যুবরাজ সিং ঢুকলেন হইহই করতে করতে। মঞ্চে উঠে দুহাত তুলে বললেন—‘ভাইয়ান হো, ভাইয়ান হো’।

মানেটা কী? মানে হলো—অভিনন্দন হে, অভিনন্দন হে।

অভিনন্দন তো আসলে তাঁকেই জানানো উচিত। হারিয়ে যেতে যেতে দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়। এই বিশ্বকাপ তো যুবরাজ সিংয়ের পুনর্জন্মের গল্প। মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনকক্ষে ঢোকার সময় তুমুল করতালিতে সেই অভিনন্দন অবশ্য জানিয়েছেনও সাংবাদিকেরা।

'ভাইয়ান হো, ভাইয়ান হো' বলতে বলতেই কি ছুটে আসছিলেন যুবরাজ সিং? ছবি: গেটি ইমেজেস

ধোনির মুখেও তখন বিস্তৃত হাসি। ধোনি কথা বলেন খুব গুছিয়ে এবং সিরিয়াস ভঙ্গিতে। সংবাদ সম্মেলনে হাসি-টাসি অপচয় করায় খুব বিশ্বাসী বলে মনে হয়নি কখনোই। এই ধোনি সেই ধোনি নয়। কথায় কথায় হাসি। কথায় কথায় রসিকতা। সাংবাদিকেরা বেশির ভাগই প্রশ্ন না করে যেন বিবৃতি পড়ে শোনালেন। আবার সুযোগ পাওয়া যায় কি না ভেবে বেশির ভাগেরই দুটি করে প্রশ্ন থাকল। ধোনি চুপচাপ তা শুনে মাথায় মাইক্রোফোন ঠেকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘প্রথম প্রশ্নটা কী ছিল ভুলে গেছি।’

জনতার ক্রিকেট-আবেগের পুরো ফায়দা তুলতে তুচ্ছ জিনিসকেই বড় বানিয়ে ফেলায় ওস্তাদ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ব্যাপারে বিতৃষ্ণা পরিষ্কারই বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুবার। বাধ্যতামূলক সংবাদ সম্মেলনেই শুধু আসেন। একান্ত সাক্ষাৎকার বলতে গেলে দেনই না। ‘বলতে গেলে’ শব্দ দুটিও চাইলে বাদ দিয়ে দিতে পারেন। সর্বশেষ কবে ভারতীয় কোনো পত্রিকায় ধোনির একান্ত সাক্ষাৎকার বেরিয়েছে, সেটি যে কেউ মনেই করতে পারেন না।

বিশ্বকাপ জিতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও খোঁচা দিতে ছাড়েননি—‘আজ হেরে গেলে প্রথম প্রশ্ন হতো, অশ্বিনের জায়গায় কেন শ্রীশান্ত? যুবরাজ সিংয়ের আগে আমি কেন নামলাম?’ প্রশ্ন দুটি যে অন্যায় হতো, তা নয়। দুটি সিদ্ধান্তেই বড় ঝুঁকি ছিল। নিজেও তা মানছেন। প্রথমটা ভুল বলেও প্রমাণিত। দ্বিতীয়টা ঠিক প্রমাণ করার দায়িত্ব ছিল নিজের ওপরই। কী দারুণভাবেই না তা করেছেন!

‘আমি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিই, কে কী বলবে তা নিয়ে ভাবি না। শুধু একটা জিনিসই মাথায় রাখি যেন সেটি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়’—নিজের দর্শনটাও জানিয়ে দিচ্ছেন তর্কযোগ্য থেকে এখন প্রায় তর্কাতীতভাবে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক।

২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ধোনি-যুগের সূচনা। আইপিএল জিতেছেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগও, এবার বিশ্বকাপ। তাঁর নেতৃত্বেই টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠে এসেছে ভারত। বিশ্বকাপ জিতে ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়েরও চূড়া দেখছে। এই যে যেটিতেই হাত দিচ্ছেন, সোনা হয়ে যাচ্ছে—রহস্যটা কী? ধোনি হাসেন, ‘আমি খুব লাকি।’

