল। তা-ই অবশ্য হওয়ার কথা। এ কারণেই ভাবছি, এই লেখার শেষে ক্রিকইনফোতে আনন্থা নারায়ণের লেখার লিংকটা দিয়ে দেব কি না। কারও যদি বিস্তারিত জানার ইচ্ছা থাকে, জেনে নিতে পারবেন। আমি এখানে সংক্ষেপে প্রক্রিয়াটা যতটা সহজ করে সম্ভব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। যে প্রশ্নটা সবার মনেই প্রথমে আসা উচিত, আনন্থা নারায়ণও সেটিই আগে পরিষ্কার করে নিয়েছেন। সাধারণ অর্থে অলরাউন্ডার মানে তো ব্যাটিংয়ে ভালো, বোলিংয়েও ভালো। কিন্তু সেই 'ভালো' কতটা ভালো হলে আমরা তাঁকে জেনুইন অলরাউন্ডারের স্বীকৃতি দিতে পারি?

এমনিতে অলরাউন্ডারের কার্যকারিতা বিবেচনায় ব্যাটিং গড় আর বোলিং গড়ের পার্থক্যের আশ্রয় নেওয়ার একটা রীতি সেই অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। এই দুই অ্যাভারেজে পার্থক্য যাঁর যত কম, তিনি ততই ভালো। মানে ব্যাটিং-বোলিং দুটিতেই তাঁর দক্ষতা খুব কাছাকাছি।কিন্তু এটাতে একটু ফাঁক আছে। যেমন ধরুন, দুজন অলরাউন্ডারের মধ্যে একজনের ব্যাটিং গড় ৫০, বোলিং গড় ৪০; আরেকজনের তা ৩০ ও ২০। ব্যাটিং গড় আর বোলিং গড়ের পার্থক্য দুই ক্ষেত্রেই ১০। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন, দ্বিতীয়জন দলের জন্য অনেক বেশি অনেক বেশি কার্যকরী।

এই স্যালুটটা দিয়েছিলেন বেন স্টোকসকে। অলরাউন্ডার হিসাবে গ্যারি সোবার্সকেও নিশ্চয়ই তা-ই দেবেন সাকিব আল হাসান। ছবি: মোহাম্মদ মানিক

এটা আমি যেমন আগে থেকেই জানি, আপনিও হয়তো জানেন। আনন্থা নারায়ণ সেটাই শুধু আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। আর ব্যাটিং গড়ে যে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, তা বুঝে নিজের মতো একটা সমাধান তিনি আগেই করে রেখেছেন। সেই শুভঙ্করের ফাঁকিটা কী? আপনি যত বেশি নট আউট থাকবেন, ততই আপনার ব্যাটিং অ্যাভারেজ বেড়ে যাবে। কিন্তু ওপেনার বা টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের তুলনায় পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের নট আউট থাকার সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। তাঁদের ব্যাটিং অ্যাভারেজেও তাই সেটির প্রতিফলন। আনন্থা নারায়ণ তাই সরাসরি ব্যাটিং অ্যাভারেজ বিবেচনায় না নিয়ে 'ওয়েটেড ব্যাটিং অ্যাভারেজ', সংক্ষেপে ডব্লিউবিএ বলে একটা জিনিস বের করেছেন। খুব সংক্ষেপে বললে যেটির প্রথম ধাপ হলো, নট আউট-আউট বিবেচনায় না নিয়ে মোট রানকে মোট ইনিংস দিয়ে ভাগ করে আরপিআই, মানে রান পার ইনিংস বের করে নেওয়া। কিন্তু তাতে নট আউট ইনিংসগুলোর প্রতি আবার অবিচার হয় না? সেগুলো যেহেতু শেষ হয়নি, ধরে নিতে হবে, তা আরও বড় হওয়ার অনন্ত সম্ভাবনা ছিল। ওয়েটেড ব্যাটিং অ্যাভারেজ এটাও বিবেচনায় নিয়েছে। আরপিআই-য়ের চেয়ে বড় নট আউট ইনিংসগুলোকে শেষ হয়ে যাওয়া ইনিংস বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আরপিআইয়ের চেয়ে কম নট আউট ইনিংসগুলোকে সম্পূর্ণ ইনিংসের কত অংশ ধরা হবে, তা বের করতে সেগুলোকে ভাগ করা হয়েছে আরপিআই দিয়ে। খুব জটিল মনে হচ্ছে, তাই তো?

প্রক্রিয়াটা বোঝাতে আনন্থা নারায়ণ যে উদাহরণটা দিয়েছেন, সেটার বঙ্গানুবাদ করলে একটু সহজ, বরং বলা ভালো, একটু কম কঠিন মনে হতে পারে। যেমন ধরুন, টেস্টে ডন ব্র্যাডম্যানের ৮০ ইনিংসের ১০টি নট আউট ইনিংস হলো: ৩০*, ৩৭*, ৫৬*, ৫৭*, ১০২*, ১০৩*, ১২৭*, ১৪৪*, ১৭৩* ও ২৯৯*। ব্র্যাডম্যানের ক্যারিয়ার আরপিআই, মানে রান/ইনিংস ৮৭.৪৫ (৬৯৯৬/৮০)। বোল্ড টাইপের শেষ ৬টি নট আউট ইনিংস আরপিআই-য়ের চেয়ে বেশি, এগুলোকে তাই শেষ হয়ে যাওয়া ইনিংস বলে ধরা হবে। ইটালিক করা প্রথম চারটি ইনিংস আরপিআই-য়ের চেয়ে কম। ব্র্যাডম্যানের ওয়েটেড ব্যাটিং অ্যাভারেজ হবে তাই ৮৯.৬২ (৬৯৯৬/৭৮.০৬)। এই ৭৮.০৬-টা কোত্থেকে এলো?

এটা এসেছে এভাবে: ৭০ (আউট হওয়া ইনিংস)+৬ (আরপিআইয়ের চেয়ে বেশি রানের নট আউট ইনিংস)+২.০৬ (আরপিআই-য়ের চেয়ে কম রানের নট আউট ইনিংসগুলোর যোগফল ১৮০/আরপিআই ৮৭.৪৫)=৭৮.০৬।

ওয়েটেড ব্যাটিং অ্যাভারেজ (ডব্লিউবিএ) বস্তুটা বোঝানোর এই প্রাণান্ত চেষ্টার কারণ আছে। কারণ অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিং করতে আনন্থা নারায়ণ অনুসৃত পদ্ধতিতে এটাই ব্যবহৃত হয়েছে। অলরাউন্ডার হিসাবে কারা বিবেচিত হবেন, এ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন নারায়ণ। আমি সংক্ষেপে সারি। প্রথম ছয়ে ব্যাটিং করতে হবে এবং দলের প্রথম তিন বোলারের মধ্যে থাকতে হবে, অংকের হিসাবে বললে ডব্লিউবিএ ৩৫-এর বেশি হতে হবে আর বোলিং অ্যাভারেজ ৩০-এর কম, প্রথমে এটাকে অলরাউন্ডারের সংজ্ঞা ধরে নিয়েছিলেন নারায়ণ। কিন্তু ৫-১০ পার্সেন্ট ছাড় দিয়েও দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার কিথ মিলার (ডব্লিউবিএ ৩৫, বোলিং অ্যাভারেজ ২৩) আর বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান (ডব্লিউবিএ ৩৭.১, বোলিং অ্যাভারেজ ৩১.১) ছাড়া আর কেউই এই শর্ত পূরণ করতে পারেন না।

ব্যাটসম্যান সোবার্স। বল যে সীমানার বাইরে, তা অনুমান করতে সমস্যা হচ্ছে না। ছবি: আইসিসি

২০০০ রান ও ১০০ উইকেটকে মানদন্ড ধরেও একটা চেষ্টা করেছিলেন। তাতে দেখা যায়, টেস্ট ইতিহাসে মাত্র ২০ জনকে অলরাউন্ডার বলা যাচ্ছে। সংখ্যাটা বাড়াতে আনন্থা নারায়ণ শেষ পর্যন্ত তাই কমপক্ষে ১৫০০ রান ও ৫০ উইকেট অথবা ১০০০ রান ও ৭৫ উইকেটকে মানদন্ড হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন। অনেক টেস্ট খেলার কারণে রানের শর্তটা পূরণ করে ফেলেছেন, এমন বোলারদের বাদ দিয়েছেন (উদাহরণ কুম্বলে, ওয়ার্ন, ওয়াকার, ভাস, ব্রড)। টেস্ট-প্রতি কমপক্ষে একটি উইকেট নেই, এমন ব্যাটসম্যানদেরও (উদাহরণ গেইল, মার্ক ওয়াহ, আসিফ ইকবাল)।   

