বাংলাদেশে সর্বশেষ ট্যুরেও টেস্ট সিরিজের উইন্ডিজ দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সেবার হোয়াইটওয়াশ হয়ে ফিরেছিলেন। এবার ফিরেছেন বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করে। কিন্তু তাঁর নামটা আসলে কী? ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট না ক্রেইগ ব্রাফেট?

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে শেষ ওভারের প্রথম চার বলেই চার ছক্কার মহানায়ক তিনি। কিন্তু তাঁর নামটা আসলে কী? কার্লোস ব্র্যাথওয়েট না কার্লোস ব্রাফেট?

বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমে ব্র্যাথওয়েট লেখা হয়, শুধু প্রথম আলোতে ব্রাফেট। এতে আমার কিছুটা দায় আছে। কিছুটা না, পুরো 'দায়'ই আমার। একই কারণে এই ওয়েবসাইটেও যেমন 'ব্রাফেট'ই লেখা হচ্ছে। তা নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন অনেক পাঠক। দায়মুক্তির জন্য ব্রাফেট লেখার কারণটা সবাইকে জানানোটা তাই কর্তব্য বলে মনে হচ্ছে।

ব্র্যাথওয়েট বা ব্রাফেটের নামটার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক পুরনো। চার ছক্কার কার্লোস তখনো দৃশ্যপটেই নেই। আমি বলছি ক্রেইগের টেস্ট অভিষেকেরও বছর চারেক আগের কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২০০৭ বিশ্বকাপের সময়ই বাজান এক বন্ধু সাংবাদিক বারবাডোজ থেকে উঠে আসা এক তরুণ প্রতিভার গল্প করছিলেন। তরুণ না বলে কিশোর বলাই ভালো, কারণ স্কুল ক্রিকেটে লম্বা ইনিংস খেলার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা ওই ব্যাটসম্যানের বয়স তখন মাত্র ১৪।

দুই বছর পর বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে তার চেহারাও দেখলাম। এটা সেই ঐতিহাসিক ট্যুর, বোর্ডের সঙ্গে টাকাপয়সার ঝামেলায় ক্রিস গেইলরা যা বয়কট করেছিলেন। ঝামেলাটা প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ছিল বলে টেস্ট সিরিজের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ 'এ' দলের অনেক খেলোয়াড়ও নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে যে দলটি খেলেছিল, স্বর্গীয় টনি কোজিয়ারের ভাষায় সেটি ছিল তাই 'ওয়েস্ট ইন্ডিজের থার্ড টিম'। 

দশ বছর আগে সর্বশেষ টেস্ট খেলা ৩৭ বছর বয়সী ফ্লয়েড রেইফারকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল অধিনায়ক করে। চার বছর পর ফিরেছিলেন টিনো বেস্ট। ড্যারেন স্যামি ছাড়া সেই দলের আর কাউকে আপনার চেনার কথা নয়। ও হ্যাঁ, এখন বললে আপনি কেমার রোচকেও চিনবেন। রোচের টেস্ট অভিষেক সেই সিরিজেই। তা হয়তো মূল খেলোয়াড়েরা ধর্মঘটে না গেলেও হতো। আগের বছরই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের দলে ছিলেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন দিনের ম্যাচেও গতির ঝড় আর বাউন্সারে জর্জরিত করেছেন ব্যাটসম্যানদের।

ক্রেইগ ও কার্লোস। দুই ব্রাফেট, নাকি দুই ব্র্যাথওয়েট?

ব্র্য্যথওয়েট না ব্রাফেট---এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছি! গিয়েছিই যখন, আরেকটু যাই। সেন্ট ভিনসেন্টে ওই সিরিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচটির কথা এখনো ভুলতে পারি না। তা শুধু বাংলাদেশ জিতেছিল বলেই নয়, কারণ আরও অনেক। সেই ট্যুরে বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক আমি। ভুতুড়ে সব ঘটনা ঘটছে, কারও সঙ্গে তা শেয়ারও করতে পারছি না। চিন্তা করতে পারেন, টেস্টের আগের দিন আয়োজক সংস্থার প্রধান ভিনদেশি সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করছেন, "আগামীকাল টেস্ট ম্যাচ হবে তো?" আয়োজক সংস্থা মানে সেন্ট ভিনসেন্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের নাম লেনক্স জন। আর ভিনদেশি সাংবাদিকের নাম আপনার অনুমান করে ফেলার কথা। কারণ, আগেই বলে দিয়েছি, ওই ট্যুরে বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক ছিলাম আমি।

সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্ট শুরুর আগের দিন অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। টেস্ট ম্যাচ হবে কি না, হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে কারা খেলবেন--এমন অনেক প্রশ্ন উড়ে বেড়াচ্ছে, অথচ উত্তর দেওয়ার লোক নেই। সাংবাদিকতা জীবনে এই একটাই টেস্ট ম্যাচ, যেটির প্রিভিউ লিখেছিলাম ঘাসের ওপর বসে। সময় পার্থক্যের কারণে সূর্য মধ্যগগনে আসতে না আসতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে পত্রিকায় লেখা পাঠানোার ডেডলাইন পেরিয়ে যায়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সকালে হোটেলে বসেই প্রিভিউ লেখার কথা। কিন্তু লিখব কী, সব কিছুই তো অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা। সকালেই তাই চলে গিয়েছিলাম মাঠে, যদি কিছু জানা যায়। সুনির্দিষ্টভাবে যে জানা যায়নি, তা দিয়েই প্রিভিউটা লিখেছিলাম। প্রেসবক্স তখনো তালাবদ্ধ, লেখার কাজটা তাই মাটিতে বসেই সারতে হয়েছিল।

দৃশ্যটা খুব স্বাভাবিক নয়। লোকজন সব অবাক হয়ে আমাকে দেখছে। দু'একজন কুশল বিনিময় করারও চেষ্টা করছে। আমি অভদ্রের মতো তাতে কোনো সাড়া দিচ্ছি না। দেব কীভাবে, কি-বোর্ড থেকে মুখ তোলার সময় থাকলে তো! তারপরও একবার তুলতেই হলো। একটু বাক্য বিনিময়ও। কারণ ল্যাপটপে বিশাল একটা ছায়া পড়তে দেখে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি, সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন কলিন ক্রফট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের ফাস্ট বোলার, বিখ্যাত সেই পেস কোয়ার্টেটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। চেহারা আর বুকে ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখেই পরিচয়টা অনুমান করে নিয়েছিলেন। হাসিমুখে ক্রফট বললেন, 'কনগ্রাচুলেশনস!' 

কনগ্রাচুলেশনস্! কনগ্রাচুলেশনস্ কেন? ঘাসের ওপর বসে এর আগে কি কেউ কোনোদিন ল্যাপটপে লেখেনি, নাকি! এজন্য অভিনন্দন জানানোর কী আছে! 

ক্রফটের মুখের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো, 'বাংলাদেশ দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট জিততে যাচ্ছে, অভিনন্দন এই জন্য।' 

কলিন ক্রফট নিজেও এখন সাংবাদিক, বিবিসির হয়ে এই সিরিজ কাভার করছেন। তাঁর কাছ থেকে নিশ্চয়ই জানা যাবে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমে কারা খেলছেন। না, কলিন ক্রফটও কিছুই জানেন না। বিশাল দুই কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখে তিক্ত একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, 'দিস ইজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়েলকাম টু দ্য ওয়ার্ল্ড অব কনফিউশন।'

 

আমার মুখে নামটা শুনেই স্পুনার বলল, "ব্র্যাথওয়েট নয়, উচ্চারণটা হবে "ব্রাফেট"।' আমি খুবই অবাক হয়ে নামটা বানান করে বললাম, 'এটা ব্রাফেট হয় কীভাবে?; স্পুনার বলল, 'হয়। কীভাবে হয়, তুমি বুঝবে না। বারবাডোজের উচ্চারণের নিজস্ব রীতি আছে।' আমি আরও নিশ্চিত হতে কাগজে BRAFFET লিখে বললাম, 'তুমি বলছ, এটা হবে উচ্চারণ?'

 

কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে বানানো ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম পেলাম প্রিভিউ পাঠানোর প্রায় নয়/দশ ঘণ্টা পর। প্রথম ড্যারেন স্যামিকে অধিনায়ক করে ১৩ জনের দল। কিছুক্ষণ পরই সেই দলে আরও দুইজন যোগ হলো, বদলে গেল অধিনায়কও। 

যাই হোক, ওই সিরিজের গল্প বলতে থাকলে আর শেষ হবে না। ব্র্যাথওয়েট বা ব্রাফেট প্রসঙ্গে ফিরি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই দলে অচেনা সব নামের ভিড়ে যে তিন/চারটা চেনা নাম, তার একটি এই ব্র্যাথওয়েট (তখন তা-ই জানতাম)। বয়স তখন ১৬,  প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে তখনই ৩৯টি সেঞ্চুরি হয়ে গেছে, বারবাডোজের হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষেকও। সেবার অবশ্য টেস্ট অভিষেক হয়নি। কিন্তু ১৬ বছরের একটা ছেলে, যার প্রডিজি হিসাবে বেড়ে ওঠা, তার স্কোয়াডে আসার খবরটা তো লিখতেই হবে। শচীন টেন্ডুলকারেরও ১৬ বছর বয়সেই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। এ-ও তো ১৬ বছর বয়সেই টেস্ট খেলেই ফেলেছিল প্রায়। টেন্ডুলকার-ব্র্যাথওয়েট আর ১৬ বছর, এসব মিলিয়েই একটা স্টোরি করব বলে ঠিক করে ফেললাম।   

