‘বাংলাওয়াশ’ কথাটা নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে প্রায় সমার্থক। 'প্রায়' শব্দটা তুলে দিলেও হয়। প্রশ্ন হতে পারে বরং একটাই-বাংলাওয়াশ কোনটার কথা বলছেন? ২০১০ না ২০১৩?

বাংলাওয়াশ মানে নিউজিল্যান্ডই। এতটাই যে, ড্যানিয়েল ভেট্টোরিও কথাটা জানেন! ২০১১ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে কী একটা প্রশ্ন করেছি, ভেট্টোরি মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘কী জানতে চাইছেন-বাংলাওয়াশ?’

২০১০ সালের অক্টোবরে ভেট্টোরির মুখে ওই হাসিটা ছিল না। যে দলের বিপক্ষে আগের ১৭টি ম্যাচের মাত্র একটিতে পরাজয়, সেই দলের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর মুখে হাসি থাকে কীভাবে! ড্যানিয়েল ভেট্টোরিই যেখানে সেই নিউজিল্যান্ড দলের অধিনায়ক। তাঁর হতচকিত মুখটা বরং এখনো চোখে ভাসে। সিরিজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসেও সেই অনুভূতি গোপন করার কোনো চেষ্টা করেননি। রেজাল্টটা যে তাঁর কাছে কতটা অভাবনীয়, সবিস্তারেই তা বর্ণনা করেছিলেন। কথাবার্তার চেয়েও 'অপমান'টা বেশি ফুটে উঠেছিল তাঁর রক্তাভ মুখে।

ভেট্টোরি স্বভাবে মৃদুভাষী। তাঁর প্রতিক্রিয়াটা তাই ক্রিকেটীয় ভাষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কোচ মার্ক গ্রেটব্যাচ সে সবের ধার ধারেননি। সিরিজে নিউজিল্যান্ডের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমন একটা উপমা ব্যবহার করেছিলেন, যা লিখতে গিয়ে কি-বোর্ডে আঙুল থমকে গেল। একটু রেখেঢেকেই তাহলে বলার চেষ্টা করি। নিউজিল্যান্ড কেমন খেলেছে বোঝাতে গিয়ে রেখেঢেকেই রাখা উচিত, মানুষের এমন একটা অঙ্গকে টেনে এনেছিলেন গ্রেটব্যাচ। অমন ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়া হয়তো নিজের আসন্ন পরিণতিটা আঁচ করতে পেরেই। বাংলাদেশ থেকে ভারত ঘুরে দেশে ফেরার পরই মার্ক গ্রেটব্যাচ চাকরি হারান।

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের খেলা মানেই এমন সব ছবি। ছবি: আইসিসি টুইটার

২০১০ সালের যে ওয়ানডে সিরিজটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের রোমান্টিক এক গল্প হয়ে আছে, তা কিন্তু হওয়ারই কথা ছিল না। সূচিতে ছিল শুধুই দুই টেস্টের সিরিজ। কয়েক মাস পরই উপমহাদেশে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রস্তুতি নিতে নিউজিল্যান্ড বোর্ড সেটিকে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে রূপান্তরের প্রস্তাব দেয়। সেই পাঁচ ম্যাচের সিরিজেই নিউজিল্যান্ড ৪-০তে হোয়াইটওয়াশ। বাতাসে উড়তে থাকা 'বাংলাওয়াশ' কথাটা পরদিনের পত্রিকায় ব্যানার হেডলাইনে পরিণত হয়ে সেটিকে ক্রিকেটীয় পরিভাষায় স্থান করে দেয়।

পাঁচ ম্যাচের সিরিজের ফল  ৪-০ হলো কীভাবে? হয়েছিল, কারণ দ্বিতীয় ম্যাচটা ভাসিয়ে দিয়ে এটিকে চার ম্যাচের সিরিজ বানিয়ে ফেলেছিল বৃষ্টি।           

ড্যানিয়েল ভেট্টোরি ‘বাংলাওয়াশ’ কথাটা জানেন। জানেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও মাইক হেসনও। তিন বছর পর আরেকটি বাংলাদেশ ট্যুরে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশের পক্ষে ৩-০। আবার পত্রপত্রিকায় ‘বাংলাওয়াশ’ শিরোনাম। সেবার ভেট্টোরি ছিলেন না। ম্যাককালাম নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক, কোচ মাইক হেসন।

