শুভ্রদার সঙ্গে আড্ডায় বসলে সবার আগে যে গল্পটা আসে, সেটা একটু অদ্ভুত।

২০০০ বা ২০০১ সাল হবে। প্রথম আলো অফিসে সন্ধ্যার সময় সাফারি পরা একজন মধ্যবয়সী প্রাজ্ঞ চেহারার মানুষ ঢুকলেন। খুব ভদ্রভাবে রিসেপশনে জানতে চান, ‘উৎপল শুভ্র আছেন?’

রিসেপশনের সামনে এক চিলতে জায়গায় দু-তিনটা চেয়ার পাতা থাকত, আমরা যাকে বলতাম বটতলা, আমি সেই বটতলায় নিজের রিপোর্ট শেষ করে রাজা–উজির মারছি। মানুষটার প্রশ্ন শুনে খানিকটা অবাক। পত্রিকা অফিসে সন্ধ্যায় ক্রীড়া সম্পাদকের সন্ধানে যে কেউ আসতে পারে, কিন্তু শুভ্রদার বেলায় সাধারণত তেমনটা হয় না। পরিচিত কেউ অফিসে আসতে চাইলে এমনভাবে মানুষটাকে নিরুৎসাহিত করতেন যে, সে বরং এর চেয়ে ‘নরকে’ যাওয়াটাই ভালো মনে করবে। তাহলে এই মানুষ কে?

ভেতরে রিসেপশনে জানানো হলো যে তার গেস্ট আছে। ওপাশ থেকে কী বলা হলো জানি না। কিছুক্ষণ পর ভেতরে গিয়ে দেখি, শুভ্রদা একজনকে খুব ধমকাচ্ছেন, আর ঠিক সেই সময়ই গুটি গুটি পায়ে মানুষটি হাজির। শুভ্রদা ধমকের ফাঁকে একবার তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন বোধ হয়। মানুষটি সেই চোখে কী দেখলেন কে জানে। আমি দেখলাম, কোনো কথা না বলে সোজা উল্টো ঘুরে গেছেন। কৌতূহলে বাইরে বেরিয়ে তাঁকে অনুসরণ করে দেখি, তিনি সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে সোজা অফিসের বাইরে।

শুভ্রদাকে পরিচয় করানোর জন্য খুব ভালো গল্প নয়, কিন্তু আদর্শ গল্প বোধ হয়। আমরা যারা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি, তারা মনে করি, সত্যিকারের উৎপল শুভ্রর চেহারা হচ্ছে এ-ই। কাজের সময় দুনিয়ার সবকিছুই তাঁর কাছে তুচ্ছ। চেনা মানুষ তখন অচেনা হয়ে যায়। ধমকাধমকি করতে গিয়ে যে কখনো কখনো কাউকে ব্যক্তিগতভাবে প্রায় শত্রু বানিয়ে বসছেন যে, সে বিষয়ে উদাসীন। নিখুঁত হতে হবে। সেরা হতে হবে—এই মন্ত্রের প্রেরণায় জগৎ–সংসারকে তুচ্ছ করে তিনি মজে নিজের তৈরি এক আশ্চর্য পৃথিবীতে। সাংবাদিকতা, কাজ তাঁর কাছে ধর্ম। সেই ধর্মে যে বা যারা সঙ্গী হতে পারে না, উৎপল শুভ্রর পৃথিবী তাদের জন্য নয়।

