গ্রেট ক্রিকেটারদের স্মৃতিশক্তিও সেই রকম হয়। গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো অনেক বোলারই তাঁর নেওয়া প্রতিটি উইকেটের বিস্তারিত বলে দিতে পারেন। বড় ব্যাটসম্যানদের প্রায় সবাই বলে দিতে পারেন বোলারের নামসহ সব আউটের বিস্তারিত। আর সেঞ্চুরি তো মনে থাকেই। কিন্তু সেঞ্চুরির সংখ্যা যদি এক শ হয়, তাহলেও কি সেসবের খুঁটিনাটি সব মনে থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো একজন মানুষই আছেন এই পৃথিবীতে। শচীন টেন্ডুলকার ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক শ সেঞ্চুরিই যে আর কারও নেই। আমার ধারণা, টেন্ডুলকার এক শটা সেঞ্চুরিরই বিস্তারিত বলে দিতে পারবেন। 

একেকটা সেঞ্চুরি একেক রকম। প্রতিটার আগে-পরের গল্পও। তারপরও নিশ্চিতভাবেই কিছু সেঞ্চুরি আলাদা হয়ে আছে তাঁর কাছেও।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে কদিনের হাসপাতাল বাস শেষে বাড়িতে ফিরেছেন টেন্ডুলকার। সেঞ্চুরি-টেঞ্চুরি নিয়ে ভাবার মতো অবস্থায় আছেন বলে মনে হয় না। নইলে ২৬ বছর আগে এই দিনে শারজায় সেই সেঞ্চুরিটার কথা আজ মনে পড়লেও পড়তে পারত। ওয়ানডেতে তাঁর চার নম্বর সেঞ্চুরি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ নম্বর। লিখতে লিখতেই মনে হলো, দিন ধরে এমন সেঞ্চুরির স্মৃতিচারণা করতে গেলে টেন্ডুলকারকে তো প্রায়ই তা করতে হবে। প্রশ্ন তো এটাও যে, ওয়ানডেতে যাঁর এমন দারুণ দারুণ সব সেঞ্চুরি আছে, এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই সেঞ্চুরি কেন তিনি আলাদাভাবে মনে রাখতে যাবেন?

তা মনে রাখার কারণ আছে বলেই তো এত বছর পর সেই সেঞ্চুরি নিয়ে লিখতে বসা। টেলিভিশনে লাইভ দেখার কথা বাদই দিলাম, মাঠে বসেও টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরি একেবারে কম দেখিনি। সব কি আর সেভাবে মনে পড়ে? কিন্তু শারজার ওই সেঞ্চুরিটা ভুলতে পারি না। কারণ এটা নয় যে, ওই সেঞ্চুরির পথেই সবচেয়ে কম বয়সে ওয়ানডেতে তিন হাজার রান করার মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন টেন্ডুলকার।

এটা কখনো মনে থাকে, কখনো থাকে না। শারজার ওই সেঞ্চুরি মনে রাখার আসল কারণ যে এটা নয়, তা তো বুঝতেই পারছেন। আসল কারণ, শচীন টেন্ডুলকারের সেই সেঞ্চুরিটা ছিল স্ট্রেট ড্রাইভের ওপর একটা মাস্টারক্লাস। যে ক্লাসের নাম দেওয়া যায়: স্ট্রেট ড্রাইভ কাহাকে বলে এবং উহা কত প্রকার ও কী কী।

স্ট্রেট ড্রাইভ তো স্ট্রেট ড্রাইভই। আর টেন্ডুলকার বরাবরই তা খুব ভালো খেলেন। এটির আবার প্রকার কী! প্রকারভেদ আছে রে ভাই, আছে। স্ট্রেট ড্রাইভের মূল ছবিটা হয়তো একই থাকে, কিন্তু তা মারার আগে, ফলো থ্রুতে কিছু না কিছু পার্থক্য তো থাকেই। ক্রিকেটের দুইটা বল তো কখনোই হুবহু এক হতে পারে না। খালি চোখে একই রকম মনে হওয়া দুটি বলেও কোনো না কোনো পার্থক্য থাকেই। টেন্ডুলকারের স্ট্রেট ড্রাইভ করা বলগুলোতেও ছিল। মাস্টারক্লাস বলছি তো এ কারণেই। স্ট্রেট ড্রাইভ কীভাবে এবং কতভাবে মারা যায়, নবীন কোনো ব্যাটসম্যান তা জানতে চাইলে টেন্ডুলকারের এই ইনিংসের ভিডিও দেখলেই চলবে।

টেন্ডুলকারের এই ইনিংসটা মনে রাখার যতটুকু কারণ আছে, তার চেয়ে বেশি আছে চামিন্ডা ভাসের। ২৩ বছর বয়সের সেই টেন্ডুলকার চার-ছয় মারার ব্যাপারে ভীষণ সাম্যবাদী ছিলেন। বোলারে-বোলারে একদমই বৈষম্য করতেন না। তারপরও সেদিন শ্রীলঙ্কার এই বাঁহাতি পেসারের দিকে তাঁর একটু বাড়তি মনোযোগ ছিল। ১৫টি চারের ৭টিই মেরেছিলেন ভাসকে। ৯ ওভারে ৬৭ রান দিয়ে বিপর্যস্ত ভাস মনে মনে নিশ্চয়ই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এই ভুল আর জীবনে করব না।

ভুলটা কী? ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচের আগে কথায় কথায় কাউকে বলেছিলেন, শচীন টেন্ডুলকারের ওষুধ তাঁর জানা আছে। কথাটা কখন-কোথায়-কাকে বলেছিলেন, তা তো আর সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে যেভাবেই হোক, তা টেন্ডুলকারের কানে পৌঁছে যায়। বাকিটুকু, যেমন বলা হয়, ইতিহাস!

১৯৯৫ সালের সেই এশিয়া কাপে বাংলাদেশও ছিল। প্রথম ম্যাচও ছিল এই ভারতের বিপক্ষেই। সেই ম্যাচে টেন্ডুলকার হাফ সেঞ্চুরি থেকে ২ রান দূরে থাকতে মোহাম্মদ রফিকের বলে বোল্ড হয়ে যান। ম্যাচটা যে ভারতই জিতেছিল, তা অবশ্য না বললেও চলছে। পরের ম্যাচ শারজার ক্রিকেটের প্রাণভোমরা ভারত-পাকিস্তান। তাতে টেন্ডুলকার মাত্র ৪ রানেই আউট। আকিব জাভেদ প্রথম স্পেলেই ভারতের চার উইকেট ফেলে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ্য অবধারিতভাবেই টেন্ডুলকারের উইকেটটা। আকিবের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে টপ এজ, উইকেটকিপার মঈন খানের গ্লাভসে বল জমা পড়া মাত্রই ম্যাচও এক রকম শেষ। কারণ ভারতের সামনে টার্গেট ছিল ২৬৭, সেই সময়ে যা অনেক রান। যা থেকে ৯৮ রান দূরে থাকতেই অলআউট হয়ে যাওয়ায় ভারতের নেট রানরেটের অবস্থাও করুণ হয়ে যায়।

চামিন্ডা ভাসের এই কাঁদো-কাঁদো ছবি শারজার ওই ম্যাচের পর নয়, এর অনেক বছর পর টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সময়কার। শারজার ওই ম্যাচেও এমন অবস্থাই হয়েছিল ভাসের

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটা তাই দুই ডাবল দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিল ভারতের সামনে। ফাইনালের আশা বাঁচিয়ে রাখতে জিততে তো হবেই, হতশ্রী নেট রানরেটটাকেও একটু ভদ্রস্থ করতে হবে। আর তখন এমন কোনো কিছুর দাবি মানেই ভারতের টেন্ডুলকারের মুখ চেয়ে থাকা। আরও অনেকবারের মতো টেন্ডুলকার সেবারও এই দাবি পূরণ করেছিলেন। শ্রীলঙ্কাকে ২০২ রানে শেষ করে দিয়ে ভারতীয় বোলাররা প্রথম দাবি পূরণের কাজটা সহজ করে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টা মেটানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে মাত্র ৩৩.১ ওভারেই (সময়টা মনে রাখতে বলি) ম্যাচ শেষ করে দেন টেন্ডুলকার।

'শেষ করে দেন' কথাটাকে আক্ষরিকভাবে নিতে বলি। ১০৭ বলে অপরাজিত ১১২ রান করে টেন্ডুলকার ম্যাচ জিতিয়েই ফিরেছিলেন। সেই সময়ে প্রায় ১০৫ স্ট্রাইক রেটের ইনিংস খেলতে হলে তাতে উল্টোপাল্টা কিছু শট থাকাটাই স্বাভাবিক। দু'একবার বল ব্যাটের এজ নিয়ে চার হয়ে যাওয়াও। টেন্ডুলকারের এই ইনিংসের মাহাত্ম্যটা এখানেই। এ সবের কিছুই সেদিন হয়নি। ক্রিকেট ব্যাকরণ বহির্ভূত একটা শটও খেলেননি টেন্ডুলকার।

ম্যাচশেষে টেন্ডুলকার কথা বলতে এলেন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে। চায়ে চুমুক দিতেই দিতেই বললেন, এই ম্যাচে ভালোভাবে জেতাটা জরুরি ছিল বলে আগেই ঠিক করে নিয়েছিলেন, আজ ইম্প্রোভাইজেশনের ছুটি।

শারজার তখনকার খোলা ছোট্ট প্রেসবক্সটাতে সাংবাদিকদের গাদাগাদি করে বসতে হতো। কিন্তু খেলা দেখার জন্য জায়গাটা ছিল বড় ভালো। মাঠের সমতলে একেবারে বাউন্ডারি লাইন লাগোয়া। সেখানে বসে টেন্ডুলকারের ওই স্বর্গীয় ব্যাটিং দেখার আনন্দময় অনুভূতিটা এত বছর পরও মনে করতে পারি।

মনে করতে পারি ম্যাচশেষের টেন্ডুলকারকেও। তখন তো আর সাজানো-গোছানো মঞ্চে বসে সামনে মাইক্রোফোন নিয়ে প্রেস কনফারেন্সের চল শুরু হয়নি। শারজাতেই যেমন প্লেয়াররা কথা বলতেন প্রেসবক্সের পাশেই ড্রেসিংরুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তা এতই ইনফরমাল ছিল যে, ম্যাচশেষে টেন্ডুলকার কথা বলতে এলেন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে। চায়ে চুমুক দিতেই দিতেই বললেন, এই ম্যাচে ভালোভাবে জেতাটা জরুরি ছিল বলে আগেই ঠিক করে নিয়েছিলেন, আজ ইম্প্রোভাইজেশনের ছুটি। পরদিনের পত্রিকায় ছাপা হওয়া লেখাটা আছে বলে টেন্ডুলকারের কথাটা  হুবুহু তুলে দিতে পারছি। তা এ রকম: 'আজ শুধুই ক্রিকেটিং শট খেলব বলে ঠিক করেই নেমেছিলাম। আজকের ম্যাচে জয় পাওয়াটা ছিল জরুরি। তাই কোনো চান্স নিতে চাইনি। আজ ফ্যান্সি শট খেলার সুযোগ ছিল না।' 

খেলেনওনি। ১৫টি চারের ১০টিই বোধ হয় ছিল স্ট্রেট ড্রাইভে। আর একমাত্র যে ছক্কাটা জয়াসুরিয়ার বলে, তা মেরেছিলেন ছক্কাই হবে, এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই। টেন্ডুলকারের প্রেস কনফারেন্সে চামিন্ডা ভাসের প্রসঙ্গটা কেউ তোলেননি। জানলে না তুলবেন! এটা তো জানা গেছে পরে। প্রায় দশ বছর পর ভাসের কাছে জানতে চেয়েছিলাম,, 'শারজার ওই ম্যাচের আগে এমন কিছু বলেছিলেন বলে যে শুনেছি, তা কি সত্যি?' 

চামিন্ডা ভাস এমনিতেই খুব মৃদুভাষী। ছোটবেলায় তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল বড় হয়ে ধর্মযাজক হবেন। তা না হয়ে হয়েছেন পেস বোলার, কিন্তু আচার আচরণ, কথাবার্তায় ধর্মযাজকের মতোই ঠান্ডা সুস্থির। প্রশ্নটা শুনে ভাস শুধু হেসেছিলেন। সেই হাসিটাকে মনে হয়েছিল জিবে কামড় দেওয়ার মতো।