টেস্টের তৃতীয় দিন বিকেলে ভারতীয় ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে একবার মনে হলাে, একটু দূরে বসে থাকা ভেংকটপতি রাজুকে গিয়ে কৃতজ্ঞতাটা জানিয়েই আসি। বিপজ্জনক হতে পারে ভেবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাতিল করেছি সেই পরিকল্পনা। এমনিতে এই হায়দরাবাদি বাঁহাতি স্পিনার খুবই সজ্জন প্রকৃতির, কিন্তু তারপরও ঝুঁকি ছিল। কারণ যে কারণে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, সেটি নিশ্চয়ই তখনাে আক্ষেপে পােড়াচ্ছিল তাঁকে। দিনের খেলা শেষে মাঠ ছাড়ার সময় রাজুকে একবার হাসতে দেখেই বরং অবাক হয়েছিলাম, এমন দুর্ভাগ্যের পরও হাসি!

তাঁর বল ব্যাটসম্যানকে বিপর্যস্ত করে স্টাম্পে গিয়ে লাগল, অথচ বিস্ময়ের বিস্ময়– বেল দুটি বহাল তবিয়তে বসে থাকল তারপরও! স্পিনারদের 'স্লো বােলার' বলা হয়, তবে রাজুও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন এত 'স্লো' বল করাটা তার একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে! ৩৭ রানে থাকা সেই ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত আর আউটই হলেন না, ইনিংসের সব উইকেট যখন শেষ তখনাে তিনি অপরাজিত, নামের পাশে ১৫৩ রান। স্টাম্পে লাগার পরও বেল পড়ে না, এমন ব্যতিক্রমী একটি বল করার জন্যই ভেংকটপতি রাজুকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইছিলাম। কারণ ব্যাটসম্যানটির নাম মার্ক এডওয়ার্ডস ওয়াহ!

রসিকতা থাক। ইচ্ছেমতাে ও রকম বল করার ক্ষমতা থাকলে ভেংকটপতি রাজু আরও অনেক দিন ভারতীয় দলে থাকতেন। তবে স্টাম্পে বল লাগার পরও বেল না পড়ায় আমার খুশি হওয়ার ব্যাপারটি রসিকতা নয়। এই প্রায় অলৌকিক ঘটনাটিই তাে সুযােগ করে দিয়েছে মার্ক ওয়াহর অমন একটি ইনিংস দেখার। আনন্দের পসরা সাজিয়ে বসায় যে ক্রিকেটের জুড়ি নেই, সেই ক্রিকেটেও মার্ক ওয়াহর ব্যাটিং দেখার চেয়ে আনন্দদায়ী খুব বেশি কিছু নেই–এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি আমি অনেক দিন আগেই, টিভি পর্দায় তাঁর দু-একটি ইনিংস দেখার পরই। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে খেলা কাভার করতে শুরু করার পরও দেখেছি মনের পর্দায় স্থায়ী ছাপ রেখে যায় এমন বেশ কটি ওয়ানডে ইনিংস। মার্ক ওয়াহ ওয়ানডেতেও মার্ক ওয়াহই, তারপরও টেস্ট ম্যাচের ব্যাটিং অন্য ব্যাপার, মার্ক ওয়াহর বড় একটি টেস্ট ইনিংস দেখার স্বপ্নটা তাই মনে ডালপালা মেলছিল অনেক দিন থেকেই।

১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে মার্ক টেলরের অস্ট্রেলিয়া যখন ভারতে এল, সিরিজের শেষ দুটি টেস্ট কাভার করতে যাওয়ার সময় দুদলের অনেক তারকার ভিড়েও মার্ক ওয়াহর মুখটা তাই উঁকি দিচ্ছিল আলাদাভাবে। মাদ্রাজে সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬৬ রান দিয়েছিল 'জুনিয়র'-এর ফর্মে থাকার ইঙ্গিতও। কলকাতায় দ্বিতীয় টেস্টেই তাই প্রত্যাশাটা মিটে যাবে বলে ভেবেছিলাম। প্রত্যাশার সঙ্গে অন্য মেরুতে থাকল প্রাপ্তি—মার্ক ওয়াহর দুই ইনিংস ১০ ও ০।