উৎপল শুভ্রর পৃথিবীটা কেমন! ক্রিকেটময়। সেটা তো আপনারা জানেনই। আমরা যারা সঙ্গী, তারা জানি, এটা সত্যের খণ্ডিত চেহারা। আসলে ক্রিকেটের বেষ্টনীতে তাঁকে আটকে রাখা একটা ভুল সীমানা দেয়াল তৈরি করা। তাঁর পৃথিবী খেলাময়। এবং এটাও বোধ হয় চূড়ান্ত সত্য নয়। তাঁর চেয়ে বেশি রবীন্দ্রসংগীত কি কেউ শোনে? তাঁর মতো করে সাহিত্য পড়ে খুব কম লোক। তাঁর মতো করে উপস্থিত রসিকতায় আসর মাত করতে পারে কয়জন? কিন্তু এই বহুমাত্রিকতা যে সঠিক মর্যাদায় বিকশিত হয়নি, এর কারণও কিন্তু খেলা। খেলাই পিঠের ভার হয়ে টেনে ধরেছে পেছনের দিকে—আমি প্রায়ই সেটা বলি। তিনি মানতে গিয়েও মানেন না। বুঝতে পারি, কোনো কিছুর বিনিময়েই খেলাকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে রাজি নন। খেলা আমাদের কাছে বিনোদন। উৎপল শুভ্রর কাছে পূজা-প্রার্থনা। এর পূজারি হয়ে জীবন যে কাটিয়ে দিতে পারছেন, এখানেই মনে করেন জীবনের সার্থকতা। প্রাপ্য সবটা তাই পাওয়া হয় না। অযৌক্তিকভাবে পেছানোর ঘটনাও ঘটে। কিন্তু হায়...উৎপল শুভ্র যে অন্য অঙ্কে, অন্য সংখ্যায় হিসাব করেন। তিনি ভিন্ন ধারাপাত পড়ে বড় হওয়া মানুষ।

যে গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটা তাঁকে বোঝানোর জন্য হয়তো আদর্শ। কিন্তু অন্য একটা গল্প দিয়েও শুরু করা যেত। ইন্টারমিডিয়েট পাস করা এক তরুণ তালে-গোলে বের হয়ে যাওয়া একটা বই নিয়ে দেখা করতে এল উৎপল শুভ্রর সঙ্গে। তত দিনে সেই প্রজন্মের কিশোর-তরুণদের কারও কারও কাছে তিনি খেলোয়াড়দের চেয়েও বড় নায়ক। তাঁর মাধ্যমে ক্রিকেট জড় চেহারা ছাড়িয়ে প্রায় প্রাণ পেয়ে গেছে। ক্রীড়া সাংবাদিকদের লেখা কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এর আগে ছিল শুষ্ক হিসাবের খাতা। তাঁর হাতে হয়ে উঠেছে শিল্প। সেই টিভিহীন যুগে কলমের আঁচড়ে না দেখা খেলাকেও দেখিয়ে ফেলছেন তিনি। আবার টিভিতে যেগুলো দেখানো হতো, সেগুলোতেও উৎপল শুভ্র আছেন। তাঁর লেখার সঙ্গে মিলিয়ে যেন পরীক্ষা হতো—যা দেখেছি, ঠিক দেখেছি তো। নব্বই দশকের শুরুতে সকালবেলা ভোরের কাগজ নিয়ে টানাটানি চলত রীতিমতো। বাংলাদেশে কোনো একজন ব্যক্তি সাংবাদিকতার কোনো শাখাকে এত বেশি প্রভাবিত করতে পারেননি। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরে কোনো সাংবাদিক নিজের বিষয়কে অতটা গুরুত্বপূর্ণ তুলতে পারেননি। সত্যি বললে, ক্রিকেটকে দুই থেকে এক নম্বর খেলা করেছে সেই সময়ের আজকের কাগজ বা ভোরের কাগজ। ফরহাদ টিটো ছিলেন সামনে, সঙ্গে আরও কয়েকজন, কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে প্রতীক তিনিই। ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান, সত্যের সঙ্গে শিল্প, অগাধ ক্রীড়াজ্ঞানের সঙ্গে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, খটখটে অঙ্কের সঙ্গে শিল্পিত ভাষা। তিনি সবাইকে ছাপিয়ে অন্য মনুমেন্টে। অন্যরা সাংবাদিকতা করেছে। তিনি ছবি এঁকেছেন। এই দেশে সাংবাদিকতায় নানা পুরস্কার দেওয়া হয়। দল আর লাইনবাজি করা লোক অথবা শেষ বয়সে গিয়ে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে সেগুলো পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে ভেবে অবাক লাগে, সাংবাদিকতার একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখার প্রায় প্রতীক হয়ে উঠেও উৎপল শুভ্র কেন সে রকম কোনো স্বীকৃতি পাননি। অথচ দেশ ছাপিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন বৃহত্তর মানচিত্রে। তা–ও কবে! বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্তরে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে। 

