উৎপল শুভ্র: তিন বাঁহাতি স্পিনারের একসঙ্গে খেলে যাওয়া এখন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। আর কোনো দল তিনজন স্পিনার নিয়েই খেলছে না। অথচ আপনারা তিনজন বাঁহাতি হয়েও দিব্যি একসঙ্গে খেলে যাচ্ছেন। রহস্যটা কী?

মোহাম্মদ রফিক: এখানকার যা উইকেট, তাতে ফাস্ট বোলারদের খুব সহজে খেলা যায়। হয়তো এ কারণেই আমাদের দলে তিনজন স্পিনার খেলানো হচ্ছে। এই বিশ্বকাপে আর কোনো দলে তিনজন স্পিনার নেই, সব দল চারজন-পাঁচজন ফাস্ট বোলার নিয়ে খেলছে। আমরা তিনজন স্পিনার শুধু খেলছিই না, নিয়মিত ৩০ ওভার-২৫ ওভার বোলিংও করছি। সফলও হয়েছি। 

আবদুর রাজ্জাক: ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেটে স্পিনাররা ভালো করবে জেনেও আর কোনো দল কিন্তু তিনজন স্পিনার আনেনি। আমরা তিনজনই খেলতে পারছি। সাকিব অলরাউন্ডার বলে, ও চার নম্বরে ব্যাট করছে, আবার ১০ ওভার বোলিংও করে দিচ্ছে। ওর মতো একজন খেলোয়াড় দলে থাকায় আমি নিজেদের লাকিই বলব।

সাকিব আল হাসান: আমার মনে হয়, শুরুতে আমাদের তিনজনকে একসঙ্গে খেলিয়ে সাফল্য পাওয়াতেই টিম ম্যানেজমেন্ট এই কম্বিনেশনটা ভাঙতে চাইছে না। আমরা যে থার্ড সিমার ছাড়াই খেলতে পারছি, এর মূল কারণ হলো রাজ্জাক ভাই নিয়মিত পাওয়ার প্লেতে বল করেন। খুব কঠিন একটা কাজ, কিন্তু তিনি দারুণ সফল। রফিক ভাই তো প্রতি ম্যাচেই ১০ ওভার ভালো বোলিং করে দিচ্ছেন। এখানে একজন পেস বোলার আনলে কোনোদিন হয়তো ভালো করত, কোনোদিন মার খেত। কিন্তু রফিক ভাই আর রাজ ভাইয়ের ২০ ওভার প্রতিদিনই দারুণ। খুব খারাপ দিন ছাড়া তাদের কেউই ৪০-৪৫-এর বেশি রান দেন না। এই বিশ্বকাপে আমাদের অ্যাটাকটা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে আলাদা।

শুভ্র: সাকিব তো নতুন, রফিক আর রাজ্জাককে প্রথম দেখার স্মৃতি মনে আছে? রফিক-রাজ্জাককেও যদি অন্য দুজনকে প্রথম দেখার স্মৃতিটা বলতে বলি।

সাকিব: রফিক ভাইয়ের নাম অনেক শুনতাম। তবে সেভাবে চিনতাম না। ছোটবেলায় আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের চেয়ে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের নিয়েই আমি বেশি মগ্ন ছিলাম। রফিক ভাইকে প্রথম বোধ হয় দেখি ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর। রাজ ভাই বোধ হয় পরপর দুবছর লিগে সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছিলেন। তখনই প্রথম উনার নাম শুনি। এর পরের বছর প্রথম একসঙ্গে খেলি।

রাজ্জাক: ১৯৯৪ সালে আমি বিকেএসপিতে ভর্তি হই। রফিক ভাই তো পরের বছর থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। আমি খেলার মধ্যেই ছিলাম বলে শুরু থেকেই রফিক ভাইকে চিনতাম। আর সাকিবের কথা প্রথম শুনি, যখন ও আন্ডার সেভেন্টিন টিমে। যে দু-একটা ছেলে খুব ভালো খেলছে, তাদের মধ্যেই সাকিবের নাম শুনতাম। পরে ওকে ভালো করে চিনি একসঙ্গে হাই পারফরম্যান্স ট্রেনিং করার সময়।