অধিনায়ক ধোনির সঙ্গে এই বিশেষণটা খুব ব্যবহার হয় বলেই বোধ হয় ওই তির্যক মন্তব্য। ‘লাকি ক্যাপ্টেন’ বলার কারণ তো ছিলই। মাঠে এমন সব আপাত দুর্বোধ্য সিদ্ধান্ত নেন যে, ক্রিকেটীয় যুক্তিবুদ্ধিতে সেটির তল মেলে না। ফাটকা খেলেন, জিতেও যান। কিন্তু বারবার একই ঘটনা হতে থাকলে সেটিকে আর ফাটকা বলবেন কীভাবে! নিজের মনের ডাকেই সাড়া দেন, তবে সেই ‘ডাক’টা তো আসে ক্ষুরধার ক্রিকেট-মস্তিষ্ক থেকেই। একেবারেই নিজস্ব কিছু ধ্যানধারণা আছে। নির্ভয়ে সেটির প্রয়োগ করতে করতে তা এখন ‘ধোনিবাদ’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেছে। শুধু ভারতীয় ক্রিকেট কেন, ক্রিকেট-বিশ্বই তাতে আলোড়িত।

সেই ধোনিবাদের মূল কথা হলো, তুমি নিজে যা ঠিক মনে করো, তাই করো। কে কী বলল, ভাবতে যেয়ো না। অতীতে কী হয়েছে না হয়েছে তা ভেবে লাভ নেই। আজ তুমি কী করবে, সেটিই আসল। ক্রিকেট তত্ত্ব-টত্ত্ব বইয়ে থাক, নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখো। এবং যা করো, নিজের মতো করে করো। তাই করে এসেছেন।

হাজার চাপেও নিষ্কম্প থাকতে পারেন বলেই বোধ হয় তিনি ধোনি! ছবি: গেটি ইমেজেস

২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রীকে প্রথম কথাটাই বলেছিলেন, ‘রবি, আমরা তোমাকে ভুল প্রমাণ করেছি।’ সেদিন হাতকাটা জার্সি পরে ট্রফি নিতে গিয়েছিলেন বলে তুমুল সমালোচনা হয়েছে। তাতে থোড়াই কেয়ার করে গত পরশুও ট্রফি নিলেন সেই হাতকাটা জার্সি গায়েই। মোটরবাইকের খুব নেশা। গান-টান খুব শোনেন বলে জানা নেই। তবে শুনলে ধোনি হয়তো এই গানটাই বেশি শোনেন—‘আই উইল ডু ইট মাই ওয়ে...।’ রাঁচির মতো ছোট্ট একটা শহর থেকে উঠে এসে এই অসীম আত্মবিশ্বাসের রহস্য এখন প্রায় পিএইচডি থিসিসের বিষয়ে পরিণত।

ধোনিবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো, যা তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ে ভাবতে যেয়ো না। এই বিশ্বকাপে যতবার চাপের কথা উঠেছে, ধোনি উল্টো জিজ্ঞেস করেছেন, ‘এ নিয়ে ভাবলে কি তা পারফরম্যান্সে সাহায্য করবে? যা পারফরম্যান্সে সাহায্য করবে না, তা নিয়ে ভেবে লাভ কী?’ সংবাদমাধ্যমের ব্যাপারেও একই রকম চিন্তা, ভালো খেললে ওরা এমনিতেই ভালো লিখবে। খারাপ খেললে ভালো লিখেও কিছু করতে পারবে না। তা হলে এ নিয়ে ভেবে কী লাভ?

নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই বলে ম্যাচের রেজাল্ট নিয়েও রাতের ঘুম নষ্ট করতে রাজি নন। ফলাফল নয়, তিনি দেখেন প্রক্রিয়াটা ঠিক আছে কি না। সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঠিকঠাক প্রস্তুতি আর সুখী ড্রেসিংরুম। ধোনির ড্রেসিংরুমে প্রথম ‘আইন’—সুখে-দুঃখে সবাইকে সবার পাশে দাঁড়াতে হবে। কেউ যত প্রতিভাবানই হোক না, টিমম্যান না হলে সেখানে তাঁর জায়গা নেই। পরিহাসই বলতে হবে, ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে অসুখী ড্রেসিংরুমের স্রষ্টা মনে করা হয় যাঁকে, সেই গ্রেগ চ্যাপেলই ধোনিবাদের সূচনা করে দিয়ে গেছেন। সেই ২০০৫ সালে, ধোনির অভিষেকের মাত্র এক বছরের মাথায়ই চ্যাপেল ভারতীয় বোর্ডকে চিঠি লিখে ধোনিকে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে পরিচর্যা করতে বলেছিলেন।

চাপ নিয়ে ভাবলে পারফরম্যান্স ভালো হবে না, তাই ভেবো না। ফল তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই ভেবো না। কিন্তু চাইলেই কি এসব না ভেবে পারা যায়? বা মাঠে স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনার মধ্যে অমন নিষ্কম্প থাকা যায়?

তিনি পারেন বলেই মহেন্দ্র সিং ধোনি আধুনিক ক্রিকেট অধিনায়কের আদর্শ হয়ে উঠলেন বলে! নাকি হয়েই গেছেন?