দুই বছর আগে বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড সফরের সময় ডানেডিনে সিরিজের শেষ ওয়ানডের সময় মাইক হেসনের সঙ্গে দেখা। কথাবার্তায় পরিষ্কার বোঝা গেল, সেই জ্বালা তিনি তখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। প্র্যাকটিস সুবিধা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করলেন। ব্যাপারটা যে ইচ্ছাকৃত, তা বোঝাতে সুনির্দিষ্ট উদাহরণও দিলেন। কণ্ঠে একরাশ তিক্ততা ঢেলে দিয়ে জানালেন, মাঠের এক পাশে বাংলাদেশ দল ভালো উইকেটে প্র্যাকটিস করেছে, আর নিউজিল্যান্ডকে দেওয়া হয়েছে আন্ডার প্রিপেয়ার্ড উইকেট। এটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু খর্বাকৃতির মানুষটা যখন বুকের কাছে হাত রেখে অভিযোগ করলেন, নিউজিল্যান্ডের প্র্যাকটিসে বিসিবির দেওয়া নেট বোলাররা ছিল সব ওই উচ্চতার, আমার একটু হাসিই পেয়ে গিয়েছিল। অভিযোগটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বিসিবিকে নিশ্চয়ই অনেক ঝামেলা করতে হয়েছে। ওই উচ্চতার বোলার জোগাড় করা তো সহজ কথা নয়।

'বাংলাওয়াশ' নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সমার্থক হয়ে যেতে পারে, তবে কথাটা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল ২০১০ সালের ওই সিরিজেরও সোয়া বছর আগে। আবিষ্কার বলব না প্রবর্তন-ঠিক বুঝতে পারছি না, যেটাই বলুন না কেন, কৃতিত্বটা পাওনা আতহার আলী খানের। ২০০৯ সালে ভাঙাচোরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট ও ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করার পর কমেন্ট্রিতে আতহারই প্রথম 'ইটস আ বাংলাওয়াশ' বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন।

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা হলে সবই সম্ভব। এই সিরিজেই অভিষিক্ত দুই ব্যাটসম্যানের একই ম্যাচে সেঞ্চুরিও। ছবি: আইসিসি টুইটার

যে কারণে বাংলাওয়াশের ইতিহাস নিয়ে এমন টানাটানি, এবার সেই কারণটা বলি। নিউজিল্যান্ড নামটা শুনলে আগে প্রথমেই বাংলাওয়াশ মনে হতো, মনে হতো ২০০৮ সালে আইসিএল-ঝড়ে এলোমেলো বাংলাদেশের সেই অভাবিত জয়, কার্ডিফে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ওই ম্যাচ, কিন্তু এখন আর তা মনে হয় না। এখন নিউজিল্যান্ড মানে বাংলাদেশের পরাজয়ের মিছিল....একের পর এক হোয়াইটওয়াশ...সর্বশেষ বাংলাওয়াশের পরই যা তিনবার হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ছয়বার। আর কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ এতবার হোয়াইটওয়াশ হয়নি। 'বাংলাওয়াশ'-এর বদলে এখন কি তাহলে 'কিউইওয়াশ' বলা উচিত না?

উচিত বলেই তো মনে হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ দল মৃদু আপত্তি তুললেও তুলতে পারে। বলতে পারে, হলে তো কিউইওয়াশ-ই হবে, বাংলাওয়াশ কথাটাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ আমরা পাচ্ছি কই?

কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। ২০১০ সাল থেকে তো একটা নিয়মই অনুসরণ করে চলছে এই দ্বৈরথ। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে বাংলাদেশ হারবে, আর বাংলাদেশে এসে নিউজিল্যান্ড। সমস্যা হলো, ২০১৩ সালের পর সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আর আসেইনি নিউজিল্যান্ড দল। যদিও এর পর তৃতীয়বারের মতো নিউজিল্যান্ডে চলে গেছে বাংলাদেশ। আর নিউজিল্যান্ড যাওয়ার পর কী হয়, তা বোঝাতে ওয়াজেদ আলীর আশ্রয় নেওয়া হয়, 'সেই ট্রাডিসান সমানে চলিছে, তার পরিবর্তন হয় নি।'

২০০১ সাল থেকে যে 'ট্রাডিসান'-এর শুরু। সেবার অবশ্য শুধু দুই টেস্টের সিরিজই ছিল। পরের সিরিজগুলোর চরিত্র বদলেছে। টেস্টের সঙ্গে ওয়ানডেও যোগ হয়েছে, কখনো টি-টোয়েন্টিও। শুধু একটা জিনিসই বদলায়নি। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলা মানেই বাংলাদেশের পরাজয়। ওয়ানডেতে ১৬ ম্যাচে ১৬ পরাজয় সুসম্পন্ন হলো আজ। এর সঙ্গে টেস্ট আর টি-টোয়েন্টি যোগ করলে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের টানা পরাজয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯।

