এবার নিউজিল্যান্ড ট্যুরে আসার আগেই একটু চিন্তা হচ্ছিল। অনেকেই বলাবলি করছিল, নিউজিল্যান্ডে পৌঁছানোর পর কোয়ারেন্টিনটা একটু আলাদা হবে। অনেক কষ্টদায়ক একটা ব্যাপার হবে। 
 
সবার মতো আমার মনের মধ্যেও ব্যাপারটি নিয়ে খচখচানি ছিল, অস্বীকার করব না। নিউজিল্যান্ডে কোয়ারেন্টিন ব্যাপারটি এমনিতেই বেশ কঠিন, নিয়ম-নীতিগুলো খুব কঠোরভাবে মানতে হয়, আর তা সবার জন্যই সমান। এ নিয়ে বিন্দুবিসর্গ ছাড় দিতেও রাজি নয় নিজজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে তাই একটা আশঙ্কা সঙ্গী করেই আমরা রওনা দিয়েছিলাম নিউজিল্যান্ডে। মনে হচ্ছিল, কঠিন কিছুই অপেক্ষা করছে সামনে। মানসিক প্রস্তুতিও তাই সেরকমই ছিল।
 
তো যখন আমরা রওনা দিই, আমাদের কোয়ারেন্টিন অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে, তার একটা আঁচ পেতে শুরু করেছিলাম ঢাকা (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) থেকেই। ভিআইপি গেট দিয়ে যাওয়াটা এমনিতে একটু স্বাচ্ছন্দ্যেরই হয়। কোনো লাইনে দাঁড়াতে হয় না, সবকিছুই বেশ তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। তো এবারে আমরা ভিআইপি টার্মিনালে পৌঁছার পর বাসের মধ্যেই প্রায় আড়াই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছিল আমাদের। আমরা লাউঞ্জে যেতে পারিনি, ভেতরে ঢুকতে পারিনি। এয়ারপোর্টের বাইরেই অপেক্ষা করছিলাম, ততক্ষণে ইমিগ্রেশনসহ আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পন্ন হচ্ছিল ভেতরে। এই প্রথমবারের মতো এয়ারপোর্টের কোথাও না নেমেই আমরা সরাসরি ফ্লাইটে ঢুকে পড়ি। অভিজ্ঞতাটা একদমই অন্যরকম ছিল। এরকম সবার থেকে আলাদা হয়ে, গার্ড-ব্যারিকেডের মধ্যে দিয়ে ফ্লাইটে গিয়ে ওঠা এই প্রথম।
 
ফ্লাইটটা খারাপ ছিল না, বেশ আরামদায়কই ছিল বলব। তবে আমরা নিউজিল্যান্ডে নামার পর আবারও অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছিল। এবার দেড় ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছিল আমাদের নিয়ে ওদের প্রোটোকল তৈরি হতে সময় লাগছিল বলে। তো বিমান থেকে  নামার পরে দেখলাম, আশেপাশে আমরা ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণী নেই। নেমে বাসে করে সোজা চলে যাই কোয়ারেন্টিন সেন্টারে। আদতে জায়গাটি ছিল একটি পাঁচ তারকা হোটেল, পরবর্তীতে এটিকেই কোয়ারেন্টিন সেন্টারের রূপ দেয়া হয়েছে।
 
শুরুতেই দলের সবাইকেই তাই বেশ ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, ১৪ দিনের মধ্যে কেউ যেন নিয়ম না ভাঙি। তাহলে এই যে এত কষ্ট করে এলাম, এখানে এত কষ্ট করছি, তা পুরোটাই পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে।
নিউজিল্যান্ডে গিয়ে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে কাটাতে হবে, তা আমরা জানতাম। আমরা তাই একটু আগে-ভাগেই এসেছি, যাতে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে কাটানোর পরে আমরা কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে, উইকেটে প্র‍্যাকটিস করতে পর্যাপ্ত সময় পাই। তো হোটেলে পৌঁছুবার সাথে সাথেই আমাদের হাতে নিয়ম-কানুনের একটি বই ধরিয়ে দেয়া হলো এবং বেশ স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হলো, আমরা যদি ১৪ দিন এই নিয়মগুলো ঠিকঠাক না মানি, তবে কোয়ারেন্টিনের মেয়াদকাল আরও বেড়ে যাবে। শুরুতেই দলের সবাইকেই তাই বেশ ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, ১৪ দিনের মধ্যে কেউ যেন নিয়ম না ভাঙি। তাহলে এই যে এত কষ্ট করে এলাম, এখানে এত কষ্ট করছি, তা পুরোটাই পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে। নিউজিল্যান্ড সরকার কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগ, কাউকেই কিছু বোঝানো যাবে না তখন।  এই যে আমরা একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছি, তা-ও তখন মূল্যহীন হয়ে পড়বে। যে সুযোগ-সুবিধাগুলো দুই সপ্তাহ পর থেকে আমাদের পাওয়ার কথা, আমরা তা পাব না।
 
