যে মাঠে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেটা হলো, সেই ইউনিভার্সিটি ওভাল মাঠের দুটি ‘প্রথম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। ২০০৮ সালে এই মাঠে প্রথম টেস্ট ম্যাচের একটা দল ছিল বাংলাদেশ। দুই বছর পর প্রথম ওয়ানডেতেও তা-ই।

এই দুটি ‘প্রথম’ তো আর এমন বিশেষ কিছু নয়। তা ‘বিশেষ কিছু’ বলে মানতেই হবে, ডানেডিনে এমন ‘প্রথম’ খুঁজতে গেলেও আপনি আর থই পাবেন না। স্কটিশদের প্রতিষ্ঠিত এই শহরে ‘প্রথম’-এর ছড়াছড়ি। নিউজিল্যান্ডের অনেক কিছুই প্রথম হয়েছে একসময় সোনার খনির কল্যাণে এই দেশের ব্যস্ততম ও সবচেয়ে সম্পদশালী শহরে।

যে ইউনিভার্সিটির মাঠে ম্যাচটা হলো, সেই ইউনিভার্সিটি অব ওটাগো নিউজিল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। নিউজিল্যান্ডের প্রথম সংবাদপত্র বেরিয়েছে এখান থেকে।  ১৮৬১ সালে প্রথম প্রকাশিত সেই ওটাগো ডেইলি টাইমস এখনো সগৌরবে টিকে আছে। খেলা দেখে থাকলে মেইন স্ট্যান্ডের গায়ে এই পত্রিকার বিশাল হোর্ডিংটাও আপনার চোখে পড়ে থাকবে।

নিউজিল্যান্ডের প্রথম গার্লস স্কুল এখানে, প্রথম চকলেট ফ্যাক্টরি (ক্যাডবেরি), প্রথম আর্ট গ্যালারি, প্রথম বোটানিক্যাল গার্ডেন, প্রথম কেবল কার, প্রথম গ্যাসে জ্বালানো বাতি—এমন অসংখ্য ‘প্রথম’। নিউজিল্যান্ডে টেলিফোনে প্রথম কলটাও করা হয়েছিল এখান থেকেই। এখন যা নিউজিল্যান্ডের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, সেই হিমায়িত মাংস নিয়ে প্রথম জাহাজটাও ছেড়েছিল ডানেডিনের চামার্স বন্দর থেকে।

এত সব ‘প্রথম’-এর শহরে তুলনায় মামুলি দুটি প্রথমের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে যাওয়াটা তো নিছকই কাকতালীয়। ডানেডিনে বাংলাদেশের ম্যাচ পড়লেই মনে হয়, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়টা এত সব ‘প্রথম’-এর শহরে এলে তা খুবই মানানসই হতো। এর আগে দুটি ওয়ানডেতে তা হয়নি, কালও হলো না। কথাটায় আফসোসের সুর ধরা পড়ল না তো আবার! তাহলে ক্ষমা চেয়ে নিই। ম্যাচ যা হয়েছে, তাতে জয়-টয় নিয়ে কথা বলাটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

তামিম ইকবালের উইকেট নিয়ে বোল্টের প্রথম আঘাত। ছবি: আইসিসি টুইটার

‘প্রথম’-এর বদলে চলুন তাহলে আমরা ডানেডিনের অন্য কিছুর সঙ্গে এই ম্যাচটার মিল খুঁজি। ম্যাচটা না বলে অবশ্য বাংলাদেশের ইনিংসটা বলাই ভালো। সেই মিল পেতেও সমস্যা হচ্ছে না। বিশ্বের সবচেয়ে খাড়া রাস্তার সঙ্গে মেলালেই তো হয়। সেটিও এই ডানেডিনেই। রাস্তার নাম বল্ডউইন স্ট্রিট। যে রাস্তার শেষ মাথায় উঠতে গিয়ে আপনার মনে হতেই পারে, এ কি রাস্তা না কি এভারেস্টে উঠছি! নেমে আসার পর আরও বেশি মন হবে। কারণ তখন যে এই কৃতিত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়। যদিও তা বিনা মূল্যে নয়।

স্বাভাবিক একটা রাস্তা যেখানে এসে খাড়া উঠতে শুরু করেছে, সেখানে ছোট্ট একটা দোকান। নাম, পটারি অ্যান্ড সার্টিফিকেট শপ। ভেতরে বল্ডউইন স্ট্রিটের ছবি-সংবলিত সব পটারি সাজানো। ছোট ছোট পোস্টকার্ডও। এখন দাম কত হয়েছে জানি না। ২০০৮ সালে একেকটার দাম ছিল এক নিউজিল্যান্ড ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে খাড়া রাস্তায় ওঠার স্বীকৃতি সম্বলিত সার্টিফিকেটের বিনিময় মূল্য দুই ডলার। যা কেনার পর তাতে নাম লিখে দেওয়া হয়। কত তারিখে এই রাস্তায় আরোহন করা হয়েছিল, সেটিও।

খাড়া রাস্তা মানে কতটা খাড়া, আপনার মনে এই কৌতূহল জাগাটা খুবই স্বাভাবিক। এটা বোঝাতে ‘গ্র্যাডিয়েন্ট’ বলে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং টার্ম ব্যবহার করতে হয়। তার চেয়ে বরং সহজ করে বলি, প্রতি ২.৮৬ মিটার এগোলে রাস্তাটা এক মিটার উঁচু হয়ে যায়। প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ১৩২ রানের ইনিংসটার সঙ্গে মিলটা এখনো ধরতে পারছেন না?

