কাল সকাল সাড়ে নয়টায় ত্রিনিদাদ থেকে অ্যান্টিগা উড়ে গেল বাংলাদেশ দল। এর আগে জয় করে গেল ত্রিনিদাদ। বাংলাদেশ সুপার এইটে উঠে যাওয়ার পর ভোররাতেও ঢাকায় আনন্দমিছিলের খবর পেলাম। ট্রিনিদের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে তাঁরাও পারলে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে পড়েন!

ত্রিনিদাদের মানুষ নিজেদের বলে ‘ট্রিনি’। টোবাগো ছোট্ট যে আরেকটি দ্বীপ এই দেশের অংশ, সেটির অধিবাসীদেরও তাঁরা ট্রিনি বলে মানতে রাজি নন। তাঁদের পরিচয় ভিন্ন। ত্রিনিদাদে আসার পর থেকে যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে, এখানে দেশাত্মবোধের নাম হওয়া উচিত দ্বীপাত্মবোধ। তা এতটাই তীব্র যে, গত দেড় দশকে ব্রায়ান লারার পর ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সেরা ক্রীড়া-রপ্তানি ডুইট ইয়র্কের কথা উঠলে ট্রিনিরা সঙ্গে সঙ্গেই আপনাকে জানিয়ে দেবে, ও তো ত্রিনিদাদের নয়। ও টোবাগোর। 

সেই ট্রিনিদের মধ্যেই পৃথিবীর পুরো উল্টো পিঠের অজানা-অচেনা এক দেশকে নিয়ে আবেগের যে জোয়ার দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে টোবাগোর চেয়েও বাংলাদেশ তাদের কাছে বেশি আপন! ডুইট ইয়র্কের চেয়ে তামিম ইকবাল-সাকিব আল হাসানরা বড় তারকা।

গ্রুপ-পর্বেই বিশ্বকাপে ত্রিনিদাদ-পর্বের সমাপ্তি হয়েছে। গত পরশু বাংলাদেশ-বারমুডা ম্যাচের লাঞ্চ-বিরতিতেই স্বেচ্ছাসেবকেরা দল বেঁধে মাঠ প্রদক্ষিণ করতে করতে বিশ্বকাপকে বিদায়ও জানিয়ে ফেলেছে। ত্রিনিদাদে আর খেলা নেই, কিন্তু বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বপ্ন তো এক ট্রিনির ব্যাটেই বাঁধা। মাটির নিচে তেলের কল্যাণে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে ধনী এই দেশে ব্রায়ান লারা শুধুই একজন ক্রিকেটার নন। দারুণ ধর্মভীরু ট্রিনিদের কাছে বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানের জায়গাটা ঈশ্বরের ঠিক নিচেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার ডেভিড স্টুয়ার্টের যেমন কোনো সন্দেহই নেই, লারা নির্বাচনে দাঁড়ালে দুঁদে রাজনীতিকেরও জামানত বাজেয়াপ্ত হতে বাধ্য। সেই স্টুয়ার্টই আবার বলছেন, ‘এই বিশ্বকাপে এখন আমার দুটি দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরই বাংলাদেশ।’ ব্রায়ান লারার পর কার খেলা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন? তামিম ইকবাল!

হাবিবুল বাশারের কাছে এক সাংবাদিক জানতে চাইলেন, বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানকে তিনি মিস করবেন কি না। হাবিবুল বাশার হেসে বললেন, ‘যেখানে বাংলাদেশ আছে, অন্য কোনো দলকে আমি মিস করতে যাব কোন দুঃখে?’

অ্যান্টিগায় আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্ব। যাতে ভারত-পাকিস্তান নেই, বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড আছে। বারমুডাকে হারিয়ে বিশ্বকাপে ভারতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে হাবিবুল বাশারের কাছে এক সাংবাদিক জানতে চাইলেন বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানকে তিনি মিস করবেন কি না। হাবিবুল বাশার হেসে বললেন, ‘যেখানে বাংলাদেশ আছে, অন্য কোনো দলকে আমি মিস করতে যাব কোন দুঃখে?’

মাঠের বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপের বিস্ময় হয়ে এসেছে। মাঠের বাইরের বাংলাদেশও চমকে দিয়েছে বিদেশি সাংবাদিকদের। সংবাদ সম্মেলনেও মাঠের পারফরম্যান্সের প্রতিফলন। হাবিবুল বাশার প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কথার পাল্টা জবাব দিয়েছেন, রসিকতা করে হাসিয়েছেন সাংবাদিকদের। আর ডেভ হোয়াটমোর তো ডেভ হোয়াটমোরই। মাঠে বাংলাদেশ গো-হারা হারার সময়ও সংবাদ সম্মেলন থেকে স্টার মার্ক পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন, আর এই সাফল্যের আলোয় তো তিনি ঝলমল করবেনই। বাংলাদেশ সুপার এইটে ওঠায় বিস্মিত কি না—এই প্রশ্নে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিকের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আমরা ভালো করলেই সবাই খুব বিস্মিত হয়। তবে আমরা হই না। আমরা জানতাম, আমাদের সুপার এইটে ওঠার সামর্থ্য আছে। ভুলে যাবেন না, এই বিশ্বকাপের আগেই আমরা নিউজিল্যান্ডকেও হারিয়েছি।’

