উৎপল শুভ্র: ‘গোল্ডেন বয়’ অভিধা নিয়ে ১৮ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক, এত দিনে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির ক্যারিয়ার কোথায় পৌঁছুল?

ড্যানিয়েল ভেট্টোরি: এত তাড়াতাড়ি টেস্ট খেলার ব্যাপারে আমি নিজেকে ভাগ্যবানই বলব। তখন দীপক প্যাটেল ক্যারিয়ারের শেষ দিকে চলে এসেছেন, নির্বাচকেরা তাই নতুন স্পিনার খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। আমি আন্ডার নাইনটিনে ভালো করেছিলাম। এরপর স্টিভ রিক্সন (সে সময়কার নিউজিল্যান্ড কোচ) আমাকে আমার প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে বোলিং করতে দেখলেন। তাতে যথেষ্ট ভালো করেছি মনে করে তিনিই সুযোগ দিলেন। এটা ছিল প্রচণ্ড চাপ, তবে একই সঙ্গে ১৮ বছর বয়সে দেশের পক্ষে খেলে ফেলাটা খুব রোমাঞ্চেরও ছিল।

শুভ্র: আপনার সময়টা তো স্পিন বোলিংয়ের স্বর্ণযুগ। ওয়ার্ন, মুরালি, কুম্বলের মতো তিন স্পিনার। সঙ্গে মুশতাক, সাকলায়েন। ওয়ার্ন চলে গেছেন, মুরালি-কুম্বলেও শেষের দিকে। স্পিন বোলিংয়ের স্বর্ণযুগ কি তাহলে শেষ হতে চলল?

ভেট্টোরি: এটা বলা কঠিন। ওই তিনজন অসাধারণ বোলার। এদের সঙ্গে মুশতাক আহমেদ ও সাকলায়েন মুশতাককে যোগ করলে আপনি হয়তো সর্বকালের সেরা পাঁচ স্পিনারকেই পেয়ে যাবেন। এতজন দারুণ বোলার চলে গেলে স্বাভাবিকভাবেই একটা শূন্যতা তৈরি হয়। তবে এদের বাইরেই তো দারুণ কিছু বোলার আছে। হরভজন সিংয়ের বোলিং দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। দানিশ কানেরিয়াও দারুণ বোলার, ও ওর প্রাপ্য স্বীকৃতি পায় বলে আমার মনে হয় না। তবে অমন তিনজন চলে গেলে, বিশেষ করে ওয়ার্ন আর মুরালিধরনের বিদায়ে বড় একটা শূন্যতা তৈরি হতে বাধ্য।

শুভ্র: আপনার সময়ে এত গ্রেট স্পিনার। আপনি কাকে দেখে অনুপ্রেরণা খুঁজতেন?

ভেট্টোরি: আমি স্পিন বোলিং মাত্রই দেখতে পছন্দ করি, তা বোলার যে-ই হোক। তবে ওয়ার্নের বোলিং দেখাটা অন্য রকম ব্যাপার ছিল। ও যেভাবে খেলাটা খেলত, তা আমার খুব পছন্দের। ব্যাটসম্যানকে আউট করার জন্য ও যেভাবে জাল ছড়াত, সেটিও খুব ভালো লাগত। মুরালিধরনকে দেখতে ভালো লাগে ওর সহজাত দক্ষতার কারণে। ভালো লাগে কুম্বলেকেও। বিশেষ করে কুম্বলে আর হরভজনকে নিজেদের মাঠে একসঙ্গে বোলিং করতে দেখাটা দারুণ। আসলে আমি যখন অন্য স্পিনারদের দেখি, সবকিছু ভুলে ফ্যান হিসেবেই দেখি।

শুভ্র: ওয়ার্নের জাদু তো শুধু বোলিংয়ে ছিল না। শরীরী ভাষা, আপিল করার ধরন—সবকিছু মিলিয়ে বোলিংটাকে পারফর্মিং আর্টের পর্যায়ে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ও। তাই না?

