চারটি নাম বলি।

হিউ ট্রাম্বল, জিমি ম্যাথুস, ওয়াসিম আকরাম ও স্টুয়ার্ট ব্রড।

এবার বলুন, এই চারজনের মধ্যে কোথায় মিল? চারজনই বােলার, এটাকে যদি মিল বলেন, সে মিল শুরুতেই শেষ। ট্রাম্বল ছিলেন অফ স্পিনার, ম্যাথুস লেগ স্পিনার, ওয়াসিম আকরাম ও স্টুয়ার্ট ব্রড দুজনই পেসার বটে; তবে একজন বাঁহাতি, আরেকজন ডানহাতি বলে এখানেও বিভাজন টানা যায়।

ট্রাম্বল ও ম্যাথুস শেষ টেস্ট খেলেছেন গত শতাব্দীর শুরুর দিকে। ক্রিকেট মাঠে তাঁদের দেখেছেন, এমন কেউ তাই বেঁচে নেই। ওয়াসিম আকরাম আমাদের জীবদ্দশারই ঘটনা আর স্টুয়ার্ট ব্রড তো খেলে যাচ্ছেন এখনো। তারপরও সেই কবেকার দুই অস্ট্রেলিয়ান স্পিনারের সঙ্গে পাকিস্তান আর ইংল্যান্ডের দুই পেসারের নাম এক সুতােয় গেঁথে দিয়েছে একটি রেকর্ড। টেস্ট ক্রিকেটে দুটি করে হ্যাটট্রিক আছে শুধু এই চারজনেরই।

ট্রাম্বলের দুটি হ্যাটট্রিকই মেলবাের্নে, ১৯০২ ও ১৯০৪ সালে ইংল্যান্ডের পর পর দুই অস্ট্রেলিয়া সফরে। দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকটি আবার টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শেষ তিন বলে। ট্রাম্বলের হ্যাটট্রিকেই সমাপ্তি সে ম্যাচের, সমাপ্তি ট্রাম্বলের টেস্ট ও ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারেরও। শেষটাকে এর চেয়ে ভালো করে মনে হয় রাঙিয়ে দেওয়া যায় না।

টেস্টে দুই হ্যাটট্রিকের প্রথম কীর্তিমানের কথা বলা হলো, এবার সর্বশেষজনের কথা বলে পরে ওয়াসিম আকরাম আর জিমি ম্যাথুসে আসি। ব্রডের প্রথম হ্যাটট্রিক ২০১১ সালে। ভারতের বিপক্ষে ট্রেন্ট ব্রিজে। দ্বিতীয়টি এর তিন বছর পর হেডিংলিতে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ওভারে বিস্তৃত ওই হ্যাটট্রিক করার পর স্টুয়ার্ট ব্রড তা বুঝতেই পারেননি, ইংল্যান্ডের অন্য ক্রিকেটাররাও না, মাঠের দর্শক তাহলে আর কীভাবে বুঝবে! টেলিভিশন দর্শক বরং সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ তখন কমেন্ট্রিতে থাকা ডেডিভ লয়েড তাদেরকে তা বলে দিয়েছিলেন।

ওয়াসিম আকরামের দুই হ্যাটট্রিক পরপর দুই টেস্টে, দুটিই ১৯৯৯ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। দ্বিতীয়টি মাঠে সশরীরে উপস্থিত থেকেই দেখেছি। লেখাটা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদেরও কেউ কেউ দেখেছেন বলে অনুমান করি। কারণ সেই হ্যাটট্রিক ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট ম্যাচে।

পরপর দুই টেস্টে হ্যাটট্রিক একটু চমকে দেওয়ার মতোই। তবে এটাই যদি চমকে দিয়ে থাকে, জিমি ম্যাথুসের কীর্তি জানার পর কী হবে? তাঁর দুটি টেস্ট হ্যাটট্রিক যে একই টেস্টে। শুধু একই টেস্টে হলেও তা যথেষ্টই বিস্ময় জাগাত, কীর্তি হিসাবে টেস্ট ইতিহাসে এক এবং অদ্বিতীয়ও হয়ে থাকত। তা অবশ্য আছেই। বিস্ময়টা চরমে উঠবে, যখন জানবেন, জিমি ম্যাথুসের ওই দুই হ্যাটট্রিক ছিল একই দিনে! 

একই টেস্টের একই দিনে দুটি হ্যাটট্রিক! জিমি ম্যাথুসের ছবিও তাই দুটিই দেওয়া উচিত

ম্যাথুসের ওই কীর্তি ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ট্রায়াঙ্গুলার টুর্নামেন্টে। ওল্ড ট্রাফোর্ডে সেই ট্রায়াঙ্গুলারের প্রথম ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে ম্যাথুসের ওই অবিশ্বাস্য কীর্তি। তিন বলে তিন উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস শেষ করে দিলেন। এরপর ফলাে অন করতে নামা দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর যখন ৫ উইকেটে ৭০, আবার শুরু ম্যাথুস-ম্যাজিক।

দুই ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হ্যাটট্রিক, যাতে আর কারও সাহায্যই লাগেনি। প্রথম হ্যাটট্রিকের দুটি এলবিডব্লিউ, অন্যটি বােল্ড। দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকের শেষ দুটি শিকার কট অ্যান্ড বােল্ড, প্রথমটি বােল্ড। ম্যাথুসের দুই হ্যাটট্রিকের কথা উঠলেই আমার বেচারা ট্রেভর ওয়ার্ডের কথা মনে পড়ে যায়। বেচারাই! কারণ দুবারই ম্যাথুসের হ্যাটট্রিকের শিকার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেটকিপারকে ডুবতে হয়েছিল 'কিং পেয়ার'-এর লজ্জায়।

ওই টেস্টে ম্যাথুসের ওই ৬টিই উইকেট। তাঁর অমরত্বও নিশ্চিত করে দিয়েছে ওই ৬ উইকেট, ওই একটা দিনই। নইলে কে তাঁকে মনে রাখত? টেস্ট খেলেছেন মাত্র ৮টি, বাকি ৭ টেস্টে ১০ উইকেট।  ওই একটা দিন, ওই একটা দিন....১৯১২ সালের ২৮ মে সকালে সূর্যটা যেন উঠেছিল শুধু জিমি ম্যাথুসের জন্য।

তা আজ তো ২৮ মে না, তাহলে হঠাৎ জিমি ম্যাথুসকে নিয়ে টানাটানি কেন? কারণ আজ জিমি ম্যাথুসের জন্মদিন। সেই জন্মদিন অবশ্য ১৩৭ বছর আগের কথা। ম্যাথুস এই পৃথিবীর পাট চুকিয়েছেন, সেটিরও তো প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল। জন্মদিনের শুভেচ্ছা তাঁর কাছে পৌঁছানোর কোনোা উপায় জানা নেই। তারপরও সমস্বরে আমরা সবাই একবার তো বলতেই পারি, 'শুভ জন্মদিন, জিমি ম্যাথুস'!

ম্যাথুস হয়তো তা শুনবেন। হয়তো শুনবেন না।