দ্বিতীয় ইনিংসে ওপেনাররা ব্যাটিং করতে নেমে গেছেন। অথচ তাঁরা জানেন না, জিততে হলে কত রান করতে হবে। ইনিংস শুরু হয়ে যাওয়ার পরও না। একটা টার্গেটের কথা শুনছিলেন বটে; না, সেটাও ঠিক না। নয় বল খেলা হয়ে যাওয়ার পর ওই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পেতে খেলা থামিয়ে দেওয়া হলো। মিনিট পাঁচেক আলোচনার পর দুই ব্যাটসম্যান জানলেন, জিততে হলে ১৬ ওভারে ১৭১ করতে হবে। ফিল্ডিং সাইড জানল, প্রতিপক্ষকে ১৬৯ রানে আটকে রাখতে পারলেই কাজ হয়ে যাবে।

এ নিয়ে এত কথা বলার কী আছে! পাড়ার ক্রিকেটে এমন হতেই পারে। হয়ও। আসলে হয় না। পাড়ার ক্রিকেটে তো আর ডাকওয়ার্থ-লুইসের বালাই নেই। তবে হ্যাঁ, বিশ্ব জুড়ে এত এত ঘরোয়া লিগ বা টুর্নামেন্ট, ও সব জায়গায় কখনো এমন হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে? যেখানে মাঠের দুইজন ছাড়াও আরও দুই আম্পায়ার থাকেন, থাকেন ম্যাচ রেফারি। বৃষ্টি বাগড়া দেওয়া ম্যাচে পরিবর্তিত টার্গেট বের করার জন্য স্ট্যাটিসটিশিয়ান, কম্পিউটারে সফটওয়্যার…আরও কত কী! 

টেলিভিশনে নেপিয়ারের ম্যাকলিন পার্কের দৃশ্য দেখতে দেখতে তাই চোখ কচলাচ্ছিলাম। দেখেও কিছু বিশ্বাস না হলে তো এটাই করার নিয়ম, তাই না? কীভাবে সম্ভব! কীভাবে সম্ভব!

ইনিংস শুরু হয়ে যাওযার পর আলোচনা হচ্ছে, টার্গেট যেন কত? নেপিয়ারে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় টি-টোয়ােন্টি সাক্ষী হয়ে থাকল এই অভূতপূর্ব ঘটনার। ছবি: গেটি ইমেজেস

সম্ভব, তা তো আমরা জানলামই। তবে ‘কীভাবে’-র উত্তর মনে হয় না কোনোদিনই পাওয়া যাবে। টার্গেট নিয়ে কনফিউশনের সময় ম্যাচ রেফারির রুমে বাংলাদেশ দলের কোচ রাসেল ডমিঙ্গো ও ম্যানেজার সাব্বির খানকে দেখলাম। অবশ্যই বিরক্ত এবং ঈষৎ উত্তেজিত। অভাবনীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে বেমানানরকম হাস্যকর এই ঘটনায় প্রাপ্তির দিক দেখছি একটাই। রাসেল ডমিঙ্গোও যে উত্তেজিত হতে জানেন, এই যুগান্তকারী তথ্যের আবিষ্কার।

চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কড়া হেডমাস্টারের স্টাইলে ড্রেসিংরুম চালানোর স্মৃতি মাঝে মধ্যেই উঁকি দেয় বলেই কি না বাংলাদেশের পরের কোচদের বড় বেশি নরম-সরম মনে হয়। আসলে তো নরম-সরমই। স্টিভ রোডস যেন “ইংলিশ ভদ্রতা কী এবং কত প্রকার” বোঝাতেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই পৃথিবীতে ভদ্রলোকের যে ভাত নাই, তাঁকে তা ভালোমতোই বুঝিয়ে দিয়েছে বিসিবি। ভালো-মন্দ রোলার কোস্টারে এগোতে এগোতে খুবই পচাভাবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ২০১৯ শেষ করার পুরো দায়ভার রোডসের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিসিবি হাত ধুয়ে ফেলেছে। 

