উৎপল শুভ্র: একসঙ্গে তিন বছরের পুরস্কার, দুবারই আপনি বর্ষসেরা। এতে কি অভিভূত, নাকি উল্টোটা—মাঝে একবার না পাওয়ায় হতাশ?

সাকিব আল হাসান: দুইটাই। ২০১০-এ পেলে আরও ভালো হতো, তা হলে পরপর তিনবার হতো। আমি তো সেদিনই বলেছি, পরপর তিনবার হলে মেসিকে ধরে ফেলতাম। আমি মেসির বড় সাপোর্টার, যদিও ও ফুটবল খেলে। বলতে পারতাম, মেসি পরপর তিনবারের বর্ষসেরা, আমিও তা-ই (হাসি)।

শুভ্র: ২০১০ সালেও বর্ষসেরা হলে তো মেসিকেও ছাড়িয়ে যেতেন! টানা চারবার হয়ে যেত...

সাকিব: তাই তো! এতে আমি খুব যে হতাশ তা না। ভালো করি নাই, তাই পাই নাই। এটা মনে একটা জেদও এনে দেয়। যাতে ধারাবাহিকভাবে ভালো করতে পারি, যাতে এই পুরস্কারগুলো আসতেই থাকে। এই পুরস্কার কিন্তু অনুপ্রেরণারও কাজ করে। পরের সিরিজটা যখন খেলতে নামব, মনে পড়বে আমি সব খেলা মিলিয়ে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড়। এটা অনেক অনুপ্রাণিত করে, দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
 
শুভ্র: গ্রামীণফোন-প্রথম আলো পুরস্কারটা তো আপনার কাছে অন্য রকম। উদীয়মান দিয়ে শুরু, মাঝখানে এক বছর পরই বর্ষসেরা, সেই বর্ষসেরাও তিনবার পেয়ে গেলেন...

সাকিব: এটা কিন্তু আমার ক্যারিয়ারটাও বুঝিয়ে দিচ্ছে। ২০০৬-এ উদীয়মান, ৮-এ বর্ষসেরা; ৯-এও, ১০টা গ্যাপ গেছে, ২০১১-তে আবার পেলাম। এর মানে হচ্ছে আমি ধারাবাহিক ছিলাম, ভালো করেছি, দলের জন্য অবদান রেখেছি।

শুভ্র: গত তিনটা বছর তো আপনার ক্যারিয়ারেও কত নাটকীয় ঘটনা...২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে হঠাত্ অধিনায়কত্ব পেয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশের নায়ক, ২০১০ সালে বলতে গেলে একাই নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াশ করা, ২০১১ সালে বিশ্বকাপের ওই উথাল-পাথাল অভিজ্ঞতা, অধিনায়কত্ব পাওয়া, আবার হারানো....গত তিন বছরের দিকে যখন পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন, চোখে প্রথম ভাসছে কোন ছবিটা?

সাকিব: সবার আগে নিউজিল্যান্ড। এরপর আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিরিজটা, বিশেষ করে টেস্টটা, ওয়ানডে অতটা না। যদিও অনেকে বলবে, ওদের দলটা ভালো ছিল না, তার পরও দিনশেষে কথা একটাই—আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছি। এর পরে ধরেন ওয়ার্ল্ড কাপ। এটা আমার লাইফকেই পরিণত করেছে। আমি এখন যতটা পরিণত পুরোটাই ২০১১ ওয়ার্ল্ড কাপের অবদান। 

বিশ্বকাপ ২০১১ সাকিবের জন্য ছিল উথালপাথাল এক অভিজ্ঞতা। এখানে যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে তাঁর চোখেমুখে। ছবি: শামসুল হক টেংকু
শুভ্র: ওয়ার্ল্ড কাপের ওই এক-দেড় মাসে বোধ হয় দেড়-দুই বছরের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে...

