কারমেলো অ্যান্থনির মনে কি ফিরে আসছিল সেই স্মৃতি? মনে পড়ছিল এথেন্স ২০০৪?

সেই অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্র দলের একমাত্র তিনিই আছেন এবারও। পরশু চতুর্থ কোয়ার্টারের শুরুতেই যখন এগিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্থনির সেই দুঃস্মৃতি মনে না পড়ে পারেই না। প্রথম ম্যাচেই পুয়ের্তো রিকোর কাছে অপ্রত্যাশিত হার। পরে লিথুয়ানিয়ার কাছেও। তারপরও সেমিফাইনাল ওঠা গিয়েছিল, যাতে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে জুটেছিল একটা পদকও। ব্রোঞ্জ জিতেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল দল ব্রোঞ্জকে কোনো পদক মনে করে নাকি!

রেকর্ড দেখলেই কারণটা বুঝতে পারবেন। রিও অলিম্পিকের আগে যে ১৭ বার বাস্কেটবলে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সোনা জিতেছে তার ১৪টিতেই। ১৯৩৬ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত টানা ৭টি অলিম্পিকে সোনা। ১৯৭২ সালে মিউনিখে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সেটি বিসর্জন দেওয়ার কাহিনি অলিম্পিকের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। যেটির প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র রুপার পদকটি নেয়নি। এখনো তা আইওসির কাছেই জমা আছে।

গত ৬টি অলিম্পিকের মধ্যে শুধু একবারই বাস্কেটবলের সোনা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। সেটি ওই ২০০৪ এথেন্সেই। আর অস্ট্রেলিয়া? অলিম্পিক বাস্কেটবলে সেরা ফল দুবার চতুর্থ হওয়া। দলের মাত্র ছয়জন এনবিএতে খেলে। তারাই যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কাঁপিয়ে দেবে, এটা কারও কল্পনায়ও ছিল না। এথেন্সের ওই দুঃসহ স্মৃতিই বোধ হয় জাগিয়ে দিল কারমেলো অ্যান্থনিকে। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই শেষ পর্যন্ত ৯৮-৮৮ পয়েন্টে জিতে গেল যুক্তরাষ্ট্র। ছেলেদের বাস্কেটবলে চতুর্থ অলিম্পিকে খেলার একমাত্র কীর্তিটা অ্যান্থনির। লেব্রন জেমসকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ডটাও করে ফেললেন এদিন।

 ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র হেরে গেলে সংবাদ সম্মেলনে নির্ঘাত খেলার চেয়ে ‘সিলভার ক্লাউড’ নিয়েই বেশি প্রশ্ন হতো! তা এই সিলভার ক্লাউডটা কী? বিলাসী এক জাহাজের নাম। এই অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ ও মহিলা বাস্কেটবল দলের আবাস।

স্কোরলাইন ম্যাচের পুরো গল্পটা বলছে না। চতুর্থ কোয়ার্টারের মাঝামাঝিও এগিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। অ্যান্থনির দারুণ কিছু থ্রি-পয়েন্টারেই বদলে গেল ছবিটা। তা না হলে সংবাদ সম্মেলনে নির্ঘাত খেলার চেয়ে ‘সিলভার ক্লাউড’ নিয়েই বেশি প্রশ্ন হতো!

তা এই সিলভার ক্লাউডটা কী? বিলাসী এক জাহাজের নাম। এই অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ ও মহিলা বাস্কেটবল দলের আবাস। বোল্ট-ফেলপস অলিম্পিক ভিলেজেই আছেন। এই অলিম্পিকের বাকি সব অ্যাথলেটও। ব্যতিক্রম শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল দল।

ব্যতিক্রমটা অবশ্য এখন নিয়ম হয়ে গেছে। ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল দল আর ভিলেজে থাকে না। ২০০৪ সালে এথেন্সেও এমন একটা জাহাজেই ছিল। বেইজিং ও লন্ডনে তো আর পাশে সাগর ছিল না, যে কারণে সেখানে হোটেলে। এনবিএর সুপারস্টারদের ভিলেজের সাধারণ জীবনযাপনে পোষায় না।

১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাস্কেটবল দলের ভিলেজের বাইরে চলে যাওয়ার সঙ্গে একটি তথ্যের যোগসূত্র আছে। অলিম্পিকে সেবারই প্রথম এনবিএর খেলোয়াড়দের খেলার অনুমতি মেলে। তারায় তারায় ভরে যায় যুক্তরাষ্ট্র দল। তারকাখচিত যে দলের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ড্রিম টিম’। পরের অলিম্পিকগুলোতে ‘ড্রিম টিম টু’ ‘ড্রিম টিম থ্রি’ও বেশ চলেছে। এবারের দলের সঙ্গে অবশ্য ‘ড্রিম-ট্রিম’ যোগ করা হচ্ছে না।

এই সেই 'সিলভার ক্লাউড'। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

যা হচ্ছে, তা হলো সিলভার ক্লাউড নিয়ে গবেষণা! সাধারণ কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সহজেই। ১৯৬টি কেবিন আছে এতে, ৪০০ জনের থাকার ব্যবস্থা। আছে সুইমিংপুল, ক্যাসিনো, লাইব্রেরি ও ফিটনেস সেন্টার। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বাস্কেটবল দল ছাড়াও বাইরের লোকজনও নাকি আছে। তবে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নেই। কৌতূহলটা এ কারণেই বেশি। নইলে কি আর জাহাজের ভেতরের কিছু ছবি জোগাড় করে ‘এক্সক্লুসিভ’ শিরোনাম দিয়ে তা ছাপে যুক্তরাষ্ট্রের এক পত্রিকা!

কেউ বলছে জাহাজ, কেউবা ইয়ট। তবে ‘বোট’ কথাটাই বেশি চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা দলের খেলোয়াড় সু বার্ড সুন্দর একটা নাম দিয়েছেন ‘বো-টেল’! বোট আর হোটেলের সংকর আরকি! যুক্তরাষ্ট্র বাস্কেটবল দলের কোচ মাইক ক্রাইজেউস্কি যা নিয়ে প্রশ্ন শুনতে শুনতে মহাবিরক্ত। এক সাংবাদিকের প্রশ্নে শব্দচয়ন একটু উল্টোপাল্টা হয়ে যাওয়ায় রেগেমেগে উত্তর দিয়েছেন, ‘আপনি ভুল বলছেন, আমরা বোটে বাস করি না। বোটে থাকছি। আমি বাস করি নর্থ ক্যারোলাইনার ডারহামে। সেখানে আমার বাড়িতেও সুইমিংপুল আছে।’

কী বোঝাতে চাইলেন ক্রাইজেউস্কি? সিলভার ক্লাউড আপনাদের কাছে বিরাট কিছু হতে পারে, আমাদের কাছে নয়, আমরা এমনিতেও এমন জীবন যাপনই করি। হয়তোবা!