এক সময় মনে হচ্ছিল, দুটি রান আউটেই মনে হয় ম্যাচটা ধরা যাবে। দুটিতেই আছেন তামিম ইকবাল।

একটায় তিনি শিকার। আরেকটাতে শিকারি। আচ্ছা, বিস্তারিত কথাবার্তা যথাক্রমে বলার আগে একটা প্রশ্ন করি, বিশ্বের প্রায় ক্রিকেট দলের ওয়ার্ম আপে সবচেয়ে কমন জিনিস কী, বলুন তো? সাধারণ দর্শকের প্র্যাকটিসে প্রবেশাধিকার নেই বলে প্রশ্নটা মনে হয় একটু কঠিনই হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক আছে, উত্তরটা তাহলে আমিই বলে দিই। ক্রিকেট দলের ওয়ার্ম আপে সবচেয়ে কমন হলো, দু্ই ভাগ হয়ে ফুটবল খেলা। তা খেলতে গিয়ে কখনো কেউ চোট পেলে এ নিয়ে কথা ওঠে। কখনো হয়তো একটু বিরতিও পড়ে। এক সময় আবার পুরোদমে তা শুরু হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ড দলে অবশ্য এই ফুটবলের খুব একটা চল দেখিনি। কালেভদ্রে যদি খেলা হয়ও, তাতে জিমি নিশাম মনে হয় খুব ভালো করেন। তাঁর ফুটবল স্কিল তো দেখলাম দুর্দান্ত! পাপড়ি মেলে ফুটে ওঠার সময়টাতেই যা বৃন্তচ্যুত করে ফেলল তামিম ইকবালকে।

জিমি নিশামের 'পায়ের খেলা'য় রান আউট তামিম ইকবাল। ছবি: টুইটার

বাংলাদেশের ইনিংসের সেটি ৩১তম ওভার। আর কিছুক্ষণ থাকলে তামিমের স্ট্রাইক রেট নিশ্চিতভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত না। যদিও ৭২.২২ স্ট্রাইক রেটে ১০৮ বলে ৭৮ রানের ইনিংসটারও নিউজিল্যান্ডকে অমন বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা।

‘তামিম যখন শিকার’ অংশটুকু শেষ। এবার ‘তামিম যখন শিকারি’।

টম ল্যাথাম আর ডেভন কনওয়ের সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ ম্যাচটা যখন বের করে নিচ্ছে, তখনই ওই ভূমিকা বদল। তা নিশামের মতো মাল্টি স্কিলের পরিচয় দিয়ে নয়, রান আউট করার আদি ও নির্ভেজাল উপায় ডিরেক্ট থ্রোতে। কনওয়ের বিদায়ে জমাট জুটিটি ভেঙে যাওয়ায় জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডের ৯৯ বলে ১০৬ রানের সমীকরণটা হঠাৎই একটু কঠিন।

একটু থেকে ‘অনেক কঠিন’ হয়ে এক সময় তা অসম্ভব হয়ে যাওয়ারই প্রবল সম্ভাবনা ছিল, যদি....। যদি? যদি আবার কী! ক্রিকেটে ‘যদি’র কোনো স্থান নেই। অন্য দেশে কথাটা কীভাবে প্রচলিত জানি না, তবে বাংলাদেশে বলে, ‘যদির কথা নদীতে ফেলো’। এই ম্যাচে তা ফেলা যাচ্ছে না, কারণ দুই রান আউটে আর ফুটে ওঠার বদলে ম্যাচটা যে নয় বলের গল্প হয়ে গেল, তার মূলে তো ওই ‘যদি’।

মুশফিকুর রহিম যদি জিমি নিশামের ক্যাচটা না ফেলতেন! ছবি: টুইটার

যদি তাঁর উইকেটকিপিং নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়ে তাসকিনের বলে নিশামের ক্যাচটা মুশফিকুর রহিম না ফেলতেন! যদি ল্যাথামের দেওয়া রুটিন রিটার্ন ক্যাচটা হাতে রাখতে না পারার দৃশ্যটা দেখে অবিশ্বাসে চোখ কচলাতে না হতো!