সাকিব: আমার কাছে মনে হয় আরও বেশি। দর্শকদের ভালোবাসা, পাগল করার মতো ভালোবাসা, রাত দুইটা-তিনটার দিকে মানুষ বেরোচ্ছে রাস্তার লাইটিং দেখতে। আমরা জিতলে মানুষ খুশিতে পাগলের মতো হয়ে গেছে। তিন-চার ঘণ্টা লেগেছে মাঠ থেকে বের হতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে রেজাল্ট খারাপ করার পর নানা রকম কমেন্ট, এক্স প্লেয়ারদের সাথে সমস্যা...এই সময়টাতে আমি অনেক কিছু শিখেছি, এটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। বোর্ডের সাথে সম্পর্ক বলেন, যা-ই বলেন, আমি সব থেকে বেশি বুঝতে পেরেছি। মানুষ চেনা...আমি এ জন্যই বলছি, ওই দেড়টা মাসে আমি যা শিখেছি, আগের তিন বছরেও অত কিছু শিখিনি।

শুভ্র: যা শিখেছেন, সেটি যদি এক কথায় বলতে বলি...

সাকিব: কীভাবে একটা পরিস্থিতি সামলাতে হয়। ইমোশন কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয়। শুধু মিডিয়ার ক্ষেত্রে না, হয়তো মাঠে আম্পায়ার একটা আউট দেয় নাই, আমি রেগে গিয়ে কিছু বলেছি। এই একই কথা তো আমি হেসেও বলতে পারতাম..এসব আরকি! 

শুভ্র: এমন কিছু কি আছে, যেটি অন্যভাবে করা যেত বা না করলেই ভালো হতো বলে মনে হয়.....যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ফিফটি এইটের পর প্রথম আলোতে লেখা কলামে এক্স প্লেয়ারদের আক্রমণ করাটা... 

সাকিব: হ্যাঁ, এটা হয়তো অন্যভাবে বলা যেত। কমেন্ট না করাই হয়তো ভালো ছিল। শেখার কথা বলছিলেন না, আপনার একটা কথাও মনে আছে। আপনি বলেছিলেন, বিতর্ক হতে পারে এমন কিছু বলতে চাইলে সেটি সেদিন না বলে পরদিন বলা...

শুভ্র: বাব্বা, আপনি এটা মনে রেখেছেন! আমি তো এত দিন ভেবেছি, ওসব জ্ঞানের কথা আপনি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেন...

সাকিব: তা হলে এটা মনে রাখলাম কীভাবে? আমি যেটা শোনার মন দিয়েই শুনি। ইম্পর্ট্যান্ট কথা মনেও রাখি। আমার ব্রেন শার্প তো (হাসি)। যেটা বলছিলাম, বিশ্বকাপে ওই অ্যাটমোস্ফিয়ারটা আমাদের খুব...আমাদের খুব...কী বলা যায়...

শুভ্র: অনুপ্রাণিত করেছিল, না চাপে ফেলে দিয়েছিল?

সাকিব: চাপেই বেশি ফেলেছে। কেউ কেউ আছে প্রেশার হ্যান্ডল করতে পারে, বেশির ভাগই কিন্তু পারে না। ওয়ার্ল্ড কাপের সময় প্রতিটা টিভি চ্যানেলে সমানে খেলার কথা চলছে, কোনো এক্সপার্ট কাউকে না কাউকে নিয়ে কথা বলছে। আমাকে নিয়ে কিন্তু কেউ কমেন্ট করছিল না। করছিল অন্য সব প্লেয়ারকে নিয়ে। হয়তো বসে আছি, গল্প করছি, একজন বলল, অমুকে আমার সম্পর্কে এইটা বলেছে। এই সব কথাবার্তা ওদের খুব চাপে ফেলে দিয়েছিল। এই জিনিসটা না হলে খুব ভালো হতো। 

শুভ্র: বিশ্বকাপ ছাড়াও বাংলাদেশের ক্রিকেটে ২০১১ তো জিম্বাবুয়ে সফরের কারণেও বিখ্যাত। আপনার ক্যাপ্টেনসি কেড়ে নেওয়া হলো। আপনি এটিকে খুব সহজভাবে নিয়েছিলেন, কিন্তু ভেতরে কি সত্যিই কোনো জ্বালা নেই?