রাসেল ডমিঙ্গো দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের কোচ ছিলেন। তার মানে কোচ হিসাবে নিশ্চয়ই একেবারে ফেলনা নন। তবে হাই পারফরম্যান্স দলের কোচ হওয়ার জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসে জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়ে তাঁকে সব সময়ই যারপরনাই বিগলিত বলে মনে হয়। ঘটনাটা এমনই যে, কোনো ক্ষেত্রে “গাছে না উঠতেই এক কাঁদি” প্রবাদটা প্রয়োগ করার প্রয়োজন হলে অনায়াসেই আপনি এর বদলে “রাসেল ডমিঙ্গা” বলতে বা লিখতে পারেন। বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স খারাপ হলেই (তা অবশ্য এখন একরকম নিয়মেই পরিণত) বিসিবির অনেক কর্তাব্যক্তিকে বলতে শুনি, “আমাদের আসলে হাথুরুর মতো কড়া কোচ দরকার।” যা শুনে বলতে ইচ্ছা করে, জানেনই যখন, তাহলে অমন কোচই আনেননি কেন?

যাক্, রাসেল ডমিঙ্গাকে এবার রেহাই দিই। তিনি ভালো মানুষ, এটা কর্মক্ষেত্রে সমস্যা করতে পারে। তবে তা তো আর তাঁর দোষ নয়। কিন্তু জেফ ক্রোকে যে এই ছাড় দেওয়া যাচ্ছে না! এই সিরিজে ম্যাচ রেফারি কে, এটা আগে জানতাম না। মাঠে প্লেয়াররা উল্টোপাল্টা কিছু না করলে ম্যাচ রেফারি কে, তা নিয়ে কার মাথা ঘামানোর সময় আছে! প্লেয়াররা উল্টোপাল্টা কিছু করলে, বা মাঠে উল্টোপাল্টা কিছু ঘটলেই না ম্যাচ রেফারি দৃশ্যপটে আসেন। আজ জেফ ক্রো যেমন এলেন।

মানুষ হিসাবে জেফ ক্রো-ও ডমিঙ্গো প্রজাতির। নিপাট ভদ্রলোক। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের বিখ্যাত দুই ভাইয়ের একজন। দুই ভাইয়ের সঙ্গেই আমার ভালো পরিচয় আছে। মার্টিন ক্রোর ক্ষেত্রে অবশ্য “পরিচয় ছিল” লিখতে হচ্ছে। ক্যান্সার অকালেই কেড়ে নিয়েছে অসাধারণ ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট মননেও অসাধারণ মার্টিন ক্রোকে। দুই ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই আমার একটা কথা কমন ছিল, “আমি কিন্তু তোমাদের বাবার খেলা দেখেছি।’

জেফ ক্রো ম্যাচ রেফারির কাজ করছেন সেই অনাদিকাল থেকে। ছবি: আইসিসি

জেফ-মার্টিনের বাবা ডেভিড ক্রো এমন বিখ্যাত কোনো ক্রিকেটার ছিলেন না। তবে আমার স্মৃতিতে তাঁর একটা বড় জায়গা আছে। ১৯৮৫ সালে এই ডেভিড ক্রো নিউজিল্যান্ড অ্যাম্বাসেডরস নামে একটা দল নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। মূলত সাবেক ক্রিকেটারদের এক দল, প্রীতি সফরের দল যেমন হয় আর কি! খুলনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমি ঢাকায় নিউজিল্যান্ড অ্যাম্বাসেডরসের ম্যাচ দেখতে এসেছিলাম। একটা ম্যাচ ছিল বিসিবি একাদশের মোড়কে জাতীয় দলের সঙ্গে, আরেকটাতে প্রতিপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (আহা, বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলা কোথায় হারিয়ে গেল)। পরে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে নামান্তরিত তখনকার ঢাকা স্টেডিয়ামে দর্শক হিসাবে সেটাই ছিল আমার অভিষেক।