মাঝখানে তাসকিনের ওভারেই কাভারে ল্যাথামের দেওয়া ক্যাচটাও যদি ধরেন, তাহলে তো নয় বলের মধ্যে তিনটি চান্স। এবং তিনটিই ধরাশায়ী। এরপরও বাংলাদেশ জিতে গেলে 'ক্যাচেস্ উইন ম্যাচেস্' বলে ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরনো আপ্তবাক্যটা অর্থহীন হয়ে যায়।

দুটি রান আউট নয়, এই নয় বলেই আসলে লেখা আছে এই ম্যাচের গল্প। আরেকটু যদি বিস্তৃত করে ভাবেন, তাহলে এর পরের ওভারটাও যোগ নিতে পারেন। তাহলে বিন্দুতে সিন্ধু ধরার কাজটা সুসম্পন্ন হয়। তাসকিনের সেই ওভারে ১৮ রান, প্রথম বলে চারটা লেগ বাই বলে তাঁর দায়ভার অবশ্য ১৪ রানের। সেই যে জয়-পরাজয়ের দোদুল্যমান সমীকরণটা নিউজিল্যান্ডের দিকে স্থির হলো, তা বদলাতে এরপর মহানাটকীয় কিছু হতে হতো। পাঁচ বছর আগে এই দিনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুর সেই ম্যাচের মতো বা এর কাছাকাছি কিছু।

তুলনাটা ঠিক হলো না। ৩ বলে ২ রানের সমীকরণকে পরাজয়ে রূপ দেওয়ার ঘটনা প্রতিদিন ঘটে না। এখানে তো ম্যাচটা তেমন কোনো পরিস্থিতিতে গেলই না। না যাওয়ার কারণ খুঁজতে মাথা চুলকানোর কোনোই কারণ নেই। ফিল্ডিংই ডোবাল বাংলাদেশকে।  যা শুধু ক্যাচ ফেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়।

ডানেডিনে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ যা খেলেছিল, তাতে দ্বিতীয় ম্যাচে এর চেয়ে ভালো না করে উপায় ছিল না। তবে ভালোরও তো রকমভেদ থাকে। এই ভালো 'বেশ ভালো' থেকে প্রায় 'খুব ভালো'তে রূপান্তরিত। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ব্যাটিং ট্যাকটিকস যা হওয়া উচিত, বাংলাদেশের ২৭১-কে বলতে হবে তার সফল রূপায়ণ।

কী সেই ট্যাকটিকস?

ইনিংসের শুরুতে পাওয়ার প্লে বলে কী যেন একটা আছে, তা বেমালুম ভুলে যাওয়া। নতুন বলটা কোনোমতে সামলাও, পরে তোমার সময় আসবে। প্রথম ১০ ওভারে ২৬ রান, আর শেষ ১০ ওভারে ৮৮। যা বলতে চাইছি, তা লেখা আছে এখানেই।

হাফ সেঞ্চুরির হাফ সেঞ্চুরি! যে কীর্তিতে ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র সপ্তম ওপেনার তামিম ইকবাল। ছবি: আইসিসি টুইটার

বাংলাদেশের ইনিংসে দুটি হাফ সেঞ্চুরিরই আলাদা তাৎপর্য আছে। হাফ সেঞ্চুরির হাফ সেঞ্চুরি তামিমকে ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র সাতজনের এক এলিট দলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ওয়ানডে ক্রিকেটের পুরো আয়ুষ্কালে ওপেনারের সংখ্যা ৮৩১। তামিমের অর্জনটাকে বোঝাতে একটু যদি ঘুরিয়ে বলি, এই ৮৩১ জনের মধ্যে ৮২৪ জনেরই হাফ সেঞ্চুরির হাফ সেঞ্চুরি নেই।

আরেকটা মিঠুনের। ২৯তম ওয়ানডেতে ছয় নম্বর হাফ সেঞ্চুরির আবার কী তাৎপর্য? তাৎপর্য আছে রে, ভাই। বাংলাদেশ বলেই আছে। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানে ক্রিকেটারদের প্রতি ভালোবাসার বাড়াবাড়ি প্রকাশের সঙ্গে পাল্লা দেয় নির্দিষ্ট কোনো ক্রিকেটারের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ। ৫৭ বলে ৭৩ রান হয়তো, হয়তো কিছুদিনের জন্য মিঠুনকে মুক্তি দেবে অকারণ সমালোচনা থেকে।