সাকিব: যেটা হয়, ধরেন কেউ যখন বলে ক্যাপ্টেনসি থেকে কেন সরিয়ে দিল, রাখলে ভালো হতো, তখন মনে পড়ে। এ ছাড়া খুব একটা মনে পড়ে না। তবে আমি এটা যতই সহজভাবে নিই না কেন, একটু খারাপ তো লাগতই। কারণ আমার মনে হয়েছে, কাজটা ঠিক করে নাই। হতে পারে, আমার ভুল ছিল, যেটা আমার চোখে পড়ে নাই। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ তো কেউ বলে নাই। আমার মনে হয়, মিডিয়ার কথা বেশি শোনা হয়েছে। অথচ ওই সফরে যাওয়ার আগে আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ক্রিকেট খেলা তো এত ইজি না। তার পরও দেখেন, ওই সিরিজে ওয়ানডেতে আমি সবচেয়ে বেশি রান করেছি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট নিয়েছি, আমাদের টিমে আমি বেস্ট পারফরমার ছিলাম, শেষ ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছি। নিজেকে ডিফেন্ড করছি না। তবে ওই সব চিন্তা করলে মনে হয়, যা করেছি আল্লার রহমতে ভালোই করেছি। আমার মনে হয়, টিমটাও ভালো দিকেই যাচ্ছিল। মিডিয়ায় অনেক রকম কথা হয়েছে, কিন্তু দেখেন তামিম আর আমি তো এখনো ভালো ফ্রেন্ড। ক্যাপ্টেন-ভাইস ক্যাপ্টেন ছিলাম দেখে হয়তো তখন এটি অন্যভাবে দেখা হয়েছে। অথচ ড্রেসিংরুমের ভেতরে-বাইরে তখন যা করতাম, এখনো তা করি। দুজন একই রকম আছি। তখন ক্যাপ্টেন ছিলাম, আমার একটা পাওয়ার ছিল, তাই এগুলো অন্য রকম লাগত।
খেলার বাইরেও অনেক ব্যস্ততা। ছবি: আবদুল হান্নান
শুভ্র: দীর্ঘ মেয়াদে অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর বাংলাদেশ দলকে নিয়ে অনেক পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। সেসব কিছুই তো করা হলো না। এ কারণে হলেও কি আবার ক্যাপ্টেন হতে চান?

সাকিব: ২০১৫ ওয়ার্ল্ড কাপ পর্যন্ত এমন কোনো চিন্তা নাই। একটাই টার্গেট, ভালোভাবে খেলা। এরপর দেখা যাবে। তবে ক্যাপ্টেনসি না করলেও আমার কাছে মনে হয় আমি এখনো কাইন্ড অব আ ক্যাপ্টেন। মাঠের বাইরে না, মাঠের ভেতরে, আমি নিজে থেকে গিয়ে মুশফিক ভাইকে অনেক কিছু বলি। বেশির ভাগ সময়ই উনি তা শোনেন। 

শুভ্র: ক্যাপ্টেনসির কী মিস করেন?

সাকিব: স্যুইট রুম, এটা আমি খুব মিস করি। উফ্, ওয়েস্ট ইন্ডিজে রুমগুলা কী ছিল (হাসি)... সোনারগাঁও বলেন, শেরাটনই বলেন এটাই আমি মিস করি, আর কিছু না। 

শুভ্র: এক নম্বর র্যাঙ্কিংটা নিয়ে কথা বলি। এটাই তো সেই জাদুর প্রদীপ, যেটি আপনাকে রাতারাতি বাকিদের চেয়ে আলাদা করে দিল... 

