ত্রিনিদাদের কুইন্স পার্ক ওভাল ভারতীয় ক্রিকেট লেখকদের কলমে প্রচুর রোমান্টিসিজম উত্পন্ন করেছে। এ মাঠেই চতুর্থ ইনিংসে ৪০৬ রান করে টেস্ট জিতেছিল ভারত। যে রেকর্ড টিকে ছিল দু দশকেরও বেশি। এ মাঠেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ভারতের প্রথম টেস্ট জয়। এ মাঠেই সুনীল গাভাস্কারের অভিষেক, পরে যা তাঁর প্রিয় মাঠও হয়ে যায়। কোনো মাঠে ৫ টেস্টের ৯ ইনিংসে ৪ সেঞ্চুরিসহ ৯৯.১২ গড়ে ৭৯৩ রান করলে সেটি প্রিয় না হয়ে উপায় থাকে!

গত শুক্রবারের পর থেকে সেই কুইন্স পার্ক ওভাল ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিষাদকাব্যেরও নাম। ভারতের বিশ্বকাপ-সূর্য যে অস্তমিত হলো এখানেই। ভারত হারলেই শুধু সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সুপার এইটে ওঠার, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের একেকটি উইকেটকে তাই মনে হচ্ছিল স্বর্গযাত্রার পথে আরেকটি ধাপ। এর মধ্যেই টেলিভিশনের পর্দায় ক্লোজআপে ধরা হলো ওই মুখটা। হতাশা-অবিশ্বাস-যন্ত্রণা যাতে মিলেমিশে একাকার। মাঠে তখন ভারতের তরী ডুবছে। আর শচীন টেন্ডুলকার, একালের ব্র্যাডম্যান, শূন্য রানে আউট হয়ে বসে আছেন ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতে।

ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত শূন্য এটি নয়। আর কোনো শূন্যই তা হতে পারবে না। ৯৯.৯৪ অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং গড়ের মতো সবচেয়ে বিখ্যাত শূন্যের ‘রেকর্ড’টিও চিরকাল স্যার ডন ব্র্যাডম্যানেরই থাকবে। মাত্র ৪ রান করলেই ব্যাটিং গড় হতো পুরোপুরি ১০০, আর শেষ টেস্ট ইনিংসে ব্র্যাডম্যান শূন্য রানে আউট—আর কোনো শূন্যর সাধ্য কি এটিকে পেছনে ঠেলে দেয়?

ডন ব্র্যাডম্যান যদি সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হন, ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং মিলিয়ে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের নাম গ্যারি সোবার্স। সেই সোবার্সের ক্যারিয়ারেও তাত্পর্যপূর্ণ এক শূন্য আছে। ওয়ানডে খেলেছেন একটিই। ১৯৭৩ সালে লিডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে সোবার্স শূন্য রানে আউট হয়ে যান। ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টেও একটা শূন্য আছে সোবার্সের। তবে ব্র্যাডম্যানের মতো সেটি শেষ ইনিংসে নয়। প্রথম ইনিংসে শূন্য, দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন ২০।

শেষ টেস্ট ইনিংসে ব্র্যাডম্যানের শূন্য, একমাত্র (প্রথম ও শেষ) ওয়ানডেতে গ্যারি সোবার্সের—এর সঙ্গে শচীন টেন্ডুলকারের এই শূন্যটিকেও রাখুন। ২০১১ বিশ্বকাপেও তাঁকে দেখতে পাওয়াটা অলৌকিক কিছু বলেই মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। তা-ই যদি হয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সফলতম ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারেরও বিশ্বকাপ শেষ হলো একটি শূন্য দিয়ে। শেষের শূন্যে তিনজনেরই মিল।

চমকে দেওয়ার মতো আরেকটি মিলও আছে। বিশ্বকাপে টেন্ডুলকারের  দুটি শূন্য। প্রথমটি ১৯৯৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওভালে। ব্র্যাডম্যানের শেষ টেস্ট ইনিংসে শূন্যও এ মাঠেই। গত শুক্রবার যে কুইন্স পার্ক ওভালে দ্বিতীয় শূন্য, সে মাঠেই সোবার্সের শেষ টেস্ট। প্রথম ইনিংসে শূন্য।

৩৬ ম্যাচে ৪টি সেঞ্চুরি ও ১৩টি হাফ সেঞ্চুরিসহ ১৭৯৬ রান। ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় যেখানে ৪৪.০৫, বিশ্বকাপে ৫৭.৯৩। কিন্তু এই রেকর্ড নিয়ে শচীন টেন্ডুলকার কী করবেন? বিশ্বকাপ তাঁর কাছে অনন্ত এক আক্ষেপের গল্প হয়েই থাকবে। এত কিছু করেও যে একবার ওই ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে পারেননি। আধুনিক ক্রিকেটের গ্রেটদের মধ্যে শুধু টেন্ডুলকার আর লারাকেই পোড়াচ্ছে এই অতৃপ্তি। লারার এখনো সুযোগ আছে। টেন্ডুলকারের নেই। ব্যাটে স্ট্রোকের ফুলঝুরি নয়, ক্লোজআপে ধরা ওই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটিই হয়তো ‘বিশ্বকাপের টেন্ডুলকার’-এর প্রতীকী চিত্র হয়ে গেল।

প্রতীকী চিত্র হয়ে আছে এই ত্রিনিদাদেও। গত শুক্রবার মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পর যে শচীন টেন্ডুলকারকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। হিলটনে তাঁর হোটেল রুমেই বন্দী হয়ে আছেন, ব্রেকফাস্ট করতে পর্যন্ত নিচে নামেননি। পুরো ভারতীয় দলই অবিশ্বাসে স্তব্ধ। গত শনিবারই ত্রিনিদাদ থেকে অ্যান্টিগা যাওয়ার কথা ছিল। সুপার এইটের খেলা সেখানেই। বাংলাদেশ সুপার এইটে উঠে গেলে সেখানে যাওয়ার আর কোনো যুক্তি নেই বলে ত্রিনিদাদেই থেকে গেছে দল। বাংলাদেশ-বারমুডা ম্যাচের অপেক্ষা।

ভারতীয় দলের চেয়েও বড় সমস্যায় পড়েছে ভারতের সাংবাদিকরা। সংবাদপত্রগুলোর কেউ কেউ থাকলেও প্রায় সব কটি টিভি চ্যানেলই দেশে ফিরতে বলে দিয়েছে তাঁদের সাংবাদিকদের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে বড় খবর তো এখন ভারতেই হবে। কোচ বরখাস্ত হবে, অধিনায়ক বদল হবে। কিন্তু ভারতের সুপার এইট নিশ্চিত ভেবে অ্যান্টিগা ও বারবাডোজে সবাই যে অগ্রিম পাওনা মিটিয়ে রুম-টুম বুক করে ফেলেছিলেন, তার কী হবে? ভারতীয় দলের চেয়ে ভারতীয় সাংবাদিকদের বেশি হতাশাক্রান্ত দেখাচ্ছে।

ভারতীয় ক্রিকেটে অবশ্যম্ভাবী যে ওলটপালট, বাংলাদেশের তাতে বাড়তি আগ্রহ আছে। মে মাসের শুরুতেই বাংলাদেশ সফরে আসছে ভারতীয় দল। এই বিশ্বকাপ বিপর্যয়ের পর প্রথম সিরিজ। সেই সিরিজে হাবিবুল বাশারের সঙ্গে কে টস করতে নামবেন, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।