পরের প্রশ্ন, ভারত যে আপনাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল, সেটি কি কোনো বাড়তি চাপ ছিল? এবার হোয়াটমোর বিস্মিত হলেন অথবা বিস্মিত হওয়ার ভান করলেন, ‘আমরা জানতাম, আমাদের এই ম্যাচ জিতবে হবে। অন্য কোন দল কী করছে বা কী আশা করছে, এ নিয়ে আমাদের ভাবার সময় ছিল না।’

৩৭ রানে বাংলাদেশের ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ায় দু'দিন ধরে পোর্ট অব স্পেনের হিলটন হোটেলে জীবন্মৃত হয়ে পড়ে থাকা ভারতীয় দলে একটু প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে এনেছিল। এই ম্যাচের আগের দিন যে যেভাবে পারেন, বারমুডার খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বারমুডার শৌখিন ক্রিকেটাররা তো বিশ্ব ক্রিকেটের এমন মহা তারকাদের পিঠ চাপড়ানি পেয়ে রীতিমতো রোমাঞ্চিত। ক্রিকেট তাঁদের জীবন-মরণ দূরের কথা, জীবিকাও নয়। চাপ-টাপ বলে কিছুও তাই তাদের অভিধানে নেই। সবাই তাই সোৎসাহে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে ফাটিয়ে দেবেন। বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে ৩৭ দেখে ভারতীয় দল কিছুক্ষণের জন্য হলেও আশার আলো দেখেছিল, বারমুডিয়ানরা বোধ হয় সত্যিই ফাটিয়ে দিচ্ছে। 

৩ উইকেটে ৩৭ হয়ে যাওয়ার পরই নেমেছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। বেশ কিছুদিন ধরে ৬ নম্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। মুশফকর রহিম মাঝেমধ্যেই প্রমোশন পাওয়ায় কখনো কখনো ব্যাট করতে হয়েছে ৭ নম্বরেও। ভারতের বিপক্ষেও ৭ নম্বরে নামার পর যুবরাজ সিং টিপ্পনি কেটেছেন, তোমাকে কি শুধু ফিল্ডিং করার জন্য দলে নেওয়া হয়েছে না কি!

অপরাজিত ২৯ রানের ইনিংসেই আশরাফুল ম্যান অব দ্য ম্যাচ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে রানসংখ্যায় এত ছোট কিন্তু প্রভাবে এমন বিশাল ইনিংস খেলে আর কেউ ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন কি না সন্দেহ।

ব্যাট করতে নামার সময় আশরাফুলের মাথায় শুধু বাংলাদেশকে সুপার এইটে তোলার দলীয় লক্ষ্যের বাইরে ব্যক্তিগত একটি লক্ষ্যও তাই ছিল। তিনি যে ৬/৭ নম্বরে খেলার মতো ব্যাটসম্যান নন, তা প্রমাণ করা। এমনিতে অপরাজিত ২৯ রানের একটি ইনিংস এত উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নয়। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় এই ২৯-এর মূল্য যে কয়েক গুণ বেশি। এ কারণেই অপরাজিত ২৯ রানের ইনিংসেই আশরাফুল ম্যান অব দ্য ম্যাচ। ওয়ানডেতে এর আগেও তিন বার ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফি উঠেছে তাঁর হাতে। তবে তার কোনোটিই হাফ সেঞ্চুরি না করে নয়। বিশ্বকাপ ইতিহাসেই রানসংখ্যায় এত ছোট কিন্তু প্রভাবে এমন বিশাল ইনিংস খেলে আর কেউ ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন কি না সন্দেহ।

বড় কোনো সাফল্যের পরও বাংলাদেশ দল এখন আর আগের মতো মাঠে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয় না। সেটিও একটি বার্তা—দেখো, তোমরা অপ্রত্যাশিত মনে করতে পারো, কিন্তু আমাদের কাছে এই জয় প্রত্যাশিতই ছিল। এ দিনও, বারমুডার চেয়ে বৃষ্টির আরও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে থাকার দিনেও, বিশ্বকাপের সুপার এইটে উঠে যাওয়ার মহা লগনেও, জয়ের পর দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান আশরাফুল আর সাকিব আল হাসানের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত কোনো উল্লাস নেই। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ধীরে ধীরে মাঠ ছাড়লেন। ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতেই একটু তাৎক্ষণিক উদযাপনের পর বাংলাদেশের বাকি দল মাঠে নেমে হাত মেলাল বারমুডিয়ানদের সঙ্গে। 

ত্রিনিদাদে তখন সন্ধ্যার আলোআঁধারি, আর বাংলাদেশে ভোর হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসের ভোর।