উৎপল শুভ্র: জন্টি রােডস নামটিই তো এখন ফিল্ডিংয়ের সমার্থক হয়ে গেছে। ছােটবেলা থেকেই কি ফিল্ডিং আপনাকে টানত?

জন্টি রােডস: বারো বছর বয়সে আমি যখন ১৩ বছর বয়সীদের সিনিয়র দলে খেলি, আমি ১০ নম্বরে ব্যাট করতাম, বােলিং করতে পারতামই না। কাজেই আমাকে একটা কিছু করতেই হতাে, আর তা ছিল ফিল্ডিং। ফিল্ডিংটা আমার বরাবরই পছন্দ ছিল। এখনাে স্কুলজীবনের ম্যাচগুলাের দিকে ফিরে তাকালে আমার যা মনে পড়ে তা হলাে, আমি রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে খুব ভালাে ছিলাম, ফিল্ডিংয়ে খুব ভালাে ছিলাম। যদিও আমার মূল পরিচয় আমি মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান, কিন্তু ফিল্ডিং আমার কাছে ক্রিকেটের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক এবং সেটি আমি সবচেয়ে বেশি উপভােগ করি। মাঠে ডাইভ দেওয়া, কঠিন ক্যাচ নেওয়া, কখনাে কখনাে বল হাতে স্টাম্পে ঝাঁপিয়ে পড়া-এসব আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।

শুভ্র: ক্রিকেটের সঙ্গে আপনি তাে হকিও খেলতেন।

রোডস: হকি আমাকে ফিল্ডিংয়ে অনেক সাহায্য করেছে। আমার ফিল্ডিংয়ের মূল শক্তি হলাে, আমি মাঠে প্রথম পাঁচ গজ খুব দ্রুত পেরােতে পারি, যে কারণে আমি সে বলের কাছে চলে যেতে পারি, এমনিতে যা ফিল্ডারের পাশ দিয়ে চলে যেত। হকি খেলতে গেলে স্টিকে বল রাখার জন্য নুয়ে থাকতে হয়, এটি আমার পা এবং পিঠের নিচের অংশের পেশি শক্তিশালী করেছে, যা পাঁচ বা ১০ গজে আমার গতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। হকির কারণেই আমি ব্যাটসম্যান হিসেবেও অনেক রিস্টি, এটি ওয়ানডেতে গ্যাপ খুঁজে পেতে দারুণ সাহায্য করে ।

শুভ্র: দুই খেলাতেই যখন এত ভালো ছিলেন, ক্রিকেট না হকি—এমন কোনাে দোলাচলে ভুগতে হয়নি?

রোডস: ১৯৮৭ সালে আমি যখন স্কুল শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম, তখন বর্ণবাদী সরকারি নীতির কারণে কোনাে আন্তর্জাতিক খেলা ছিল না। তখন ছয় মাস প্রভিন্সিয়াল টিমের হয়ে হকি খেলি, ছয় মাস ক্রিকেট খেলি। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে আমাকে দলে নেওয়াটা আমার কাছেই বিস্ময় হয়ে এসেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেস, সাধারণ মানুষের কথা আর কি বলব, আমি নিজেই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমি তো তখন ক্রিকেটের চেয়ে হকিতেই ভালাে করছি। ক্যারিয়ার হিসেবেও ভাবছিলাম হকির কথাই। কিন্তু ভাগ্যই বলতে হবে, ক্রিকেট নিজেই যেন আমাকে বেছে নিল। নাইনটি টু বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে আমি এমন ভালো কিছু করিনি। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ডাইভ দিয়ে ইনজামামকে রান আউট করে আমি রাতারাতি দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচিত মুখ হয়ে গেলাম। ব্যাটিং-ট্যাটিং নয়, সেই রান আউটটিই ওয়ানডে দলে আমার জায়গা পাকা করে দেয়।

১৯৯২ বিশ্বকাপে ইনজামামকে সেই রান আউট। যা রাতারাতি বিখ্যাত বানিয়ে দেয় জন্টি রোডসকে। ছবি: নেটওয়ার্ক ১৮

শুভ্র: শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা কেন, বিশ্বকাপ তাে আপনাকে পুরো ক্রিকেট বিশ্বেই রাতারাতি ‘হিরাে’ বানিয়ে দিয়েছিল...

