আইপিএলে খেলার জন্য ছুটি চেয়ে চিঠি দিয়েছেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। বিসিবি ছুটি মঞ্জুর করে আইপিএলে খেলার অনাপত্তিপত্র দিয়েছে পরের দিনই। এরপর কেটে গেছে এক মাসেরও বেশি। কিন্তু সাকিব আল হাসানের সেই চিঠি আর ছুটি নিয়ে বিতর্কের পাগলা ঘোড়া ছুটেই চলেছে।

অথচ ঘটনা কিন্তু খুব সরল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ একজন খেলোয়াড় বোর্ডের কাছে ছুটি চেয়েছেন। চাইতেই পারেন। ছুটি দেওয়া না-দেওয়াটা বোর্ডের ইচ্ছা। বোর্ড ঠিক মনে করলে ছুটি দেবে, সাকিবের চাওয়াটা ‘অন্যায়’ মনে হলে ছুটি দেবে না। গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সাকিব আল হাসান বলেই সম্ভবত সেখান থেকে উল্টো গল্পের শুরু। বোর্ড সভাপতি থেকে শুরু করে বোর্ডের আরও অনেকে এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। মিডিয়াতে ঝড় উঠল। সাকিব যা নিয়ে যথেষ্টই বিরক্ত। কাল রাতে ইন্টারভিউ দেওয়ার আগে একবার বললেন, ‘আর কোনো ক্রিকেটার কি ছুটি নেয় না? তাঁদের নিয়ে তো এত কথা হয় না। তাহলে আমাকে নিয়ে এত কথা কেন?’

‘এত কথা কেন’–এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা। তিনি সাকিব আল হাসান বলে। ছুটির চিঠি নিয়ে বিতর্কটা আবার উসকে দিয়েছে একটি অনলাইনের সঙ্গে সাকিবের ভিডিও ইন্টারভিউ। তিনি টেস্ট খেলতে চান না বলে যে কথাটা ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়েই তাঁর মূল আপত্তি। ক্রিকেট বোর্ডকে দেওয়া চিঠিতে টেস্ট প্রসঙ্গে কোনো কথাই লেখেননি বলে দাবি তো করেছেনই, টেনে এনেছেন বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খানকেও। আকরাম তাঁর চিঠিটা পড়েই দেখেননি বলে সাকিবের অনুমানের কারণ একটাই। চিঠিটা পড়লে আকরাম কখনোই বলতেন না, সাকিব টেস্ট খেলতে চান না।

প্যাঁচটা লেগেছে এখানেই। তাই আকরাম খানকে ফোন। জিজ্ঞেস করলাম, চিঠিতে টেস্টের কোনো প্রসঙ্গ না থাকার পরও কেন তিনি বলেছেন, সাকিব টেস্ট খেলতে চান না?  আকরাম উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন, ‘আমাকে দেখান, আমি কোথায় এ কথা বলেছি?’ যে প্যাঁচের কথা বলছিলাম, সেটা আকরামই ছাড়িয়ে দিলেন, ‘সাকিব শ্রীলঙ্কা ট্যুরে না গিয়ে আইপিএল খেলতে চেয়েছে। সবাই জানে, আপনিও জানেন, শ্রীলঙ্কা ট্যুরে বাংলাদেশ শুধু টেস্ট খেলতেই যাবে। এ কারণেই টেস্ট সিরিজ থেকে সাকিবকে ছুটি দেওয়ার কথাটা এসেছে। কিন্তু আমি কখনোই বলিনি যে, সাকিব টেস্ট খেলতে চায় না।’

আর চিঠিটা তিনি পড়েনইনি বলে সাকিবের যে অভিযোগ, এটা শুনে আকরাম একটু বিস্মিতও। ‘সাকিব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে। আমি ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান বলে সেই চিঠি আমার কাছেও এসেছে। আর এত বড় একটা সিদ্ধান্ত, শুধু আমি কেন, বোর্ডের আরও দশজন সেই চিঠি পড়েছে।‘