১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ কভার করতে গেছি। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে সবার একটাই প্রশ্ন—শুভ্র কোথায়? সেটা স্রেফ জানতে চাওয়া নয়, কৌতূহলের সঙ্গে মিশে শ্রদ্ধা। কারণ, তারা ইতিমধ্যে অবাক বিস্ময়ে দেখেছে, বাংলাদেশ থেকে আসা একজন সাংবাদিক ক্রিকেট জানা আর বোঝায় তাদের সমকক্ষ। ক্রিকেট দুনিয়ার সাংবাদিকদের কাছে তিনিই বাংলাদেশের ক্রিকেট। মনে করতে পারি না, দেশি আর কোনো সাংবাদিক অন্য দেশের মানুষের কাছে এমন উঁচুতে উঠেছিলেন! অথচ নিজের দেশের তথাকথিত মূলধারা এই ব্যাপারটি ধরতেই ব্যর্থ। মূলধারা অবশ্য এসব কারণে বহুদিন ধরেই ভুল ধারা!

উৎপল শুভ্রের সঙ্গে মোস্তফা মামুন। ২০১৫ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় সিডনিতে

ও, আচ্ছা, ইন্টারমিডিয়েট পাস করা তরুণটির গল্পটা শেষ করি। বইমেলায় দেখা করতে এসে তালেগোলে বেরিয়ে যাওয়া নিজের কাঁচা বয়সের কাঁচা হাতের উপন্যাসটি ধরিয়ে দিল। প্রত্যাশার বেশি প্রশ্রয় পেল। এমনই প্রশ্রয় যে কয়েক মাসের মধ্যে ভোরের কাগজে তাঁর সহকর্মী। গল্প হিসেবে এ-ই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সেখানেই শেষ হলো না। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের সেই তরুণটি তাঁর স্নেহ-শাসন আর ছায়ায় ছাত্রাবস্থাতেই পুরোদস্তুর পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক। পত্রিকায় প্রথম পাতায় লেখা ছাপা হয়। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। তাঁর নাম? ঘনিষ্ঠ সামান্য কিছু মানুষই শুধু জানে, আমার জীবনে উৎপল শুভ্রর ছায়াটা এমনই বিস্তৃত। তিনি ক্রীড়া সাংবাদিক না হলে আমি ক্রীড়া সাংবাদিক হই না। তিনি সামনে না থাকলে আমরা আরও অনেকে নিশ্চিতভাবে অন্য পেশায় থাকতাম। আমি কয়েকবার পথচ্যুত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আইন পড়া শেষ হওয়ার পর ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডনে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। একটা বা দুটো সেশনেই তিনি খারিজ করে নতুন স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করলেন। ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট কত উঁচুতে যাচ্ছে, আর আপনি কালো গাউনে শরীর ঢেকে রাখবেন?’ অতএব সঙ্গে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত থাকলাম না। লেখায় গালগল্প বেশি থাকত বলেই কিনা কেউ কেউ আমার নামটা আলাদা করে বলতে শুরু করল। অবশ্য তাতেও শুরুর আওয়াজটা তিনিই তৈরি করেছিলেন। মনে পড়ে, অস্ট্রেলিয়া বা কোনো একটা সফরে গেছি, ফেরার পর আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা চিঠি। কোনো একজন পাঠক লিখেছেন, তাঁকে উদ্দেশ করেই। সেই চিঠিতে এক জায়গায় লেখা, ‘এখন আপনার লেখা আর আগের মতো ভালো লাগে না। বরং মোস্তফা মামুন...’। 

চিঠির বিষয়টা আনন্দের কিন্তু সেটা ছাপিয়ে গেল বিস্ময়ে। চিঠিটা তো তাঁকে লেখা। আমার হাতে দিতে যাবেন কেন? পরে জানা গেল, শুধু তিনি আর আমিতে ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ নেই। ইতিমধ্যে গোটা সেকশনে লেখাটা পড়ে শুনিয়েছেন। তাঁকে নিজের জায়গায় ভাবলাম। আচ্ছা, আমি হলে কী এমন উদারতা দেখাতে পারতাম? ঠিক নিশ্চিত হতে পারলাম না। বহুবার এমন হয়েছে, হয়তো কেউ একজন তাঁর লেখার প্রশংসা করতে গেছেন, তিনি তাঁকে শুদ্ধ করে দিয়ে বলেছেন, আজকে আমার লেখা নয়, ওর লেখাটা ভালো। দেশে খুব সফল মানুষের প্রতি একধরনের বিরোধিতা থাকে সবার। দুই নম্বর বা পরের জন আবার প্রয়োজনের বেশি ভালোবাসা পায়। অতএব, আলোচনা এমন দাঁড়াল যে মামুনও খুব ভালো। সত্যি বললে, তাঁর সঙ্গে নাম উচ্চারণই বাড়াবাড়ি। আমি বিব্রত হই আর ভাবি, গাছের সঙ্গে কি ডালের তুলনা চলে! উৎপল শুভ্র পথের স্রষ্টা। আমরা সেই পথের পথিক মাত্র।

যাহোক, ইতিমধ্যে কিছু নাম হয়ে গেছে। বাজারে নানা রকম নতুন প্রজেক্ট আসছে। প্রস্তাব পেতে শুরু করলাম অনেক জায়গা থেকে। বিবেচনা করতে গিয়ে এ-ও মনে হলো যে নিজেকে পরীক্ষার জন্য এই বিশাল ছায়া থেকে বোধ হয় বেরোনোও দরকার। বিচ্ছেদ ঘটল ২০০৪ সালে। কাজ করেছি ৯ বছর, তাঁকে ছাড়ার পর ১৭ বছর, কিন্তু আজও প্রায় সবটা শিক্ষা তাঁরই। ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে এরপর তিন জায়গায় কাজ করেছি। যখনই সমস্যায় পড়েছি, ভেবেছি, শুভ্রদা হলে এখানে কী করতেন? ব্যস, সমাধান। সত্যি বললে, ছেড়ে গিয়ে বরং আরও বেশি তাঁর ছায়াতলে গিয়েছি। সঙ্গে থাকার সময় যেগুলোকে দোষ মনে হতো, সেগুলোর বাস্তবতা বুঝে তিনি হাজির হয়েছেন আরও অনন্য হয়ে। আর তাই আজ যখন কোথাও কোথাও দেখি, এই প্রজন্মের কারও কারও কাছে তিনি ঠিক সেই শ্রদ্ধার জায়গায় নেই, তখন ওদের জন্য করুণা বোধ করি। উৎপল শুভ্র খেলা নিয়ে যত বই পড়েছেন, অনেকে অত বই একসঙ্গে দেখেনি। তিনি জীবনে যত ক্রিকেট দেখেছেন, ১০০ বছর বাঁচলেও অত খেলা কেউ হয়তো দেখতে পারবে না। তিনি জীবনে যত ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, অনেকে পুরো জীবন জপ করেও এদের সবার নাম মনে রাখতে পারবে না।

বাংলায় মতি নন্দীই ক্রীড়া সাংবাদিকতাকে অন্য চেহারা দিয়েছেন। নিজে নামকরা সাহিত্যিক, সেই সূত্রে লেখায় সাহিত্যের যোগ ঘটিয়ে তিনি বাংলা ক্রীড়া লেখালেখিকে নতুন দিক দেখান। কিন্তু তাঁর অনুসারীদের কেউ কেউ মনে করেন, নিজের জায়গায় একরোখা ছিলেন বলে একটা সময় তিনি মেয়াদ ফুরিয়ে বসেন। সেই জায়গা নেন অশোক দাশগুপ্ত (এখন তিনি কলকাতার আজকাল পত্রিকার সম্পাদক)। মতি নন্দী ছিলেন লেখা আর সাহিত্যমুখী সাংবাদিক। আজকাল সেটাকে খেলোয়াড়মুখী করে তোলে। সেভাবে ভাবলে উৎপল শুভ্র একই সঙ্গে মতি নন্দী এবং অশোক দাশগুপ্ত। তিনি লেখায় শিল্প এনেছেন, আবার খেলোয়াড়মুখিতারও প্রতীক তিনি। আমাদের আগের সাংবাদিকতায় যথারীতি সংগঠক-মন্ত্রী এঁরা অনেক জায়গাজুড়ে থাকতেন। তারপর খেলা আর খেলোয়াড়।  সাংবাদিকতার নতুন দর্শনে তারকা হয়ে উঠল অপরিচিত ক্রিকেটাররা। আর এভাবেই ক্রিকেটের স্বপ্ন তৈরি হলো পরের প্রজন্মে। এর জোরেই আসলে ক্রিকেট পরের সিঁড়িগুলো বেয়ে গেছে। উৎপল শুভ্র একা হয়তো নন, কিন্তু তাঁর দ্যুতিতে উজ্জ্বল আজকের কাগজ-ভোরের কাগজ প্রজন্মকে ক্রিকেটের পেছনে এনে আজকের ক্রিকেট সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে দিয়েছে।

