বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৪৩/৭

আগের আটটি ম্যাচের দিকে দৃষ্টি ফেরানোর পর এ কথা বলতে সাহস লাগে। সেই সাহস ছিল অধিনায়ক আকরাম খানের। সাহস না বলে বলা উচিত, ব্যাটসম্যানদের ওপর আস্থা। সেমিফাইনালের আগে আকরাম বলেছিলেন, ‌‘এখন পর্যন্ত হয়তো আমরা প্রমাণ দিতে পারিনি। তারপরও আমি বলব, ব্যাটিংই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ডিপার্টমেন্ট।’

এর প্রমাণ দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর বেছে নিতে পারতেন না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। বোলারদের ভালো পারফরম্যান্সের কারণে টসে জিতলে প্রথমে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত করে ফেলেছিল বাংলাদেশ দল। টসে হারার পর তাই যখন ব্যাট করতে নামতে হয়, তখন মনে একটু অস্বস্তি থাকা ছিল খুবই স্বাভাবিক। আগের ম্যাচগুলোতে টপ অর্ডার সেভাবে ক্লিক করেনি, তাই চাপ একটা ছিলই। সেমিফাইনালের মতো প্রেশার ম্যাচ, যেটি জিতলেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত–সেটিতেই বাংলাদেশের ব্যাটিং প্রকাশিত হলো পরিপূর্ণ মহিমায়। টুর্নামেন্টে অন্য দলের ব্যাটসম্যানরা যখন পাওয়ার ক্রিকেটের নমুনা রেখেছেন, তখন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা উপমহাদেশীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের ছাপ রেখেছেন তাঁদের ব্যাটিংয়ে। টাইমিং, প্লেসমেন্টকে অবলম্বন মেনেও যে বুনো শক্তির প্রদর্শনীকে মোকাবিলা করা যায়, তার প্রমাণ কাল ভালোই পেয়েছে স্কটল্যান্ড দল।

তবে বাংলাদেশের ইনিংসেও পাওয়ার ক্রিকেট একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। রফিক একাই হয়ে দাঁড়িয়েছেন সেই পাওয়ার ক্রিকেটের প্রতীক। এর সঙ্গে বুলবুল ও নান্নুর শিল্পিত ইনিংস, পাইলটের সাহসী ব্যাটিং মিলে এমন একটা অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ, যেখান থেকে বাংলাদেশের জন্য এই সেমিফাইনাল হারা হবে কঠিন কাজ। কিলাত কেলাব মাঠের উইকেট স্লো, আউটফিল্ড তার চেয়েও এক কাঠি সরেস, তারপরও বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ২৪৩ রানের বিরাট একটা সংগ্রহে পৌঁছুতে পেরেছে বুলবুল ও পাইলটের গড়ে দেওয়া ভিত্তির কারণে।

শুরুটা সেরকম আহামরি কিছু হয়নি। আতহার ও দুর্জয়ের উদ্বোধনী জুটি কালও ভালো সূচনা করতে পারেনি। স্কটিশ অধিনায়ক জর্জ স্যালমন্ড দ্বিতীয় ওভারেই নতুন বল তুলে দিয়েছিলেন অফ স্পিনার ইয়ান বেভানের হাতে। দুই পা দৌড়ে এসে জোরের ওপর বল করেন বেভান। সেমিফাইনালের আগে ৭ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে তিনিই স্কটল্যান্ডের সফলতম বোলার। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদেরও বেভান যথেষ্টই ভুগিয়েছেন। তাঁর তৃতীয় ওভারের প্রথম বলেই আতহারকে তুলে নেন তিনি। শুরু থেকেই আস্থাহীনতায় ভুগতে থাকা আতহার ১৭ বল খেলে করেছেন ৫ রান। ১২ রানেই এই ধাক্কা সামলানোর জন্য নামতে হয় এর আগে টুর্নামেন্টে মাত্র দুটি বল খেলার সুযোগ পাওয়া পাইলটকে।

