র‍্যাঙ্কিং-ফ্যাঙ্কিং কী যেন আছে! পুরো ফালতু ব্যাপার।

বাংলাদেশ দল এখন এমন বলতেই পারে। ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের এক নম্বর দলের সঙ্গে নয় নম্বর দলের লড়াই—কোন দল কোথায় তা না জেনে কেউ কালকের খেলা দেখলে বাংলাদেশকেই ভাবতেন এক নম্বর দল! দক্ষিণ আফ্রিকাকে নয় নম্বর!

দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এই বাংলাদেশ নতুন। বাংলাদেশের কাছে এই দক্ষিণ আফ্রিকাও। কালকের আগে এই দু দলের ওয়ানডে ইতিহাসে লেখা ছিল শুধুই বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণের গল্প। ৭টি ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দু শ পেরিয়েছে মাত্র একবার। যেটিতে ‘খুব ভালো’ করেছে, সেটিতেও হারতে হয়েছে ৮৩ রানে। এত দিন বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল শুধুই এক বিভীষিকার নাম। কাল উল্টো বাংলাদেশই বিভীষিকা হয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য।

বাকি সব সাফল্য পেছনে ফেলে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ম্যাচও বলতে হবে এই ‘গায়ানা মহাকাব্য’কেই। সেটি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম জয় বলে নয়। সেটি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের এক নম্বর দল বলে নয়। এই জয় পুরো বিশ্বকাপকে কাঁপিয়ে দিয়েছে বলেও নয়। সেরা ম্যাচ—এত দিন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের যে চেহারা দেখা যেত, কাল দক্ষিণ আফ্রিকারই সেই চেহারা বানিয়ে দেওয়ার কারণে।

গত তিন বছরে ‘দৈত্য বধ’ করাটাকে অভ্যাসই বানিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা... এই বিশ্বকাপে এসে আবার ভারত—কিন্তু এর কোনোটিতেই পরাক্রান্ত প্রতিপক্ষকে এমন নাস্তানাবুদ করে জেতা হয়নি। কোনোটিতেই ম্যাচের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অনেক আগেই বাংলাদেশের জয় পাওয়াটা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়নি।

এই বিশ্বকাপকে চমকে দিয়েছে বাংলাদেশ, চমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকেই। কিছুটা হয়তো নিজেদেরও। হ্যাঁ, সুপার এইটে উঠেই আরও দু-একটা আপসেট ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুটি ম্যাচের দুঃস্মৃতি মুছে দিয়েছিল সেই আত্মবিশ্বাস। এ ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দল আবার কথা বলতে শুরু করেছিল পুরোনো সুরে। গত পরশু সংবাদ সম্মেলনে হাবিবুল বাশারকে সরাসরিই প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই ম্যাচে কী প্রত্যাশা তাঁর, জেতা না লড়াই করা? হাবিবুল লড়াই করতে চেয়েছিলেন। অথচ বাংলাদেশ কাল এমন খেলাই খেলল যে, তেমন কোনো লড়াইও করতে হলো না। বাংলাদেশ এখন বড় বিপজ্জনক দল, যাদের নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা মানেই আগুন নিয়ে খেলা।

এবি ডি ভিলিয়ার্সকে বোল্ড করে দিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক ! ৬৪ রানে পড়ে গেছে দক্ষিণ আাফ্রিকার তৃতীয় উইকেট। উদযাপনের এই ধারা চলতেই থাকবে এর পর। ছবি: এএফপি

এ ম্যাচের আগে প্রথম আলোতে গ্রায়েম স্মিথের কলামটা নিশ্চয়ই পড়েছেন। ভারত যে ভুল করেছে, তাঁর দল তা আর করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা ভুল করতে না চাইলেই হবে! বাংলাদেশ যে তাঁদের ভুল করতে বাধ্য করেছে। ১৩.৪ ওভারে মাত্র ৪২ রানের ওপেনিং জুটি, ২০তম ওভারে ৬৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলা, ২৫ ওভার শেষেও স্কোর মাত্র ৯২—গ্রায়েম স্মিথ কল্পনাও করেননি, তাঁর অধিনায়কত্ব জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জাটা অপেক্ষা করছে এ ম্যাচেই।

চার শ’র বেশি রানও যারা তাড়া করে ফেলে, সেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৮৪ রানে অলআউট করে দেওয়াটা বোলারদের বড় কৃতিত্ব, সেটি বোধ হয় না বললেও চলে। বিপজ্জনক স্মিথকে আউট করে রাসেল দিলেন ব্রেক থ্রু, এরপর স্পিনের মায়াজালে জড়িয়ে হাঁসফাঁস করলেন দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানরা।

ম্যাচ শেষ! জিতে গেছে বাংলাদেশ! গায়ানার প্রভিডেন্স স্টেডিয়ামে আনন্দ আর আনন্দ

ভারতের বিপক্ষে বোলারদের এগিয়ে নেওয়ার কাজটা শেষ করেছিলেন ব্যাটসম্যানরা। আর কাল ব্যাটসম্যানদের গড়ে দেওয়া ভিত্তিতে দাঁড়িয়েই তাঁদের জয়োৎসব।

ব্যাটসম্যানদের না বলে শুধু মোহাম্মদ আশরাফুলেরও বলতে পারেন। আফতাব করেছেন ৩৫, কেম্পের বলে পরপর দুটি ছক্কা মেরে তিনিই প্রথম দিয়েছেন যুদ্ধের ঘোষণা। রান আড়াই শ পেরিয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডে অবদান আছে মাশরাফির ১৬ বলে ২৫ রানেরও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুল-মালা যা-ই দেন, তা দিতে হবে মোহাম্মদ আশরাফুলকেই। ৮৩ বলে ৮৭ রানের যে ইনিংসটি খেলেছেন, সেটি আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে আশরাফুল যেদিন খেলেন, সেদিন বিশ্বের কোনো দলই আর অজেয় থাকে না। অস্ট্রেলিয়াও থাকেনি, দক্ষিণ আফ্রিকাও থাকল না।