এতে অলরাউন্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১। এই ৫১ জনের অলরাউন্ড সূচক বের করতে আনন্থা নারায়ণ যে ফর্মুলাটা ব্যবহার করেছেন, তা পাঁচটি সূচকের যোগফল: ব্যাটিং (২৫ পয়েন্ট)+ বোলিং (২৫ পয়েন্ট)+ প্রতি টেস্টে অলরাউন্ড অবদান (২০ পয়েন্ট)+অলরাউন্ড প্রভাব (২০ পয়েন্ট)+ অলরাউন্ড তীব্র প্রভাব (১০ পয়েন্ট)। ইমপ্যাক্ট আর হাই ইমপ্যাক্টের বাংলা হিসাবে প্রভাব আর তীব্র প্রভাবটা কেমন শোনাচ্ছে জানি, কিন্তু আর কোনো শব্দ মাথায় আসছে না। এরপর থেকে তাহলে ইমপ্যাক্টই লিখি, কী বলেন?

প্রতিটি সূচক আলাদা করে ব্যাখ্যা করতে গেলে এই লেখা আর শেষ হবে মনে হয় না। আমি তাই শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই। ব্যাটিং সূচকের জন্য নারায়ণ ব্যবহার করেছেন তাঁর উদ্ভাবিত ওই ওয়েটেড ব্যাটিং অ্যাভারেজ। তাঁর নির্ধারিত মানদন্ডে পুরো ২৫ পয়েন্ট পেতে ডব্লিউবিএ হতে হবে ৫৭.৫। কারোরই তা নেই। এই ৫১ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ডব্লিউবিএ সোবার্সের ৫১.৪৭। তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ ২২.৪ পয়েন্ট অর্থাৎ প্রায় ৯০ পার্সেন্ট নাম্বার। পরের দুটি সূচক নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় আর না যাই। কিন্তু ইমপ্যাক্ট আর হাই ইমপ্যাক্ট নিয়ে একটু বলতেই হবে। কারণ এই দুই ক্ষেত্রেই সাকিব আল হাসান এক নম্বর। তাঁর খেলা ৫৭ টেস্টের ২৩টিতেই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য নির্ধারিত মানদন্ড ছুঁয়ে অলরাউন্ড ইমপ্যাক্টের জন্য সম্ভাব্য ২০ পয়েন্টের মধ্যে ১৭.৫ পেয়েছেন তিনি। আনন্থা নারায়ণ হাই ইমপ্যাক্টের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, 'ওয়ান্স ইন আ লাইফ টাইম পারফরম্যান্স'। রান-উইকেটে যেটি অনূদিত হয়েছে ব্যাটিংয়ে ১০০ রানের বেশি ও বোলিংয়ে কমপক্ষে চার উইকেট। সাকিব নয় টেস্টে এই শর্ত পূরণ করায় পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৯ পয়েন্ট।

পাঁচটি সূচক যোগ করে দেখা যাচ্ছে, সাকিব দশমিক চার পয়েন্টের ব্যবধানে গ্যারি সোবার্সকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। এতে ওই অলরাউন্ড ইমপ্যাক্ট আর অলরাউন্ড হাই ইমপ্যাক্টের বড় ভূমিকা। যে ৫৭টি টেস্ট খেলেছেন, তার ৪০ শতাংশ ম্যাচেই ব্যাটে-বলে বড় প্রভাব ফেলেছেন সাকিব। হাই ইমপ্যাক্টের শর্ত এক শর বেশি রান আর চার বা এর বেশি উইকেটের যুগলবন্দি হয়েছে প্রতি ছয় টেস্টে একবার। ঘটনাচক্রে এটা আবার মিলে গেছে গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে। বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচে সাকিবের অলরাউন্ড ইমপ্যাক্ট বা হাই ইমপ্যাক্ট  সম্পর্কিত তথ্যটা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। আমরা সবাই তা জানি।