আচ্ছা, তাহলে বুঝিয়ে বলি। একটা দল প্রথমে ব্যাটিং করতে নামলে কী লক্ষ্য থাকে? অবশ্যই যত বেশি সম্ভব রান করা, তাই তো! উইকেট-আবহাওয়া সব বিবেচনায় নিয়ে কাল্পনিক একটা স্কোরও থাকে মাথায়। তামিম ইকবালের মাথায় ঘুরপাক খাওয়া সেই অঙ্কটা কত ছিল, তা তো আর জানার উপায় নেই। তবে তা যে আড়াই শ-টাড়াই শর কম না, এটা তো আমরা অনুমান করে নিতেই পারি। যদিও এই ছোট মাঠে আড়াই শ উইনিং স্কোর তো নয়ই, ফাইটিং স্কোরের স্বীকৃতিও পাবে টেনেটুনে।

   ম্যাচের সবচেয়ে নিয়মিত যে দৃশ্য। ছবি: আইসিসি টুইটার

তার পরও সেটাই যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে, বাংলাদেশের জন্য সেখানে পৌঁছানোর পথটা ক্রমশই খাড়া থেকে আরও খাড়া হয়ে গেছে। বল্ডউইন স্ট্রিট আর কী, তার চেয়ে অনেক বেশি। হাঁসফাস করে হলেও আপনি তা-ও বল্ডউইন স্ট্রিটের মাথায় পা রাখতে পারবেন। রাস্তা দিয়ে হেঁটে না পারলে পাশেই সিঁড়ি আছে। বাংলাদেশের ইনিংস রাস্তা দিয়ে উঠবে দূরে থাক, ‘সিঁড়ি’ দিয়েও তো গন্তব্যের ছায়াটাও দেখতে পেল না।

এক সময় বরং কুইন্সটাউন খুব তীব্রভাবেই উঁকি দিতে শুরু করেছিল। কুইন্সটাউন মানে ২০০৭ সালের থার্র্টি ফার্স্টের বিখ্যাত সেই ম্যাচ। যাতে বাংলাদেশ ৯৩ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল। এই ৯৩ আসল গল্প নয়। বাংলাদেশ এর চেয়েও কম রানে অনেকবার অলআউট হয়েছে। অন্য সব দলও। কুইন্সটাউন বিখ্যাত হয়ে আছে ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ব্যাটিং তাণ্ডবের কারণে। বাংলাদেশের ৯৩ পেরোতে নিউজিল্যান্ডের লেগেছিল মাত্র ৬ ওভার। এটাকেও ব্যতিক্রমী বলেই মানতে হবে, ছয় ওভারের ৩৬ বলের ২৮টিই খেলেছিলেন ম্যাককালাম। ওই ২৮ বলেই করেছিলেন ৮০ রান। বাংলাদেশের স্কোরটা আরেকটু বড় হলে ওয়ানডেতে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটা সেদিন ভেঙে যায়।

কুইন্সটাউনের মাঠটা অপূর্ব সুন্দর। আসলে তো তা স্টেডিয়াম না, একটা ইভেন্ট সেন্টার। বিশাল খোলা মাঠ, সেই মাঠের একটা পাশে সবুজ ঘাসে ঢাকা ঢাল, যেখানে বসে পেছনে তাকালেই পাহাড়। চারপাশে এমন অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মধ্যে ম্যাককালামের তাণ্ডব দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, যা হচ্ছে, এর নাম হওয়া উচিত–মার্ডার ইন প্যারাডাইস।  

দ্য হেরাল্ড পত্রিকায় দেখা ওই বিজ্ঞাপনটার কথাও মনে পড়ছিল। বাংলাদেশের জন্য রীতিমতো অপমানজনক বিজ্ঞাপন। অকল্যান্ডে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাঠে দর্শক আনতে নিউজিল্যান্ডের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকে ছাপা হওয়া সেই বিজ্ঞাপনে দুই অধিনায়কের ছবির পাশে বড় করে লেখা: যে ম্যাচে সবচেয়ে বেশি বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার রেকর্ড হবে। নিশ্চিত ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণও অবশ্য ছোট হরফে লেখা ছিল: প্রকৃত ফলাফল অন্যরকমও হতে পারে।