আইপিএল খেলতে চেয়ে ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহীকে দেওয়া সাকিবের চিঠি উৎপলশুভ্রডটকমের হাতে এসেছে। আকরাম কথাটাতে ঘোর আপত্তি করলেও ‘সাকিব বনাম আকরাম’ নাটকে রূপ নেওয়া এই বিতর্কে দুই জনের কথারই সত্যতা মিলছে। ইংরেজিতে লেখা সাকিবের সেই চিঠিতে ‘টেস্ট’ কথাটাই নেই। বিশ্বকাপ প্রস্তুতির জন্য আইপিএলে খেলার অনুমতিই চিঠির মূল প্রতিপাদ্য। তবে বিসিবি যে একই সময়ে শ্রীলঙ্কায় একটা ট্যুর আয়োজনের চেষ্টা করছে, সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে তাতে।

সাকিবের কথা তাহলে ঠিক। আবার আকরামের কথাও। শ্রীলঙ্কায় পরিকল্পিত ট্যুরে যে শুধু টেস্ট ম্যাচ থাকবে, এটা সাকিবের না জানা থাকার কোনো কারণ নেই। শ্রীলঙ্কা ট্যুর থেকে ছুটি চাওয়া মানে তো তাহলে টেস্ট সিরিজ থেকে ছুটি চাওয়াই।

আরেকটা ধোঁয়াশাও পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো। সাকিবকে কিন্তু বিসিবি পুরো আইপিএলের জন্য ছুটি দেয়নি। সাকিবের চিঠিতে প্রার্থিত ছুটির সময়কাল নিয়ে কোনো কথাই নেই। ছুটির সময়কালটা তাই বিসিবিই নির্ধারণ করেছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তা হলো ১ এপ্রিল থেকে ১৮ মে। আইপিএল শুরু ৯ এপ্রিল, শেষ ৩০ মে। আইপিএলের শেষ অংশটা তাই খেলতে পারবেন না সাকিব। এর কারণটা হলো, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। যেটি খেলতে শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশে আসবে, ২০ মে শুরু হয়ে যে সিরিজ চলবে আইপিএলের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ মে পর্যন্ত।

সংক্ষেপে এই হলো সাকিবের ছুটি-নাটকের কাহিনি। অনেক কিছুতেই সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘প্রথম’। ছুটি নিয়ে আলোচনা-বিতর্কেও সগৌরব প্রথম স্থানটি তাঁর।        

 

সাকিবের সেই চিঠি:

To
The C.E.O
Bangladesh Cricket Board
Mirpur, Dhaka

Subject: Requesting for permission to take part in IPL 2021.

Dear Sir,
With due respect I, Shakib Al Hasan, would like to state that we are scheduled to play T20 World Cup in India on the month of October 2021. This is a very important tournament for us. I believe taking part in the upcoming IPL will give me the best opportunity to prepare for this prestigious tournament. I understand that Bcb is planning to organise a tour in Sri Lanka at the same time when the IPL will take place.

In this circumstance, I would request you to allow me to participate in upcoming IPL and give me the best opportunity to prepare for the T20 World Cup.

Sincerely yours

Shakib Al Hasan
Cricketer
Bangladesh National Cricket Team

 

------

 

চিঠিটা বাংলা করলে এমন দাঁড়ায়:

বরাবর
প্রধান নির্বাহী
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড
মিরপুর, ঢাকা।

বিষয়: আইপিএল ২০২১ এ খেলার অনুমতি চেয়ে আবেদন।

জনাব,
আমি, সাকিব আল হাসান যথাযথ বিনয়ের সঙ্গে এই কথাটি জানাতে চাই যে, আমরা ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি। এটি আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট। আমি বিশ্বাস করি, আসন্ন আইপিএলে অংশ নেওয়া আমাকে এই মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির সেরা সুযোগ দেবে। আমি অবহিত আছি যে,  আইপিএল যখন হবে, বিসিবি একই সময়ে  শ্রীলঙ্কায় একটি সফর আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে।

সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমাকে আসন্ন আইপিএলে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য সেরা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

ধন্যবাদান্তে,

সাকিব আল হাসান
ক্রিকেটার
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল