উৎপল শুভ্র: মাঠে নামলাম, জিতলাম—ক্যাপ্টেন্সিটা তো আপনার কাছে এখন খুব সহজ মনে হওয়ার কথা!

সাকিব আল হাসান: (হাসি) আমি আসলে মাঠে নামার সময় বা খেলা চলার সময় কখনো এমন ভাবি না যে, জিততেই হবে। আমার কথা হলো, সবাই মাঠে হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেবে। তার পর যদি জিততে না পারি তো নাই। আজই (তৃতীয় ওয়ানডেতে) যেমন একবার মনে হয়েছিল, যদি হেরে যাই! পরক্ষণেই মনে হয়েছে, হারলে কী হবে? ভালো না খেললে হারব।

শুভ্র: এক মাস আগেও তো আপনার কল্পনা করার কথা নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট ও ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করে অধিনায়ক হিসেবে আপনি সাক্ষাৎকার দেবেন। দুই সিরিজেই আবার সেরা খেলোয়াড়—স্বপ্ন-স্বপ্ন লাগে না?

সাকিব: গভীরভাবে চিন্তা না করলে এটা বোঝা যায় না। যা চাইছি তা-ই হচ্ছে। যা করতে চাইছি, তা-ই। কখনো কাল্পনিকও মনে হয়। যা হয়েছে অনেক বড় ব্যাপার। একজন ক্রিকেটারের জীবনে এসবই তো স্বপ্ন থাকে। এত অল্প সময়ে এত কিছু পেয়ে গেলাম!

শুভ্র: কাউকে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক করার সময় বড় চিন্তা থাকে, বাড়তি চাপটা তাঁর খেলায় প্রভাব ফেলবে কি না। কিন্তু অধিনায়কত্ব তো আপনার পারফরম্যান্স আরও ভালো করে দিল!

সাকিব: আমার কাছে ক্যাপ্টেন্সি খুব চাপ মনে হয় না। আগে যখন চিন্তা করেছি, যদি একদিন অধিনায়ক হই কী হবে, মনে হয়েছে এটা আমার বোলিংয়ে অ্যাফেক্ট করবে। কারণ বেশির ভাগ সময়ই আমার মনে হতো, না, এখন আমি বোলিং করব না। তবে অধিনায়ক হওয়ার পর দেখলাম, উল্টো দলের প্রয়োজনের সময় নিজেই দায়িত্ব নিয়ে বোলিং করতে এসেছি।

শুভ্র: ব্যাটিংয়ের সময় তো অধিনায়কত্বের কথা ভুলে গিয়ে নিজেকে একজন ব্যাটসম্যান ভাবলেই হয়। তবে বলাটা সহজ, আপনি কি তা পেরেছেন?

সাকিব: ব্যাটিংয়ের সময় ক্যাপ্টেন্সির কথা মনে থাকে না। তবে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে একবার মনে হয়েছিল। একবার ভাবলাম, একটা মেরে দিই। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, আমি না অধিনায়ক, যদি এখন মারতে গিয়ে আউট হয়ে যাই, পরের ব্যাটসম্যানদের কী বলব?

শুভ্র: মাশরাফি ইনজ্যুরড না হলে আপনি অধিনায়কত্ব পান না। তার পরও মাশরাফিকে মিস করছেন না?

সাকিব: ম্যাচে তো খুবই মিস করেছি। আমাদের ফাস্ট বোলাররা ১০ ওভার বোলিংই করতে পারছে না। এখানে স্পিনাররা ভালো করেছে বলে সমস্যা হয়নি। কিন্তু সব সময় তো আর এমন হবে না। যাক, আমি জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত আছি। ওখানে ভালো করতে পারলেই হ্যাপি।

শুভ্র: তা কেন, মাশরাফি কবে ফিরবে তা তো একটু অনিশ্চিত। দীর্ঘ মেয়াদেও তো আপনি ক্যাপ্টেন্সি পেতে পারেন।

সাকিব: তেমন হলে দেখা যাবে। তবে আমি মনে করি, ম্যাশ যত দিন আছে, ও-ই অধিনায়ক। অধিনায়ক হিসেবে ও-ই ঠিক লোক।

শুভ্র: কিন্তু এই সাফল্যের পর আপনাকেই অধিনায়ক রেখে দেওয়ার একটা দাবি তো উঠে গেছে।

সাকিব: এর কারণ দল ভালো করছে, আমার নিজের পারফরম্যান্সও ভালো ছিল। তবে আমি তো বললামই, মাশরাফি ভাই যত দিন খেলবে, তাঁরই অধিনায়ক থাকা উচিত। আসলে আমার এ নিয়ে খুব মাথাব্যথা নেই। জিম্বাবুয়ে সফর পর্যন্ত আমার দায়িত্ব। আর আমি আগে থেকে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করতে পারি না। সেদিন ক্রিকইনফোতে এ বিষয়ে একটা লেখা পড়ার পর মনে হলো, আমাকে যদি ক্যাপ্টেন্সি দেয়, আমি কী করব? সঙ্গে সঙ্গেই ভাবলাম, ও যখন হবে তখন দেখা যাবে।

শুভ্র: টেস্ট সিরিজের পর ওয়ানডে সিরিজেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ হোয়াইটওয়াশ। এই সফরটা তো বাংলাদেশকে দুহাত ভরে দিল। এতটা কি সত্যি কল্পনা করেছিলেন?