বিশ্ব রেকর্ডের রেকর্ডের প্রতিশ্রুতি দেওযা অকল্যান্ড ওয়ানডেতে কোনো রেকর্ডই হয়নি, নেপিয়ারে পরের ম্যাচে বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে হারলেও সেখানেও না। কুইন্সটাউনের ওই ওয়ানডেতে সবচেয়ে কম বল খেলে সবচেয়ে বেশি রান সফলভাবে তাড়া করার রেকর্ড হলেও হয়ে থাকতে পারে। তবে এটা তো আর রেকর্ড বইয়ে স্থান পাওয়ার মতো কিছু নয়। রেকর্ড বইয়ে সবচেয়ে বেশি বল হাতে রেখে জয়ের জন্য যে একটা পৃষ্ঠা বরাদ্দ আছে, সেখানে ২৬৪ বল বাকি থাকতে নিউজিল্যান্ডের জয় কুইন্সটাউন ওয়ানডেকে চার নম্বরে রেখেছিল। এখন তা পাঁচে নেমে গেছে।

ওই ম্যাচের পর টিম হোটেলে বাংলাদেশের অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের বড় একটা ইন্টারভিউ করেছিলাম। অপরূপ কুইন্সটাউনে নতুন বছর আবাহনের আয়োজন চলছে চারপাশে, যে শহরে নেমেই আশরাফুল দারুণ এক বাণী দিয়েছেন: যে দিকে তাকাই, সেদিকেই ভিউকার্ড। সেই উৎসবের আবহের সঙ্গে বেমানান হয়ে হতচকিত বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা একেকজন যেন শোকসভার অতিথি। অধিনায়ক বলে আশরাফুলের মধ্যে শোকের প্রকাশটা আরও বেশি। একটু পরপরই যে কথাটা বলছিলেন, তা দিয়েই ইন্টারভিউটার হেডিং করেছিলাম: ‘কী বলব...বিশ্বাসই হচ্ছে না!’

কল্পনা করতে চেষ্টা করছি, এই ট্যুরে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা থাকলে তামিম ইকবাল তাঁদের কী বলতেন? ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না’ বলে দাবি নিশ্চয়ই করতেন না। গাপটিল যেভাবে শুরু করেছিলেন, তাতে কুইন্সটাউন একটু উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তো ২২তম ওভার পর্যন্ত মাঠে রাখা গেছে নিউজিল্যান্ডকে। কম কী!

বাংলাদেশের ইনিংস প্রায় শেষ হলো বলে. ..। ছবি: আইসিসি টুইটার

৫০ ওভারের ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ২২তম ওভার পর্যন্ত ব্যাট করাতে পারাটাতেও যদি একটু তৃপ্তি মেলে, ম্যাচের একতরফা চরিত্র বোঝাতে আর কিছু আসলে বলতে হয় না। বাংলাদেশের ইনিংসটা একটু এগোনোর পরই তো বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল যে, ইনিংসের প্রথম স্কোরিং শটটা ছিল ছক্কা। এই মাঠেই তামিমের টেস্ট অভিষেক, আজ আবার ছিল তাঁর জন্মদিন। ট্রেন্ট বোল্টকে আপার কাটে মারা ছক্কাটা দেখে মনে হয়েছিল, জন্মদিনে অন্য কারও কাছ থেকে উপহার পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে উপহারের ব্যবস্থা তিনি নিজেই করে নেবেন। এই ভ্রান্তিবিলাসে অবশ্য বেশিক্ষণ ভুগতে দেননি।       

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ কেন পারে না, তার সবচেয়ে কারণ হিসাবে অবধারিতভাবেই কন্ডিশনের কথা আসে। অনেক ঠান্ডা থাকে, বাতাসও। বল অনেক বেশি সুইং করে, তা অবশ্য শুধু কন্ডিশনের গুণে নয়। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা বল সুইং করাতেও জানে। নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের চারটি ট্যুর কাভার করার কল্যাণে জানি, সুইংয়ের চেয়েও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বেশি ভোগায় বাউন্স। সাধারণ দর্শকের কাছে এই বাড়তি বাউন্স ব্যাপারটা হয়তো তেমন বড় কিছু মনে হয় না, তবে ব্যাটসম্যানদের জন্য তা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন। তা এটি সামলানোর টেকনিকও তো আছে। কঠিন, কিন্তু অসম্ভব কিছু তো আর নয়। রানসংখ্যায় প্রতিফলিত না হলেও লিটন দাস যা কিছুটা হলেও দেখিয়েছেন।

এই ম্যাচের আগে অনেকগুলো বিষয় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ছিল। দলের মূল দুই ব্যাটসম্যান নেই, যাঁদের একজন আবার অধিনায়ক। সর্বশেষ ওয়ানডে প্রায় এক বছর আগে। জেনে একটু অবাকই লাগে, ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর এটি নিউজিল্যান্ডের মাত্র চতুর্থ ওয়ানডে। ২০১২ সালের পর এই প্রথম দলে তিনজন ডেবুট্যান্ট।

ম্যাচ দেখে অবশ্য এসব কিছুই বোঝার উপায় থাকল না। মনে হলো, নিউজিল্যান্ড খেলার মধ্যেই ছিল। বাংলাদেশই বরং অনেক দিন পর ওয়ানডে খেলতে নেমেছে।