সুইং বোলার আউট সুইং করতে করতে হঠাৎই একটা বল ভেতরে ঢোকাবেন। টানা বেরিয়ে যাওয়া বল খেলতে খেলতে ব্যাটসম্যান তখন তা এড়ানোর চিন্তায় আচ্ছন্ন। এরই মধ্যে হঠাৎ ভেতরে ঢোকা বল....একটু সমস্যায় তো ফেলবেই ব্যাটসম্যানকে। যুগে যুগে বোলাররা ব্যাটসম্যানদের এই ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে গেছেন।

টানা কয়েকটা শর্ট বল করে পেস বোলার হঠাৎই একটা বল করবেন ওপরে। আগের কয়েকটা বলের প্রভাবে ব্যাটসম্যানের মস্তিষ্ক ততক্ষণে ব্যাক ফুটে যাওয়ার স্বয়ংক্রিয় সংকেত পাঠাতে শুরু করেছে। হঠাৎ ড্রাইভ করা লেংথে বল পেয়ে একটু অপ্রস্তুত তিনি বোধ করতেই পারেন। যুগে যুগে বোলাররা এই ট্যাকটিকস কাজে লাগানোর চেষ্টা করে গেছেন।

এ তো মাত্র দুটি উদাহরণ। চাইলে এমন আরও অনেক দেওয়া যাবে। প্রয়োজন দেখছি না। এ সব কোনো মহাকাশ বিজ্ঞান নয়, সাম্প্রতিক কোনো আবিষ্কারও না। সব ব্যাটসম্যানেরই এ সব জানা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যাটসম্যানদের তো এ সব মুখস্থই।

বোলার যদি ব্যাটসম্যানের পরীক্ষা নেন বলে ধরে নিই, এ সব হলো সেই পরীক্ষার কমন প্রশ্ন। কিন্তু এটা তো আর স্কুল-কলেজের পরীক্ষা নয় যে, প্রশ্ন কমন পড়লেই পাস নিশ্চিত। ক্রিকেটে কমন প্রশ্নের উত্তরেও ব্যাটসম্যানের ভুল হয়। ভুল না হলে তো ব্যাটসম্যান কখনো আউটই হতেন না।

প্ল্যান কাজে লাগার তৃপ্তি। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ট্রেন্ট বোল্ট। ছবি: টুইটার

ডানেডিনে প্রথম ওয়ানেডেতে ট্রেন্ট বোল্টের ‘প্ল্যান’ করে তামিম ইকবালকে আউট করা নিয়ে এত কথা হচ্ছে দেখে এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার অবতারণা। এমন প্ল্যান বোল্ট নিশ্চয়ই সব সময়ই করেন। এমন প্ল্যান বলতে হুবহু এটাই নয়। উইকেট, ব্যাটসম্যান, ম্যাচের পরিস্থিতি ভেদে প্ল্যানও নিশ্চয়ই বদলায়।  কখনো তা সফল হয়, কখনো হয় না। ক্রিকেট খেলাটাই তো তা-ই। বোলারের সব প্ল্যান সফল হলে ব্যাটসম্যানরা কেউ রানই করতে পারতেন না। আবার ব্যাটসম্যানরা বোলারের অনুমিত প্ল্যান নস্যাৎ করে দিলে উইকেটই পড়ত না।

কথাগুলো একটু বোকা বোকা শোনাতে পারে। কারও এমন মন হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয় যে, এসব পুরনো কথা নতুন করে বলার কী হলো! কে না তা জানে! 

তারপরও বলছি, কারণ দলীয় খেলার মোড়কে ব্যাটসম্যান-বোলারের ব্যক্তিগত লড়াইটাকে আমার কাছে ক্রিকেটের অনন্য অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বলে মনে হয়। এটাও বোধ হয় এমন ঘটা করে বলার মতো কিছু নয়। ক্রিকেট খেলার প্রাণভোমরাই যে ওই ব্যাটসম্যান-বোলার দ্বৈরথে লুকিয়ে, এটাও তো কারও অজানা থাকার কারণ নেই।

কখনো কখনো কোনো বোলার এমন একটা বল করে ফেলেন, তা খেলার সাধ্য কোনো ব্যাটসম্যানেরই থাকে না। সব সময়ই যে তা বোলারের কৃতিত্ব, এমনও নয়। কখনো কখনো উইকেটেরও তাতে ভূমিকা থাকে। বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচের পরের দিনগুলোর উইকেটের। এ ধরনের বলকে একেক ভাষায় একেক নামে ডাকা হলেও ‘আনপ্লেয়েবল’ দিয়ে মোটামুটি সবাইকেই তা বোঝানো যায়। সর্বজনস্বীকৃত ‘আনপ্লেয়েবল’ বল ব্যাটসম্যানের জন্য দুঃস্বপ্ন, পরে যদিও তা একটু স্বস্তির ঢালেও পরিণত হয়। দায়মুক্তির স্বস্তি। আহা, বেচারার তো কিছু করার ছিল না।

সৌম্য সরকার যেভাবে আউট হয়েছেন, তাতে প্রশ্ন উঠবেই। ছবি: টুইটার

নইলে কি হয়? কোনো ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পর তাঁর কী ভুল হয়েছে, তা নিয়ে অবধারিতভাবেই কাটাছেঁড়া চলে। বেশির ভাগ সময় দাঁড়াতে হয় কাঠগড়াতেও। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটু বেশিই হয়। তা হওয়া স্বাভাবিকও। বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা যেহেতু প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার আসার মতোই নিয়মিত চক্রে ফিরে ফিরে আসে, আলোচনা-সমালোচনা একটু বেশি তো হবেই। নইলে অন্য দলগুলোও কখনো কখনো এমন সব ব্যাটিং প্রদর্শনী মেলে ধরে, ব্যাটসম্যানদের নাম ধরে ধরে চিন্তা করলে যা চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না। ভারতের গত অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেড টেস্টের উদাহরণ দিতে গিয়েও একটু থমকে গেলাম। আপনি তো তা জানেনই। পার্থক্যটা হলো, ৩৬ রানে অলআউট হওয়ার পরই ভারতের মতো দলগুলো বিপুল বিক্রমে ফিরে আসতে পারে। আসেও, এসেছেও। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেহেতু বেশির ভাগ সময়ই তা ঘটে না, তাই একটা বাজে পারফরম্যান্সের পরই একেবারে গেল-গেল রব উঠে যায়।

