২৫ মার্চকে ২৫ মার্চ করে রাখার কম চেষ্টা করেনি বৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত কী ভেবে যেন ক্ষান্ত দিল। হয়তো ৩৬ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো বেদনায় প্রলেপ বোলাতেই।

বাংলাদেশের কাছে ২৫ মার্চের একটাই নামকালরাত্রি! এটি স্বজন হারানোর রাত, দুঃস্বপ্নের রাত। একটি জাতিকে তার ইতিহাসের কঠিনতম মুহূর্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার রাত।

এত দিন শুধু তা-ই ছিল। ৩৬ বছর পর ২৫ মার্চের আরেকটি রাত এল বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিশ্বকাপের সুপার এইট নিশ্চিত হবে এই রাতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে রচিত হবে নতুন ইতিহাসএমন রাত আর কটি এসেছে বাঙালির জীবনে। কিন্তু ২৫ মার্চ যে তখন আর ২৫ মার্চ থাকে না, মাখামাখি হয়ে যায় আনন্দ-বেদনায়!

প্রকৃতি তা হতে দেবে না বলেই মনে হচ্ছিল একটা সময়। একটু পরপরই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, খেলা শুরু হয়ে একটু পরই থেমে যাওয়াম্যাচটির পরের দিনে গড়ানো নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। ২৫ মার্চ ২৫ মার্চের জায়গায় থাকুক, বাংলাদেশে উৎসবের দিনটি আসুক ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসেএটা প্রায় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পর কেন যেন মত বদলাল প্রকৃতি। আর তাতেই পুরো বিপরীত হয়ে গেল ৩৬ বছর আগে-পরের দুটি ২৫ মার্চের রাত।

ম্যাচটা যত না বারমুডার সঙ্গে, তার চেয়ে বেশি ছিল বৃষ্টির সঙ্গে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের এমন উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা তাই ওই ম্যাচের নিয়মিত ছবি।  ছবি: গেটি ইমেজেস

একটি বেদনার-দুঃখের, আরেকটি আনন্দের-গৌরবের। এক ২৫ মার্চ একটি জাতির ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া, আরেকটি শুধুই একটি খেলোয়াড়ি সাফল্য। দুটির কোনো তুলনাই চলে না। ২৫ মার্চ বললে এখনো সেই ভয়াল রাতের কথাই মনে হবে আগে। তবে একটু পরে হলেও তো মনে হবেআরেকটি ২৫ মার্চও আছে, যেদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপের সুপার এইটে উঠেছিল।

কালকের ম্যাচে বাংলাদেশের আসল প্রতিপক্ষ বারমুডা ছিল না। আসল প্রতিপক্ষ ছিল চাপ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বৃষ্টি। কুইন্স পার্ক ওভালে দিনের শেষ দু ঘণ্টার আগ পর্যন্ত যা হচ্ছিল, তা ক্রিকেট নয়, বৃষ্টির সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। আগের রাতে বৃষ্টি, সকালে টস হওয়ার পর থেকে বৃষ্টি। ৫০ ওভারের ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই ৪১ ওভারের হয়ে গেল। ৩৫, ৩০...একটু পরপরই কমাতে কমাতে সেটিকে ২১ ওভারের ম্যাচ বানিয়ে ফেলল বৃষ্টি।

এই ম্যাচ জিতলেই বাংলাদেশ সুপার এইটে। বৃষ্টিতে ভেসে গেলেও সমস্যা নেই। ১ পয়েন্ট পেলেও বাংলাদেশের সুপার এইটে ওঠা আটকাবে না। কিন্তু খেলা যতই সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর হচ্ছিল, বাংলাদেশের ওপর চাপটাও বাড়ছিল সমানুপাতিক হারে। এই কিছু দিন আগেও বড় দলের বিপক্ষে খেলার সময় বাংলাদেশও এমন ম্যাচেরই প্রত্যাশা করে এসেছে। ম্যাচের দৈর্ঘ্য যত কম, তুলনায় শক্তিশালী দলের বিপক্ষে দুর্বল দলের আপসেট ঘটানোর সম্ভাবনাও ততই বেশি। এই দুশ্চিন্তার মধ্যে শুধু একটা ব্যাপারই স্বস্তি দিচ্ছিল বাংলাদেশকে। সকালে টসটা জেতা।

একটু পরপরই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, সারা দিনে একবারও সর্যের দেখা নেইএই উইকেটে প্রমে ব্যাট করা মানেই সর্বনাশের আহ্বান। বারমুডাকে সেই আহ্বানই জানাল বাংলাদেশ। বৃষ্টির কারণে চতুর্থবার খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় বারমুডার স্কোর ১৫.১ ওভারে ৪ উইকেটে ৪৫। তখনো এটি ৩০ ওভারের ম্যাচ। আবার শুরু হতে হতে হয়ে গেল ২১ ওভারের। বাকি ৫.৫ ওভারে বারমুডার ব্যাটসম্যানরা দুমদাম ব্যাট চালিয়ে তুলে ফেলল ৪৯ রান। মাশরাফি ও রাসেলের কোটা আগেই শেষ, সিমিং কন্ডিশন কাজে লাগাতে আফতাবকে একটি ওভার দিয়েছিলেন হাবিবুল। কেন দিয়েছিলেন, তা ভেবে মাথার চুল ছিঁড়তে হলো তাঁকে। আফতাবের সেই ওভারে দুটি চার ও ১টি ছয়, সব মিলিয়ে ১৭ রান!