দেখো কাণ্ড, জেফ ক্রোকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর বাপকে টেনে এনেছি। তা কী যেন বলছিলাম? ও হ্যাঁ, জেফ ক্রোকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন নেই বলে তাঁকে একটু গালমন্দ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে ৩৯টি টেস্ট খেলেছেন, ৭৫টি ওয়ানডে। করেছেন অধিনায়কত্বও। আইসিসির ম্যাচ রেফারি হিসাবেও কাজ করেছেন সেই অনাদিকাল থেকে। সুনির্দিষ্টিভাবে বললে ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে। বৃষ্টিতে এতক্ষণ খেলা বন্ধ থাকার পরও ডাকওয়ার্থ/লুইসটা ঠিকভাবে হিসাব করা হয়নি, এটা খেয়াল না করলে তো বলতে হয়, “তুমি অনেক সার্ভিস দিয়েছ। অনেক ধন্যবাদ। এবার তুমি বিদায় নাও বাপু।”

জেফ ক্রো অবশ্য বলতেই পারেন, “আরে, আমি তো এর চেয়ে অনেক বড় ব্লান্ডার করেও টিকে গেছি। এ আর এমন কি!’ আজ নেপিয়ারের ঘটনা দেখার পর জেফ ক্রো ম্যাচ রেফারি জেনে আমারও সেই ঘটনার কথাই মনে পড়েছে। বারবাডোজে ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই প্রহসনেও তো এই জেফ ক্রোই ছিলেন ম্যাচ রেফারি। ঘটনাটা কি মনে আছে আপনার?

আমি জীবনেও তা ভুলব না, কারণ ওই ফাইনালের ম্যাচ রিপোর্ট অফিসে পাঠিয়ে দেওয়ার পর আমাকে তা আবারও লিখতে হয়েছিল। সেটাও কেনসিংটন ওভালের প্রায়ান্ধকার প্রেসবক্সে। ঘটনাটা কি মনে করিয়ে দেব? এটাই একমাত্র বিশ্বকাপ, যাতে বিজয়ী দল দুই-দুইবার বিজয়োল্লাস করেছিল। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিং তাতে একটুও খুশি হননি। বরং প্রেস কনফারেন্সে এসে প্রথমেই অনুনয়ের সুরে বলেছিলেন, আশা করি, শেষ ১৫-২০ মিনিটকে শিরোনাম বানিয়ে এই বিশ্বকাপে আমরা যে ক্রিকেটটা খেলেছি, আপনারা তা ভুলে যাবেন না।’

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে দাপট দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক শিরোপা জিতেছিল, কারও পক্ষেই তা ভোলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ওই শেষ ‘১৫-২০ মিনিট’কেও যে ভোলা যাচ্ছিল না! সেই প্রথম বৃষ্টির কারণে সংক্ষিপ্ত বিশ্বকাপ ফাইনাল, সেই প্রথম খেলা ‘শেষ’ হয়ে যাওয়ার পরও আবার তা শুরু! দ্বিতীয়টি শুধু বিশ্বকাপ ফাইনালেই নয়, ক্রিকেট ইতিহাসেই প্রথম। কেনসিংটন ওভালে সন্ধ্যা নেমে গেছে, জ্বলে গেছে রাস্তার বাতি, ব্যাটসম্যানরা বল দেখছেন না। অস্ট্রেলিয়ার দুই স্পিনার শুধু হাত ঘুরিয়ে বল করে যাচ্ছেন, আর ব্যাটসম্যানরা অন্ধের মতো ব্যাট এগিয়ে দিচ্ছেন। ভাবা যায়, একটা বিশ্বকাপ ফাইনাল এভাবে শেষ হচ্ছে!

এর আগেও একবার ‘শেষ’ হয়েছিল! শেষ ৩ ওভারে শ্রীলঙ্কার দরকার ৬৩ রান, উইকেটে দুই পেস বোলার, অন্ধকারে বল দেখা যাচ্ছে না। ভাস আর মালিঙ্গাকে দুই আম্পায়ার ‘লাইট অফার’ করতেই মেনে নিলেন তাঁরা। অস্ট্রেলিয়ানরা মেতে উঠল আনন্দে। জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্মারক হিসেবে একটা স্টাম্প তুলে নিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা। শুরু হয়ে গেল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও। অথচ একটু পরই বাকি ৩ ওভার শেষ করতে আবার শুরু হলো খেলা!