ডানেডিনে প্রথম ওয়ানডেতে ১৩১ রানে অলআউট হওয়ার প্রতিক্রয়াই দেখুন না! বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বাজে ব্যাটিং করেছে। এ নিয়ে তো আর তর্ক করার কিছু নেই। তর্কের মীমাংসা করতে জ্বলজ্যান্ত স্কোরকার্ডই তো আছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের অপরিচিত বিরুদ্ধ কন্ডিশন, দুর্দান্ত বোলিং অ্যাটাক, ট্যুরের প্রথম ম্যাচ –এ সব কি একটুও বিবেচনা দাবি করে না! বাংলাদেশের তুলনায় অনেক শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপকেও তো নিউজিল্যান্ডে গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করতে দেখেছি। তা-ও একবার-দুবার নয়। গতি, সুইং, বাউন্স –এই তিনটি আলাদা আলাদাভাবেও ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় পরীক্ষার নাম। আর এই তিনটির ককটেল তো রীতিমতো আততায়ীর রূপ নেয়। আর ব্যাটসম্যানেরা যদি উপমহাদেশীয় হন, তাহলে তো কথাই নেই। তখন ব্যাপারটা দাঁড়ায়, নিস্তরঙ্গ পুকুরে সাঁতার কাটতে অভ্যস্ত কাউকে হঠাৎ তরঙ্গায়িত সাগরে নামিয়ে দেওয়ার মতো।  

হ্যাঁ, সেই চিরন্তন প্রশ্নটা উঠবেই উঠবে। বাংলাদেশের ম্যাচের যত ম্যাচ রিপোর্ট লিখেছি, খুঁজলে তাতে সবচেয়ে কমন পাওয়া যাবে সম্ভবত এই প্রশ্নটাই–আউটগুলোতে বোলারের যতটা কৃতিত্ব, ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতা কি তার চেয়ে বেশি নয়? ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার অভিযোগটাও একই রকম নিয়মিতই থেকেছে তাতে। তা করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেও ভুলে গেছি, অনেক সময়ই আপাত সফট ডিসমিসালের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে আসলে এর আগের কিছুটা সময়ে ব্যাটসম্যানের মানসিক স্থৈর্য নাড়িয়ে দেওয়া আগের কিছু বল। তারপরও ব্যাটসম্যানের ভুল তো থাকেই। 

ক্রিকেটে জয়-পরাজয়টাকে এই জাতি এমন জীবন-মরণ ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে যে, এই মজার কথা বললে কারও তেড়ে আসাটাও বিচিত্র নয়।

'ব্যাটসম্যানের ভুল'-এর কথা ওঠায় বাংলাদেশের সাবেক কোচ ট্রেভর চ্যাপেলের একটা কথা মনে পড়ে গেল। সেটাও বাংলাদেশের এক নিউজিল্যান্ড সফরেই। ২০০১ সালে বাংলাদেশের প্রথম সফর। হ্যামিল্টন টেস্টে ৩৮ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন হাবিবুল বাশার। তারপর স্বভাব অনুযায়ী আউট হয়ে গেছেন ক্রিকেটের ভাষায় একটা লুজ শট খেলে। বাংলাদেশের বাকি ব্যাটসম্যানরা রান করায় হাবিবুলকে অনুসরণ করতে না পারলেও লুজ শট খেলায় তা করতে পেরেছেন। দিনের খেলাশেষে ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে ট্রেভর চ্যাপেলকে প্রশ্ন করলাম, ‘বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা তো সবাই নিজেদের ভুলে আউট হয়ে এসেছে।’

‘প্রশ্ন’ বলছি এ ব্যাপারে ট্রেভর চ্যাপেলের মন্তব্য জানতে চাইছি বলে। নইলে আসলে তো এটা মন্তব্য। মুখে পরিচিত সেই কাষ্ঠহাসি ফুটিয়ে ট্রেভর চ্যাপেল উত্তর দিলেন, ‘ক্রিকেটের নব্বই শতাংশ আউট তো ব্যাটসম্যানের ভুলেই হয়।’ শতাংশের হিসাবটা তো আর পরিসংখ্যান ঘেঁটে গবেষণা করে বের করা নয়। তাই একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে। তবে মূল কথাটা তো তাতে বদলাচ্ছে না। ব্যাটিং ব্যাকরণ অনুযায়ী যা যা করার কথা, ঠিকভাবে তা করলে ওই যে ‘আনপ্লেয়েবল’ বলের কথা বললাম, তেমন বল ছাড়া তো ব্যাটসম্যানের আউটই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ব্যাটিং ব্যাকরণ জানা আর কার্যক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা তো আর এক কথা নয়। এর মাঝখানে আরও অনেক কিছু আছে।

এই ‘অনেক কিছু’টাই ক্রিকেটের মজা। ক্রিকেটে জয়-পরাজয়টাকে এই জাতি এমন জীবন-মরণ ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে যে, এই মজার কথা বললে কারও তেড়ে আসাটাও বিচিত্র নয়।