প্রিয় ম্যারাডোনা,

তোমার কথা উঠলেই চোখে ভেসে ওঠে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। ছিয়াশি বিশ্বকাপে মাঝমাঠ থেকে ছিটকে বেরুলো তােমার খর্বাকৃতি দেহ, হতবিহ্বল ইংরেজ খেলােয়াড়দের পেছনে ফেলে কী অসাধারণ সৌন্দর্যময়তায় এগিয়ে যাচ্ছ তুমি প্রতিপক্ষের গােলের দিকে। বলের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণের এক অনুপম প্রদর্শনীতে পৌঁছেও গেলে একসময় কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়। বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক পিটার শিলটনকেও বােকা বানিয়ে যখন বল ঠেলে দিলে জালে, সৃষ্টি হলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের মহত্তম মুহূর্তগুলাের একটি। বিস্ময়ের ঘাের কাটতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল, তারপরই ফেটে পড়ল গােটা স্টেডিয়াম। টিভি সেটের সামনে বসা কোটি কোটি দর্শক কচলে নিলো চোখ, সারাবিশ্ব আক্রান্ত হলাে ম্যারাডেনা-ফিভারে। একাকার হয়ে গেলাে দু'টি নাম-ফুটবল আর ম্যারাডােনা, ম্যারাডোনা আর ফুটবল।

তােমার দেশ আর্জেন্টিনা, গর্ব করার মতাে এমন কী-ই বা আছে তার! তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যহত দেশগুলাের তাে সেই একই কাহিনী-দারিদ্র্য, হতাশা, ঋণের বােঝা আর সামরিক বাহিনীর উচ্চাভিলাসী ষড়যন্ত্র। সেই আর্জেন্টিনাকে ভিন্ন পরিচিতি দিলে তুমি, আসীন করলে মর্যাদার আসনে। আর্জেন্টিনা থেকে বহুদূরে বাংলাদেশ নামের এই ছােট দেশটির প্রতিটি মানুষও চেনে এখন আর্জেন্টিনাকে, তবে পরিচিতি তার: 'ম্যারাডােনার দেশ'। বুয়েনস এইরেসের বস্তি থেকে খ্যাতি আর প্রাচুর্যের চূড়ায় উঠে বিশ্বজুড়ে পীড়িত মানুষের নিয়ত অনুপ্রেরণা হয়েছিলে তুমি। মাঠে তোমার অবিশ্বাস্য ক্রীড়াশৈলী, প্রচারের এত ডামাডােলের মধ্যেও কেন যেন কখনোই খুব দূরের মানুষ মনে হয়নি তােমাকে। চেহারায় সাদৃশ্য কারণ হতে পারে একটা, এছাড়াও এদেশের অধিকাংশ মানুষের মতো তােমারও ছিল কুসংস্কারের প্রতি আনুগত্য। সব মিলিয়ে তুমি ছিলে ঠিক যেন পাশের বাড়ির ছেলেটি।

নব্বইয়ের বিশ্বকাপে নিজের খেলাটা খেলতে পারোনি তুমি। বলা ভালো, খেলতে দেয়া হয়নি তােমাকে। কারণ আমরা যেমন জানি, বিপক্ষও জানত- আর্জেন্টিনা মানেই তুমি, বল পায়ে এক লাতিন যাদুকর। তাই প্রতিভার মূল্য দিতে হলো বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের আক্রমণে। ওদের আঘাতে যখন মাটিতে পড়ে আক্রোশে মাথা নাড়তে তুমি, নিষ্ফল আক্রোশে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত টিভি সেটের সামনে বসা এদেশের মানুষও। তারপর অবিশ্বাস্যভাবে দলকে ফাইনালে টেনে নিয়ে গিয়েও চূড়ান্ত সাফল্য থেকে যখন বঞ্চিত হলাে তােমার দল, রেফারির একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে, কেঁদে ফেলেছিলে তুমি। তুমি তো জানো না, তোমার চোখের জল এদেশের কােটি মানুষকে কাঁদিয়েছে সে রাতে।