দুই বছর আগে নিউজিল্যান্ড সফরের সুখস্মৃতিও মনে পড়ে গিয়ে থাকবে তাঁর। পুরোটাই অবশ্য সুখের স্মৃতি নয়। প্রথম দুই ওয়ানডেতে হাফ সেঞ্চুরি করার পর হ্যামস্ট্রিংয়ে ইনজুরি তাঁকে তৃতীয় ম্যাচে খেলতে দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিঠুনকে নিয়ে ট্রল করাটাকে যারা অবশ্য পালনীয় নৈমিত্তিক কাজের অংশ বানিয়ে ফেলেছেন, তারা কল্পনাও করতে পারবেন না, মিঠুনকে হারিয়ে ফেলায় কেমন একটা হাহাকার উঠে ছিল বাংলাদেশ দলে। কারণ শুধু দুটি হাফ সেঞ্চুরি নয়। ওই বিরুদ্ধ কন্ডিশনে মিঠুনকেই সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ লাগছিল।

মুশফিকের সঙ্গে মাঝ উইকেটে মোহাম্মদ মিঠুন। ৫৭ বলে অপরাজিত ৭৩ একটু হলেও মুক্তির স্বাদ দেব মিঠুনকে। ছবি: টুইটার

এবার লেখাটা শেষ করতে হয়। তা কী দিয়ে শেষ করি? আচ্ছা, আসুন আমরা পজিটিভ-নেগেটিভ নিয়ে আলোচনা করি।  ক্রিকেট ম্যাচে জিতে গেলে নেগেটিভ খুঁজতে হয়। বুঝতে পারছেন না? বড় দলগুলো জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে সমস্যাগুলোতে আলো ফেলতে ভুলে যায় না। আর হেরে গেলে কী করা? দলকে চাঙ্গা রাখতে নেগেটিভগুলোকে বেশি সামনে না এনে অধিনায়ক-কোচকে তখন পজিটিভ খুঁজতে হয়। তামিম-ডমিঙ্গোর তা খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ব্যাটিং স্ট্র্যাটেজির সফল রূপায়ণের কথা তো বলাই হলো, মোহাম্মদ মিঠুনের কথাও, মাহেদি হাসানও সগৌরবে থাকবেন এই তালিকায়। ছক্কা মারায় সহজাত দক্ষতার প্রমাণ প্রথম ম্যাচেই দিয়েছেন, এ দিনও দিলেন। যদিও এরপরই মনে করিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায় খুব প্রচলিত ওই কথাটা–সিক্স অ্যান্ড আউট!

ছক্কা মারার সহজাত ক্ষমতার সঙ্গে বোলিং মিলিয়ে মাহেদি হাসানকে চিত্তাকর্ষক এক প্যাকেজ বলেই মনে হচ্ছে। ছবি: নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট

কথাটার উৎপত্তি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটাও তাহলে বলে ফেলি। ধরুন, চারপাশে ওয়াল, মাঝখানের জায়গাটায় খেলা হচ্ছে, বল বাইরে গেলে হারিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এ কারণেই ওই ‘সিক্স অ্যান্ড আউট’-এর চোখরাঙানি। ওয়ালের ওপর দিয়ে বল মারলে ছক্কার আনন্দ নয়, উল্টো মেলে আউট হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা। মাহেদির সঙ্গে হুবহু হয়তো মিলল না। ছক্কার ছয় রান তো তিনি ঠিকই পেয়েছেন, আউট তো পরের বলে।

মাহেদিকে পজিটিভের তালিকায় রাখার একটা কারণ অবশ্যই ছক্কা মারার ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা। ঈশ্বরদত্ত না হলে ওই ছোট্ট শরীর নিয়ে এত বড় বড় ছক্কা মারা যায় না। এর চেয়েও বড় কারণ বোলিং। দুটি মিলিয়ে প্যাকেজটা চিত্তাকর্ষকই লাগছে।

নিউজিল্যান্ডকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলাম না, খেলা দেখে থাকলে কমেন্ট্রিতেই হয়তো সেটির কথা জেনে গেছেন। জিততে হলে হ্যাগলি ওভালে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করার রেকর্ড করতে হতো, তা করেও ফেলল নিউজিল্যান্ড। প্রতিপক্ষ এত সহায়তা করলে না করে উপায় থাকে নাকি!