মনােরঞ্জক ব্যাটিংয়ের জন্য দুদল মিলিয়েই হয়তাে মার্ক ওয়াহ এক নম্বর। তবে মােহাম্মদ আজহারউদ্দিন, শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী-ভারতীয় দলের তারকারাও তাে এ ব্যাপারে খুব একটা পিছিয়ে নেই। তারকা-অতারকা নির্বিশেষে ভারতের সব ব্যাটসম্যানই অবশ্য রান পেলেন কলকাতায়। নভজোৎ সিং সিধু ৯৭, ভেংকট লক্ষ্মণ ৯৫, রাহুল দ্রাবিড় ৮৬, শচীন টেন্ডুলকার ৭৯, সৌরভ গাঙ্গুলী ৬৫ এবং 'ইডেনের বরপুত্র' মােহাম্মদ আজহারউদ্দিন অপরাজিত ১৬৩। চার দিন বিরতির পর ব্যাঙ্গালােরে তৃতীয় টেস্ট যখন শুরুই হলাে শচীন টেন্ডুলকারের ১৭৭ রানের ইনিংস দিয়ে, মনে মনে বললাম, 'এবার মার্ক ওয়াহর একটি ভালাে ইনিংস দেখতে পেলেই আর কোনাে অতৃপ্তি থাকে না!' স্টাম্পে লাগার পরও বেল পড়বে না–ভেংকটপতি রান অমন রহস্যময় একটি বল না করলে সেই চাওয়া পূরণ হয় না। শুধু শুধু কি আর রাজুকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলাম!

বড় ভাই স্টিভ ওই টেস্টে ছিলেন না বলে মার্ক ওয়াহকে নিতে হয়েছিল বাড়তি দায়িত্ব। ছবি: গেটি ইমেজেস

চাওয়া পূরণ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আরেকটি ব্যাপারও, মার্ক ওয়াহর শারীরিক অসুস্থতা। গ্যাস্ট্রিকের পুরনাে সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় টেস্ট শুরু হওয়ার আগে বেশ বড় একটা প্রশ্নচিহ্নই ছিল তাঁর নামের পাশে। সেটিকে উপেক্ষা করেই তাঁকে খেলতে হয়েছে, না খেলে উপায়ও ছিল না। কলকাতা টেস্টে কুঁচকিতে টান পড়ায় স্টিভ ওয়াহ এই টেস্ট থেকে ছিটকে পড়েছিলেন আগেই। এরপর মার্ক ওয়াহও না থাকলে কীভাবে চলে? দুই ওয়াহ-যমজকেই হারিয়ে ফেললে অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডারের চেহারা যে একেবারেই দীনহীন রূপ নেয়! মার্ক ওয়াহকে তাই খেলতেই হলাে, স্টিভের অনুপস্থিতিতে বাড়তি দায়িত্বও চেপে বসল তাঁর কাঁধে। তবে এটি সমস্যা নয়, এসব তত দিনে তাঁর অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা।

অস্ট্রেলিয়া দলে স্টিভ ওয়াহ প্রায় পাঁচ বছরের সিনিয়র, দুই ভাই মিলে অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার সামলাচ্ছেন, সেটিও তাে প্রায় এক দশক হয়ে গেল। সেই যে সিডনির এক বিষন্ন সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা মার্ক ওয়াহকে অস্ট্রেলিয়া দলে সুযােগ পাওয়ায় অভিনন্দন জানানাের পর ‘কে বাদ পড়ল' প্রশ্নের জবাবে স্টিভ ওয়াহর ছােট্ট উত্তর ছিল 'আমি', বলতে গেলে সেদিন থেকেই মিডল-অর্ডার ব্যাটিং নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দুশ্চিন্তা শেষ। চার মিনিটের ছােট-বড় দুই যমজের ক্যারিয়ারেই এখন গােধূলি লগ্ন আসি আসি করছে। সন্ধ্যা নামতেও এখন আর খুব বেশি দেরি নেই। যেদিন সত্যি নামবে, সত্যিকার অর্থেই অবসান হবে একটি যুগের। দুই যমজের একসঙ্গে টেস্ট খেলার কীর্তির তাে আর কোনো উদাহরণই নেই, ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক কীর্তিমান ভ্রাতৃযুগলের মধ্যেও সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় অধিষ্ঠান করার ব্যাপারটিও নিশ্চিত করে ফেলেছেন তাঁরা অনেকদিন আগেই।