এখন তােমার ঘাের দুঃসময়। কোকেন গ্রহণের দায়ে বহিষ্কৃত হয়ে বলতে গেলে শেষই হয়ে গেছে তােমার ফুটবল ক্যারিয়ার। আর মাঠে নামবে না তুমি, সবুজ মাঠের প্রতিটি ঘাস আর নতজানু হবে না বিস্ময়ে, দর্শকদের চোখে আর মুগ্ধতার মায়াঞ্জন বোলাবে না তোমার অনুপম খেলা।

কিন্তু এখানেই তাে শেষ নয় বিড়ম্বনার। নব্বইয়ের বিশ্বকাপে গােলআলুর মধ্যে ফুলে ওঠা পা নিয়েও মাঠে নামছিলে তুমি পেইনকিলার ইনজেকশন দিয়ে, তােমার উচ্চারণে ফুটে বেরিয়েছিল অনুসরণীয় দেশপ্রেম: আমার দেশের জন্যে সব ব্যথা সইতে পারি আমি।

সেই আর্জেন্টিনা, তােমার প্রিয় দেশ, যেখানে অধিষ্ঠিত হয়েছিলে তুমি ঈশ্বরতুল্য উচ্চতায়, সেখানেই হাজতে রাত কাটাতে হবে তােমাকে-কে ভেবেছিল তা!

তোমার অ্যাপার্টমেন্টে কোকেন পেয়েছে পুলিশ। তারপরও এদেশের মানুষ বিশ্বাসই করতে চায় না কিছু। তাদের কাছে এটা সাজানাে নাটক বা ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের সব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তোমার ছবি। এমন ছবি, যা দেখতে চায়নি কেউ। অথচ দেখাে, কতটা ভালবাসে তােমাকে মানুষ, একটি কথাও বলেনি কেউ তােমার বিরুদ্ধে, বরং সহমর্মিতা উপচে পড়েছে সবার কথায়। ইতালিতে মাফিয়ার সঙ্গে তােমার গন্ডগােলের কথা সবারই জানা। জানারই কথা, তােমার সম্পর্কিত যেকোনাে খবরই তাে গোগ্রাসে গিলে পাঠক। বিশ্বকাপের সময়ও বলেছিলে তুমি, মাফিয়ারাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়াউৎসবকে। তােমার গ্রেফতারের খবর পড়ে একজন তাে পুরােপুরিই উড়িয়ে দিলাে ব্যাপারটা। বলল, "সবই মাফিয়ার চাল। মাফিয়ার বিরুদ্ধে বলেছিল ম্যারাডােনা, ওরা অ্যাপার্টমেন্টে আগেই রেখে এসেছে কোকেন।"

যে দেশে তুমি ঈশ্বরের মর্যাদায় আসীন, সে দেশের জেলেই রাত কাটাতে হবে তোমাকে, কে ভেবেছিল! বুয়েনস এইরেস, ১৯৯১। ছবি: মিডিয়াম

বলা হয়, সত্য কোনােদিন চাপা থাকে না, আবার থাকে। মিথ্যে অপবাদের দুর্বহ বােঝাও তাে বয়ে বেড়াতে হয় অনেককেই। হয়তাে বা একদিন প্রকাশিত হবে সন্দেহাতীত সত্য। যদি সত্যিই  তুমি দোষী হয়ে থাকো, একটি প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছে আমার: কেন এমন করলে তুমি? যশ, খ্যাতি, বিত্ত-বৈভব কোনো কিছুরই ভাে অভাব ছিল না তােমার। আর পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্লভ যে পাওয়া, মানুষের ভালবাসা- তােমার চেয়ে বেশি ক'জন তা পেয়েছে? তারপরও কী কোথাও ফাঁকি ছিল তােমার জীবনে? তাই জড়িয়ে পড়া এই সর্বনাশা মােহজালে?

কিন্তু তারপরও, তোমার বিরুদ্ধে অভিযােগে সন্দেহের কণামাত্রও যদি না থাকে একদিন, তবুও বিশ্বাস করো, প্রিয় ম্যারাডোনা, তােমার কথা মনে হলেই চোখে ভেসে উঠবে ছিয়াশির অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। কখনােই গলায় চেপে বসা পুলিশের বাহুর মধ্যে বিপর্যস্ত তােমার মুখ নয়!

আরও পড়ুন...
তিনি ছিলেন তাঁর মতো