কার্টলি অ্যামব্রোসের যে ইন্টারভিউটা এই ওয়েবসাইটে আছে, পত্রিকাতে তা পরপর দুই দিন দুই পর্বে ছাপা হয়েছিল। জীবনে এত ইন্টারভিউ করেছি, দুই পর্বে কারও ইন্টারভিউ ছাপা হওয়ার ঘটনা খুবই কম। অনেক বড় ইন্টারভিউও কাটছাঁট করে এক দিনেই শেষ করে দিয়েছি। অ্যামব্রোসেরটা কেন তাহলে ব্যতিক্রম?

কারণ একটাই—তিনি কার্টলি অ্যামব্রোস, যাঁর বড় ইন্টারভিউ কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ইন্টারভিউই-বা দিয়েছেন কয়টা? খেলোয়াড়ি জীবনে ইন্টারভিউ চাইলেই অননুকরণীয় ভঙ্গিও ভাষায় জানিয়ে দিতেন—কার্টলি টকস্ টু নো ম্যান। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে এই ইন্টারভিউটা নেওয়ার সময়ও সেই নীতি থেকে এসেছিলেন, তা নয়। তখনো ইন্টারভিউ দিতে তাঁর ভীষণ অনীহাই ছিল। এত বড় ইন্টারভিউটা তাহলে কীভাবে হলো?

তা-ও আবার দায়সারা উত্তর দিয়ে সেরে ফেলা ইন্টারভিউ নয়। শুরু থেকেই এমন আন্তরিকভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্টারভিউর আড়ষ্টতা উধাও হয়ে গিয়ে দুজনের মধ্যে নির্ভেজাল আড্ডা শুরু হয়ে গেল।

অথচ ইন্টারভিউটাই হয়েছে আসলে কপালগুণে। সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে টসের সময় কার্টলি অ্যামব্রোস মাঠে ছিলেন। ভেবেছি, বিশেষ অতিথি হয়ে-টয়ে হয়তো এসেছিলেন, চলেও গেছেন। ‘লাইন অ্যান্ড লেংথ’ রেডিওর হয়ে তিনি যে কমেন্ট্রি করছেন, সেটি জানলাম ওই রেডিওর বুথে গিয়ে। সেখানে অ্যামব্রোস আমার যে পরিচয় পেলেন, তা ইন্টারভিউ-প্রার্থী সাংবাদিকের নয়। আমি সেখানে বিশেষজ্ঞ (!!), চা-বিরতির সময় বিশেষ পর্বে বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং এই টেস্ট নিয়ে কথা বলব।

সেন্ট ভিনসেন্টে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচে কমেন্ট্রি বক্সে কার্টলি অ্যামব্রোস। জুলাই, ২০০৯। ছবি: উৎপল শুভ্র

লাইন অ্যান্ড লেংথ রেডিওর প্রযোজক অনেক অনুরোধ-টনুরোধ করে নিয়ে গেছেন। লাইভ অনুষ্ঠানে জ্ঞানী-গুণী (!!) কথাবার্তা বলে তাঁকে যখন অ্যামব্রোসকে আমার সঙ্গে বসিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলাম, তিনি ঋণ শুধতে ব্যগ্র। অ্যামব্রোসও যেন আমাকে সাংবাদিকের বদলে সহ-কমেন্টেটরের আসনে বসিয়ে দিয়ে গল্প করতে শুরু করলেন।

সর্বকালের সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন, ম্যাচের পর ম্যাচ অসাধারণ পারফরম্যান্স। সঙ্গে ওই ব্যতিক্রমী চেহারা (বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি করে আমি বলতাম—‘মিষ্টি চেহারা’) আর মাঠের উদ্‌যাপন মিলিয়ে সত্যিকার এক চরিত্র। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের তুমুল আগ্রহের জবাবে ওই এক কথা—কার্টলি টকস্ টু নো ম্যান। একান্ত সাক্ষাৎকার দূরে থাক, সংবাদ সম্মেলনেও পারতপক্ষে যেতেন না। কখনো কোনো সাংবাদিক কপালগুণে অ্যামব্রোসের কোনো কোট পেয়ে গেলে অবধারিতভাবেই তা লেখার সময় ‘ইন আ রেয়ার চ্যাট উইথ কার্টলি অ্যামব্রোস’ কথাটার উল্লেখ থাকত।

এটুকুই অ্যামব্রোসের ইন্টারভিউটাকে বিশেষ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ হতে পারে। তবে আমার কাছে আরও স্পেশাল হয়ে থাকার আরেকটা কারণ আছে। এই ইন্টারভিউর মাধ্যমে যে আমার দশ বছরের অপেক্ষার অবসান। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় দুদিন আক্ষরিক অর্থেই অ্যামব্রোসের পেছনে লেগে ছিলাম। ডাবলিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচের আগের দিন, কোথায় একটু চোট আছে বলে অ্যামব্রোস প্র্যাকটিস করছেন না। মাঠের বাইরে ঘাসে বসে গান গাইছেন।