সাকিব: কথাটা ঠিক, যেমন বাইরের কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে সবাই বলে, বিশ্বের নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার। এতে ভেতর থেকে কেমন একটা ফিলিংস আসে, বলে বোঝানো মুশকিল। কখনো অন্য রকমও মনে হয়। এই যেমন কাল রাতে টিভি চালিয়েছি। ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের হাইলাইটস দেখে আফসোস লাগল, কত দিন সাদা ড্রেসে খেলি না। ওয়ানডে-টেস্ট কত দিন খেলছি না, র্যাঙ্কিং-ট্যাঙ্কিং সব উড়ে যাবে। আমার কিছুই করার থাকবে না।

আমার সবচেয়ে খুশি লাগে যখন আমার ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিং ও বোলিং র‍্যাঙ্কিং কাছাকাছি থাকে। ধরেন, ওয়ানডেতে আমি ব্যাটসম্যানদের র‍্যাঙ্কিংয়ে ১২ নম্বরে উঠেছিলাম। এর মানে কী, আমি ওয়ার্ল্ডের টপ বারোজন ব্যাটসম্যানের মধ্যে পড়ি। এটা অনেক ইন্সপায়ার করে।

শুভ্র: ‘সেবনের আগে ও পরে’র লাইনে যদি একটা প্রশ্ন করি, র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে ওঠার আগে-পরে কী পার্থক্য?

সাকিব: আমার মনে হয়, এটা আমার মধ্যে একটা আলাদা দায়িত্ববোধ এনে দিয়েছে। চাপ নয়, দায়িত্ব। যেটা আমি খুব ভালোভাবে নিতে পেরেছি, যা আমাকে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করেছে। ধরেন, আমার পেছনে ক্যালিসের নাম, আফ্রিদির নাম, যুবরাজ-ওয়াটসনের নাম। তার মানে আমি ওদের চেয়ে ভালো কিছু করেছি বলেই ওই জায়গায় আছি। কাজেই আমার উচিত আমার টিমের পক্ষে আরও ভালো করা। ওরা এত দিন ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছে, তা হলে আমি কেন পারব না? তখন কী হচ্ছে, বাংলাদেশের কারও সঙ্গে না, আমার কম্পিটিশন হচ্ছে ক্যালিসের সঙ্গে, ওয়াটসনের সঙ্গে। এটা লেখার পরে কেউ ভাবতে পারে, ওরে বাবা নিজেকে কী মনে করছে...তবে এখন আমি ও রকমই চিন্তা করি।

শুভ্র: ওয়ানডের চেয়ে টেস্টে এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়াটা কি একটু বেশি গৌরবের বলে মনে হয়? প্রথমত, এটিকে জ্যাক ক্যালিস প্রায় নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। দ্বিতীয়ত, টেস্ট ক্রিকেটে যে বাংলাদেশ কোনো শক্তিই নয়, সেই বাংলাদেশের একজন এক নম্বর অলরাউন্ডার...

সাকিব: টেস্টেরটা হওয়ার পরে খুবই খুশি লাগছে, ওয়ানডের চেয়ে অনেক বেশি খুশি। আমার সবচেয়ে খুশি লাগে যখন আমার ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিং ও বোলিং র‍্যাঙ্কিং কাছাকাছি থাকে। ধরেন, ওয়ানডেতে আমি ব্যাটসম্যানদের র‍্যাঙ্কিংয়ে ১২ নম্বরে উঠেছিলাম। এর মানে কী, আমি ওয়ার্ল্ডের টপ বারোজন ব্যাটসম্যানের মধ্যে পড়ি। এটা অনেক ইন্সপায়ার করে।

শুভ্র: এবার একটা অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ। আপনার জিম্বাবুয়ে না-যাওয়া নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছে। আপনার ব্যাখ্যা কী?

সাকিব: প্রথম কথা, জিম্বাবুয়েতে এটা ইন্টারন্যাশনাল সিরিজ নয়। আর আমাকে ভালোভাবে খেলতে হলে একটু শ্বাস ফেলার সময় তো পেতে হবে। এখন একটু ভেবে বলেন তো বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েতে কেন যাচ্ছে—টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপের আগে বেশি খেলার সুযোগ নাই, এ জন্যই তো? আমার ক্ষেত্রে তো তা নয়। আমি তো ম্যাচেই ছিলাম। ৭০টা না ৭৫টা টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছি, বাংলাদেশের আর কেউ মনে হয় এর অর্ধেকও খেলেনি। ফিজিক্যালি যত না, মেন্টালি আমি খুব টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলাম। শরীরেও কিছু সমস্যা ছিল, আমার মনে হয় ছুটির পর সে সব আর থাকবে না। আমি যখন সাত-আট দিন মাঠে যাই না, আমার হাত চুলকাতে থাকে। যখন আবার মাঠে যাই, টায়ার্ড হওয়ার পরও মনে হয় আরেকটু ব্যাটিং করি, আরেকটু দৌড়াই, আরেকটু জিম করি। এবারও এমন হবে, সামনে এতে আমার আরও ভালো হবে। 

শুভ্র: সবই বুঝলাম, কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করে, এই বিশ্রামটা বাংলাদেশের খেলার সময় না নিয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের সময় কেন নিলেন না?

সাকিব: আইপিএল তো চলছিল দুই মাস আগে থেকে, এই ডিসিশনটা আমি চিন্তা করেছি আইপিএলের মাঝামাঝি থেকে। প্রিমিয়ার লিগের কথা যদি বলেন, এমন একটা অবস্থা যে আমি না থাকলে টিমটার খুব দুর্দশা হতো। আমার জায়গায় একটু ধরবে এমন কেউ নাই, প্লাস ফরেনার আসারও কোনো চান্স নাই। তা ছাড়া আমাদের টিমে টাকা একজন দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু টিম আমি আর তামিমই করেছি। তাই বাড়তি একটা দায়িত্ব ছিল, মাঝপথে তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমার কাছে মনে হয়েছে, জিম্বাবুয়ে ট্যুরটা অন্য দশটা ট্যুরের চেয়ে একটু কম ইম্পর্ট্যান্ট। যদি তা না হতো, এগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হতো, আমি অবশ্যই যেতাম। ইনজুরি নিয়েও আমি খেলেছি না...আমার গ্রোয়েনে এক বছর টানা ইনজুরি ছিল, আমি খেলার মতো অবস্থায় ছিলাম না। ঠিকমতো দৌড়াতেই পারতাম না। ইনজেকশন দেওয়া হলো, কাজ করে নাই। পরে অপারেশন করাতে অস্ট্রেলিয়া গেলাম, ভাগ্য ভালো লাগে নাই। আমি ওর মধ্যেও টানা নয় মাস খেলেছি। (২০০৯ সালে) ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে এক দিন আগে লন্ডনে এসে ইনজেকশন নিয়ে জিম্বাবুয়ে গিয়ে খেলেছি। আমি নিজেকে বড় করার জন্য এটা বলছি না। শুধু বলি, আমি জানি আমি কী করছি। এসব ব্যাপারে আমি খুব সচেতন। আমার মনে হয় না এই ব্যাপার নিয়ে কারও খুব বেশি চিন্তা করার দরকার আছে। আমি আছি, আমার চিন্তা আছে আর আমার চিন্তায় অন্য সবকিছুর চেয়ে বাংলাদেশই আগে।

শুভ্র: তার পরও যদি প্রশ্ন করি, কখনো যদি এমন পরিস্থিতি আসে বাংলাদেশের পক্ষে খেলা আর আইপিএল বা বিপিএলে খেলার মধ্যে একটা বেছে নিতে হচ্ছে, কোনটা নেবেন?

