ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মোহাম্মদ রফিক বললেন, ‘কী, বলেছিলাম না! টেস্ট ম্যাচ এত সোজা না!’ 

সত্যিই বলেছিলেন! পরশু বিকেলে ২৮ ওভারেই জিম্বাবুয়ের ৪ উইকেট তুলে নেওয়ার পর ‘ফলোঅন’ আর ‘ইনিংস ব্যবধানে জয়’ কথা দুটো যখন সবার মুখে মুখে ফিরছে, সংবাদ সম্মেলনে এসে রফিক বলে গিয়েছিলেন, ম্যাচের এখনো অনেক বাকি। এখনই উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। 

কাল তৃতীয় দিনের খেলা শেষে সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার সময় রফিকের মুখে হাসি। তাঁর কথা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে নয়, ওই হাসিতে লুকিয়ে আছে ৭-৩-৯-২! তাঁর শেষ স্পেল। ক্রমেই ধূসর হতে থাকা বাংলাদেশের স্বপ্নের গায়ে ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনল তো ওই স্পেলটিই। প্রথম তিন স্পেলে উইকেট পাননি রফিক। তারপরও দ্বিতীয় নতুন বলে ৮.৩ ওভার হতেই আবার তাঁরই শরণাপন্ন হলেন হাবিবুল বাশার। রফিকের হাতে বল তুলে দেওয়ার সময় অধিনায়ক কী বলেছিলেন, জানা নেই। তবে অনুমান তো করাই যায়। ‘একটা কিছু করো! ম্যাচ তো হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে’—এমন কিছুই কি?

আসলেই তখন বাংলাদেশের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ম্যাচ। স্বপ্নের মতো প্রথম দুটি দিনের পাশে তৃতীয় দিনটিকে মনে হচ্ছে দুঃস্বপ্ন। জিম্বাবুয়েকে ফলোঅন করানোর স্বপ্ন প্রায় শেষই হয়ে গেছে, এল্টন চিগুম্বুরা আর টাটেন্ডা টাইবুর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে, জিম্বাবুয়ে যেন ফিরে গেছে সেই হিথ স্ট্রিকদের দিনে। তখনই রফিকের ওই স্পেল। চতুর্থ বলেই চিগুম্বুরাকে কট বিহাইন্ড বানিয়ে ভাঙলেন ১১৯ রানের জুটি। দিনের ২ ওভার বাকি থাকতে নিলেন আসল উইকেটটি—৯২ রানে এলবিডব্লু টাইবু!   

২১তম জন্মদিনের আগেই জাতীয় দলের অধিনায়ক এবং টেস্ট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়কের বিশ্বাস, ‘বয়স শুধুই একটা সংখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়’। কথাবার্তায় নিয়মিতই এর প্রমাণ দিচ্ছেন, প্রমাণ হয়ে এলেন কালকের ব্যাটসম্যান টাইবুও। বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের পথে বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই টাইবুকে ফেরাতে না পারলে বাংলাদেশ দলের অনেকেরই বিনিদ্র রাত কাটত। অন্তত আফতাব আহমেদের যে কাটতই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ৭৯ রানে তাপসের বলে পয়েন্টে ক্যাচ দিয়েছিলেন টাইবু, আফতাব তো তা ধরতে পারেনইনি, উল্টো চার বানিয়ে দিয়েছেন সেটিকে। 

বাংলাদেশের স্পিন-টুইন। এনামুল হক জুনিয়র ও মোহাম্মদ রফিক। ছবি: শামসুল হক টেংকু

এর আগে এনামুলের বলে সিলি পয়েন্টে ক্যাচ দিতে দিতেও বেঁচে যাওয়ার সময় টাইবুর রান ৪৭। সেটি যে ক্যাচ হয়নি, তার কারণ হয়তো একটাই। বোলারের নাম এনামুল হক! ক্রিকেটে কখনো কখনো ভাগ্যই যে সব কিছুর নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়, কালকের এনামুলই তার প্রমাণ। তাঁর বোলিংয়েই সবচেয়ে বেশি ভুগেছে জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যানরা; অথচ স্কোরকার্ড বলছে, ২৬ ওভার বোলিং করে এই ইনিংসে এখনো তাঁর কোনো উইকেট নেই! স্কোরকার্ড এখানে এমনই গাধা যে, ডেভ হোয়াটমোর পর্যন্ত সমবেদনা না জানিযে পারলেন না, ‘ও যখন বল করেছে, মনে হয়েছে যেকোনো সময় উইকেট পাবে। সবচেয়ে বেশিবার ব্যাটকে পরাজিত করেছে ওর বলই। ভেরি আনলাকি!’

শুধু এনামুলই নন, অসাধারণ বোলিং করেছেন বাংলাদেশের সব বোলারই। টাইবু আর চিগুম্বুরার ১১৯ রানের জুটি তাঁদের ভালো ব্যাটিংয়ের পুরস্কার, বোলারদের কোনো দায় নেই তাতে। যে উইকেট দ্বিতীয় দিনেই ব্যাটিং-দুরূহ হয়ে উঠবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ডেভ হোয়াটমোর, তৃতীয় দিনে এসে সেটি যেন আরও বেশি বন্ধু হয়ে গেল ব্যাটসম্যানদের। সেই উইকেটেই বোলাররা সারা দিন নিখুঁতভাবে করে গেলেন তাঁদের কাজটা। যে পুল আর হুক টাইবুর ট্রেডমার্ক শট, সেই শট দেখাই গেল না। কেন দেখা গেল না, এই প্রশ্নের জবাবে টাইবু যে বললেন, ‘ওরা (বাংলাদেশের বোলাররা) তো ওরকম বলই দিল না,’ বাংলাদেশের বোলিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট এটাই।

যে উইকেটে পেসারদের খেলা খুবই সহজ বলে জানাচ্ছেন টাইবু, সেই উইকেটেই মাশরাফি বিন মুর্তজার বোলিং স্পেলগুলো দেখুন। ৬-৪-৮-১, ৭-৩-৯-১, ৭-২-১০-০!  সকালে তৃতীয় ওভারেই মাসাকাদজাকে বোল্ড করেছেন। দ্বিতীয় স্পেলে এসে ভেঙেছেন টাইবুর সঙ্গে ব্রেন্ডন টেলরের ৬৬ রানের জুটিটি। জিম্বাবুয়ে তখন ৬ উইকেটে ১৫২। ফলোঅন এড়াতে তখনো প্রয়োজন ১৩৭ রানের। এর ১১৯-ই এনে দিয়েছে টাইবু-চিগুম্বুরার ওই জুটি। 

জিম্বাবুয়েকে ফলো অন করানো যায়নি, তবে বাংলাদেশ তৃতীয় দিন শেষে ১৮০ রানে এগিয়ে। হন্ডো আর পোফুকে নিয়েই এনকালা বিরাট কিছু করে ফেলবেন বলে যতই হুমকি দিন টাইবু, ম্যাচ এখনো বাংলাদেশের হাতেই আছে।

রফিকের ওই দ্বিতীয় স্পেলটির কল্যাণেই।

আরও পড়ুন...
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-১
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-২
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-৩
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-৪
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-৬
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-৭
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়-৮