বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ভক্তরা জেনে একটু কষ্টই পাবেন। বাংলাদেশ কোথায়, তা জানেন না হাভিয়ের স্যাভিওলা! যে দেশে তাঁকে নিয়ে এত মাতামাতি, তাঁর দেশের এত ভক্ত, চোখ-মুখ দেখে মনে হলো, সেই দেশের নামটাও এই প্রথম শুনলেন।  

টেলিভিশনেই তাঁকে ছোট দেখায়। সামনাসামনি আরও ছোট। এমন চেহারা যে, চেনা না থাকলে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানোর কোনো কারণ নেই। ফুটবলারদের নাকি ঊরু দেখে চেনা যায়। তা-ই যদি হয়, তাহলে হাভিয়ের স্যাভিওলাকে পেশাদার ফুটবলার মনে হওয়ার কোনো কারণই নেই। উচ্চতা, শারীরিক গড়ন বাংলাদেশের সাব্বিরের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

কথায় কথায় হাসেন, বাংলাদেশ কোথায় জানেন না বলার সময়ও হাসলেন। কী বলছেন, তা বুঝতে অবশ্য একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। গত পরশু রাতে অলিম্পিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচশেষে হাভিয়ের স্যাভিওলার সঙ্গে যে মিনিট দশেক কথা হলো, আমার একটি কথাও বুঝলেন না স্যাভিওলা! আমিও স্যাভিওলার একটি কথাও না! রহস্য মনে হচ্ছে? রহস্যের উত্তর হলো, স্যাভিওলা স্প্যানিশ ছাড়া আর কোনো ভাষা জানেন না। ইংরেজি-স্প্যানিশ দুটোই জানেন, এমন এক আর্জেন্টাইন টিভি-সাংবাদিক দোভাষী হতে রাজি হলেন বলেই সম্ভব হলো এই ‘মিনি সাক্ষাৎকার’। 

‘বাংলাদেশে আপনার অনেক ভক্ত, আর্জেন্টিনারও প্রচুর সমর্থক’— এ কথার জবাবেই স্যাভিওলা জানতে চাইলেন ‘বাংলাদেশ দেশটা যেন কোথায়?’

তা বুঝিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় ছিল না বলেই তাড়াতাড়ি পরের প্রশ্ন, ‘অলিম্পিক কেমন লাগছে?’ উত্তরটা বুঝতে যথারীতি একটু অপেক্ষা করতে হলো, তবে স্যাভিওলার চোখ-মুখ দেখে যা অনুমান করা গিয়েছিল, বলেছেন তা-ই,  ‘এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। এক সঙ্গে এত খেলার এত খেলোয়াড়...অনেক ভলিবল খেলোয়াড়, অনেক হকি খেলোয়াড়— যাদের আগে শুধু টিভিতে দেখেছি, এখানে তাদের সামনাসামনি দেখছি। অলিম্পিকে এসে আমার খুব ভালো লাগছে।’

টিভিতে দেখা মানুষগুলোকে সামনাসামনি দেখার যে অভিজ্ঞতার কথা বললেন, তাঁকে দেখেও নিশ্চয়ই একই অনুভূতি হচ্ছে অনেকের। এ কথার উত্তর না দিলেও চলে, তাই স্যাভিওলা শুধু হাসলেন। আর্জেন্টাইন কোনো ফুটবলারের সঙ্গে কথা হবে আর ম্যারাডোনা আসবেন না, তা কি হয়? অনেক 'নতুন ম্যারাডোনা'র মধ্যে স্যাভিওলাও তো একজন। ম্যারাডোনাই তার ‘আইডল’ কি না— এ প্রশ্নের জবাবটা দিলেন ‘এটা কোনো প্রশ্ন হলো’ ভঙ্গিতে, ‘সব আর্জেন্টাইন ফুটবলারই ম্যারাডোনার ফ্যান। আমাদের দলের যে কাউকে এ প্রশ্ন করুন, সে এ কথাই বলবে।’

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা রেষারেষির কথা আগেই জানা ছিল, আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের কথা বলে তা আরও বুঝেছি। তা এই দুই দেশের ফুটবলারদের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন? বার্সেলোনায় ব্রাজিলিয়ান টিমমেট রোনালদিনহোর সঙ্গে খেলতে কেমন লাগে তাঁর? জবাব দেওয়ার সময় মুখ এমন গম্ভীর যে, ব্রাজিল সম্পর্কে বিস্ফোরক কোনো মন্তব্য করছেন বলে ভেবেছিলাম। চমকটা এল অন্য দিক থেকে। বার্সেলোনায় আর থাকছেন না স্যাভিওলা! ‘রোনালদিনহোর সঙ্গে আর খেলা হচ্ছে না। ও ফ্রান্স থেকে স্পেনে এসেছিল আর আমি স্পেন থেকে ফ্রান্সে যাচ্ছি।’

সোনার বল-সোনার বুট দুটিই হাভিয়ের স্যাভিওলার। এটা অবশ্য মূল বিশ্বকাপে নয়, ২০০১ সালে আর্জেন্টিনাতেই অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ যুব বিশ্বকাপে। ৭ ম্যাচে স্যাভিওলা করেছিলেন ১১ গোল। ছবি: এএফএ

লুকোছাপা না করে খুলে বললেন কারণটাও। স্যাভিওলা যেতে চাননি, কিন্তু যেতে হচ্ছে। রোনালদিনহো আছেন, নতুন এসেছেন ক্যামেরুনের স্যামুয়েল ইতো আর সুইডেনের হেনরিক লারসন, বার্সেলোনার প্রথম এগারোতে জায়গা পাওয়া তাই নিশ্চিত নয়। এ কারণেই স্যাভিওলা ফ্রান্সে চলে যাচ্ছেন, সম্ভাব্য গন্তব্য মোনাকো।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারের কথা উঠলে তাঁর নাম আসে। মাঠেও অনেকবারই তাঁর পায়ে অনূদিত হয়েছে এই স্বীকৃতি। একটু আগে শেষ হওয়া ম্যাচটিও বুঝিয়ে দিয়েছে, দর্শক-পছন্দের বিচারেও স্যাভিওলা আর্জেন্টিনা দলের বাকিদের চেয়ে এগিয়ে। প্রথম একাদশে সুযোগ হয়নি এখানেও। বিরতির একটু আগে ওয়ার্মআপ শুরু করতেই জেগে উঠল পুরো স্টেডিয়াম। ৩৫ মিনিট বাকি থাকতে যখন নামলেন, তখন তা ভেঙে পড়ার উপক্রম। অথচ জাতীয় দলের মতো ক্লাব দলেও তাঁর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?

এবার একেবারেই কূটনৈতিক উত্তর, ‘বেঞ্চে বসে থাকতে তো খারাপই লাগে। কিন্তু এটা মেনে না নিয়ে উপায় কী! ১৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে কাকে খেলানো হবে না হবে, এটা শুধু কোচেরই সিদ্ধান্ত।’ যেন এটা আমার জানা ছিল না। 

‘প্রস্তাব পেলে বাংলাদেশের কোনো ক্লাবে খেলতে যাবেন’— শেষ প্রশ্নটা যে রসিকতা, তা বুঝতে ‘দোভাষী’র একটু সময় লাগল। কথা না বলে স্যাভিওলাকে শুধু হাসতে দেখে মনে হলো, তিনি বুঝতে পেরেছেন।

সেই হাসির আরেকটা অর্থও হয়—‘বাংলাদেশ দেশটা কোথায়, আগে তা জেনে নিই!’