সব ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে যে যার রুমে চলে গেলাম, ১৪ দিনের জন্যে। রুমে ঢোকার পর সঙ্গে সঙ্গেই বেশ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো, ১৪ দিন এই রুমে একা কাটাতে হবে ভেবে। কীভাবে কাটাব, তা অনেক বড় ভাবনার বিষয় ছিল। কোভিড-১৯ যখন শুরু হলো, তখনও কিন্তু আমরা লকডাউনে ছিলাম। তবে সেখানে পরিবারের সবার সঙ্গে ছিলাম, আর পরিবারের সবার সঙ্গে থাকলে যা হয়, সময়টা আপনা-আপনিই কেটে যায়। অনেকে ব্যাপারটা খুব উপভোগও করে। আর এখানে একা একটা রুমের মধ্যে ১৪-দিন থাকতে হবে, পরিস্থিতিটা তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
 
ওদের অনেক নির্দেশিকার ভেতরে একটি ছিল, সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত জানালা খোলা রাখতে পারব। তো জানালা খোলাটাও একটা বড় অপেক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রথম দিকে। কখন একটু জানালা খুলব, আকাশ দেখব, তাজা হাওয়া নেব, এসবের জন্য আর কি।
 
প্রথম দিন রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কোভিড পরীক্ষা, শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। ১৪ দিনে চারবার কোভিড-১৯ টেস্ট তো করা হয়েছেই, সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা মাপাটা দৈনন্দিন জীবনের অংশই হয়ে গিয়েছিল তখন। প্রতিদিন সকাল আটটার সময় নিয়ম করে তাপমাত্রা মাপা হতো আমাদের। সব দেখে-শুনে প্রথম দিকেই বুঝে গিয়েছিলাম, ব্যাপারটা মোটেই সহজ কিছু হচ্ছে না। বিশেষ করে প্রথম তিনদিন তো খুবই কষ্ট হচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ আমাদের রুমের বাইরে খাবার রেখে দিয়ে যেত, সেটা  নিজেরাই রুমে নিয়ে খেতাম। ওদের ডিনার টাইম আর আমাদের ডিনার টাইমে মিলত না, দেখা যেত বিকেলবেলা খাবার রেখে যাচ্ছে, এদিকে আমরা খেতে খেতে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। খাবারের মেন্যু নির্বাচনের সুযোগও বেশ সীমিত ছিল। প্রথম তিন দিন খুবই অসহায় লেগেছিল সব মিলিয়ে।
 