 প্রতি ছয় টেস্টে একবার এক শর বেশি রান আর চার বা এর বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তিই চিনিয়ে দেয় অলরাউন্ডার সাকিবকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

অলরাউন্ডার হিসাবে সাকিব যে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারেন, এই তথ্যও অজানা কিছু নয়। মিরপুরে তাঁর ৫০তম টেস্টে অবিশ্বাস্য এক অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়ার পর সাকিবকে নিয়ে একটা লেখা লিখতে গিয়ে নিতান্তই কৌতূহলভরে ক্রিকেট ইতিহাসের অলরাউন্ড গ্রেটদের সঙ্গে সাকিবের পরিসংখ্যান একটু মিলিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। তা দেখতে গিয়ে বিষম চমক। প্রথম ৫০ টেস্টের পারফরম্যান্স ধরলে গত শতকের আটের দশকের বিখ্যাত চার অলরাউন্ডার এবং এর আগে-পরের দুই গ্রেট সোবার্স ও ক্যালিস কারও চেয়েই তো তিনি পিছিয়ে নেই।   

এর কিছুদিন পর আমার 'এগারো' বইয়ে সাকিব-অধ্যায়টা লেখার আগে সীমানাটা ছড়িয়ে দিয়েছিলাম টেস্ট থেকে ওয়ানডেতেও। বাহন ছিল অবশ্যই পরিসংখ্যান। তখন পর্যন্ত সাকিব খেলেছিলেন ৫৫টি টেস্ট ও ১৯৫টি ওয়ানডে। টেস্টের ক্ষেত্রে ৫৫ টেস্ট শেষে বাকিদের রান-উইকেটের সঙ্গে সাকিবের রান-উইকেটের তুলনাই যথেষ্ট ছিল। ওয়ানডেতে একটু সমস্যায় পড়েছিলাম। সোবার্স মাত্র একটিই ওয়ানডে খেলেছেন বলে তিনি না হয় বাদ। বাকিদের মধ্যেও যে কপিল আর ক্যালিস ছাড়া আর কেউ ১৯৫টি ওয়ানডে খেলেননি। এই দুজনের সঙ্গে সরাসরি তুলনা হলো। বাকিদের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ—ইমরান (১৭৫), বোথাম (১১৬), হ্যাডলির (১১৫) সমান ম্যাচ খেলার পর সাকিব কোথায় ছিলেন। তা করতে গিয়েই দেখলাম, সাকিব কারও চেয়ে কম যান না! কেউ রানে এগিয়ে থাকলে সাকিব উইকেটে এগিয়ে, কারও ক্ষেত্রে বা উল্টোটা। যা থেকে সরল সমীকরণ করে নিয়েছিলাম—সাকিব শুধু বর্তমান সময়েরই নয়, ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা অলরাউন্ডারদের একজন।

তাই বলে টেস্ট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার হিসাবে সাকিব সোবার্সকেও ছাড়িয়ে এক নম্বর, এটা মানতে একটু সমস্যাই হচ্ছে। আনন্থা নারায়ণ একভাবে হিসেব করেছেন, আরেকজন হয়তো অন্যভাবে করবেন। সেটি হয়তো আমাদের অন্য সিদ্ধান্তের কথা জানাবে। নারায়ণের সেরা বিশের তালিকাটা দেখলেই তো মনে অনেক প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। সাকিব-সোবার্সের পর সেখানে তিন নম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার অব্রে ফকনার, যাঁর ২৫ টেস্টের বেশির ভাগই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে। ফকনারের পর কিথ মিলার-জ্যাক গ্রেগরিকে না হয় একটু গাইগুঁই করে মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু এরপরই ক্রিস কেয়ার্নস? বোথাম-ইমরান-হ্যাডলি-কপিলেরও আগে! কপিল তো কথার টানে চলে এলেন, নইলে অনন্থা নারায়ণের হিসাবে তো টেস্ট অলরাউন্ডারদের মধ্যে সেরা বিশেও কপিল দেবের নামগন্ধ নেই। অথচ ভারতের তিনজন কিন্তু আছেন এখানে। এঁদের মধ্যে ভিনু মানকড় পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে বেঁচেছেন। রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা টেস্ট ইতিহাসের সেরা বিশ অলরাউন্ডারের তালিকায় কপিল দেব নেই, অথচ তাঁরা আছেন শুনলে বিষম লজ্জা পাবেন বলে অনুমান করি। আটের দশকের অলরাউন্ডার চতুষ্টয়ের মধ্যে বাকি তিনজন অবশ্য আছেন সেরা বিশে। বোথাম আর ইমরান সাত আর আট নম্বরে। ১২ নম্বরে হ্যাডলি। 