খেলা নাকি শেষ হয়নি! অধিনায়ক রিকি পন্টিং ও মাহেলা জয়াবর্ধনের সঙ্গে আম্পায়ার স্টিভ বাকনর। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনাল, ব্রিজটাউন। ছবি: গেটি ইমেজেস

অস্ট্রেলিয়ানদের বিশ্বকাপ-জয়ের উৎসবের মধ্যে আম্পায়ার আলিম দার যখন রিকি পন্টিংকে গিয়ে বললেন, যেহেতু বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়নি, হয়েছে আলোর স্বল্পতায়, ম্যাচ তাই শেষ হয়নি, পন্টিং বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ যা-ই হোক, ডাকওয়ার্থ-লুইসে ম্যাচের রেজাল্ট হতে ইনিংসের ২০ ওভার হলেই তো হলো। অথচ এমন অভিজ্ঞ দুই আম্পায়ার স্টিভ বাকনর ও আলিম দার কিনা তা বেমালুম ভুলে গেলেন। টিভি আম্পায়ার ছিলেন রুডি কোয়ের্তজেন, রিজার্ভ আম্পায়ার বিলি বাউডেন। সবাই তো অভিজ্ঞতায় টইটুম্বুর। এমন ভুল তাঁরা কীভাবে করেছিলেন, এই বিস্ময় আমার এখনো যায়নি। ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো-ই বা কী করছিলেন? পাঁচজন মিলে উল্টো দুই অধিনায়ককে জানিয়ে দিলেন, বাকি ৩ ওভার খেলা হবে পর দিন।

দুই অধিনায়কের কেউই তাতে রাজি নন। ওই “ফাইভ ওয়াইজ মেন’-ও অনড়। বাকি ৩ ওভার স্পিনাররাই করবে, পন্টিংয়ের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর মাহেলা জয়াবর্ধনে জানালেন, ‘তা হলে আজই আমরা খেলব।’

তা-ই খেলেছিলেন। যা দেখাটাও ছিল একটা যন্ত্রণা।আমার অবশ্য দেখার সময়ও ছিল না। শেষের ওই প্রহসনই তো তখন ফাইনালের মূল স্টোরি হয়ে গেছে। ম্যাচ রিপোর্টের শুরুতেই তো ওটা চাই। আমি তখন এক-আধবার মাঠের দিকে তাকিয়ে ঝড়ের বেগে কি বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছি।  

এমন রাগ হচ্ছিল যে, ম্যাচশেষে দুই অধিনায়কের প্রেস কনফারেন্সের মাঝখানে এসে জেফ ক্রো যখন সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চাইছেন, আমি বাংলা সিনেমার স্টাইলে অস্ফুটে বলেছিলাম, 'আমি তোকে কখনো ক্ষমা করব না...।' শেষ শব্দটা উহ্যই থাক। এর আগে পন্টিং আর জয়াবর্ধনের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন জেফ ক্রো। পন্টিংয়ের কথাবার্তায় মনে হয়েছিল, তিনিও আমার মতো ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নইলে কেন বলবেন, 'এই বিশ্বকাপে আমরা যেমন খেলেছি, তাতে এমন শেষ আমরা ডিজার্ভ করি না।' 

২০০৭ ফাইনালের কথা মনে পড়ছে আর খুব জানতে ইচ্ছা করছে, নেপিয়ারেও কি ক্ষমা চেয়েছেন জেফ ক্রো? এই নিউজিল্যান্ড সফরে তো বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিকই নেই। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর এই প্রথম কোনো সাংবাদিকবর্জিত ট্যুর। জেফ ক্রো তাহলে ক্ষমাটা চাইবেন কার কাছে? কেন, সাংবাদিক নেই তো কি, ক্ষমা চাওয়ার ক্রমতালিকায় সাংবাদিকেরা তো আসেন অনেক পরে। বাংলাদেশের অধিনায়ক আছেন না? ইনিংসের শুরুতেই অমন কনফিউশনে ফেলে দেওয়ার জন্য মাহমুদউল্লাহর কাছে জেফ ক্রো ক্ষমা চেয়েছেন কি না, খোঁজ নিতে হবে তো!