প্রথম চার দিন আমরা কোনো কিছু পাইনি। অর্থাৎ শুরুর চারদিন একই তোয়ালে, একই চাদর ব্যবহার করতে হয়েছে আমাদের।
একটা সুবিধা অবশ্য পেয়েছিলাম। সবসময় যা হয়, লম্বা যাত্রার পরে জেটল্যাগ একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবারে কোয়ারেন্টিনে থেকে বেশ ভালোই হয়েছিল। বাংলাদেশে যখন ঘুমের সময় হয়, নিউজিল্যান্ডে তখন ভোরবেলা। তো বেশির ভাগ দিনেই যা করতাম, সারা রাত জেগে থাকতাম, ভোরবেলা ঘুমোতে যেতাম, দিনের বেলার বেশির ভাগটা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিতাম। আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের সবার কামরাতেই দুটি করে প্লেট, চামচ, গ্লাস দেয়া হয়েছিল আর বলে দেয়া হয়েছিল, ১৪ দিনের জন্যে এসবই আমাদের সম্বল। ওরা যেটা করত, কাগজের প্যাকেটে খাবার রেখে যেত, আমি প্লেট ধুয়ে খাবারটা খেয়ে কাগজের প্যাকেটটা বাইরে রেখে দিতাম। পরবর্তীবার ব্যবহারের জন্য প্লেট ধুয়ে রেখে দেয়ার কাজটি করতে হতো আমাকেই। ট্যুরে গিয়ে এমন নিজের প্লেট নিজেই ধোয়া, নিজের বিছানা নিজেই করার অভিজ্ঞতা আগে  কখনো হয়নি। অবশ্য এই মহামারীতে বাসায় থাকতে থাকতে থালাবাসন ধোয়ার অভিজ্ঞতাটা হয়ে গিয়েছিল, আমার তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি। 
 
হাতে এমন অফুরন্ত সময়, এসব করতে গিয়ে কিছুটা সময়ও কেটে যেত। আরেকটা ব্যতিক্রমও হয়েছে এবার। হোটেলে সাধারণত যা হয়, রুমবয় এসে প্রতি সকালে বিছানাপত্র, তোয়ালে বদলে দিয়ে যায়। কিন্তু এবার প্রথম চার দিন আমরা কোনো কিছু পাইনি। অর্থাৎ শুরুর চারদিন একই তোয়ালে, একই চাদর ব্যবহার করতে হয়েছে আমাদের। আমাদের দ্বিতীয় কোভিড পরীক্ষার রেজাল্ট আসার আগ পর্যন্ত ওরা আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারবে না, কোনোকিছু ধরবে না, এমনই কথা হয়েছিল।
 
আমরা কেউ কারও সাথে দেখা করতে পারতাম না। আমার পাশের রুমেই মানুষ ছিল, কিন্তু ওদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল, আমরা দরজা খুলেও কেউ কাউকে দেখতে পারব না। তো কয়েকদিন যাওয়ার পরে আমি রাবিদ (মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম) ভাইকে ফোনেই বলছিলাম, 'ভাই, খাবারটা যখন দেয়, তখন দরজাটা খুইলেন। আমিও দরজাটা খুললাম। দূর থেকেই আপনার চেহারাটা দেখলাম একটু।' পাশাপাশি রুমে থেকেও আমাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগ করতে ইন্টারনেটই ছিল ভরসা। আর ইন্টারনেটের বদৌলতে দেশে যোগাযোগ করাটাও তো বেশ সহজ এখন, দেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেও অনেকটা সময় কেটে যেত।
 
একটু হাঁটতে যেতে পারব, এটাও বেশ বড় আনন্দের ব্যাপার ছিল আমাদের জন্য। ছবি: বিসিবি
তো প্রথম তিনদিন শেষে আমাদের ওপর আরোপিত বিধি-নিষেধ একটু শিথিল করা হয়েছিল। বিভিন্ন রঙে আমাদের চারটা গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল, আমরা পড়েছিলাম বেগুনি গ্রুপে। তো একেকটা গ্রুপ একটা নির্দিষ্ট সময়ে, হোটেলের ভেতরেই নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় হাঁটা-চলা করতে পারবে, এমনই নির্দেশনা পেয়েছিলাম দ্বিতীয় পরীক্ষার রেজাল্ট আসার পরে। একটু হাঁটতে যেতে পারব, তখন এটাও বেশ বড় আনন্দের ব্যাপার ছিল আমাদের জন্য।
 