বাংলাদেশের তিন বাঁহাতি স্পিনার ভালোমতোই বুঝিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো কন্ডিশনেই ভালো করার সামর্থ্য তাঁদের আছে। সবচেয়ে বেশি বুঝিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক, ৪ ওভারে ২০ রান দিয়ে তাঁর ৩ উইকেট।

২১ ওভারের ম্যাচ মানে তো টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটই। বারমুডার ইনিংসের শেষ দিকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটই হলো। চার-ছয়-উইকেট-দুর্দান্ত ক্যাচ-ক্যাচ ড্রপ–নাটকীয়তায় ঠাসা ওই শেষ ৫ ওভার। আশরাফুল ও রাসেল ক্যাচ ফেলেছেন। হাবিবুল নিয়েছেন দারুণ একটা ক্যাচ। চেষ্টা থাকলে ব্যাটিং-বোলিংয়ের চেয়ে ফিল্ডিংয়ে যে অনেক তাড়াতাড়ি নিজেকে বদলে দেওয়া যায়, গত কিছু দিনের হাবিবুল বাশারই এর প্রমাণ।

অপেক্ষা...যে অপেক্ষার শেষটা হয়েছিল মধুর। কুইন্স পার্ক ওভালের ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতে অধিনায়ক হাবিবুল বাশার, মাশরাফি বিন মুর্তজা ও সৈয়দ রাসেল। পেছনে দেখা যাচ্ছে তাপস বৈশ্যকেও। ছবি: গেটি ইমেজেস

বারমুডা করেছিল ৯৪, স্বাভাবিক নিয়মে বাংলাদেশের টার্গেট তাই ৯৫ হওয়ার কথা। কিন্তু এটি তো স্বাভাবিক ম্যাচ নয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতির প্রয়োগ বাংলাদেশের টার্গেট করে দিল ৯৬। পরে ব্যাট করা দলের টার্গেট নির্ধারণে প্রথমে ব্যাট করা দল কত উইকেট হারিয়েছেএর একটা বড় ভূমিকা থাকে। শেষদিকে মুড়িমুড়কির মতো উইকেট পড়ে বারমুডা ৯ উইকেট হারিয়ে না ফেললে বাংলাদেশের টার্গেটটা আরও বড় হতো।

এই ৯৬-কেই তো একসময় অনেক বড় বলে মনে হচ্ছিল। দ্বিতীয় ওভারেই তামিম ইকবাল নেই। অষ্টম ওভারের মধ্যে আফতাব আহমেদ ও শাহরিয়ার নাফীসও তাঁর অনুগামী হওয়ার পর বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ৩৭। প্রেসবক্সে জনাকয়েক ভারতীয় সাংবাদিকের অনেকের মুখে তখন গত দুদিনের মধ্যে প্রথম হাসি দেখা যাচ্ছে। কন্ডিশন-চাপ মিলিয়ে বারমুডার এক মিডিয়াম পেসার, মুকাদ্দেম না কি যেন নাম, তাঁকেই মনে হচ্ছে গ্লেন ম্যাকগ্রা।

আগের দুই ম্যাচে ৭ নম্বরে ব্যাট করেছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। টিম ম্যানেজমেন্টের বোধোদয় হওয়ায় কাল ৫ নম্বরে নামানো হলো তাঁকে। তিনিই হাল ধরলেন বাংলাদেশের ইনিংসের। সঙ্গী সাকিব আল হাসান। একটু-আধটু উদ্বেগের মুহূর্ত এই দুজনকেও ছুঁয়েছে। তবে পাগুলে ম্যাচে এমন হয়ই। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটের সহজ জয় বাংলাদেশের। সেটিও সাড়ে তিন ওভার হাতে রেখেই। লেভেরকের বলে সাকিবের মারা বাউন্ডারিতে ম্যাচ যখন শেষ হলো, ত্রিনিদাদের বাতাসে পতপত করে উড়ল লাল-সবুজ।

এই বিশ্বকাপে আরও অনেক দিন তা উড়তেই থাকবে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বারমুডা: ২১ ওভারে ৯৪/৯ (পিচার ২২, বোরডেন ২, রোমেইন ১১, মাইনর্স ২৩, কান ১৬, টাকার ৯, মুকদ্দেম ০*; মাশরাফি ২/৮, রাসেল ১/১৪, রাজ্জাক ৩/২০, রফিক ১/১৮, সাকিব ২/১২, আফতাব ০/১৭)

বাংলাদেশ: ১৭.৩ ওভারে ৯৬/৩ (তামিম ১, শাহরিয়ার ১২, আফতাব ৭, সাকিব ২৬, আশরাফুল ২৯; হার্ডল ০/২৫, মুকদ্দেম ৩/১৯, টাকার ০/১৪, লেভেরক ০/১৯, বোরডেন ০/১৫)

ফল: বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মোহাম্মদ আশরাফুল