সাকিব: অবশ্যই বাংলাদেশ। কেন এই প্রশ্নটা করেছেন বুঝেছি। দেখেন, এই গত বিপিএলেই আমি যে টাকা পেয়েছি, ন্যাশনাল টিমের পক্ষে যত ভালো খেলা সম্ভব তা খেললেও এক বছরে বড়জোর এর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পাব। কিন্তু আমি একটা কথা কখনো ভুলি না। বিপিএল বা আইপিএলে আমার যে ওই টাকাটা পাওয়ার সুযোগ হয়েছে, এটা এসেছে ন্যাশনাল টিম থেকে। বাংলাদেশ আমাকে ওই পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলেই তো ওরা আমাকে ওই টাকা দিয়ে কিনতে বাধ্য হয়েছে। আমি এটাকে এভাবেই দেখি। আমার কাছে দেশই সবার আগে আছে, এটা নিয়ে টেনশন করার কিছু নাই। 

শুভ্র: বিপিএল, এশিয়া কাপ ও আইপিএলের পর আপনাকে নিয়ে উন্মাদনাটা অনেক বেড়েছে, এটা কি টের পান?

সাকিব: খুব ভালোভাবেই। গত কিছুদিনের মধ্যেই পরিবর্তনটা হয়েছে। আগে পাঁচটা মানুষ আসত, এখন হয়তো ডাবল আসে। আরও বেশি ইন্টারেস্ট নিয়ে, আরও বেশি রেসপেক্ট নিয়ে। এটা খুব ভালো টের পাই। 

শুভ্র: কদিন আগে যে বললেন, আপনি প্ল্যান করে কিছু করেন না, যখন যা মনে হয় তা-ই করে ফেলেন, এটা কতটা সত্যি?

সাকিব: আমি যখন যেটা প্ল্যান করি, ভালোভাবে প্ল্যান করি। অনেকে আছে না, ম্যাচের তিন-চার দিন আগে থেকে প্ল্যান করে, আমি সেটা পারি না। আমার নার্ভাস লাগে। হয়তো ম্যাচের আগের রাতে আধা ঘণ্টা প্ল্যান করলাম অথবা ডে-নাইট ম্যাচ হলে ম্যাচের দিন সকালে। যেটা মনে হয় একটু আগে করা দরকার, সেটা আগেই করি; যেটা পরে করলেও চলে, সেটা পরে করি। 

শুভ্র: এই যে বেশি না ভেবে নির্ভার থাকার ক্ষমতা, এটা কি আপনার সহজাত, মানে সব সময়ই ছিল?

সাকিব: হ্যাঁ। আন্ডার ফিফটিনের কথা বাদ দেন, আন্ডার সেভেনটিন থেকে ম্যাচ সিচুয়েশন নিয়ে কখনোই কারও আমাকে খুব বেশি বলা লাগেনি। অটোমেটিকই যেন আমি বুঝতে পারতাম, এখন এমন করা দরকার। আমার বোলিংটাই যেমন, আমি মনে করি এটা গড গিফটেড। এটা নিয়ে আমি অনেক কম কাজ করি, তার পরও এটাই আমার স্ট্রং পয়েন্ট। আমি ব্যাটসম্যানদের নড়াচড়া দেখেই বুঝতে পারি সে কী করতে যাচ্ছে। এবারের আইপিএলে যখন ওভার দ্য উইকেট বল করতে এসেছি, সবাই ভেবেছে পায়ে বল করবে, আর আমি করেছি ওয়াইড ইয়র্কার। সবাই ধোঁকা খেয়েছে। আমার মনে হয়, ম্যাচে ঢুকলে আমার মাথা খুলে যায়, কীভাবে কীভাবে যেন আইডিয়াগুলো আসতে থাকে। 

শুভ্র: মাঠে কখনো এমন কি হয়েছে, চাপটা এমন অসহ্য হয়ে উঠেছে যে মনে হয়েছে সব ফেলে পালিয়ে যাই?

সাকিব: আমার বরং এই প্রেসারটা খুব ভালো লাগে। হয়তো ধুপধাপ ২/৩ উইকেট পড়ে গেছে, আমাকে ধরতে হবে। মনে হয় খুব কঠিন কাজ। কিন্তু আমার মনে হয়, যদি এই পরিস্থিতিতে খেলতে না পারলাম, তা হলে আমি কিসের প্লেয়ার। বাড়তি চ্যালেঞ্জ মনে হয়। কখনো এমন মনে হয় না, ধুত্, এত প্রেসার, একটা মেরে আউট হয়ে যাই!

