টুইটারে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার। কিছুদিন আগে সেখানে ব্যাঙের মুখোশ পরা একটা ছবি পোস্ট করলেন। নিজেরই ছবি। নিচে ক্যাপশন—আমি ব্যাঙ হতে পারিনি!

কোসুকে কিতাজিমা তাহলে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন! বুঝতে পেরেছিলেন, লন্ডন অলিম্পিক আসছে ‘ব্যাঙ রাজা’র রাজত্ব অবসানের ঘোষণা নিয়ে। গত পরশু অ্যাকুয়াটিক সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষিত হলো। ‘ঘোষিত হলো’ কথাটা প্রতীকী অর্থে। ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে সোনা জিতেছেন হাঙ্গেরির ড্যানিয়েল গুয়ার্তো। অ্যাকুয়াটিক সেন্টারকে সব সময় সরগরম করে রাখা সাঁতারের ধারাভাষ্যকারেরা তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। চতুর্থ হওয়া কিতাজিমার কথা কে মনে রাখে!

তবে সাঁতার শেষে পুলের দিকে যেন অভিমানভরে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাওয়া সাঁতারুকে ইতিহাস অবশ্যই মনে রাখবে। বেইজিং অলিম্পিকে ‘কিউব’ নামের পুলে মাইকেল ফেলপসের ঔজ্জ্বল্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন বাকি সবাই। কোসুকে কিতাজিমার কীর্তিটা তাই প্রাপ্য মনোযোগ পায়নি। অথচ ইতিহাস তিনিও গড়েছিলেন—এথেন্সে ১০০ ও ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে জেতা ‘ডাবল’ বেইজিংয়েও ধরে রেখে। পরপর দুই অলিম্পিকে ব্রেস্টস্ট্রোক ‘ডাবল’ জয় তো অনন্যই, ব্রেস্টস্ট্রোকে ৪টি অলিম্পিক সোনাও আর কারও নেই।

ফেলপসের সময়ে জন্ম নেওয়াটাকে যেকোনো সাঁতারুই তাঁর দুর্ভাগ্য বলে ভাবতে পারেন। তবে একটা জায়গায় ফেল্প্সকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কিতাজিমা। অলিম্পিকে দুজন মেয়ের পরপর তিন অলিম্পিকে একই ইভেন্টে ব্যক্তিগত সোনা জয়ের ঘটনা আছে (অস্ট্রেলিয়ার ডন ফ্রেজার, ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল, ১৯৫৬-৬৪ ও হাঙ্গেরির ক্রিস্টিনা এগারজেগি, ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ১৯৮৮-৯৬)। তবে কোনো পুরুষ সাঁতারুর এই কীর্তি নেই। সেই কীর্তিমান হওয়ার সুযোগটা ফেল্প্স আগে পেয়েছিলেন, এবারের সাঁতার প্রতিযোগিতার প্রথম দিনেই। ৪০০ মিটার মিডলেতে ফেলপসের ব্যর্থতার পর কিতাজিমার সুযোগ আসে ‘প্রথম’ হয়ে যাওয়ার। অথচ ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে হলেন পঞ্চম। ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে ফেল্প্স সোনা জিততে না-পারায় পাওয়া দ্বিতীয় সুযোগটাও পরশু কাজে লাগাতে পারলেন না। বিশ্ব রেকর্ডের চেয়ে কম সময়ে প্রথম ৫০ মিটার সাঁতারেও, প্রথম ১০০ মিটার এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পদক তালিকাতেই নেই। যেটিকে বলা যায় যুগের অবসান, সুইমিংপুলে ‘ব্যাঙ রাজত্বের’ও!

কোসুকে কিতাজিমা: ব্রেস্টস্ট্রোকের রাজা ওরফে 'ব্যাঙ রাজা'

বারবার ‘ব্যাঙ’ ‘ব্যাঙ’ করার রহস্যটা খুলে বলা দরকার। ২০০৩ সালে প্রথম এশিয়ান হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছিলেন। সেটিও ১০০ ও ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোক—দুটিতেই বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। পরের বছর এথেন্সেও ব্রেস্টস্ট্রোক ডাবল। ব্রেস্টস্ট্রোক দেওয়ার সময় সব সাঁতারুই ব্যাঙ-লাফ দিচ্ছেন বলে মনে হয়। কিতাজিমাকে একটু বেশিই ব্যাঙ-ব্যাঙ লাগত বলে জাপানিরা ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়ে দেয় ‘ফ্রগ কিং!’ 

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েই তারকা, এথেন্সে প্রথম জাপানি হিসেবে সাঁতারে দুটি সোনা জয়ের পর পরিণত হন জাতীয় বীরে। ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোক জয়ের পর কিতাজিমার বিজয়োল্লাসটাও সাঁতারের অমর ছবি হয়ে আছে। পুলের পাশে প্রথম প্রতিক্রিয়াটাও খুব বিখ্যাত—চো-কিমোচি! অর্থ—আমার খুবই খুবই ভালো লাগছে। খুব দ্রুতই জাপানিদের মুখের বুলিতে পরিণত হয় এটি। খুশির উপলক্ষ বা আনন্দ বোঝাতে মুখে মুখে ‘চো-কিমোচি’।

বেইজিংয়ের পর আত্মতৃপ্তি ঘিরে ধরেছিল বলেই কিনা, সাঁতারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাচ্চাদের কোচিং করাতে শুরু করান, নিজের অ্যাথলেটিক ক্যারিয়ার নিয়ে বক্তৃতা দিতে যান এখানে-ওখানে। সারাক্ষণ তাঁকে অনুসরণ করে বেড়ানো জাপানি সংবাদমাধ্যমের চোখের আড়াল হতে ২০০৯ সালে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ইংরেজি পড়বেন বলে। সেখানেই রক্তে জলের টানটা প্রবল হয়ে ওঠে আবারও। ফেরেন সুইমিংপুলে।

এথেন্সে ছিল ‘ডাবল’, বেইজিংয়ে হলো ‘ডাবল ডাবল’। জাপানের অলিম্পিক ট্রায়ালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ‘ডাবল ট্রিপল’-এর স্বপ্নও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বয়স যে নীরবে থাবা বসিয়ে দেয়, ২৯ বছর বয়সী কিতাজিমাকে সেটিই বুঝিয়ে দিল লন্ডন অলিম্পিক। তাঁর নামাঙ্কিত দুটি ইভেন্টেই বিশ্ব রেকর্ড গড়ে সোনা জিতেছেন তরুণতর প্রতিদ্বন্দ্বী। 

সব রাজত্বই একদিন শেষ হয়। ‘ব্যাঙ রাজা’র ব্যতিক্রম হওয়ার সাধ্য কী!