এর আগে ১৯৯৪ সালে  কলম্বােয় তাকে ইন্টারভিউ করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছি। প্রতিশ্রুতি আদায় করে রাখার পরও রুমমেট মুশতাক আহমেদের ইন্টারভিউ শেষ করতে করতে তিনি উধাও। ইন্টারভিউয়ের ভয়ে পলাতক! দু বছর পর সিঙ্গাপুরে সে উপায় ছিল না। সেবার যে ইনজামামের রুমমেট বাসিত আলীই বন্ধু সাংবাদিককে সরাসরি রুমে এনে বসিয়ে দিয়েছেন সামনে! ইনজামামকে ইংরেজি বলার 'দুঃস্বপ্ন থেকে উদ্ধার করতে ইন্টারভিউটা করতে হয়েছিল উর্দুতে। ইনজামামের ইংরেজি-জ্ঞানের চেয়ে আমার উর্দু-জ্ঞান সামান্যই ভালাে ছিল বলে মাঝে মধ্যেই দোভাষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছিল বাসিতকে! 

উৎপল শুভ্র : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার পাঁচ বছর কেমন কাটল? কী পেয়েছেন আর কী পাননি?

ইনজামাম-উল হক : পাকিস্তানের পক্ষে ভালাে খেলে যাওয়াটাই আমার লক্ষ্য। সে লক্ষ্যটা হয়তাে মােটামুটি পূরণ হয়েছে। আর ওয়ানডের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেটে আমি বেশি ভালাে খেলতে চাই। টেস্টে আমি এখনাে লম্বা ইনিংস খেলতে পারিনি। এই অতৃপ্তিটা আমার বড় যন্ত্রণা। লম্বা টেস্ট ইনিংস খেলাই আমার স্বপ্ন। এ কারণেই ইংল্যান্ড সফরটার দিকে খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি আমি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে আমি লম্বা ইনিংস খেলতে চাই।

শুভ্র : ওয়ানডের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেট আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

ইনজামাম : আমার কাছে টেস্ট ক্রিকেটই আসল ক্রিকেট। যদিও টেস্টের চেয়ে অনেক বেশি ওয়ানডে খেলতে হয় আমাদের। তবে ওয়ানডে হলাে দর্শকদের জন্য। খেলােয়াড়দের কাছে টেস্ট ক্রিকেটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ানডের চেয়ে টেস্ট খেলে আমি অনেক বেশি মজা পাই।

শুভ্র : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার সেরা ইনিংস মনে করেন কোনটিকে?

ইনজামাম : গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে আমি একটি টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলাম (৯২ সালে অ্যান্টিগায় ১২৩)। ওই ইনিংসটি খুব ভালাে ছিল। এ ছাড়া করাচিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আরেকটি স্মরণীয় ইনিংস খেলেছিলাম। মুশতাকের সঙ্গে শেষ। উইকেটে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে পাকিস্তানকে ম্যাচ জিতিয়েছিলাম। এ কারণেই ওই ইনিংসটি বেশি পছন্দের। ওয়ানডেতে আমার সেরা ইনিংস ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই বিপক্ষে করা অপরাজিত ৯০ রান (১৯৯২ সালে পাের্ট অব স্পেনে)। (১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত করাচির ওই টেস্টে ৫৮ রান করে অপরাজিত ছিলেন ইনজামাম, মুশতাক করেছিলেন অপরাজিত ২০। অসমাপ্ত শেষ উইকেটে দুজন তুলেছিলেন রেকর্ড ৫৭ রান।)

সেজদারত মুশতাক আহমেদ, করাচি টেস্টে জয় নিশ্চিত করে ছুটে আসছেন ইনজামাম। ছবি: অলস্পোর্ট

শুভ্র : আমি ভেবেছিলাম, ওয়ানডেতে সেরা ইনিংস হিসেবে ৯২-এর বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ইনিংসটির কথা বলবেন।

ইনজামাম : হ্যা, ওই ইনিংসটিও নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন অনেক চাপের মধ্যে ব্যাট করতে নেমেছিলাম। তখন ওভারে ৮-৯ রান করে প্রয়ােজন ছিল। দ্রুত রান করার চেষ্টা করতে হবে— এটাই শুধু মাথায় ছিল আমার। জানতাম শুরু থেকেই শট খেলতে হবে। তা-ই খেলেছি। ভাগ্যও ভালাে ছিল। সেদিন যা খেলতে চেয়েছি, তা-ই হয়েছে। শটগুলােও গেছে গ্যাপে। অমন চাপের মধ্যে আমি ভালাে খেলায় দল জিতেছে, তাই আনন্দটা অন্য রকম ছিল।

শুভ্র : ব্যাট করতে নামার সময় ইমরান কী বলেছিলেন আপনাকে?

ইনজামাম : ইমরান ভাই আমাকে বলেছেন, তােমার ন্যাচারাল খেলা খেলাে। যা হয় হবে, তুমি শুরু থেকেই শট খেলার চেষ্টা কোরাে। আমি তা-ই করেছি এবং তাতে সফলও হয়েছি।

শুভ্র : আপনার ক্যারিয়ারে ইমরানের ভূমিকা কতখানি?