ভেট্টোরি: আসলেই তা-ই। কীভাবে ব্যাটসম্যানকে আউট করবে, সবকিছু ছক কাটা থাকত ওর। এমনকি আম্পায়ারদের প্রভাবিত করার কাজটাও ও খুব ভালো পারত। শুধু বোলিংই নয়, ক্রিকেট মাঠে ব্যাটসম্যানকে আউট করার জন্য যা যা করা দরকার, ওয়ার্ন ছিল এর পুরো একটা প্যাকেজ।

শুভ্র: ওয়ার্ন চলে যাওয়ায় ক্রিকেট তো অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে, কী বলেন?

ভেট্টোরি: ওর মতো গ্রেট কেউ বিদায় নিলে খেলাটা তো একটু রঙ হারাবেই। তবে ক্রিকেটে কেউ না কেউ চলে আসেই। যেকোনো গ্রেট খেলোয়াড় বিদায় নিলেই খেলা থেকে কী একটা হারিয়ে গেল বলে হাহাকার শুনবেন। তবে আপনি দেখবেন, কেউ না কেউ ঠিকই উঠে আসে। হয়তো ওই গ্রেটের জায়গাটা নিতে পারে না, তবে ওই শূন্যতাটা ঠিকই ঢেকে যায়।

স্পিনার-সম্মেলন! ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আইসিসি সুপার সিরিজের সময় একসঙ্গে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল, শেন ওয়ার্ন, মুত্তিয়া মুরালিধরন ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। ছবি: গেটি ইমেজশুভ্র: স্পিন বোলিং দেখলে ফ্যান হয়ে যান বললেন। দুই বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় আইসিসি সুপার সিরিজের সময় ওয়ার্ন, মুরালি, ম্যাকগিলের সঙ্গে আপনাকে তুমুল আড্ডায় মেতে উঠতেও দেখেছি। স্পিনাররা কি নিজেদের বৃহত্তর একটা সমাজের অংশ ভাবে? নিজেদের বোলিংয়ের গোপন রহস্যও বলে দেয় একে অন্যকে?

ভেট্টোরি: আমার মনে হয়, স্পিনাররা এমনই ভাবে। ম্যাচ শেষে কোনো স্পিনার প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুমে গেলে দেখা যাবে, আরেকজন স্পিনারের সঙ্গেই তাঁর আড্ডা জমে উঠেছে। আমি মনে করি, স্পিনারদের মধ্যে পারস্পরিক একটা শ্রদ্ধাবোধের ব্যাপার আছে। কে কীভাবে কী করে এ নিয়ে আগ্রহ আছে। কখনো কখনো স্পিনারের জীবন কেমন কঠিন হয়ে যায়, কখনো বা মজার—এই উপলব্ধিটাও বোধ হয় স্পিনারদের মধ্যে সর্বজনীন। সুযোগ পেলেই আপনি তাই স্পিনারদের আড্ডায় মেতে উঠতে দেখবেন। নিজের বোলিংয়ের গোপন রহস্য? তা কেউ বলে কেউ বলে না। মুরালিধরন যেমন সব সময়ই সবকিছু খুলে বলতে প্রস্তুত।

শুভ্র: সেটা কি বলে দিলেও আর কারও পক্ষে তা করা সম্ভব নয় বলে?

ভেট্টোরি: (হাসি) হতে পারে। তবে মুরালির সঙ্গে কথা বলাটা সব সময়ই দারুণ। আপনি যা কিছু জানতে চান, ওর বলতে কোনো আপত্তি নেই। আগেই যেমন বলেছি, স্পিনাররা সবাই আসলে স্পিন বোলিংয়ের ফ্যানও। অন্য স্পিনারদের বোলিং দেখতে তারা ভালোবাসে। সবকিছুর মূল ওই স্পিন বোলিংয়ের প্রতি ভালোবাসা।

শুভ্র: স্পিনারদের মধ্যে বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনাররাই বোধ হয় সবচেয়ে আনগ্ল্যামারাস। মানেন?

