বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি নিয়ে রিকি পন্টিংয়ের কোনো আগ্রহ থাকার কথা না। তারপরও যদি কোনো কারণে অকল্যান্ডে একটা চোখ রেখে থাকেন, তাঁর প্রতিক্রিয়াটা খুব জানতে ইচ্ছা করছে। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক গত বছর আইপিএলের সময় ব্যাটসম্যানদের গদা চালানো দেখে বলেছিলেন, ‘টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং অনেকটাই বেসবলের মতো হয়ে যাচ্ছে।’

অকল্যান্ডে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ম্যাচটা বৃষ্টির কারণে টি-টোয়েন্টি থেকে টি-টেনে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর ‘অনেকটাই’ শব্দটা আর কেন রাখবেন? নামেই এটা ক্রিকেট, আসলে তো বেসবলই। আর বেসবল হয়ে যাওয়া মানে বাংলাদেশের সমস্যা আরও বেড়ে যাওয়া। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে ক্রিকেটেই বাংলাদেশ পারে না, বেসবলে কীভাবে পারবে?

আরেকটি আউট! ৮ রানেই বোল্ড নাজমুল হোসেন শান্ত। ছবি: গেটি ইমেজেস

টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংই পাওয়ার হিটিংয়ের খেলা, টি-টেন তো আরও বেশি। এই ট্যুরে বাংলাদেশ দলের সমস্যার তালিকা করতে গেলে সেটির দৈর্ঘ্য নিউজিল্যান্ডের নর্থ আর সাউথ আইল্যান্ডের মাঝের সাগরে কল্পিত সেতুর সমান হয়ে যাবে। এরপর কিনা শেষ ম্যাচে তাদের কাছে পাওয়ার হিটিংয়ের চাহিদাপত্র! অন্যায়, ঘোরতর অন্যায়।

সেই ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ইংল্যান্ড টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর একটা লেখা লিখেছিলাম, যেটির হেডিং ছিল: পাওয়ার হিটার চাই, পাওয়ার হিটার! লেখার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, টি-টোয়েন্টিতে ভালো করতে হলে বাংলাদেশের এখন পাওয়ার হিটার চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। আরেকবার এই নিউজিল্যান্ডেই দৈত্যাকৃতি জ্যাকব ওরামের বেধড়ক মার দেখে আমি জীবনানন্দ দাশের মায়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। মার তো খাচ্ছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা, আমার আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন পড়ল কেন?

কথাটা আক্ষরিক অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না। আমি কুসুমকুমারী দাশের কবিতার বিখ্যাত সেই লাইনটা দিয়ে হেডিং করেছিলাম, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে...’। পরের লাইনটা অবশ্য একটু বদলে দিতে হয়েছিল, এক-দুই নেওয়াতে বড় না হয়ে ছক্কা মারায় বড় হবে।

‘সেই ছেলে’ আমাদের দেশে এখনো হয়নি। আমার পরামর্শ অনুযায়ী পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়নি। দিলেও আসলে কোনো লাভ হতো বলে মনে হয় না। এত প্যাচালের সারমর্ম একটাই–বলে বলে চার-ছক্কা মারার মতো ব্যাটসম্যান বাংলাদেশ এখনো উৎপন্ন করতে পারেনি। ‘বলে বলে’ কথাটা যে এখানে দ্ব্যর্থক, তা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

সারমর্ম এটাও যে, ম্যাচটা টি-টেন হয়ে যাওয়ার পরই আসলে পুরস্কার বিতরণীটা সেরে ফেলা যেত। বাংলাদেশ জিতে যেতে পারে, এমন সন্দেহ করার কোনো কারণই ছিল না। শুরু হওয়ার আগেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, এই ম্যাচের সম্ভাব্য রেজাল্ট একটাই। না, ভুল বললাম। বৃষ্টির আবার ফিরে আসার একটা আশঙ্কা তো ছিলই। সম্ভাব্য রেজাল্টের মধ্যে তাই ‘নো রেজাল্ট’-ও রাখতে হচ্ছিল।

নিউজিল্যান্ডে ১০ ওভারের ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা আর আগামীকাল সকালেই করোনা উধাও হয়ে গিয়ে পৃথিবীর আবার সেই সুস্থ-স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় সমান। তার ওপর খেলাটা যেখানে হচ্ছে ইডেন পার্কে।

আপনি অবশ্য বলতেই পারেন, নিউজিল্যান্ডে ম্যাচ কত ওভারের, তাতে কীই-বা আসে যায়! শেষ পর্যন্ত তো পরাজয়ই বাংলাদেশের নিয়তি। অতীত রেকর্ড তাই বলে। কিন্তু সেই অতীত তো বদলেও যায়। আগে হয়নি বলে কখনোই হবে না, এমন তো কোনো কথা নেই।

কিন্তু ১০ ওভারের ম্যাচে এই জাতীয় সম্ভাবনা আর আগামীকাল সকালেই করোনা উধাও হয়ে গিয়ে পৃথিবীর আবার সেই সুস্থ-স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় সমান। তার ওপর খেলাটা যেখানে হচ্ছে ইডেন পার্কে। এই মাঠেও দু’একটা লো স্কোরিং ম্যাচ যে হয়নি, তা নয়। তবে সেই ব্যতিক্রম নিয়মকে প্রমাণ করতেই। মাঠটা শুধু ছোটই নয়, আকৃতিটাও অদ্ভুত। অষ্টভুজাকৃতিরই বলা যায়, ক্রিকেটের জন্য যেটির চার বাহু কেটে চতুর্ভুজ বানানো হয়েছে। ফুটবল মাঠ হিসেবে ঠিক আছে, ক্রিকেট মাঠ হিসেবে নয়। তবে মূলত এটি রাগবি মাঠ, লম্বালম্বি বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ মিটার। যেখানে আইসিসি নির্ধারিত সর্বনিম্ন মাপের চেয়েও যা দশ মিটার কম। অনেক পুরোনো ভেন্যু, তবে সেটির আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের যোগ্যতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। মাঝখানে তা কেড়ে নেওয়ার কথাও উঠেছিল।