ইনজামাম : অনেক। ইমরান ভাই আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়ে গেছেন। বিশ্বকাপের শুরুতে আমি ভালাে খেলতে পারছিলাম না। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার মাত্র শুরু, বিশ্বকাপের মতাে বড় আসরে খেলতে গিয়ে তাই ঘাবড়েও গিয়েছিলাম। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার উইকেট পাকিস্তানের চেয়ে একেবারে আলাদা। সে কারণেও কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু রান না পাওয়ার পরও ইমরান ভাই আমার ওপর আস্থা রেখে সব ম্যাচে খেলিয়েছেন। তিনি সব সময় আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ানাের চেষ্টা করে গেছেন। বলেছেন, আউট হয়ে যাও, অসুবিধে নেই। কিন্তু তােমার ন্যাচারাল খেলা ছেড়ে না।

ইনজামামের ইনজামাম হয়ে ওঠায় ইমরান খানের অনেক অবদান। ছবি: এএফপি

শুভ্র : শুরুর দিকের কথা কিছু বলবেন? আপনার পরিবার, কীভাবে খেলা শুরু ইত্যাদি...

ইনজামাম : আমার বাবা জমিদার। আমরা চার ভাই, এক বােন। আমি সবার ছােট। আমার বড় ভাই ইন্তেজার-উল হক ক্রিকেট খেলতেন। তাকে খেলতে দেখেই আমার খেলার ইচ্ছে হয়। তখন আমি স্কুলে পড়ি। কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল টিমে খেলি। তারপর এক সময় ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট।

শুভ্র : পাকিস্তান দলে ডাক পাওয়ার দিনটি নিশ্চয়ই খুব আনন্দের ছিল।

ইনজামাম : তা তাে অবশ্যই। ১৯৯১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাকিস্তান আসার আগে একটা ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানেই আমাকে প্রথম খেলতে দেখেন ইমরান ভাই । তখনই তিনি আমাকে ডেকে বলে দেন, তুমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলবে।

শুভ্র : খেলা শুরু করার সময় আইডল ছিল কে?

ইনজামাম : ভিভ রিচার্ডস।

শুভ্র : কেন?

ইনজামাম : রিচার্ডস যেভাবে মাঠে নামতেন, যেভাবে ব্যাট করতেন... সব মিলিয়েই খুব ভালাে লাগত তাঁকে।

শুভ্র : যেসব বােলারকে খেলেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে কার বল খেলা?

ইনজামাম : ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্টলি অ্যামব্রোস ও কোর্টনি ওয়ালশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ফানি ডি ভিলিয়ার্স। কঠিন এই অর্থে যে, ওরা খুব ভালাে বােলার। ওদের বিপক্ষে খুব সাবধানে খেলতে হয়।

শুভ্র : লারা আর টেন্ডুলকারের মধ্যে কে সেরা-এ নিয়ে এখন তর্ক ক্রিকেটামােদীদের মধ্যে। ইমরান এ দুজনের সঙ্গে আপনার নামও জুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু লারা তাে এখন অনেক এগিয়ে গেছে।

ইনজামাম : লারা টেস্টে ৩৭৫ রান করেছে। দারুণ এক পারফরম্যান্স। আমার ক্যারিয়ারের এখনাে অনেকটা বাকি। আমিও স্বপ্ন দেখি, একদিন ৩৭৫-এর রেকর্ড ভেঙে দেব। তবে সবার আগে একটা কথা বলতে চাই, লারা অনেক এগিয়ে গেছে। গত দু বছর ও দারুণ খেলেছে, ওর ব্যাটিংও খুবই ইমপ্রুভ করেছে। আমি মনে করি, এখন লারার সঙ্গে আমার কোনাে তুলনাই চলে না।

শুভ্র : টেন্ডুলকার আর লারার মধ্যে আপনার কাকে পছন্দ?

ইনজামাম : টেন্ডুলকারও লারার তুলনায় কিছু নয়। টেন্ডুলকার খুব ভালো ব্যাটসম্যান। তবে নিঃসন্দেহে লারাই এক নম্বর।

টেন্ডুলকার না লারা? তখন ইনজামামের চোখে লারাই ছিলেন সেরা। ছবি: এএফপি

শুভ্র : ৩৭৫-এর রেকর্ড ভাঙাই তাহলে আপনার স্বপ্ন?

ইনজামাম : এটা তাে আছেই। তবে আমার আসল স্বপ্ন টেস্টে অনেক সেঞ্চুরি করা । গাভাস্কারের ৩৪ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে দিতে চাই আমি। তবে আসল লক্ষ্য হলাে, পাকিস্তানের পক্ষে অনেক দিন খেলে যাওয়া এবং ভালাে খেলা।

শুভ্র : স্পিনের চেয়ে আপনি পেস বােলিং বেশি ভালাে খেলেন বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে।

ইনজামাম : আমার নিজের তা মনে হয় না। আমার তাে মনে হয়, পেস-স্পিন। দুটোই আমি একই রকম খেলি। কেউ কেউ বলে আমি ফাস্ট বােলিং বেশি ভালাে খেলি। বলতে পারেন, এটা তাদের ধারণা।

শুভ্র : পাকিস্তানের অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না?

ইনজামাম : না। অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন আমার নেই। আমি শুধু পাকিস্তানের পক্ষে অনেক দিন খেলে যেতে চাই।

শুভ্র : মাঠের বাইরের ইনজামাম-উল হক সম্পর্কে কিছু বলুন। হবি-টবি এসব আর কি!

ইনজামাম : এমনিতে আমি খুব শান্ত। কিছুটা লাজুকই বলতে পারেন। সহজে কারও সঙ্গে মিশতে পারি না। টেবিল টেনিস খেলতে খুব পছন্দ করি, ফুটবল দেখতেও। ফুটবলে ব্রাজিলের কড়া সমর্থক আমি।