  একই সময়ের দুর্দান্ত চার অলরাউন্ডার। ইমরান-বোথাম-হ্যাডলি প্রথম বারোর মধ্যে থাকলেও সেরা বিশেও নেই কপিল দেব! ছবি: উইজডেন

আনন্থা নারায়ণের সেরা বিশে আরও অনেক বিস্ময় আছে। এর একটা, জ্যাক ক্যালিসের নাম ১০ নম্বরে। বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের সেরা অলরাউন্ডার হিসাবে যাঁকে আমি সাকিবের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করি, সেই বেন স্টোকস আছেন ১৬ নম্বরে। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসাবে কপিল দেবের অনুপস্থিতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছে ববি সিম্পসনের উপস্থিতি। ব্যাটিংয়ে সিম্পসনের ট্রিপল সেঞ্চুরিও আছে, কিন্তু বোলিংয়ে তো ৪২.৩ গড়ে ৬২ টেস্টে ৭১ উইকেট। তিনিই কিনা টেস্ট ইতিহাসের ১৯তম সেরা অলরাউন্ডার!

এসব তালিকাকে তাই মজা হিসাবে ধরে নেওয়াই ভালো। তবে সাকিবের নামটা এক নম্বরে আসায় একটা কারণে আমি খুশি হয়েছি। আমার সব সময়ই মনে হয়, শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটার বলেই সাকিব বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটা পাচ্ছেন না। যেখানে বেশির ভাগ সময়ই তুলনায় বেশি শক্তিধর প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে হয় বলে অন্যদের চেয়ে উল্টো তাঁর বাড়তি কিছু গ্রেস মার্ক পাওয়া উচিত। তা-ও ভালো, আইসিসি র‍্যাঙ্কিংটা চালু করেছিল। অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর স্থানটাকে এক সময় প্রায় নিজের সম্পত্তি করে নিয়েছিলেন বলে বহির্বিশ্ব সাকিবকে একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেনি। আনন্থা নারায়ণের গবেষণাকর্মের উদ্দেশে এ কারণেই আমি একটা করতালি দিতে চাই। ক্রিকইনফোর মতো প্রভাবশালী মাধ্যমে এটির প্রকাশ  ক্রিকেট বিশ্বে সাকিব-মহিমা একটু হলেও তো উজ্জ্বল করবেই।

আর বাংলাদেশের মানুষ হিসাবে আমাদের তো এতে খুশি না হওয়ার কোনো কারণই নেই। আমিও খুশি। তবে আরও খুশি হতাম, যদি গ্যারি সোবার্স এক নম্বরে থেকে সাকিব দুইয়ে থাকতেন। কেন, জানতে চান? তাহলে স্মৃতি থেকে পুরোনো একটা ঘটনা বলি। বছর বিশ-বাইশ আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ঢুকে রিকার্ডো পাওয়েল নামে এক জ্যামাইকান ব্যাটসম্যান দু'একটা ছক্কাবহুল ঝোড়ো ইনিংস খেলার পর অনেকে তাঁর সঙ্গে ভিভ রিচার্ডসের তুলনা করতে শুরু করেছিলেন। কলকাতার সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য তখন প্রথম আলোর স্টেডিয়াম পাতায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর একটা কলাম ছিল ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে রিকার্ডো পাওয়েলের তুলনা করা নিয়ে। যেটির তিনি শিরোনাম দিয়েছিলেন, 'ভিভকে শান্তিতে থাকতে দিন।'

গৌতমদার অনুকরণে আমিও বলতে চাই, 'সোবার্সকে শান্তিতে থাকতে দিন।'

ক্রিকইনফোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পড়তে......

আরও পড়ুন:
সাকিবই ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার?