.

স্টুয়ার্ট রবার্টসন এখন কোথায় আছেন, কী করেন কিছুই জানি না। গুগল নামের আশ্চর্য প্রদীপের শরণাপন্ন হলে দশমিক ৫৬ সেকেন্ডে রবার্টসনের নামসংবলিত ২ কোটি ৪৮ লাখ লেখা-ছবি-ভিডিও চোখের সামনে হাজির করছে। আমি যে স্টুয়ার্ট রবার্টসনকে খুঁজছি, গুগল তো আর শুধু তাঁকেই খুঁজছে না। নামটাও এমন কোনো আনকমন না, এই নামে কত মানুষই তো আছে! গুগলে আসা সব তো আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব নয়। যতটুকু পারলাম, দেখলাম। কোনোটাতেই স্টুয়ার্ট রবার্টসনের হাল-হকিকতের খবর নেই। 

২.

আপনার মনে নির্ঘাত প্রশ্ন জেগেছে, এই স্টুয়ার্ট রবার্টসনটা আবার কে? তাঁকে এত খোঁজাখুঁজির দরকার পড়ল কেন? কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তা জানতেই বা কেন এত কৌতুহল! খেলা নিয়েই যেহেতু আমার কায়কারবার, হয়তো অনুমান করে নিয়েছেন, এই স্টুয়ার্ট রবার্টসন কোনো ক্রিকেটার-ফুটবলারই হবেন, বা অন্য খেলার কেউ। নামটা শুনতেও বেশ ক্রিকেটার-ক্রিকেটার লাগে। কিন্তু আমি যে স্টুয়ার্ট রবার্টসনকে খুঁজছি, তিনি কোনো ক্রিকেটার নন। শখে নিশ্চয়ই তিনিও খেলেছেন বা খেলেন। তবে তা বলার মতো কিছু নয়। তাহলে তিনি কে?

৩.

প্রশ্ন তো এটাই এবং এই প্রশ্নটা যে আপনি করছেন, এ নিয়ে স্টুয়ার্ট রবার্টসনের একটু দুঃখ হতেই পারে। ক্রিকেটার নন, কিন্তু ক্রিকেটকে বদলে দেওয়ার পেছনে যে বড় ভূমিকা আছে তাঁর। ক্যারি প্যাকারের পর ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটা এই ভদ্রলোকের কল্যাণেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টি-টোয়েন্টি মচ্ছবের সময় অবধারিতভাবেই এই স্টুয়ার্ট রবার্টসনের কথা আমার মনে পড়ে যায়! আজ আরেকটি আইপিএল শুরু হচ্ছে বলে যেমন খুব মনে পড়ছে স্টুয়ার্ট রবার্টসনকে।

৪.

ক্রিকেট নামের জটিল কিন্তু আনন্দময় খেলাটি নিশ্চয়ই কারও একক আবিষ্কার নয়। টেস্ট ক্রিকেট নামের বটবৃক্ষ থেকে ঝুরি হয়ে নেমে আসা ওয়ানডে ক্রিকেটও নয়। টি-টোয়েন্টি এখানেই ব্যতিক্রম। স্টুয়ার্ট রবার্টসনও এখানেই অনন্য।

৫.

কৃত্রিম আলো আর রঙিন পোশাকে ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছিলেন ক্যারি প্যাকার। সেই ‘বিপ্লব’-এর মূলে ছিল ব্যবসা। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের টিভি-স্বত্ব না পেয়ে চ্যানেল নাইনের মালিক বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের কিনে নিয়ে নিজেই শুরু করে দিয়েছিলেন ‘বিদ্রোহী’ এক সিরিজ। সেই উদ্ভাবন ছিল প্রতিহিংসাপ্রসূত ব্যবসায়িক উচ্চাভিলাষ। আর স্টুয়ার্ট রবার্টসনেরটা চাকরির দায়।

৬.

কাউন্টি ক্রিকেটে ক্রমহ্রাসমান দর্শকসংখ্যাই ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডকে নতুন কিছু ভাবতে বাধ্য করেছিল। সেটি ভাবার দায়িত্ব তো ইসিবির বিপণন ব্যবস্থাপকেরই। স্টুয়ার্ট রবার্টসন ভেবে ভেবেই সমাধান বের করে ফেলেননি। যাঁরা ক্রিকেট মাঠে আসেন, তাঁরা কেন আসেন; আর আসেন না, কেন নয়—এই জরিপকেন্দ্রিক বাজার গবেষণায় ব্যয় করা হয়েছিল দুই লাখ পাউন্ড। যেটির ফলাফলই জানিয়ে দিয়েছিল দর্শকচাহিদা—বৈকালিক বিনোদনের জন্য সংক্ষিপ্ততর কিছু।

৭.

ঘণ্টা তিনেকের বিনোদন জোগাতে রবার্টসনের বিশ-বিশ ৪০ ওভারের ক্রিকেটের প্রস্তাব ২০০১ সালে কাউন্টি দলগুলোর চেয়ারম্যানদের সভায় পাস হলো ১০-৭ ভোটে। যার অর্থ, আর মাত্র দুজন চেয়ারম্যান বিপক্ষে ভোট দিলেই ক্রিকেটে যুগ-বদলের এই ঘটনা আর ঘটে না।

৮.

ভাবতে বিস্ময়করই লাগে, যে ইংল্যান্ড ক্রিকেট ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় পূজারি, সেই রক্ষণশীলতার দুর্গ থেকেই কি না জন্ম টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের! ২০০৩ সালে রোজ বোলে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দুই দল ছিল হ্যাম্পশায়ার ও সাসেক্স। যেটির শুরু লক্ষ্যভ্রষ্টতায়, জেমস কার্টলির প্রথম বলটিই ওয়াইড। কিন্তু সেটি প্রতীকী হয়ে ওঠার বদলে টি-টোয়েন্টি প্রথম ম্যাচ থেকেই যাকে বলে ‘সুপারহিট’।

৯.

ক্রিকেটের সঙ্গে এই যে ‘সুপারহিট’ কথাটা অবলীলায় ব্যবহার করে ফেললাম, এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে টি-টোয়েন্টির চরিত্র! উইকেট এখানে সস্তা, চার-ছয় মুড়িমুড়কি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুড়োহুড়ি… তাৎক্ষণিক আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরা এবং দ্রুতই সেই স্মৃতিতে ধুলো পড়ে যাওয়া। সময়টাই কি এখন এমন! কোনো কিছুরই গভীরে না গিয়ে ভাসা ভাসা বোধ আর ক্ষণিকের উত্তেজনাই আমাদের জীবন!

১০.

তাঁর চিন্তাপ্রসূত টি-টোয়েন্টি এমন সর্বব্যাপী হয়ে উঠে ক্রিকেটের চেহারাই বদলে দেবে, স্টুয়ার্ট রবার্টসন সুদূরতম কল্পনাতেও তা ভেবেছেন বলে মনে হয় না। এটি যে এমন সোনার ডিম পাড়া হাঁস হয়ে উঠবে, সেটি তো নয়ই। টাকাকে খোলামকুচি বানিয়ে ফেলা আইপিএল নিলামের সময় একটু কি দীর্ঘশ্বাস পড়ে রবার্টসনের? পুরোনো একটা সাক্ষাৎকারে দেখছি, মজা করে বলছেন, ‘এই যে টি-টোয়েন্টিতে এত টাকা, আমার কিন্তু এক টাকাও বাড়তি আয় হয়নি।’

১১.

আজ আরেকটি আইপিএল শুরু। যা আগের কোনোটির মতোই নয়। না, দর্শকশূন্য গ্যালারির কথা বলছি না। এর সঙ্গে তো গত আসরেই পরিচয় হয়ে গেছে আইপিএলের। তা হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে। যেখানে করোনা ভাইরাস তখন সেভাবে তার থাবাই বিস্তার করতে পারেনি। আইপিএলের তৃতীয়বারের মতো দেশান্তরী হওয়ার কারণও ছিল এটাই। আর এবারের আইপিএল হচ্ছে করোনায় বিপর্যস্ত ভারতে, আক্রান্তের সংখ্যা যখন প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে।

আইপিএল মানে তো শুধুই ক্রিকেট নয়, অর্থের ঝনঝনানিও। আইপিএল তাই হতেই হবে। ছবি: বিসিসিআই

১২.

তারপরও আইপিএল হতেই হবে। দ্য শো মাস্ট গো অন। খেলা ছাড়া, বিনোদন ছাড়া মানুষ বাঁচবে কীভাবে! আসল কারণ যে এটা নয়, তা আপনিও জানেন, আমিও জানি। আসল কারণ টাকা। আইপিএল মানেই অর্থের ঝনঝনানি। একটা আসর না হওয়া মানেই হাজার হাজার কোটি টাকার মামলা। স্টুয়ার্ট রবার্টসন, আপনি এখন কোথায় আছেন?

১৩.

চাকরির দায় বলেন বা কর্তব্য, তা থেকেই স্টুয়ার্ট রবার্টসনের এই আবিষ্কার। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কখনো দেখা হলে একটা প্রশ্ন করবই করব বলে ঠিক করে রেখেছি। ‘মিস্টার স্টুয়ার্ট, আপনার কি কখনো আফসোস হয়, আহা, ইসিবি থেকে বেরিয়ে গিয়ে টি-টোয়েন্টির আইডিয়াটা কেন প্যাটেন্ট করে ফেলিনি? তাহলে দাবি করা যেত, যেখানেই টি-টোয়েন্টি হবে, লাভের এত পার্সেন্ট আমাকে দিতে হবে। শুধু আইপিএল থেকে তা পেলেই তো স্টুয়ার্ট রবার্টসনের পরবর্তী কয়েক পুরুষ পায়ের ওপর পা তুলে আরামে জীবন কাটিয়ে দিতে পারত।

১৪.

স্টুয়ার্ট রবার্টসনের হয়তো আফসোস হয়, হয়তো হয় না। চিন্তাটাই তো অবাস্তব। তার চেয়েও বড় কথা, কখনো ক্রিকেট মাঠে আসেন না, এমন একটা দর্শকশ্রেণিকে মাঠে টেনে আনার জন্য যে টি-টোয়েন্টির আবিষ্কার, তা এমন অর্থকরী হয়ে উঠবে, এটা তিনি কীভাবে ভাববেন! কে-ইবা তা ভাবতে পেরেছিল!

১৫.

সামান্য একটা দাবি অবশ্য করতেই পারেন স্টুয়ার্ট রবার্টসন। টাকা-পয়সা চাই না, অন্তত টি-টোয়েন্টি নিয়ে মাতামাতি করার সময় আমার নামটা একটু মনে রেখো। আইপিএলের উদ্বোধনের দিন তো অবশ্যই।