মার্ক ওয়াহর ব্যাটিংয়ের মহিমা বােঝানোর জন্য এসব সংখ্যা-টংখ্যা একেবারেই কোনাে কাজের নয়। আঁকা ছবির সংখ্যা দিয়ে কি আর চিত্রকরের বিচার হয়? এ জিনিস চোখে দেখতে হয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।

ব্যাঙ্গালােরে তাদের একজন, স্টিভ ওয়াহকে খেলা দেখতে হলাে বাইরে বসে। মার্ক ওয়াহ খেললেন এবং খেললেন মার্ক ওয়াহর মতােই। দুই ইনিংসে ১৫৩ ও ৩৩, দুবারই অপরাজিত। তবে মার্ক ওয়াহর ব্যাটিংয়ের মহিমা বােঝানোর জন্য এসব সংখ্যা-টংখ্যা একেবারেই কোনাে কাজের নয়। আঁকা ছবির সংখ্যা দিয়ে কি আর চিত্রকরের বিচার হয়? এ জিনিস চোখে দেখতে হয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। মহৎ কোনাে শিল্পকর্মের মতােই ফর্মে থাকা মার্ক ওয়াহর ব্যাটিংও দর্শকদের আপ্লুত করে দেওয়ার মতাে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। তাঁর সব কিছুতেই জড়িয়ে থাকে এক 'অলস সৌন্দর্য, শট খেলার জন্য সব সময়ই হাতে একটু বাড়তি সময়, সেই শটও যেন বলের গায়ে ব্যাটের পরশ বােলানাে। তাঁর ব্যাটিংয়ে শক্তির রূঢ় প্রদর্শনী বলতে কিছু নেই, নেই চোখকে আহত করতে পারে এমন সামান্যতম উগ্রতা: পুরােটাই রেশমি পরশ, পুরােটাই স্টাইল আর আভিজাত্য। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় লন্ডন টেলিগ্রাফের ক্রিকেট করসপন্ডেন্ট মাইকেল হেন্ডারসন যে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘দিস বয় ইজ এ ট্রেজার', তা আসলে সবারই মনের কথা হওয়া উচিত। মার্ক ওয়াহ তো সত্যিই এক সম্পদ।  প্রকৃতি শূন্য স্থান পছন্দ করতে না বলে কারও জায়গাই শূন্য থাকে না, কিন্তু মার্ক ওয়াহ বিদায় নেওয়ার পর শূন্য জায়গাটা কবে ভরবে, বলা একটু কঠিনই। কারণ জাত শিল্পীর মতােই মার্ক ওয়াহদেরও তৈরি করা যায় না, তাঁরা জন্মায়!

টেস্টের দ্বিতীয় দিন চা-বিরতির ঠিক আগে পাঞ্জাবি অফ স্পিনার হরভজন সিং টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর দশম বলেই গ্রেগ ব্লিউয়েটকে বােল্ড করে দেওয়ার পর নামলেন সেই মার্ক ওয়াহ। স্কোরবোর্ডে তখন ২ উইকেটে ৭৭। আর এক ওভার শেষেই চা-বিরতি, মার্ক ওয়াহ তখনাে শূন্য। হঠাৎ আসা বৃষ্টি নয় মিনিট বাড়িয়ে দিল চা-বিরতি। আবার খেলা শুরু হতেই শুরু হলাে ব্যাটিংয়ের অনুপম এক প্রদর্শনী। বিতর্কিত বােলিং অ্যকশনের কারণে পরে কিছুদিনের জন্য পথ হারিয়ে ফেলা হরভজন সিংয়ের অভিষেক সেই টেস্টেই। সদ্য কৈশােরােত্তীর্ণ এই অফ স্পিনার টেস্ট শুরুর আগের দিনই জানিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা, 'মার্ক ওয়াহকে আউট করতে চাই।' প্রতিপক্ষ দলের মূল ব্যাটসম্যান, বােলাররা তাে তাঁর উইকেট চাইবেই, তবে হরভজনের মার্ক ওয়াহকে টার্গেট করার কারণটি ছিল ব্যতিক্রমী, 'ওর চেহারা খুব সুন্দর।'

সুন্দর চেহারার সেই ব্যাটসম্যানের সঙ্গে হরভজনের লড়াইটা হলাে সত্যিই দেখার মতাে। সেই লড়াইয়ে কে বিজয়ী হবেন, তাতে অবশ্য কখনই সংশয় জাগতে দেননি ব্যাটসম্যান। তবে প্রথম টেস্ট খেলতে নামা এক বােলারের জন্য মার্ক ওয়াহর বিপক্ষে লড়াই-লড়াই ভাব জাগাতে পারাও তাে কম কথা নয়। হরভজনের বলেই প্রথম বাউন্ডারিটি মারলেন মার্ক ওয়াহ, চোখ জুড়ানাে একটি কাভার ড্রাইভ, প্রথম ছয়টিও তাঁর বলেই । ২ থেকে ৬ রানে গিয়েছিলেন প্রথম চারটি মেরে, ছয় মেরে ২০ থেকে ২৬-এ! একটু পর রাজুর মাথার ওপর দিয়ে মারা স্ট্রেট ড্রাইভটি অল্পের জন্য ছক্কা হলো না, এক বাউন্সে তা সীমানার বাইরে। মার্ক ওয়াহ ৩১ থেকে ৩৫! সেই ওভারেই রাজুর ওই বিস্ময়কর বল। স্টাম্পে বল লাগার পর ও বেল না পড়া! এই একটি মুহূর্তই যেন বয়ে নিয়ে এল আগাম বার্তা, মার্ক ওয়াহ আর আউট হচ্ছেন না।

আউট তাে হলেনই না, ৬ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের ইনিংসটিতে ওই একবারই বােলারের কাছে হার, এর আগে-পরে তাঁকে সামান্যতম বিব্রত করার সান্ত্বনাও জুটল না কোনাে বােলারের ভাগ্যে। স্টাম্পে বল লাগিয়ে রাজু একবার বিব্রত করেছিলেন, সেই অপরাধে তাঁর ওপর দিয়েই গেল মার্ক ওয়াহর পরের ৩টি ছক্কার ঝড়। এগুলাে অবশ্য সেদিনের নয়, পরের দিনের ঘটনা । মার্ক ওয়াহ দ্বিতীয় দিন শেষ করলেন ৫৮ রানে। সঙ্গী 'ওয়ানডে স্পেশালিস্ট' লেবেল ঝেড়ে ফেলে শেষ পর্যন্ত টেস্ট অভিষিক্ত ড্যারেন লেম্যান (অপরাজিত ৩৫)। স্কোর ৩ উইকেটে ২০৯। ভালাে অবস্থা, তবে প্রথম ইনিংসে ভারত যেহেতু করেছে ৪২৪, অস্ট্রেলিয়া তাই তখনাে নিরাপদ নয়।

পরদিন সেই নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে গেলেন বলতে গেলে মার্ক ওয়াহ একাই। সেঞ্চুরি হয়ে গেল লাঞ্চের আগেই। ব্যাঙ্গালােরের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে কোনো অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরি। ২০৭ মিনিট, ১৬০ বল, ৯টি চার ও ২টি ছয়। ৭৮তম টেস্টে মার্ক ওয়াহর ১৪তম সেঞ্চুরি । ৫৮ থেকে সেই সেঞ্চুরিতে পৌঁছুতে লাগল ৬২ বল। আগের দিনের ৫৮ রানের ৩৮-ই (৪X৮, ৬x১) এসেছিল বাউন্ডারি থেকে, অথচ বাকি ৪২ রানে বিস্ময়করভাবে মাত্র ১টি করে চার ও ছয়।

এই ছবিটি অবশ্য ব্যাঙ্গালোর টেস্টের নয়। অন্য কোনো টেস্টে, অন্য কোনো সেঞ্চুরির পর। ছবি: গেটি ইমেজেস

মার্ক ওয়াহর সঙ্গে ব্যাপারটি যায় না। তা একটু স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাটিংই করতে হয়েছিল তাঁকে, বাধ্য হয়েই। তৃতীয় দিন লাঞ্চের আগেই আরাে ৩ উইকেট নেই, মাত্র ৩৭ রানের মধ্যে ড্যারেন লেম্যান (৫২), রিকি পন্টিং (১৬) ও ইয়ান হিলি (৪) ছেড়ে এসেছেন তাঁকে। লেম্যানের সঙ্গে ১৫২ বলে ১০৬ রানের পার্টনারশিপটির পর সঙ্গ দেওয়ার মতাে পার্টনারই পাচ্ছিলেন না আর। বাউন্ডারির পরিবর্তে ১/২ রান নিয়ে টিকে থাকার দিকে মন দিতে হয়েছিল এ সময়টায়। দায়িত্বটাও এ সময়েই আরও বেশি বােধ করলেন মার্ক ওয়াহ, আপাত খেয়ালি স্বভাবের আড়ালে থাকা তাঁর সিরিয়াসনেসটাকে যাঁরা দেখতে পান না, তাঁদেরও যেন দেখাতে চাইলেন 'দায়িত্ব' শব্দটি তাঁর অভিধানেও কম বড় করে লেখা নেই।

লেম্যান যখন আউট হলেন, মার্ক ওয়াহ তখন ৮১ রানে। পুরাে ইনিংস ব্যাট করার প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছেন তখনই। এ কারণেই অন্য রূপে দেখা গেল তাঁকে, ২৩ ওভার পর পন্টিং আউট হওয়ার সময় এগােলেন মাত্র ৫ রান, ২৫ রানের পার্টনারশিপে সেট হয়ে যাওয়া মার্ক ওয়াহর অবদান ৫, ভাবা যায়! শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান পন্টিংও যখন তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটতে শুরু করে দিলেন, মার্ক ওয়াহর বােঝা হয়ে গেল টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে রান করার কাজটাও তাঁকেই করতে হবে।

কিছুক্ষণ পর তাঁকে ৯৪ রানে রেখে একটি বাউন্ডারি মেরেই যখন দায়িত্ব শেষ করলেন হিলি, সত্যিকার অর্থে চাপটা প্রথম অনুভব করতে শুরু করলেন তখনই। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৬ উইকেটে ২৮৬, ভারতের ৪২৪ রানের শৃঙ্গটাকে তখন মনে হচ্ছে আরাে অনেক উঁচুতে। দল তাকিয়ে আছে শুধু তাঁরই দিকে, এই বোধই মার্ক ওয়াহর ক্লান্ত শরীরে এনে দিল নতুন উদ্যম। একটু অন্তর্মুখী স্বভাবের বলে নেতৃত্বের ব্যাপারটি তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না- এ রকমই জানে সবাই। কিন্তু তখন শুধু নিজের খেলাটা খেললেই চলছে না, নেতা হয়ে অনুপ্রাণিত করতে হচ্ছে ব্যাটসম্যানের ভূমিকায় নামা বােলারদেরও। তা তাে করলেনই, সঙ্গে পরিপূর্ণ মহিমায় উদ্ভাসিত হতে থাকল তাঁর নিজের ব্যাটিংও। ১ রানে 'লাইফ' পাওয়া শেন ওয়ার্নও সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য। লাঞ্চের সময় মার্ক ওয়াহ অপরাজিত ১১০, শেন ওয়ার্ন ২৯।

ওয়ার্ন অবশ্য এরপর আর বেশিক্ষণ থাকলেন না। ৭৬ রানের পার্টনারশিপে ৩৩ রান জমা দিয়ে তাঁর বিদায়ের পর মার্ক ওয়াহ বুঝে ফেললেন, যা করার করতে হবে তাড়াতাড়িই। তাই রাজুকে ছক্কা মেরে ১৩৪ থেকে ১৪০, ১৪৫ রান থেকে আরেকটি ছক্কায় পেরিয়ে গেলেন ১৫০। ১৫১ রান–৩২২ মিনিট, ২৬৩ বল, ১৩টি চার ও ৪টি ছয়। তৃতীয় ফিফটি এসেছে ১০৩ বলে, মার্ক ওয়াহর জন্য একটু বেশিই! দলের পরিস্থিতি বিবেচনায় মারার বল নির্বাচনে তাঁকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হয়েছে, নইলে তৃতীয় ফিফটির ৩৪-ই তাে এসেছে মাত্র ৭টি স্কোরিং শট থেকে (৪x৪, ৬x৩) । ১৫০ পেরােনাের পর খেলার সুযােগ পেলেন আর মাত্র ৪টি বল, চা-বিরতির ২৬ মিনিট আগে শেষ ব্যাটসম্যান অ্যাডাম ডেলও আউট। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ঠিক ৪০০।

১৫৩ রানে অপরাজিত মার্ক ওয়াহ মাঠ ছেড়ে বেরােনাের সময় তুমুল অভিনন্দনের জবাবে ব্যাট তুললেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুখচ্ছবি চারপাশে আনন্দের চেয়ে আক্ষেপের বার্তাই ছড়িয়েছে বেশি। ব্যাট হাতে যা ইচ্ছে করতে পারি আমি, এমন অনুভূতি জাগানাে একটি দিনে এভাবে থেমে যেতে হলে আক্ষেপ হওয়ারই কথা।

পরদিন সন্ধ্যা-সন্ধ্যা বিকেলে অপরাজিত ৩৩ রান করে ফেরা মার্ক ওয়াহকে বরং অনেক বেশি হাস্যোজ্জ্বল দেখাল। সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে পরাজয়ের পর তখন যে তিনি শেষ টেস্টে দলকে জিতিয়ে ফিরছেন! বিস্ময় বললেও কম বলা হয়। তৃতীয় দিন চা-বিরতির আগে আগে দুই দলের মাত্র একটি করে ইনিংস শেষ হলাে, সেই ইনিংস দুটিও যেখানে ৪২৪ আর ৪০০, এরপর তো টেস্টে মীমাংসা হওয়াই কঠিন।  অথচ তা তাে হলোই, সেটিও চার দিনের মধ্যে!

কারণ ছিল অনেকগুলােই। সিরিজে আর কিছু পাওয়ার বা হারানাের নেই দেখে দু্ই দলই খেলেছে বাঁধনহীন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। ব্যর্থ একটি সিরিজের শেষ প্রান্তে এসে জ্বলে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার মার্ক টেলর ও মাইকেল স্ল্যাটার। চতুর্থ দিন সকালে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়ে গেছেন পেসার মাইকেল কাসপ্রােভিচ। তারপরও কেউ যদি বাকি সব ভুলে গিয়ে বলে বসেন, ‘অস্ট্রেলিয়া তাে জিতবেই, মার্ক ওয়াহ সেঞ্চুরি করেছে না', খুব একটা ভুল বলবেন না তিনি। কথাটা খুবই সত্যি, মার্ক ওয়াহর সেঞ্চুরি বিফলে যায় কমই। অকারণে(!) সেঞ্চুরি করা পছন্দ নয় 'জুনিয়র-এর। টেস্টে তাঁর সেঞ্চুরিগুলাের দিকে তাকিয়ে দেখুন, হয় তা ম্যাচ জিতিয়েছে, নয়তো ম্যাচ বাঁচিয়েছে।

ব্যাঙ্গালােরে অপরাজিত ১৫৩ টেস্টে তাঁর ১৪ নম্বর সেঞ্চুরি, এই ১৪ সেঞ্চুরির ১০টিই জয়ী দলের পক্ষে। ওয়ানডেতে তাে আর ম্যাচ বাঁচানাের প্রশ্ন নেই, সেখানে ম্যাচ বাঁচানাে মানেই ম্যাচ জেতা। টেন্ডুলকারের মতােই মিডল অর্ডার থেকে ওপেনিংয়ে উঠে আসার পরই সেঞ্চুরির সঙ্গে সেভাবে সখ্য হয়েছে তাঁর এবং ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত মার্ক ওয়াহর যে ১৫টি সেঞ্চুরি, তার মাত্র তিনটিই জেতাতে পারেনি অস্ট্রেলিয়াকে। এই তিনবারই প্রতিপক্ষ দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছে, কেউ অবশ্য এটাও বলতে পারেন যে, অস্ট্রেলীয় বােলাররা জঘন্য বােলিং করেছে। তবে এগুলােকে ব্যতিক্রম মেনে মার্ক ওয়াহ রান পেলেই অস্ট্রেলিয়া জিতবে, এমন একটা ব্যাপার মােটামুটি মেনেই নিয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব।