দুর্জয় ও পাইলট সে লক্ষ্যে ভালোমতোই এগোচ্ছিলেন। বিশেষ করে দুর্জয় তাঁর দুর্দান্ত স্ট্রোক-প্লের মাধ্যমে অনেকটাই হালকা করে দিয়েছিলেন চাপটা। বড় একটা ইনিংস খেলার পূবার্ভাস ছিল দুর্জয়ের ব্যাটিংয়ে, কিন্তু রান আউটের দুর্ভাগ্য তাতে বাধ সেধেছে। দোষটা অবশ্য তাঁরই। পাইলট উইলিয়ামসের বল উইকেটের পেছনে অন সাইডে খেলতেই দৌড়ে চলে যান দুর্জয়। উইকেটকিপার বাঁ দিকে অনেকটা ডাইভ দিয়ে বল আটকে ফেলেন, নন স্ট্রাইকিং প্রান্তের বেল যখন বাতাসে, দুর্জয় তখন পাইলটের সঙ্গে কথা বলছেন! ৪১ বলে খেলা ২৬ রানের ইনিংসে দুর্জয় ৪টি বাউন্ডারি মেরেছেন, সব কটিই স্কয়ার লেগ থেকে মিড উইকেট পর্যন্ত বৃত্তচাপের মধ্যে। শেষ দুটি বাউন্ডারি তিন বলের মধ্যে, স্কট গুরলের করা ইনিংসের একাদশতম ওভারে।

খালেদ মাসুদ পাইলটের এই ছবিটা পরের দিন ম্যাচ শেষ হওয়ার পর। তিন নম্বরে নেমে ৭০ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে পেয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচের স্বীকৃতি। সমর্থকদের সঙ্গে সেই পুরস্কার হাতে। ছবি: শামসুল হক টেংকু

৫২ রানে দ্বিতীয় উইকেট পড়ার পর বুলবুল মাথায় বেশ ভালো চাপ নিয়েই ব্যাট করতে নেমেছিলেন। যদিও তাঁর ব্যাটিংয়ে তার ছাপ পড়েনি। নামের পাশ থেকে শূন্যটা দূর করতে ৮টি বল খেলতে হয়েছে তাঁকে, অষ্টম বলটিতে চোখ জুড়ানো একটা অফ ড্রাইভের মাধ্যমে এসেছে তাঁর চার বাউন্ডারির প্রথমটি। পাইলটের সঙ্গে বুলবুলের ২৬ ওভার স্থায়ী ১১৫ রানের পার্টনারশিপ এবারের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের উজ্জ্বলতম অধ্যায়। পাইলট মুখোমুখি হওয়া পঞ্চম বলে অন ড্রাইভ করে ২ রান নিয়ে শুরু করেছিলেন। ৪০তম ওভারের প্রথম বলে থার্ড আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ারের টিভি রিপ্লে দেখে নেওয়া সিদ্ধান্তে স্টাম্পিং হওয়ার আগে খেলেছেন ৭০ রানের এক ঝলমলে ইনিংস। এজন্য খেলতে হয়েছে মাত্র ৯৬ বল, মেরেছেন ৬টি বাউন্ডারি। বাউন্ডারির শেষ দুটি পুল করে, বাকি চারটি এসেছে দারুণ ড্রাইভের মাধ্যমে।

দ্বিতীয় উইকেট জুটি অবশ্য ভেঙেছে এর আগের ওভারেই। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে আসা পেস বোলার জন ব্লেইনের একেবারে গড়িয়ে যাওয়া একটি বল স্টাম্প সোজা যাওয়াটাকে বুলবুলের দুর্ভাগ্য বলেই মানতে হবে। ৮১ বলে খেলা বুলবুলের ৫৭ রানে ৪টি বাউন্ডারি, চারটিই অফ সাইডে। কাভার ড্রাইভে দুটি, বাকি দুটির একটি অফ ড্রাইভ ও অন্যটি থার্ডম্যানে গ্লাইড করে। বাঁহাতি স্পিনার কিথ শেরিডানের বলে একমাত্র ছক্কাটি মেরেছেন ওয়াইডিশ লং অনের ওপর দিয়ে। বুলবুল উইকেটে থাকলে রান আসতই–এই হতাশার পরও ৩৯তম ওভারে হাতে ৭ উইকেট থাকায় তাঁর আউটটি নিয়ে মুষড়ে পড়ার কিছু ছিল না।

কিন্তু বুলবুলকে দিয়েই শুরু হয় একটা মিনি ধসের। পরের দুই ওভারে পাইলট ও আকরামও প্যাভিলিয়নমুখো হলে হঠাৎই বাংলাদেশে ইনিংসের পথ হারিয়ে ফেলার দশা হয়। মাত্র ১৫ বলের মধ্যে ৬ রান তুলতে এই তিনটি উইকেট। আকরাম প্রথম তিন বলে ৪ রান নিয়ে ভালোই শুরু করেছিলেন। কিন্তু চতুর্থ বলটিকে ডিপ স্কয়ার লেগে তুলে দেন তিনি। পেসার ব্লেইনের ওই বলটি পুল করার মতোই ছিল, আকরাম পুরো শক্তিতে মারলে হয়তো ছক্কাই হয়ে যেত, কিন্তু অনেকটা হাফ-হার্টেড শট খেলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। স্কোরবোর্ডে যখন রানের লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কথা, সেখানে এই তিনটি উইকেট রানের গতিতে বাধ তুলে দেয় কিছুক্ষণের জন্য। ৪০ থেকে ৪৪–এই ৫ ওভারে মাত্র ১৬ রান তুলতে পারে বাংলাদেশ।

নান্নু ৩৯ রানের হার না-মানা ইনিংসটি খেলেছেন মাত্র ৩৭ বলে। শেষ ৬ ওভারে ৪৯ রান তুলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ এ সময়েই হঠাৎ করে খুব কাছে এসে পড়েছে বাংলাদেশের!

৬ ওভার বাকি থাকতে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ১৮৪। এক সময় ২৫০ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল যে ইনিংসের, সেটির তখন ২৩০ রানে পৌঁছানোর ব্যাপারেও সন্দেহ! তবে তখনও রফিক ব্যাট করতে বাকি–এই ভরসাটা ছিল। রফিক প্রত্যাশার চেয়েও বেশি করেছেন। অ্যাঙ্কেলে সমস্যা, টুর্নামেন্টে এর আগে ব্যাট করার সুযোগ পাননি বললেই চলে, এতসব প্রতিকূলতা রফিকের জন্য কোনো সমস্যাই হতে পারেনি। নান্নুর সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ৩৯ বলে ৩৯ রানের জুটি গড়ার পর সাইফুল ২৩ বলে ১৫ রান করে বোল্ড হয়ে গেলে ব্যাট করতে নামেন রফিক। ইনিংসের তখন ১৬ বল বাকি। এর ৭টি খেলেছেন রফিক, সপ্তমটিতে ক্যাচ দিয়েছেন লং অনে, এর আগে ৬ বলে তুলে ফেলেছেন ১৬ রান। প্রথম বলটিতে পয়েন্টের ওপর তুলে দিয়েছিলেন, ফিল্ডার দৌড়ে গিয়ে তা ধরার সময় পাননি। সেটিতে আসে ২ রান, পরের বলটিতে কাভার ড্রাইভ করে চার, পরেরটি কাভারের ওপর দিয়ে ছয়, এরপর আরেকটি ২। ৪৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে সাইফুল আউট হওয়ার পরও রফিকের কল্যাণে সে ওভার থেকে আসে ১৬।

নান্নু অবশ্য শুরু করেছিলেন তারও আগে। সাত নম্বরে ব্যাট করতে নামা নান্নুর ব্যাটিংয়ে রফিকের মতো উন্মত্ততা ছিল না, তা ছিল শৈল্পিক সুষমায় পরিপূর্ণ। ৪৬তম ওভারে বাউন্ডারি ছাড়াই ১১ রান আসে তাঁর কারণেই। এর ১০ রান করেছেন নান্নু, শট থার্ডম্যান থাকার পরও গ্লাইড ও রিভার্স সুইপে রান এনেছেন তিনি। রফিক আউট হওয়ার পর ইনিংসের শেষ ৪টি বলে করেছেন ১০ রান, মিড উইকেট দিয়ে তাঁর ইনিংসের একমাত্র বাউন্ডারিটিও এ সময়েই। নান্নু ৩৯ রানের হার না-মানা ইনিংসটি খেলেছেন মাত্র ৩৭ বলে। শেষ ৬ ওভারে ৪৯ রান তুলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ এ সময়েই হঠাৎ করে খুব কাছে এসে পড়েছে বাংলাদেশের!