এই মাঠে মাত্র ১২০ বলের খেলায় নিউজিল্যান্ডের যা করার কথা, তা-ই হলো। ১২টি চার ও ১০টি ছক্কায় ২২ বল থেকেই তো ১০৮ রান। এরপর ১৪১-কে তো একটু কমই বলতে হয়। ১৪.২ আস্কিং রেটের চাহিদা নিয়ে ব্যাট করতে নামলে শুরু থেকে মায়ের দিব্যি দিয়ে চালানো ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর চালাতে গেলে বেশির ভাগ যা হওয়ার কথা, বাংলাদেশ ইনিংসে তা-ই হলো।

শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে, নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা যা-ই মেরেছেন, তা-ই সীমানাছাড়া হয়েছে। ফিন অ্যালেন একাই তো করেছেন ২৯ বলে ৭১। ছবি: গেটি ইমেজেস

ঘটনাচক্রে ম্যাচটা হয়েছে ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেকের দিনে। তখন তো বটেই, এরপরও একটা লম্বা সময় ওয়ানডেতে পুরো ওভার খেলতে পারলেই বাংলাদেশ লক্ষ্য পূরণের আনন্দে ডগমগ হয়ে যেত। কে ভেবেছিল, এই ১০ ওভারের ইনিংসেও সেই দিন আবার ফিরে আসবে! শেষ পর্যন্ত সেই ‘লক্ষ্য’-ও অবশ্য পূরণ হয়নি। তারপরও দেখেন, ৭৬ রানের ৫০-ই চার-ছয় থেকে। বলছিলাম না, এটা ক্রিকেট নয়, পুরোই বেসবল!

ম্যাচ যতই টি-টেন হয়ে যাক, রেকর্ড বই এটাকে টি-টোয়েন্টি বলেই বিবেচনা করবে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম রানের তিনটি ইনিংসই এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। আজকের ৭৬ আছে ঠিক মাঝখানে। সামনে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কলকাতার ৭০, পেছনে ২০১০ সালে হ্যামিল্টনের ৭৮। 

কলকাতায় সৌম্য সরকার না থাকলে বলা যেত, বাংলাদেশের এই দলের কারোর ওপরই দুইবার বজ্রপাত হয়নি। বজ্রপাতের উপমা যদি টানতেই হয়, তা লিটন কুমার দাসের ওপরই পড়েছে বলতে হবে। সিরিজে আগের পাঁচ ম্যাচে মোট ৫০ রান এই ম্যাচে তাঁর দলে জায়গা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। অথচ পাকেচক্রে সেই লিটনই কিনা অধিনায়ক! এ ধরনের উপলক্ষ স্মরণীয় করে রাখার স্বপ্ন থাকে সবারই। ঘটনাচক্রে এমন সুযোগ পেয়ে রেকর্ড-টেকর্ড করে ফেলার ঘটনাও খুঁজলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। রেকর্ড অবশ্য লিটনও করেছেন। এমনই রেকর্ড, যা কিনা আগামী কিছুদিন বেচারার ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দেবে। এক হাবিবুল বাশার যদি তাঁকে একটু সান্ত্বনা দিতে পারেন। লিটন যে বিষের যাতনা ভোগ করছেন, তা তিনি খুব ভালো বুঝবেন। কারণ আশীবিষে তাঁকেও দংশেছিল। 

২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়ে টেস্টে অধিনায়ক হিসাবে অভিষেকেই ‘পেয়ার’ পাওয়ার রাতে হাবিবুলের সেই হাহাকারে ভরা কণ্ঠ এখনো কানে বাজে। ‘এটা বলে বোঝানোর নয় রে ভাই। যে পায়, সে-ই বোঝে!’ বলার পর দুষ্টুমিতে আশ্রয় খুঁজতে চেয়ে পাশে বসে থাকা মোহাম্মদ আশরাফুলের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘লিখে দেন, আশার ফুল আশরাফুল, ঝরা ফুল হাবিবুল।'

সান্ত্বনা পেতে হাবিবুলের তা-ও দুজন সঙ্গী ছিল। টেস্টে অধিনায়কত্ব অভিষেকে ‘পেয়ার’ তিনি প্রথম পাননি। তাঁর আগেই এই ‘কীর্তি’ করে রেখেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মার্ক টেলর ও পাকিস্তানের রশিদ লতিফ।

অধিনায়কত্ব-অভিষেকে প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে লিটন দাস যেন রশীদ করীমের উপন্যাস। বড়ই নিঃসঙ্গ! ছবি: এএফপি।

কিন্তু লিটন তো একটা জায়গায় এক ও অনন্য। কয়েকটা বল খেলে শূন্য রানে আউট হলেও তা যথেষ্টই যন্ত্রণার কারণ হতো, প্রথম বলেই আউট হয়ে সেই শূন্যের রং সোনালী (গোল্ডেন ডাক) হয়ে গেছে বলে যন্ত্রণাটা আরও বেশি। লিটনের দুঃখগাথার তো এখানেই শেষ নয়। ক্যাপ্টেনসি অভিষেকে প্রথম বলেই বোল্ড–এই যন্ত্রণায় তিনি হয়ে যাচ্ছেন রশীদ করীমের উপন্যাস।

বড়ই নিঃসঙ্গ!