সেই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া ম্যানেজার ফিলিপ স্পুনার। আগেই পরিচয় ছিল বলে জানতাম, স্পুনারও বাজান, মানে বারবাডোজের ছেলে। ক্রেইগ 'ব্র্যাথওয়েট' সম্পর্কে বাড়তি কিছু তথ্য পেতে তাই স্পুনারের দ্বারস্থ হলাম। 

আমার মুখে নামটা শুনেই স্পুনার বলল, 'ব্র্যাথওয়েট নয়, উচ্চারণটা হবে "ব্রাফেট"।'  

আমি খুবই অবাক হয়ে নামটা বানান করে বললাম, 'এটা ব্রাফেট হয় কীভাবে?'

'হয়। কীভাবে হয়, তুমি বুঝবে না। বারবাডোজের উচ্চারণের নিজস্ব রীতি আছে।'

আমি আরও নিশ্চিত হতে কাগজে BRAFFET লিখে বললাম, 'তুমি বলছ, এটা হবে উচ্চারণ?'

স্পুনার সম্মতিসূচক মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, 'তোমাকে ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য দিই। বারবাডোজে সবচেয়ে কমন সারনেম হলো এই "ব্রাফেট"। কিন্তু এখনো কোনো ব্রাফেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে খেলেনি। ইট সিমস্ হি উইল বি দ্য ফার্স্ট ব্রাফেট টু প্লে ফর ওয়েস্ট ইন্ডিজ।'

তা-ই হয়েছে। পরে তো ক্রেইগের সঙ্গে যোগ হলেন আরেক ব্রাফেট---'কার্লোস'। তিনিও বারবাডোজেরই সন্তান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে পাঠানো নিউজে 'ব্রাফেট' লেখা দেখে অফিসে থাকা সহকর্মীদের মনে প্রশ্নের উদয় হবে জানতাম। তাড়াহুড়োয় কত ভুলই তো হয় ভেবে কেউ 'কারেকশন'ও করে দিতে পারেন। তা ঠেকাতে অফিসে ফোন করে তাই বলে দিয়েছিলাম, 'এটা ব্রাফেটই হবে।'

সেই থেকে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে প্রথম আলোতে 'ব্রাফেট'ই লেখা হচ্ছে। এ নিয়ে অবশ্য অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। আরও নিশ্চিত হতে খোদ ক্রেইগ ব্রাফেটকেই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছি। উত্তরটা তো অনুমান করতেই পারছেন। কারণ আমি এখনো ব্রাফেটই লিখে যাচ্ছি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের গত সফরে করোনা আর বায়ো-বাবলের কারণে ক্রিকেটারদের ধারেকাছে যাওয়ার উপায় ছিল না। নইলে ক্রেইগ ব্রাফেটকে আবারও জিজ্ঞেস করতাম, 'ভাই, আবারও একই কথা জানতে চাইছি বলে রাগ করবেন না প্লিজ। আপনার নামের সঠিক উচ্চারণটা আসলে কী? ব্রাফেটই যদি হবে, তাহলে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কমেন্টেটরও ব্র্যাথওয়েট বলে যাচ্ছেন কেন?'

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কমেন্টটর বলতে তো মূলত ইয়ান বিশপই। বিশপ ত্রিনিদাদের মানুষ, ঠিক আছে, কিন্তু তাঁর তো বারবাডোজের উচ্চারণ জানার কথা। না জানলেও কারও না কারও তাঁকে বলে দেওয়ার কথা। আমাকে যেমন দিয়েছিলেন ফিলিপ স্পুনার। অথচ বিশপ তো ব্র্যাথওয়েটই বলেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ ওভারে পরপর ওই চার ছক্কার পর 'কার্লোস ব্র্যাথওয়েইট, রিমেম্বার দ্য নেম' চিৎকারটা তো এখনো অনেকের কানে বাজে। তাহলে?

এই 'তাহলে'র উত্তর আমি জানি না। জানলে আপনাদের জানাব। এর আগ পর্যন্ত আমি 'ব্রাফেট'ই লিখে যাব। ব্র্যাথওয়েট নয়।