ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে যতই জাপান ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ বলে পড়ে থাকি না কেন, সূর্য আসলে সবার আগে ওঠে নিউজিল্যান্ডে। নতুন বছরের নতুন সূর্যও তাই সবার আগে দেখে নিউজিল্যান্ডাররা। আমারও একবার তা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ২০০৮ সালের প্রথম সূর্য। ছবির মতো সুন্দর কুইন্সটাউনে নিউ ইয়ার উদযাপনের সেই অভিজ্ঞতা বাকি জীবনের সঞ্চয় হয়ে আছে।

আতশবাজিতে আলোকিত আকাশ দেখতে দেখতে নিজেকে একটু বিল গেটস-বিল গেটস বলেও মনে হচ্ছিল। এখানে বিল গেটস আসছেন কীভাবে? আসছেন, কারণ মাইক্রাসফটের অধীশ্বর সেবার নিউ ইয়ার উদযাপন করতে কুইন্সটাউনে গিয়েছিলেন।

কুইন্সটাউনে যখন নতুন বছরের প্রথম দিন শুরু হয়ে যাচ্ছে, হিসাব করে দেখলাম, বাংলাদেশে তখন বিকেল ৫টা। নতুন বছরের প্রথম সূর্যটা দেখেই সেই রাতে, মানে ভোরে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। নিউজিল্যান্ডের নতুন একটা নামও মাথায় এসেছিল তখনই ‘উদিত সূর্যের দেশ’। সেই নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের আরেকটি সিরিজ শুরুর আগে মনে হচ্ছে, ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে নামটা আসলে হওয়া উচিত আবুল হাসানের কবিতার পঙ্ক্তি দিয়ে। উদিত দুঃখের দেশ।

বাংলাদেশের জন্য নিউজিল্যান্ড তো তা-ই। এমনিতে নিউজিল্যান্ড দারুণ এক দেশ। প্রকৃতি সুন্দর, মানুষ সুন্দর, সাংবাদিক হিসাবে বাড়তি সুবিধা পত্রিকার লেখার জন্য অঢেল সময়। আমার তো খুবই পছন্দের দেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরও নিউজিল্যান্ড ট্যুর খুব প্রিয় বলেই জানি। কিন্তু ক্রিকেটের কথা উঠলেই তা আর প্রিয় থাকে না। নিউজিল্যান্ড হয়ে যায় ‘উদিত দুঃখের দেশ’! 

দুই বছর আগে বাংলাদেশের সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে তামিম ইকবালের ইন্টারভিউ করছি। ওয়ানডে সিরিজ মাত্রই শেষ হয়েছে। তিন ম্যাচে রান ৫, ৫ ও ০। এই সময়গুলোতে তামিমের মুখের দিকে তাকানো যায় না। স্কোরগুলো যেন মুখে ভেসে ওঠে।  ট্যুরের শুরুতে নিউজিল্যান্ড নিয়ে মুগ্ধতার কথা বলেছেন। আবারও সেই প্রসঙ্গ ওঠায় তামিম ঘোষণা করে দিলেন, ‘এই মুহূর্তে নিউজিল্যান্ড আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দেশ।’ এর পর স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘ক্রিকেটের কথা বললে বাংলাদেশের জন্যও তো সবচেয়ে খারাপ দেশ।’

‘সবচেয়ে খারাপ দেশ’, কারণ বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারে না। এই দুই দেশের ক্রিকেট দ্বৈরথে আশ্চর্য একটা খেলা চলছে। বাংলাদেশে খেলা হলে বাংলাদেশ জেতে। নিউজিল্যান্ডে খেলা হলে নিউজিল্যান্ড। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের পর কোনো ওয়ানডে জিততে পারেনি নিউজিল্যান্ড। এর পর অবশ্য বাংলাদেশে ওরা এসেছেই মাত্র দুবার। সর্বশেষ সেই আট বছর আগে। এর মধ্যে প্রথমবার, ২০১০ সালে ওয়ানডে সিরিজে ৪-০ হেরে ‘বাংলাওয়াশ’ কথাটাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট অভিধানে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। কেউ যেন তা ভুলে না যায়, তিন বছর পর এসে ৩-০তে হেরে সেই বন্দোবস্তও করেছে। 

নিউজিল্যান্ডকে ‘উদিত দুঃখের দেশ’ বলছি সে দেশে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১৩ ওয়ানডে, ১৩ পরাজয়ের রেকর্ড মনে রেখে। নইলে নিউজিল্যান্ড তো বাংলাদেশের ক্রিকেটে কম আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসেনি। দুটি বাংলাওয়াশ তো আছেই, ২০০৮ সালে আইসিএল-কবলিত ভাঙাচোরা বাংলাদেশ দলের সেই জয়ের কথাই বা ভুলবেন কিভাবে! সে সময়ের বিচারে যা বড় এক আপসেটই ছিল।

দুই দলের ওয়ানডে লড়াইয়ে গত এক যুগের ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ বাংলাদেশে রাজা, নিউজিল্যান্ড নিউজিল্যান্ডে। এই ধাঁধার সমাধান তো তাহলে খুব সহজ। একটা শব্দেই যেটির ব্যাখ্যা করা যায়–কন্ডিশন। বাংলাদেশের স্লো-লো স্পিনিং উইকেটে হাবুডুবু খায় নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের সিমিং ও বাউন্সি উইকেটে বাংলাদেশ। 

প্রথম ওয়ানডের আগে ডানেডিনের ইউনিভার্সিটি অব ওভাল মাঠে প্র্যাকটিস শুরুর আগে বাংলাদেশ দল। ছবি: বিসিবি

দুই বছর আগের ট্যুরে ডানেডিনে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচের সময় নিউজিল্যান্ডের সাবেক দুই কোচ ওয়ারেন লিস ও মাইক হেসনের সঙ্গে গল্প করতে করতে আমরা তিনজনই এই ব্যাখ্যায় প্রায় একমত হয়ে গিয়েছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, তিনজনের চোখেই প্রায় একই সময়ে এই থিওরির একটা ফাঁক ধরা পড়ল। ওয়ানডেতে বিপ্লব এনে দেওয়া ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেই নিউজিল্যান্ড দলের কোচ ওয়ারেস লিস ‘এই কন্ডিশন বাংলাদেশের জন্য আসলেই কঠিন। বাংলাদেশে ওরা যেমন উইকেটে খেলে…’ জাতীয় সান্ত্বনাসূচক কথা বলতে বলতে হঠাৎ থমকে গেলেন। পাশ থেকে মাইক হেসন আর আমি দুজনই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলাম, ‘তাহলে ডাবলিনে কী হয়েছিল? কার্ডিফে?’ ওয়ারেন লিস বললেন, ‘আমিও সে কথা মনে পড়াতেই থেমে গেলাম।‘

২০১৯ বিশ্বকাপের আগে ডাবলিনে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। কার্ডিফে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ওই জয় তো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা জয়গুলোর প্রথম তিনেই থাকবে। ডাবলিন আর কার্ডিফের কন্ডিশন তো আর নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের সঙ্গে খুব একটা আলাদা ছিল না। সেখানে পারলে নিউজিল্যান্ডে কেন পারে না বাংলাদেশ? শেষে আমরা তিনজনই একমত হয়ে গেলাম, খেলায় যেমন অমীমাংসিত কিছু রহস্য থাকে, এটিও তারই একটি। অমীমাংসিত রহস্যের কথা বলতে গিয়ে একটা উদাহরণ তাৎক্ষণিকভাবে মাথায় এলো। বিশ্বকাপে পাকিস্তান যেমন ভারতকে হারাতে পারে না।

যে ডানেডিনে নিউজিল্যান্ডে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিল বাংলাদেশ, এবার প্রথম ম্যাচও সেখানেই। খেলার আনন্দে খেলার সময়টা মনে করিয়ে দেওয়া ইউনিভার্সিটি অব ওভাল মাঠে। যেখানে পা রাখলেই তামিম ইকবালকে নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। ২০০৮ সালে এই মাঠেই যে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। টেস্ট অভিষেক এমনিতেই ভোলার জিনিস নয়। তামিম ইকবাল তো আরও ভুলবেন না। দুই ইনিংসে ৫৩ ও ৮৪ রান করে সেই অভিষেককে যে তিনি রঙিন করে রেখেছিলেন। সেদিন তো নিশ্চয়ই কল্পনাও করেননি, তের বছর পর এই মাঠেই তিনি অধিনায়কের ভূমিকায় বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড দুঃখ ঘোচানোর মিশনে নামবেন!