রােডস: 'হিরাে শব্দটা হয়তাে বেশি হয়ে যায়। তবে এটা ঠিক, নােবডি থেকে রাতারাতি পুরাে দেশে পরিচিত এক মুখ হয়ে গেলাম আমি। এর আরেকটা দিকও ছিল। অনেক দিন বিশ্ব ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকায় ক্রিকেটটা দক্ষিণ আফ্রিকার আমজনতার মধ্যে সেভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল না। ফুটবল-রাগবি বরং অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিল।  শিশু-কিশােরদের ক্রিকেটে আকৃষ্ট করতে দক্ষিণ আফ্রিকান বাের্ড তখন ফ্রেশ ইয়াং একটা মুখ খুঁজছিল। এ জন্য ওরা যােগ্য মনে করল আমাকেই।

শুভ্র: তা হঠাৎ করে এমন বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার পর নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়নি?

রােডস: শুরুতে খুবই সমস্যা হয়েছিল। কারণ স্কুল-ইউনিভার্সিটির দিনগুলােতে আমি ছিলাম খুবই লাজুক। হঠাৎ করেই যা হলাে, তাতে দেখা গেল, আমার জীবন পুরােই বদলে যাচ্ছে। আমাকে অচেনা লােকদের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে, ক্রিকেট স্টেডিয়াম বা নেট উদ্বোধন করতে যেতে হচ্ছে, আফটার ডিনার স্পিকার হিসেবে যেতে হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলতে। খেলার চেয়ে এগুলাে ছিল অনেক বেশি কঠিন। কারণ তখন আমি লাইমলাইট একদমই এনজয় করতাম না। তবে করতে করতে সবকিছুই অভ্যাস হয়ে যায়। একসময় আমার কাছেও এসব খুব স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হলাে। আমার খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসও আমাকে খুব সাহায্য করেছে। আমার স্ত্রী, সে সময়ের গার্লফ্রেন্ডও আমাকে মাটিতে পা রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমাকে সে প্রায়ই বলত, 'দেখাে, এসব ঈশ্বরের আশীর্বাদ। তুমি কৃতজ্ঞ থেকো।' আসলে আমার পরিবার, আমার বাবা-মা ও দুই ভাই খুব ঘনিষ্ঠ। তাঁরাই আমাকে বিনয়ী থাকতে সাহায্য করেছে।

এই ছবিটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে ফিল্ডার জন্টি রোডসকে

শুভ্র: মাঠে আপনার ফিল্ডিং দেখে সবাই মুগ্ধ হয়, তার পেছনে নিশ্চয়ই অনেক সাধনা আছে। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে হেডিংলিতে হার্শেল গিবসের সঙ্গে আপনার একটা আলাদা ফিল্ডিং সেশন দেখে রীতিমতো চমৎকৃত হয়ে গিয়েছিলাম। দলের প্র্যাকটিসের বাইরে আপনি সব সময়ই কি এমন বাড়তি কিছু করেন?