তাঁর লেখা বা রিপোর্টিং পত্রিকায় ছাপা হয় বলে সবাই দেখে। অনেক গুণমুগ্ধ। কিন্তু আমার মনে হয়, পেছনের উৎপল শুভ্রকে দেখার সুযোগ যদি থাকত, তাহলে মুগ্ধতার সীমা আকাশে পৌঁছাত। ১৯৯৩ সাফ গেমসে বাংলাদেশ বিদায় নেওয়ার পর হেডিং করলেন, ‘এ খেলা দেখতে চায়নি বাংলাদেশ’, তাতে পুরো দেশের হাহাকার যেন ধরা পড়ল। ‘এক দৌড়ে ইতিহাসে ঢুকে গেলেন জনসন’ এমন শিরোনামের পর আর কি পুরো লেখা পড়া লাগে! শিরোনামের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই সম্পাদনা। কত দিন এমন হয়েছে যে সাধারণ একটা লেখা দিয়ে মন খারাপ করে ভাবছি, দূর, হলো না কিছু। পরদিন দেখি তুমুল প্রশংসা। দু-একটা বাক্যের এদিক-ওদিকে শ্রমিকের তুচ্ছ সৃষ্টি পরিণত হয়েছে শিল্পে বা কাব্যে। এমনও কত হয়েছে যে পুরো লেখাই নিজে লিখে সতীর্থের নামে ছাপিয়ে পরদিন বিস্তর প্রশংসা জুটিয়ে দিয়েছেন। আগের রাতে লেখার আইডিয়া দিতেন, আর যেন এক গোপন রাজ্যকোষের দেখা মিলত। মাঝে মাঝে ভেবে স্তম্ভিত হতাম, মানুষটার চোখে খেলার এত এত দিক কীভাবে ধরা পড়ে।

কিন্তু এক কাজ, এত উত্তেজনা নিয়ে বছরের পর বছর করলে একসময় একঘেয়েমি আসতে বাধ্য। অন্তর্গত ক্লান্তিতেই কিনা কোথাও কোথাও মনে হতো, স্থবিরতা পেয়ে বসেছে। মাঝেমধ্যে ভাবতাম, বোধ হয় একরকম ইনিংস ঘোষণা করে দিয়েছেন। ক্রিকেট-সংসার-সংগীত আর সিনেমাতে আবিষ্ট হয়ে পরের খেলাগুলো সাবেক খেলোয়াড় হয়ে গ্যালারি থেকেই দেখতে চান। কিন্তু তাঁর পুরোটুকু চিনি বলেই বিশ্বাস করতাম, আজও অনিঃশেষ। জ্বালানি আছে নতুন দিশা দেখানোর। আর সে জন্যই ‘উৎপল শুভ্র ডটকম’ আমার কাছে বিরাট ব্যাপার। একসময় প্রাণসঞ্চারী হয়ে সাংবাদিকতা আর খেলাকে নতুন করে জাগিয়েছিলেন। এখনকার বিভ্রান্ত সময়ে আবার চাই দিশা। নতুন পতাকা হাতে নতুন পথের ঠিকানা তিনিই দিতে পারেন।

‘উৎপল শুভ্র ডটকম’ তাই শুধু একটা ওয়েবসাইটের নাম নয়, কলম-কিবোর্ডের আড়ালে একটা দিকনির্দেশনার মশালও। আবার বোধ হয় ভেজাল শুদ্ধিকরণের রেসিপি।

ও, হ্যাঁ, আমি অবশ্য উৎপল শুভ্র নামের পরে ডটকম-টটকম দেখতে পাচ্ছি না। আমি সব সময় দেখতে পাই, উৎপল শুভ্র, দ্য বেস্ট!