মার্ক ওয়াহর কাছে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি হারানোর পরও অ্যালান বোর্ডার উল্টো উচ্ছ্বসিত, 'কী চমৎকারই না লাগে ওর ব্যাটিং দেখতে! রেকর্ডটি তুলে দেওয়ার জন্য চাইলেও এর চেয়ে ভালাে কাউকে বেছে নিতে পারতাম না আমি।'

এ কারণেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওভালে ভারতের বিপক্ষে সুপার সিক্সের প্রথম ম্যাচটির পরই অনেকে লর্ডসের ব্যালকনিতে ট্রফি হাতে স্টিভ ওয়াহকে আগাম দেখে ফেলেছিলেন। নতুন বল হাতে পেয়ে গ্রেন ম্যাকগ্রা আবার আগুন ঝরাতে শুরু করেছেন, কারণ এটি ছিল না। আসল কারণ–সেই ম্যাচেই বিশ্বকাপে প্রথম রান পেতে শুরু করেছিলেন মার্ক ওয়াহ। আর মার্ক ওয়াহর রান পাওয়া আর অস্ট্রেলিয়ার জয়কে তাে অনেক আগেই সমার্থক বলে জেনে গেছে সবাই। সে ম্যাচে ৮৩ রানের পর লর্ডসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরি। সেই ইনিংসটি খেলার পথেই ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ স্কোরার হিসেবে অ্যালান বাের্ডারকে ঠেলে দিলেন দুই নম্বরে। বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির সংখ্যাতেও তখন তিনি এক নম্বর। অ্যালান বাের্ডারের মতাে এক্ষেত্রে পেছনে ঠেলে দেওয়া ভিভ রিচার্ডস ও রমিজ রাজাও সে ম্যাচে কমেন্টেটর হিসেবে উপস্থিত এবং তিনজনই মার্ক ওয়াহর ব্যাটিংয়ের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত। ব্যাটিংয়ের দৃষ্টিনন্দন দিকটি যদি বিবেচ্য হয়, তাহলে উত্তর মেরুতে মার্ক ওয়াহর অবস্থান হলে বাের্ডারকে খুঁজতে হবে দক্ষিণ মেরুতে। পার্থক্যটা বাের্ডারেরও ভালােই জানা, হয়তাে এ কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রানের মালিকের প্রথম কথাই ছিল, 'কী চমৎকারই না লাগে ওর ব্যাটিং দেখতে!' পরের কথাটিও বিশাল কমপ্লিমেন্ট, 'রেকর্ডটি তুলে দেওয়ার জন্য চাইলেও এর চেয়ে ভালাে কাউকে বেছে নিতে পারতাম না আমি।'

তবে বাের্ডারের উচ্ছ্বাসে নয়, অবাক হয়েছিলাম স্যার আইজাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডসও তাঁর সঙ্গে সুর মেলানােয়। অকারণে প্রশংসা করার লােক রিচার্ডস নন, নিজে মাঠে এত সব অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়েছেন যে, তাঁকে উচ্ছুসিত করে তােলার মতাে কিছু করাটাও সহজ কাজ নয়। মার্ক ওয়াহর সেঞ্চুরির পর সেই ভিভ রিচার্ডসকেও এই একটি জায়গাতে মনে হলাে অন্যরকম। 'মার্ক ওয়াহর ব্যাটিং দেখতে আমি অনেক মাইল হেঁটে যেতে রাজি'' জাতীয় মন্তব্য করে চমকে দিলেন কথাবার্তায়, হাবভাবে এখনাে খেলােয়াড়ী জীবনের মতােই ড্যাশিং রিচার্ডস। 'গ্রেট প্লেয়ার! রেকর্ডটি ওর হয়েছে, এতে আমারই খুব ভালাে লাগছে'–বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ডের চেয়ে ‘কিং ভিভ'-এর দেওয়া এই কমপ্লিমেন্টকেই হয়তাে বেশি মূল্যবান বলে মানবেন মার্ক ওয়াহ।

(লেখকের 'সেই সব ইনিংস' বই থেকে)