খুব যে উচ্চাঙ্গের ফুটবল হয়েছে, এমন নয়। ‘ক্লাসিক’ ম্যাচের তালিকায় গত পরশু রাতের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল? প্রশ্নই ওঠে না। তবে এই বিচার তো শুধু খেলার নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু একটা খেলা কি শুধু খেলোয়াড়ি উৎকর্ষের কারণেই স্মরণীয় হয়! নাটকীয়তার কারণেও তো হতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে চেলসি-বায়ার্ন মিউনিখ এক শতে এক শ পাবে।

বাংলাদেশে যখন রাত প্রায় ভোরের কোলে ঢলে পড়েছে, মাঠে চলছে বিপরীতমুখী আবেগের প্রদর্শনী। চেলসির সবাই ভেসে যাচ্ছেন আনন্দস্রোতে। তবে দিদিয়ের দ্রগবার মতো আর কেউ নয়। কী রেখে কী করবেন যেন বুঝে উঠতে পারছেন না আইভরিয়ান স্ট্রাইকার।

বায়ার্নের সবাই দুঃখরাতের যাত্রী। তবে আরিয়েন রোবেনের মতো যেন আর কেউ নন। মুণ্ডিত মস্তক আর কোটরাগত চোখ মিলিয়ে ডাচ উইঙ্গারকে এমনিতেই একটু অদ্ভুত লাগে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আরও বেশি লাগছিল। কখনো উবু হয়ে মাঠে বসে। কখনো পা ছড়িয়ে। কখনো মুখে আঙুল পুরে কামড় দিচ্ছেন। যেন মিলিয়ে নিতে চাইছেন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল! 

আনন্দের প্রতিভূ হিসেবে দ্রগবা যেমন ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, দুঃখের প্রতীকী চিত্রে রোবেন তা নন। সেখানে শোয়েনস্টাইগার তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। অতিরিক্ত সময়ে রোবেন পেনাল্টিটা মিস না করলে খেলাটা আর পেনাল্টি শ্যুটআউটে যায় না। শোয়েনস্টাইগারের দুঃখ তো আরও টাটকা। টাইব্রেকারে তাঁর শটেই নির্ধারিত হলো এবারের বিজয়ী। মাত্র কয়েক দিন আগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও তা-ই হয়েছিল। সেদিন শোয়েনস্টাইগার শটটা মেরেই বিজয়ানন্দে ভোঁ দৌড় দিয়েছিলেন। আর এ দিন বুকের কাছ থেকে জার্সিটা টেনে তুলে মুখ ঢেকে ফেললেন। জীবনের মতোই ফুটবলও যেমন দেয়, তেমনি নেয়ও।

শোয়েনস্টাইগারের শটে বিজয়ী নির্ধারিত হয়েছে লিখেছি। ঠিকই আছে, তাঁর শটটা পোস্টে না লাগলে পরের শটেই শেষ না হয়ে টাইব্রেকার আরও দীর্ঘ হয়। তবে আক্ষরিক অর্থে ম্যাচের শেষ হয়েছে দ্রগবার গোলে। কী একটা রাতই না কাটল তাঁর! ঘণ্টা তিনেকেরও কম সময়ের মধ্যে আবেগের কত রূপের সঙ্গেই না পরিচয়!

শেষ পর্যন্ত মধুরেণ সমাপয়েৎ। কিন্তু এর আগে চেলসির সমর্থকদের কাছে দ্রগবা যেন আব্বাসউদ্দীনের সেই বিখ্যাত গান, ‘ভাসাইলি রে ডুবাইলি রে...’। দুর্দান্ত এক গোলে ভাসিয়েছিলেন ডুবন্ত চেলসিকে। রিবেরিকে মেরে পেনাল্টি ডেকে এনে সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন ডোবানোর আয়োজনও। রোবেন নিজে ডুবে দ্রগবাকে আবার ভেসে ওঠার সুযোগ করে দিলেন। চিত্রনাট্যে যে এমনই লেখা ছিল! 

টাইব্রেকারে দ্রগবার জয়সূচক গোলের পর ধারাভাষ্যকার বারবার বলছিলেন, ‘ডেসটিনি, ডেসটিনি!’ ঘুমঘুম চোখে টেলিভিশনের পর্দায় নাটকীয় ওই রাতের সাক্ষী হয়ে থাকতে থাকতে আসলেই মনে হচ্ছিল, নিয়তিই বোধ হয় সব ঠিক করে রেখেছিল। মাঠে যা হচ্ছে, তা সেই পাণ্ডুলিপি মেনেই! কে লিখেছেন এই চিত্রনাট্য!

দিদিয়ের দ্রগবার গোলেই শেষ হয়েছিল ফাইনাল

যে-ই লিখে থাকুন, নাটকীয়তা তাঁর বড় পছন্দ। হয়তো ট্র্যাজেডিও। নিজেদের মাঠে ইউরো-শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামার বিরল সৌভাগ্য খুব বেশি দলের হয়নি। বায়ার্নের হলো। দুঃখটা সে কারণেই আরও বেশি বুকে বাজল বাভারিয়ানদের। তিন বছরে দুটি ফাইনালে হার। এর আগে ১৯৯৯ ফাইনালে বাড়তি সময়ে দুই গোল খেয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে হারের স্মৃতি এখনো দগদগে ঘা হয়ে আছে। সেটি তো এর চেয়েও নাটকীয়। বায়ার্ন জিতছে জেনে পুরস্কার বিতরণীতে যাবেন বলে স্টেডিয়ামের লিফটে উঠেছেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। নিচে নেমে শোনেন, বায়ার্ন হেরে গেছে!

এবারও কি কম হলো! অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি মিস করে টাইব্রেকারে হার! আরে, জার্মানরা না টাইব্রেকারে হারে না! হারে না, কিন্তু এটি যে আর ১০টি রাতের মতো নয়। পাগুলে এই রাতে সবই সম্ভব। আসল কারণ কি এটাই যে চেলসির হাতেই ট্রফি ওঠাটা নিয়তি-নির্ধারিত ছিল!

পরশুর ফাইনালের আসল মহিমাও এখানে। খেলার সবচেয়ে বড় মজাই তো অভাবিত কিছুর বিস্ময়স্রোতে ভেসে যাওয়া। এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ সবচেয়ে বড় সেই উপহারই দিল। মৌসুমের শুরু থেকেই ছন্নছাড়া, ঘরোয়া লিগে ছয় নম্বর চেলসি হয়ে গেল ইউরোপ-সেরা।

মাসখানেক আগেও এই ভবিষ্যদ্বাণী করলে কী যে হাসির রোল পড়ত!

আরও পড়ুন:
যে মহারণ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী চলে না