রােডস: খুব বেশি কিছু না। আসলে ফিল্ডিংটা নিয়ে পুরাে দক্ষিণ আফ্রিকা দলেরই একটা গর্ব আছে। দলের বাকিদের চেয়ে আমি হয়তাে ১০-১৫ মিনিট বেশি ক্যাচিং প্র্যাকটিস করি, স্টাম্পে বল ছুড়ি। আসলে আমার ফিল্ডিংয়ের মূল বিষয় হলাে প্র্যাকটিসেও আমি মাঠের মতাে সর্বস্ব ঢেলে দিই। সেই ছােটবেলায় আমার বাবা বলেছিলেন, 'প্র্যাকটিস মেকস ম্যান পারফেক্ট' কথাটা ঠিক নয়, কথাটা হবে 'পারফেক্ট প্র্যাকটিস মেকস ম্যান পারফেক্ট'। এটা আমি সব সময়ই মনে রাখি। প্র্যাকটিসেও আমি ম্যাচের মতােই ডাইভ দিই, ম্যাচের মতােই বল হাতে স্টাম্পে ছুড়ে দিই নিজেকে। প্র্যাকটিসে এসব না করলে আপনি ম্যাচে তা করবেন কীভাবে? (কনুই-পেটে ছড়ে যাওয়া জায়গা দেখিয়ে) এই যে দেখুন, এগুলাে ম্যাচের নয়, প্র্যাকটিসের চিহ্ন। আমি হয়তাে দলের অন্যদের চেয়ে খুব বেশি সময় প্র্যাকটিস করি না, তবে আমার প্র্যাকটিসের ইনটেনসিটিটা খুব তীব্র থাকে। এখন অবশ্য হার্শেল গিবস, জাস্টিন অনটং, বােটা ডিপেনারের মতাে কয়েকজন তরুণ এসেছে, যারা দুর্দান্ত ফিল্ডার। আমি এমনভাবে প্র্যাকটিস করি, যাতে ওদের মনে হয়, জন্টি তেত্রিশ হয়েও যদি এভাবে ডাইভ দিতে পারে, তাহলে আমরা চব্বিশ-পঁচিশ হয়ে পারব না কেন?

শুভ্র: মাঠে যেভাবে আপনি লাফান-ঝাঁপান, ডাইভ দেন; আপনার শরীর এই ধকল কীভাবে সামলায়?

রোডস: এর জন্য কিছু মূল্য তো আমাকে দিতেই হয়। প্রতি মাসেই যেমন আমাকে কার্ডিয়াক টেস্ট করাতে হয়। কারণ মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রথমে আপনার হাত পড়বে না, পড়বে বুক। বুকে-ঘাড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকি লাগে, বলা যায় প্রতি সপ্তাহেই আমার কার ক্র্যাশের অভিজ্ঞতা হয়। পিঠের নিচের দিক, হ্যামস্ট্রিং এগুলােতে টান লাগেই। আগে এসব এত গায়ে লাগত না, কিন্তু এখন তো বয়স বেড়েছে, পর পর দুদিন ম্যাচ খেলা আমার জন্য এখন খুব কঠিন। মাঠে আমি আগের চেয়ে স্লো হয়ে গেছি বলে মনে হয় না, তবে এখন ধকলটা সামলে উঠতে অনেক বেশি সময় লাগে। ম্যাচের পরদিন শরীর বিদ্রোহ জানাতে থাকে। আর ছড়ে যাওয়া কনুই, কোমর এসব তাে দশ বছর ধরেই আমার নিত্যসঙ্গী।

মাঠে জন্টি রোডস থাকা মানেই ছিল ক্রিকেটে এমন অ্যাক্রোবেটের দেখা মেলা

শুভ্র: আধুনিক ক্রিকেটে ফিল্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় তারকা আপনি। বলা যায়, আপনিই ফিল্ডিংকে গ্ল্যামারাস করেছেন। জানতে ইচ্ছা করছে, ফিল্ডিংয়ের 'পোস্টার বয়'-এর ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রিয় ফিল্ডার ছিলেন কে?

রোডস: অনেকেই আমাকে কলিন ব্ল্যান্ডের উত্তরসূরি বলে, কারণ তিনিও দক্ষিণ আফ্রিকান। কিন্তু আমি আসলে ব্ল্যান্ডকে সেভাবে দেখিইনি। প্রথমত, তখন এমন টেলিভিশন ছিল না, তা ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা নিষিদ্ধ হওয়ায় তাঁর ক্যারিয়ারও সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বরং আমি পিটার কারস্টেনের বিপক্ষে খেলেছি, স্কুলে পড়ার সময় রেবেল ট্যুরে তাঁর খেলা দেখেছি। পিটার কারস্টেনের ফিল্ডিং ছিল দুর্দান্ত, তিনিই আমার ছােটবেলার ফিল্ডিং হিরাে।