ভেট্টোরি: বাঁহাতি স্পিনার সম্পর্কে সাধারণ ধারণাটা তো ঢ্যাঙা একটা লোক, যে ব্যাটিং-ফিল্ডিং কিচ্ছু পারে না। তবে এখন এর ব্যতিক্রম আছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বাঁহাতি স্পিন সেই অর্থে গ্ল্যামারাস নয়। দর্শকেরা ওয়ার্নের লেগ ব্রেক বা মুরালির ‘দুসরা’ দেখে যতটা রোমাঞ্চিত হয়, বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিন দেখে তা হয় না। তবে মন্টি পানেসারের মতো নতুন কেউ কেউ এসেছে। ওরও বড় আবেদন আছে। বোলিংও দারুণ করছে। যা প্রমাণ করেছে বাঁহাতি স্পিন করেও টেস্ট ক্রিকেটে সফল হওয়া সম্ভব।

ছোট মাঠে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে বল করাটা দুঃস্বপ্নের নামান্তর। রাহুল দ্রাবিড়ের কথাও বলব। ওকে দুঃস্বপ্ন বলব না, ও আপনার বোলিংকে ছত্রখান করে ফেলবে না, কিন্তু আপনার মনে হবে, এ কী ব্যাটসম্যানের সামনে পড়লাম রে বাবা, একে তো কখনোই আউট করা যাবে না!

শুভ্র: বাঁহাতি স্পিনার সম্পর্কে সাধারণ যে ধারণার কথা বললেন, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি অবশ্যই সেই দলে পড়েন না। হ্যাডলি ও কেয়ার্নসের পর নিউজিল্যান্ডে শুধু আপনারই ২০০ উইকেট ও ২০০০ রানের ‘ডাবল’ আছে। আপনি তো নিজেকে অলরাউন্ডার বলে দাবি করতেই পারেন।

ভেট্টোরি: তা পারি। গত তিন-বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটে আমার ব্যাটিং অ্যাভারেজ খুশি হওয়ার মতোই। ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু স্কোর করেছি। এ জন্য অনেক খেটেছিও। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে লম্বা সময় ব্যাট করতে না পারাটা বড় একটা হতাশা ছিল আমার জন্য। গত কয়েক বছরে এই সমস্যাটা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। এখন নিজেকে অলরাউন্ডার দাবি করে আরও ওপরে ব্যাটিং করতে চাইতেই পারি। তবে আপাতত আমি ৮ নম্বরে ব্যাট করেই খুশি।

শুভ্র: কোনো ব্যাটসম্যান কি ‘মাঠ থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচি’ এমন অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে?

ভেট্টোরি: কখনো কখনো তো এমন হয়েছেই। এটা আসলে নির্ভর করে মাঠের আয়তনের ওপর। ছোট মাঠে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে বল করাটা যেমন দুঃস্বপ্নের নামান্তর। ও সব সময়ই আক্রমণাত্মক, পরিস্থিতি যা-ই হোক, ও নীরব থাকার লোক নয়। রাহুল দ্রাবিড়ের কথাও বলব। ওকে দুঃস্বপ্ন বলব না, ও আপনার বোলিংকে ছত্রখান করে ফেলবে না, কিন্তু আপনার মনে হবে, এ কী ব্যাটসম্যানের সামনে পড়লাম রে বাবা, একে তো কখনোই আউট করা যাবে না। আরও কিছু ব্যাটসম্যান আছে, যাদের বিপক্ষে কখনো কখনো কোথায় বল ফেলব ঠিক করা যায় না। তবে ওই দুজনের কথাই প্রথমে মনে হলো।

শুভ্র: আপনাকে কখনোই সেভাবে ‘ক্যাপ্টেনসি ম্যাটেরিয়াল’ মনে করা হয়নি। অথচ ক্যাপ্টেন তো ঠিকই হয়ে গেলেন। তা ক্যাপ্টেনসি কি উপভোগ করছেন?