শুভ্র: যদি এই মুহূর্তে বলা হয়, আপনার খেলায় কোনো একটি জিনিস যোগ করতে চান, সেটি কী হবে?

সাকিব: ব্যাটিং-বোলিং দুদিকে দুটির কথা বলব। ফিল্ডিং নিয়ে আমার কোনো টেনশন নেই। ফিল্ডিং ঠিকই আছে, আরেকটু প্র্যাকটিস করলে আরও ভালো করব। বোলিংয়ে একটা বল শিখতে চাই, যেটা লেফটিদের বাইরে বের হবে। এখনো মাঝেমধ্যে অ্যাঙ্গেলের কারণে বেরিয়ে যায়, অমন না। আমি চাচ্ছি দুসরা-টুসরা জাতীয় উল্টা বল। এখন যে ক্রিকেট হয়েছে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে, শুধু টি-টোয়েন্টিই কেন, ওয়ানডেতেও এখন ব্যাটসম্যানরা ডাউন দ্য উইকেট মারতে যাবেই। এই বলটা শিখতে পারলে অনেক কাজে দিত। তখন ব্যাটসম্যান ডাউন দ্য উইকেট আসার আগে এক শবার ভাবত। ওই বল বেশি করা লাগবে না। দুই ওভারে একটা করলেই ব্যাটসম্যান চিন্তা করবে, ডাউন দ্য উইকেট যে যাব, যদি উল্টাটা হয়, তাহলে তো বল সোজা আকাশে উঠে যাবে। এবার আইপিএলে এটা আমি খুব ফিল করেছি। ফিরে এসে রাজ ভাইকেও (আবদুর রাজ্জাক) বলেছি, এটা শেখেন, নইলে টিকে থাকা কঠিন। ব্যাটিংয়ে আমার লেগ সাইডের খেলায় আরও উন্নতি করতে চাই। একটু-আধটু না, ভালোই উন্নতি দরকার।

শুভ্র: এই সাক্ষাৎকার নিতে বসার আগে ২০০৮ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ হওয়ার পর নেওয়া আপনার সাক্ষাৎকারটা পড়ছিলাম। সেখানে ফুটবল নিয়ে অনেক কথা ছিল। ফুটবল নিয়ে উন্মাদনটা এখনো আছে?

সাকিব: খুব আছে। আমার ফেসবুকে আমি খেলা নিয়ে খুব কমই স্ট্যাটাস দিই। দিলে সেটি ফুটবল।

ফুটবল খুব পছন্দের খেলা। তার চেয়েও বেশি পছন্দ লিওনেল মেসিকে। ছবি: আবদুল হান্নান
শুভ্র: ওই সাক্ষাৎকারে বিশ্বের বড় বড় সব স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল ম্যাচ দেখার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। সেই স্বপ্ন কি এখনো জীবিত?

সাকিব: হ্যাঁ। বিশ্বকাপ দেখারই তো প্ল্যান করছি। আমি আর তামিম ব্রাজিলে যাব। সমস্যা হলো, আমি চাই আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখতে, তামিম ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে, দুজনই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার একটি করে ম্যাচ দেখব। 

শুভ্র: আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এমন কেউ কি আছেন, যাকে আপনি ঈর্ষা করেন?

সাকিব: ঈর্ষা? ঈর্ষা মানে...

শুভ্র: এমন কেউ, আপনি যাঁর মতো হতে পারলে খুশি হতেন?

সাকিব: মেসি।

শুভ্র: কেন? মেসির কী ভালো লাগে?

সাকিব: কী ভালো লাগে...আসলে সব কিছুই ভালো লাগে। মেসির ফ্যান তো প্রথমে ওর খেলা দেখে। এর সঙ্গে ওর কথাবার্তা, আচার, আচরণ...ও এখনো বাচ্চাদের মতো...এটাও ভালো লাগে।