গায়ানার জর্জটাউনের টিম হোটেলে ইন্টারভিউয়ের মোড়কে আড্ডায় বাংলাদেশের তিন বাঁহাতি স্পিনার সাকিব, রাজ্জাক ও রফিক। ছবিটাতেও যেন কালের ধুলা পড়েছে।

শুভ্র: রাজ্জাক, আপনার বাঁহাতি স্পিনার হওয়ার গল্পটা তো পুরো রফিকের মতো। ছিলেন বাঁহাতি পেসার, হয়ে গেলেন স্পিনার। রফিকও তো তা-ই। রফিকের গল্পটা তো আপনি জানেন।

রাজ্জাক: হ্যাঁ, জানি।

শুভ্র: রফিক, আপনি জানেন রাজ্জাকের পেসার থেকে স্পিনার হওয়ার গল্প?

রফিক: না তো। বল্ তো শুনি।

রাজ্জাক: বিকেএসপিতে আমাদের ঘাসের মাঠে ম্যাচ হতো। তাতে সবাই স্পিন বোলিং করত। এক দিন ৪ ওভারে ৪ রানে ৫ উইকেট পেলাম। এর পর পিঠে ব্যথা পেলাম, পেস বোলিং করতে সমস্যা হতো, আর স্পিনে ভালো করছিলাম। এভাবেই স্পিনার হয়ে গেলাম।

শুভ্র: রফিককে তো বাঁহাতি স্পিনার বানিয়েছেন পাকিস্তানি অলরাউন্ডার ওয়াসিম হায়দার, তাই না? সাকিব বোধ হয় গল্পটা জানেন না। রফিক, বলবেন নাকি ওকে!

রফিক: লিগে পর দিন আবাহনীর সঙ্গে খেলা। ওয়াসিম হায়দার আর আমি নক করছি। ও আমাকে ২৫টা বল করবে, আমি ওকে ২৫টা। তো আমি স্পিন করছি। খেলতে খেলতে ও কী বুঝল, তখন বুঝিনি। পরদিন ৫ ওভার পেস বোলিং করানোর পর বাকি ৫ ওভার স্পিন বোলিং করলাম। বিমানের অধিনায়ক ছিলেন শানু ভাই। তিনি আমাকে বললেন, এবার স্পিন বল কর। শানু ভাই আর ওয়াসিম হায়দার যে আগেই আলোচনা করে এটা ঠিক করে রেখেছিলেন, আমি তা জানতাম না। ওই ৫ ওভারে আমি ৩ উইকেট পেয়ে যাই। লিগটা শেষ হওয়ার পর অফ সিজনটা আমি প্রচুর খেটেছি। কারণ টেনশন ছিল, স্পিনে কেমন করি, বিমান আমাকে নেবে কি নেবে না। বিমানের কর্মকর্তা রাইস ভাই অবশ্য আমাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘তুই চিন্তা করিস না। তুই খেলবিই। স্পিন বোলিংটা ভালো করে শিখতে থাক।’ আজ আমি যে পর্যায়ে এসেছি, তাতে বিমানের অনেক অবদান।

শুভ্র: এবার একটু কঠিন প্রশ্ন। তিনজনই যেহেতু বাঁহাতি স্পিনার, একে অন্যের বোলিং সম্পর্কে আপনাদেরই ভালো বলতে পারার কথা। রাজ্জাক, আপনি শুরু করুন।

রাজ্জাক: রফিক ভাই আর আমার মধ্যে বেশ মিল আছে। তবে সাকিব ডিফারেন্ট। ও টার্ন আর লুপের ওপর বেশি নির্ভর করে। আমার আর রফিক ভাইয়ের মধ্যে মিল হলো, আমরা দুজনই জোরের ওপর বল করি। ছোট টার্ন হলেও আমাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না। আমরা পার পেয়ে যেতে পারি। কিন্তু উইকেটে একেবারেই টার্ন না থাকলে সাকিবের একটু অসুবিধা হয়। কারণ ওর বল আস্তে আসে বলে ব্যাটসম্যানরা সময় একটু বেশি পায়।

সাকিব: রফিক ভাইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, উনি ব্যাটসম্যানকে খুব ভালো রিড করতে পারেন। কাকে কখন জোরে করতে হবে, আস্তে করতে হবে, এটা উনি খুব ভালো বোঝেন। রাজ ভাইয়ের ঘটনা হলো, যত বড় ব্যাটসম্যানই হোক আমি তাকে ডট বল করতে পারব—এই কনফিডেন্সটা উনার আছে। এ কারণেই উনি সব সময়ই ভালো বোলিং করেন।