ভেট্টোরি: দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় শুরুটা খুব কঠিন হয়েছে। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারিনি, তাতে যা হওয়ার কথা তা-ই হয়েছে। সমানে হেরেছি। দেশে ফিরে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে ভালো খেলতে শুরু করেছি। তবে আমার মনে হয় নিউজিল্যান্ড দলের মতো আমার অধিনায়কত্বেরও আসল পরীক্ষাটা হবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগামী সিরিজে। ওই সিরিজটা জিততে হবে, এমন একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়ে গেছে। ওই সিরিজেই আমি বুঝতে পারব, অধিনায়কত্বটা আমি উপভোগ করছি কি না, অধিনায়কত্ব করার মতো টেম্পারামেন্ট আমার আছে কি না।

শুভ্র: স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের মতো এমন উঁচু দরের একজন অধিনায়ক দলে থাকাটা কি একটু বিব্রত করে? বিশেষ করে অধিনায়কত্ব হারিয়ে যেখানে তিনি খুশি নন।

ভেট্টোরি: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার দশ বছরের প্রায় পুরোটাই আমি স্টিভেনের অধিনায়কত্বে খেলেছি। অনেক সময়ই আমার সাফল্যেও ওর অধিনায়কত্বের অবদান ছিল। এটাও জানি, অধিনায়কত্ব হারানোটা স্টিভেন মেনে নিতে পারেনি। তবে ওকে দলে পাওয়াটাকে আমি দারুণই বলব। ওর ক্রিকেটজ্ঞানটা কোন অধিনায়ক মাঠে পেতে চাইবে না, বলুন?

তরুণ ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। ছবিটা ১৯৯৯ সালের। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চ টেস্টে। ছবি: গেটি ইমেজেস শুভ্র: বোলার-ক্যাপ্টেনের বড় সমস্যা বোধ হয়, হয় বেশি বা কম বোলিং করে ফেলা?

ভেট্টোরি: আমার মনে হয়, বেশির ভাগ বোলার-ক্যাপ্টেনই কম বোলিং করার দায়ে অভিযুক্ত। আশা করি, আমি সেই দলে পড়ব না। আমি মনে করি, কঠিন পরিস্থিতি দেখে পিছুটান না দেওয়াটাই আসল। বরং কঠিন সময়ে আরও বেশি বোলিং করতে আসা উচিত। তাতে আপনি বোলার হিসেবে যেমন, তেমনি অধিনায়ক হিসেবেও সবার রেসপেক্টটা পাবেন।

শুভ্র: আপনার নিকনেম নাকি হ্যারি পটার। পছন্দ করেন এটা?

ভেট্টোরি: (হাসি) শুধু অস্ট্রেলিয়ান মেয়েরাই আমাকে হ্যারি পটার ডাকে এবং এর আগে-পরে কিছু গালি থাকে। আমার টিমমেটরা কেউ ওই নামে ডাকে না।

শুভ্র: চশমা-টশমা মিলিয়ে আপনাকে তো খুব পড়ুয়া ছাত্র অথবা অধ্যাপকসুলভ মনে হয়। ড্যানিয়েল ভেট্টোরি আসলে কেমন?

ভেট্টোরি: আমার মনে হয় না আমি ও-রকম। দলের অন্যরা আপনাকে ভালো বলতে পারবে। আসলে কারও চোখে চশমা দেখলেই তাঁকে পড়ুয়া, অধ্যাপকসুলভ মনে করাটা মানুষের স্বভাব। আর আমি স্কুল থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চলে এসেছি বলে তখন এমন বলা হয়েছে। এটাই টিকে আছে।

শুভ্র: খেলা ছাড়ার আগে কী পেলে বলবেন যে, আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-জীবন সার্থক?

ভেট্টোরি: এই তো ২০০০ রান ও ২০০ উইকেটের ক্লাবে ঢুকলাম। পরের ধাপটা তো ৩০০০ রান ও ৩০০ উইকেটই হওয়া উচিত, এটা হওয়া মানে হাতে গোনা কয়েকজন ক্রিকেটারের দলে ঢুকে যাওয়া। ওই দলে কিছু গ্রেট আছেন, যাঁদের চেয়ে আমার হয়তো সময় বেশি লাগবে। তবে এ রকম কিছু হলে কিছু একটা করেছি তৃপ্তিটা পাব। এটা একটা লক্ষ্য। আরেকটা লক্ষ্য, নিউজিল্যান্ডকে ধারাবাহিকভাবে কিছু টেস্ট জয়ে নেতৃত্ব নেওয়া। অনেক দিন থেকেই আমাদের টেস্ট পারফরম্যান্সটা ভালো হচ্ছে না।