কোনো নির্দিষ্ট একটা দেশে গিয়ে টানা পরাজয়ের বিশ্ব রেকর্ডটা আগেও বাংলাদেশের ছিল। এখন যেটা হচ্ছে, তাতে তো মনে হচ্ছেরেকর্ডটাকে বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটা মিশনে নেমেছে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডে টানা পরাজয় বললে অবশ্য একটু ভুল হয়। বলতে হবে, নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা পরাজয়। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে জয়ের স্বাদ একবার হলেও তো পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে তা স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে, ২০১৫ বিশ্বকাপে। নেলসনের সেই ম্যাচেও কিন্তু স্কটল্যান্ড ৩১৮ রান করে ফেলার পর মনে হয়েছিল, প্রতিপক্ষ কে, তাতে কিছু আসে যায় না; বাংলাদেশের জন্য নিউজিল্যান্ডের মাটি দুর্জয় ঘাঁটি হয়েই থাকবে। সেই স্কটিশ পাহাড়ও টপকে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল যাঁর, সেই তামিম ইকবাল অধিনায়ক হয়েও 'ট্রাডিসান'টা বদলাতে পারলেন না।

বাংলাদেশ যে নিউজিল্যান্ডে পারেই না, এটিকে তো মনে হচ্ছে খেলার অমীমাংসিত রহস্যের তালিকায় আরেকটি সংযোজন। ইভান লেন্ডল যেমন একটা লম্বা সময় বিশ্ব টেনিসে রাজত্ব করেও কখনো উইম্বলডন জিততে পারেননি। ২০১৬ রিও অলিম্পিকের আগ পর্যন্ত ব্রাজিলের অলিম্পিক ফুটবলের সোনা জিততে না পারাও যেমন একটা রহস্য হয়ে ছিল। খুঁজলে এমন উদাহরণ নিশ্চয়ই আরও পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় ম্যাচটাকে ব্যতিক্রম ধরলে এই ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ যা খেলল, তাতে নিউজিল্যান্ডে জিততে না পারাটাকে রহস্য-টহস্য বলে উদাহরণ হিসাবে অন্য খেলাও টেনে আনাটাকে একটু হাস্যকর মনে হতেই পারে। দ্বিতীয় ম্যাচকে যে ব্যতিক্রম বলছি, তা-ই বা কেন? ক্যাচ ধরাও কি ক্রিকেটীয় দক্ষতার একটা অংশ নয়? ক্যাচ ফেলে দিয়ে হারার পর আফসোস হতে পারে, কিন্তু সেটিকে দুর্ভাগ্য বলার কোনো সুযোগ তো নেই।

টসে হারটা ভাগ্য আর নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের পরাজয়টা যেন ভবিতব্য। ছবি: আইসিসি টুইটার
তার পরও 'রহস্য' কথাটার পুনরাবৃত্তি করতে চাই। কেন করতে চাই, বলছি। কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর কথা তো আগেই বলেছি। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে ডাবলিনে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টেও তো নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। একই দেশের দুই ভেন্যুর চরিত্রই যেখানে অনেক সময় মেলে না, ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভেন্যুর মধ্যে সাযুজ্য খোঁজাটা হয়তো হয়তো ঠিক নয়। তবে এটা তো বলাই যায়, নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশকে যে কন্ডিশনে খেলতে হয়, তার সঙ্গে কার্ডিফ বা ডাবলিনের যথেষ্টই মিল আছে। তাহলে কার্ডিফ বা ডাবলিনে পারলে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে কেন পারে না?

এটা এমন এক প্রশ্ন, না-পারা পর্যন্ত যা ক্রমশই আরও বড় হয়ে উঠতে থাকবে। বাংলাদেশের জন্য কাজটা কঠিন থেকে কঠিনতরও। ম্যাচ যখন দোদুল্যমান থাকবে, নিউজিল্যান্ডের মনে হবে, আরে, আমরা তো আমাদের দেশে বাংলাদেশের কাছে হারি না। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনে 'কু' ডাকবে-আমরা তো শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড পারি না, এবারও মনে হয় পারব না।

যেমন হয়েছিল শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে হারতে হারতে বাংলাদেশ নিজেদেরই যে রেকর্ডটা ভেঙে ফেলেছে, তা তো ছিল এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই। ২০১৩ সালে মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরি আর আশরাফুলের প্রায় ডাবল সেঞ্চুরিতে গল টেস্ট ড্র করার কদিন পরই বাংলাদেশ যে একটা ওয়ানডেও জিতে ফেলল-এই দুটোর মধ্যে যোগসূত্র আছে বলেই মনে হয়। ২০১৭ সালে কলম্বোতে নিজেদের শততম টেস্টটিকে বাংলাদেশ যে জয়ে রাঙাল, হয়তো সেটির সঙ্গেও।

ডানেডিন আর ওয়েলিংটনে সিরিজের প্রথম ও তৃতীয় ম্যাচ দুটি এমন চোখ রাঙাচ্ছে যে, কথাটা বলতে একটু বাধো-বাধোই ঠেকছে। তবে তা অবশ্যই সময়টার কারণে, নইলে বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড-গেরো একদিন না একদিন যে কাটবে, এ নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহই নেই।

তা যেদিন কাটবে, সেদিন দেখা যাবে। আপাতত কথা একটাই।

বাংলাওয়াশ এখন কিউইওয়াশ!