সাকিব: এভাবে তো ভাবিনি। তবে দেখেন, দুই টেস্টেই প্রথম ইনিংসে আমরা খারাপ করেছি। কারণ আমরা খুব নার্ভাস ছিলাম। কারণ হঠাত্ করেই সব চাপ আমাদের ওপর চলে এসেছিল। আমরা জিততে না পারলে সবাই বলত—কিরে, তোরা এই দলের সঙ্গেও পারিস্ না? আস্তে আস্তে আমাদের আত্মবিশ্বাসটা বেড়েছে। আপনি দেখেন, আমাদের টিমটা কিন্তু একজন-দুজনের ওপর নির্ভর করেনি। আজ রিয়াদ ভাই ভালো খেলল, প্রথম দুই ম্যাচে অ্যাশ আর আমি। মুশফিক ভাই ভালো ব্যাটিং করেছে, রকিবুল ভালো খেলেছে। যখন যাকে লেগেছে সে-ই দাঁড়িয়ে গেছে। এটা খুব ভালো দিক।

শুভ্র: অধিনায়ক হিসেবে হান্ড্রেড পার্সেন্ট রেকর্ড। দুই সিরিজেই সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। এটা তো জিজ্ঞেস করার দরকার নেই যে, এটা আপনার জীবনের সেরা সিরিজ কি না!

সাকিব: একটা সিরিজ থেকে আরেকটা ভালো হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটা মনে হয়েছে নিজের সেরা, এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আরও ভালো। এখানে তো এর চেয়ে বেশি কিছু চাইতে পারতাম না। প্রতিটি সিরিজেই উন্নতি হচ্ছে।

শুভ্র: এই সফরে এত সাফল্যের মধ্যে আলাদাভাবে কোনটা মনে থাকবে?

সাকিব: প্রথম টেস্টে মাশরাফি ভাই ইনজ্যুরড হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ অধিনায়কত্ব পেয়ে ম্যাচ জিততে অনেক কিছু করেছি। এখন একা একা চিন্তা করলে খুব ভালো লাগে, মনে হয় আমিই ম্যাচ জিতিয়েছি। দ্বিতীয় ওয়ানডেটার কথাও বলব। শুধু ২৭৪ চেজ করেছি বলে নয়, আমরা খুব সেনসিবল ব্যাটিং করেছি। অনেক বড় টিমও এমন করতে পারবে না।

শুভ্র: এখন আপনি যা-ই স্পর্শ করছেন, সোনা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব দিন তো আর এমন যাবে না। বাজে সময়ও আসবে। ২০০৭ শ্রীলঙ্কা সফরে যেমন এসেছিল, মনে আছে ওই কথা?

সাকিব: মনে থাকবে না মানে! তবে ওই সময়টা ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে অনেক ভালো করেছে। ওই একটা সিরিজ থেকে এত কিছু শিখেছি যে, ভবিষ্যতে যখন খারাপ সময় আসবে তখন তা কাজে লাগবে। খারাপ সময় তো আসবেই, তবে আমি যেটা বুঝি, ভালো সময়টাকে যত বেশি সম্ভব লম্বা করার চেষ্টা করা উচিত। খুব বেশি চিন্তাও করি না। বেশি চিন্তাভাবনা না করেই আমি সাসকেসফুল হয়েছি, আমি তাই এ পথেই থাকতে চাই।

শুভ্র: মাঠে দেখলাম মাঝেমধ্যে সতীর্থদের ওপর খুব রাগ দেখাচ্ছেন। ওরা কীভাবে নিচ্ছে?

সাকিব: ব্যাটিং-বোলিংয়ে কেউ খারাপ করলে আমার রাগ হয় না, কিন্তু ফিল্ডিংয়ে যদি কাউকে দেখে মনে হয়, হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিচ্ছে না, তাহলে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। মিস তো হবেই, আমিও মিস করি, কিন্তু যদি মনে হয় হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিলে ও বলটা ধরতে পারত, তাহলে সেটা মেনে নিতে পারি না। খেলোয়াড়েরা এটা কীভাবে নিচ্ছে তা বলতে পারব না। তবে আমার তো মনে হয় না, কেউ মনে কিছু পুষে রাখছে।

শুভ্র: ওয়েস্ট ইন্ডিজে তো আর একটা টি-টোয়েন্টিই বাকি। সেটি হেরে গেলেও এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু জিম্বাবুয়েতে জিততে না পারলে তো অ্যান্টি ক্লাইমেক্স হয়ে যাবে!

সাকিব: আমি ওভাবে ভাবছি না। আমি চাই, কেউ যেন ওসব মাথায় না রাখে। আমরা এখন যে ক্রিকেট খেলছি তাতে জিম্বাবুয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। পাঁচ-শূন্যটুন্য নয়, আমার প্রথম লক্ষ্য সিরিজ জেতা, তারপর যত ভালো করা যায়।