এর আগেই একবার ইন্টারভিউ চেয়ে অদ্ভুত এক শূন্য দৃষ্টির জবাব পেয়েছি। অ্যামব্রোসকে একা দেখে তাঁর পাশে গিয়ে বসে আবারও অনুরোধ করলাম। অ্যামব্রোস হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলার ভঙ্গি করে গান গেয়ে যাচ্ছেন। অ্যামব্রোসকে খুশি করতে আমিও আগা নেই মাথা নেই ওই গানের তালে মাথা দুলিয়ে যাচ্ছি। খেলা ছাড়ার পর নিয়মিতই গান-টান করতে শুরু করেছেন। স্বদেশি অ্যান্টিগান রিচি রিচার্ডসনের সঙ্গে ব্যান্ডও করেছেন। তবে সত্যি কথাই ভালো, ডাবলিনে মালাহাইড মাঠে অ্যামব্রোসের গান শ্রবণযন্ত্রের ওপর অত্যাচার বলেই মনে হয়েছিল।

পরে গায়ক হিসাবে ভালোই নামডাক হয়েছে। তবে ১৯৯৯ সালে অ্যামব্রোসের গানকে মনে হয়েছিল শ্রবণযন্ত্রের ওপর অত্যাচার! ছবি: উইন্ডিজ ক্রিকেট

গানে একটু বিরতি পড়ার সুযোগে আমি বললাম, ‘আমি শুধু সাংবাদিক নই, আপনার বিরাট ফ্যান। ইংল্যান্ডে এসেছি শুধু আপনাকে ইন্টারভিউ করতে।’ প্রায় আক্ষরিক অর্থেই আকর্ণবিস্তৃত হাসি দিয়ে অ্যামব্রোস বললেন, ‘নো ম্যান, নো, তুমি এসেছ বিশ্বকাপ কাভার করতে।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটা তো ঠিকই। তবে আপনার ইন্টারভিউ নেওয়াটাই এই বিশ্বকাপে আমার একমাত্র স্বপ্ন।’

এই ব্রহ্মাস্ত্রে কাজ হওয়া সুনিশ্চিত। কিসের কী, নির্বিকার মুখে কথাটা শুনে অ্যামব্রোস আবার সঙ্গীতচর্চায় মনোনিবেশ করলেন। আর আমি অভিনয়ে। গান গাইলে এমন গানই গাওয়া উচিত, এমনভাবেই গাওয়া উচিত, এটা বোঝাতে মাথা দোলাতে শুরু করেছি। কিন্তু কতক্ষণ আর তা পারা যায়! অন্য কাজও তো আছে। আমি তাই আরেকবার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু ‘কার্টলি, প্লিজ...’ বলে কথা শুরু করতেই অ্যামব্রোস হাত তুলে আমাকে দিয়ে থামিয়ে বললেন, ‘বিরক্ত করছ কেন? বলেছি না, আমি ইন্টারভিউ দিই না।’

ওই শরীর, তার ওপর রাতে ভালো ঘুম-টুম না হওয়ার কারণেই কিনা অ্যামব্রোসের চোখ একটু রক্তাভ, আমি আর ঘাঁটানোর সাহস পেলাম না।

প্র্যাকটিস শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল যখন বাসে উঠছে, আবারও আমি তাঁর পাশে। যা বলার তো বলা হয়েই গেছে, এবার শুধু ‘প্লিজ, প্লিজ’ করছি। আমাকে দেখেই অ্যামব্রোসের চোখেমুখে ‘কী জ্বালাতেই না পড়েছি’ ভাব ফুটে উঠল। বাসের পাদানিতে পা রেখে অ্যামব্রোস বললেন, ‘ওকে, আমি ভেবে দেখব। সন্ধ্যার পর হোটেলে আমার রুমে ফোন কোরো।’

কথাটাকে মোটামুটি প্রতিশ্রুতি বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু তা শোনাল অন্য রকম। অ্যামব্রোসের কানে হেডফোন, গানের যা রুচি বুঝেছি, তাতে নিশ্চয়ই ধুমধাড়াক্কা কোনো মিউজিকই শুনছিলেন। আর হেডফোনে বেশি সাউন্ড দিয়ে কিছু শুনতে থাকলে যা হয়, অ্যামব্রোসের কথাটা শোনাল চিৎকারের মতো। এমনই যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য ক্রিকেটাররা রীতিমতো চমকে উঠে খুবই সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি মানে মানে কেটে পড়লাম।

এটা দুপুরের কথা। সন্ধ্যার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোটেলে গিয়ে অ্যামব্রোসের রুমে ফোন করলাম। এখনকার সাংবাদিকদের কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হবে যে, তখন এই সুবিধাটা ছিল। টিম হোটেলে গিয়ে হাউস টেলিফোন তুলে অপারেটরকে ‘প্লিজ, পুট মি টু অমুক’ বললেই ওই রুমে কানেকশন দিয়ে দিতেন। অ্যামব্রোস ফোন তুলতেই দুপুরের পরিচয় দিয়ে-টিয়ে বললাম, ‘আপনি কি লবিতে আসবেন, নাকি আমি আপনার রুমে আসব?’

শীতল গলায় অ্যামব্রোস জবাব দিলেন, ‘আপনাকে তো বলেছি, আমি ইন্টারভিউ দিই না।’

আমি বললাম, ‘না, না আপনি তো বলেছিলেন, ভেবে দেখবেন।’

অ্যামব্রোসের উত্তরটা এখনো কানে বাজে, ‘ওকে, আমি ভেবে দেখেছি এবং ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি ইন্টারভিউ দেব না। ঠিক আছে?’

সারাটা দিন পেছনে লেগে থেকে আশায় আশায় থাকার পর এটা ঠিক থাকে কীভাবে! আমি তাই আবার অনুরোধ করলাম।

অ্যামব্রোস বললেন, ‘ইউ আর নট লিসেনিং।’

নাছোড়বান্দা আমি আবারও ‘প্লিজ’ বললাম। অ্যামব্রোস এবার আরও দুটি শব্দ যোগ করে বললেন, ‘ইটস্ অবভিয়াস ইউ আর নট লিসেনিং!’

এই হেয়ারস্টাইলের রহস্যটা কী? হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাকি সবার চেয়ে আলাদা হয়ে থাকা। আই জাস্ট ট্রাই টু বি ডিফ্রেন্ট।’ আলাদা হয়ে থাকাটা এত জরুরি কেন? আবারও হাসি, ‘কার্টলি অ্যামব্রোস একটাই—এটা নিশ্চিত করতে।’

সেন্ট ভিনসেন্টে ইন্টারভিউ শুরু করার আগে অ্যামব্রোসকে গল্পটা বললাম। অ্যামব্রোস হা হা করে হাসলেন। ইন্টারভিউ নেওয়ার পর থেকে তো বেশ খাতির। প্রেসবক্সের নিচেই রেডিও-টিভির কমেন্ট্রি বুথ। লাঞ্চ বা টি-র সময় নিচে নেমে গিয়ে অ্যামব্রোসের সঙ্গে আড্ডাও মেরে আসি। সেই আড্ডাতেই অনেক দিন মনে জমে থাকা প্রশ্নটা করলাম, ‘ইন্টারভিউ দিতে আপনার এমন অনীহা কেন?’

অ্যামব্রোস একটা হাসি দিলেন, ‘কারণ একটাই, আমার ভালো লাগে না। একজনকে দিলে আরেকজন চাইবে, তাই কাউকেই দিই না।’

চুল নিয়ে খেলোয়াড়ি জীবনেও নানা এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। তবে সেবার যে হেয়ারস্টাইলটা দেখেছিলাম, পরে তা সবার পরিচিত হয়ে গেলেও তখন তা একেবারেই নতুন। একটু অদ্ভুতও। কামানো মাথার পেছনে চুলের ছোট্ট একটা বৃত্ত, তা থেকে বেরিয়ে এসেছে তিন-চারটি লম্বা জটা। এই হেয়ারস্টাইলের রহস্যটা কী? অ্যামব্রোসের মনে হয় প্রসঙ্গটা খুব পছন্দ হলো। হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাকি সবার চেয়ে আলাদা হয়ে থাকা। আই জাস্ট ট্রাই টু বি ডিফারেন্ট।’ আলাদা হয়ে থাকাটা এত জরুরি কেন? আবারও হাসি, ‘কার্টলি অ্যামব্রোস একটাই—এটা নিশ্চিত করতে।’

বাংলাদেশে তো একবারই গেছেন, কী মনে আছে?

প্রশ্নটা শুনে অ্যামব্রোস বিস্মিত, ‘বাংলাদেশ! না, আমি তো কখনো বাংলাদেশে যাইনি। ক্রিকেটের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আর কেনিয়াতেই আমার যাওয়া হয়নি।’

শুনে তো আমি মহাবিস্মিত। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পরপরই একটি তিন দিনের ম্যাচ আর দুটি ওয়ানডে খেলতে বাংলাদেশে এসেছিল ব্রায়ান লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই দলে তো অ্যামব্রোসও ছিলেন। খেলেছেনও মনে পড়ছে। কিন্তু অ্যামব্রোস তো দেখি নিশ্চিত, ‘না, না আমি বাংলাদেশে যাইনি। নকআউট বিশ্বকাপে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে বিশ্রাম অথবা বাদ দেওয়া হয়েছিল।’

আরও কিছুক্ষণ গল্পটল্প করে পুরো বিভ্রান্ত হয়ে প্রেসবক্সে ফিরলাম। ক্রিকইনফোতে অ্যামব্রোসের ক্যারিয়ারে গিয়ে দেখি, আমিই ঠিক। অ্যামব্রোস ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, খেলেছেনও দুটি ওয়ানডেতেই। আবার গেলাম নিচে। কাগজে লিখে নিয়ে যাওয়া তথ্যপ্রমাণ মানে ওই দুই ম্যাচে তাঁর বোলিং ফিগার দেখে অ্যামব্রোস অবাক হয়ে বললেন, ‘তাই নাকি? আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, খেলেছিও! তাহলে মনে পড়ছে না কেন?’

এই প্রশ্নের উত্তর আমি কীভাবে জানব, বলুন!