রফিক: ওরা দুজন এখনো নতুন। আমি এক শর ওপর ম্যাচ খেলে ফেলেছি। ওরা যত ম্যাচ খেলবে, ততই বেশি কনফিডেন্স পাবে। নিজের বোলিংয়ের ব্যাপারে বলব, আল্লাহ আমাকে একটা ক্ষমতা দিয়েছেন, আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাটসম্যানকে লক্ষ্য করতে পারি। ব্যাটসম্যান কী করতে চাইছে, সেটা দেখেই তাই বল করতে পারি।

তিন বাঁহাতি স্পিনার মিলে লিখেছেন অনেক সাফল্যের গল্প। বাঁ থেকে: আবদুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ রফিক ও সাকিব আল হাসান

শুভ্র: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনাদের প্রিয় বাঁহাতি স্পিনার কে? আদর্শ বলে মনে করেন এমন কেউ কি ছিলেন বা আছেন?

রফিক: আমার জয়াসুরিয়াকে ভালো লাগত। ও আমার মতোই বাঁহাতি স্পিনার, ব্যাটিংয়েও আমি ওর সঙ্গে মিল খুঁজে পেতাম। আমি তাই ওকে ফলো করতে চেষ্টা করতাম। 

রাজ্জাক: ভেট্টোরির বোলিং ভালো লাগে। ওর স্ট্রাইড, বোলিং অ্যাকশন সবই ভালো লাগে।

সাকিব: আমার ভেট্টোরিকে ভালো লাগে। ওর অনেক ভ্যারিয়েশন আছে। একই জায়গা থেকে সেই ভ্যারিয়েশনগুলো করতে পারে।

শুভ্র: রাজ্জাক, আপনি না এক সময় বিষেন সিং বেদীর খুব ভক্ত ছিলেন।

রাজ্জাক: বিকেএসপিতে থাকতে আমি প্রথম যে স্পিন ক্যাম্পটা করেছিলাম, সেটি করিয়েছিলেন বিষেন সিং বেদী। তখন উনার কথাবার্তা খুব ভালো লেগেছিল। উনি বলেছিলেন, স্পিন বোলারের ফ্লাইটটাই আসল। বোওল লাইক এ রেইনবো। কিন্তু এখন আমি যদি রেইনবোর মতো বল করতে যাই, তা হলে নিজেই রেইনবো হয়ে যাব (হাসি)। 

শুভ্র: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বল করাটা সবচেয়ে কঠিন বলে মনে হয়েছে?  

রফিক: সব লেফটি ব্যাটসম্যানকে বল করতেই আমার একটু সমস্যা হয়। ওরা উইথ দ্য স্পিন মারতে পারে। তা ছাড়া ডানহাতি ব্যাটসম্যানের লেগ স্টাম্পে বল পড়লেও সেটি ভেতরে ঢুকে বলে সমস্যা হয় না, কিন্তু বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে অফ স্টাম্পে পড়েও বল টার্ন করলে তা ওয়াইড হয়ে যায়। সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে হেইডেনকে।

রাজ্জাক: সনাৎ জয়াসুরিয়া। সেটি শুধু এই বিশ্বকাপে মার খেয়েছি বলে নয়। এর আগে ওর বিপক্ষে একবার বোলিং করেছি। সেবারও ভালো কিছু হয়নি।

সাকিব: সবচেয়ে কঠিন ম্যাথু হেইডেন।

শুভ্র: বিশ্বকাপটা কেমন লাগছে? 

রফিক: আমরা দিন দিন ইমপ্রুভ করছি বলেই আজকের জায়গায় আসতে পেরেছি। বিশ্বকাপটা খুব ভালো কাটছে। তবে বাকি তিনটা ম্যাচ ভালো হলেই বলতে পারব যে, সব ভালো হলো।

রাজ্জাক: যা ভেবে এসেছিলাম, এখন পর্যন্ত তার চেয়েও ভালো হয়েছে। খুব ভালো লাগছে ওয়ার্ল্ড কাপটা। 

সাকিব: এত ভালো লাগছে যে, কোনো ভাষাই আসছে না।