তখন যা হতো, হাঁটতে বের হতে গেলে আমাদের রুম নম্বর বলে যেতে হত, আধাঘণ্টা হাঁটার পরে ফেরার সময় আবারও রুম নম্বর বলে তবে ঢুকতে হতো। অনেকটা যেন স্কুলের দিনগুলোর ওই রোল কলের মতো। আর যে আধঘণ্টা হাঁটতাম, সেখানেও কিন্তু সবসময়ই আমাদের ওপর নজর রাখা হতো। আমরা কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছি কি না, একজন আরেকজনের খুব কাছাকাছি চলে যাচ্ছি কি না, সামাজিক দূরত্ব মানছি কি না, কেউ বেষ্টনীর বাইরে যাচ্ছি কি না, সবই খেয়াল রাখা হতো। তবুও আমরা খুশি ছিলাম, কারণ তখন আধঘণ্টা খোলা বাতাসে হাঁটতে পারাটাও অনেক বড় ব্যাপার ছিল, অনেকটা মেঘের পরে রোদ দেখবার মতো।
প্রথমে একবার, পরবর্তী সময়ে দু'বারও বের হতে দিচ্ছিল আমাদের। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, আধঘণ্টা বাইরে কাটিয়ে এসে ফের ওই রুমের মধ্যে, তখন আবারও সবাই আলাদা, কারও সঙ্গে কারও দেখা নেই। সাইক্লিংয়ের জন্যে একটা মেশিন দেয়া হয়েছিল আমাদের সবার রুমে, সবাই সাইক্লিং করেই সময় কাটাত।, কিন্তু আবারও বলছি, সময়টা সহজ ছিল না মোটেই।
 
সাত দিন পরে আরেকটা আনন্দের ঘটনা ঘটল। আবারও যখন সবার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলো, তখন জানানো হলো, আগের ভাগ করা গ্রুপ অনুযায়ীই মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতে পারব আমরা। যদিও খুবই অল্প একটু সময়, কিন্তু খোলা আকাশে, ওই বন্দিদশা থেকে মাঠে গিয়ে অনুশীলন করাটাও বিশাল বড় একটা ব্যাপার ছিল। তবে মাঠে গিয়েও আমরা অবাধে মেলামেশা করার সুযোগ পেতাম না, কেননা সেখানেও আমাদের কারও না কারও নজরবন্দী হয়েই থাকতে হতো।
 
যখন মাঠে যেতে পারলাম, তখন মনে হচ্ছিল, জীবনে এর চাইতে আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। মাঠে গিয়ে মাস্ক খুলে অনুশীলন, রানিং-স্ট্রেচিং করতে পেরেছিলাম বলে কোয়ারেন্টিনের শেষ সাত দিন একটু ভালোই কেটেছিল।
খাবারের সমস্যাটাও বড় সমস্যা ছিল। যেহেতু কন্টিনেটাল ফুড দেয়া হতো, অনেক দিন পরে আমাদের জন্যে এ ধরনের খাবার গ্রহণ, হজম করাটাও বেশ কঠিন ছিল। কদিন পর অবশ্য স্বাদ বদলের জন্যে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার দিয়ে খেয়েছে অনেকে। তবে প্রথম দিকে তিন বেলাই ওরা খাবার দিয়ে যেত। তিনটি জিনিস একদম নিশ্চিত ছিল তখন, সকাল সাড়ে সাতটায় নাস্তা, আটটায় তাপমাত্রা মাপা, আর দিনের মধ্যে কোনো এক সময় এসে কারও না কারও সবকিছু তদারকি করে যাওয়া।
 
যখন মাঠে যেতে পারলাম, তখন মনে হচ্ছিল, জীবনে এর চাইতে আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। মাঠে গিয়ে মাস্ক খুলে অনুশীলন, রানিং-স্ট্রেচিং করতে পেরেছিলাম বলে কোয়ারেন্টিনের শেষ সাত দিন একটু ভালোই কেটেছিল। তবে মাঠে তো যেতাম মাত্র দুই ঘণ্টা সময়ের জন্য।  দিনের বাকি ২২ ঘণ্টাই তো আমাদের রুমের মধ্যে বন্দি। তবে  মানুষ অদ্ভুত এক জীব, পরিস্থিতি যা-ই হোক, নিজেদের সেভাবেই অভ্যস্ত করে নেয়। শেষের দিকে এসে আমরা বুঝতে পারলাম, একটু অনুপ্রাণিতই হলাম বলা চলে, যে এখন থেকে আমরা যখনই কোনো সিরিজ খেলতে যাব, কিংবা ঘরোয়া কোনো টুর্নামেন্টও যদি খেলি, আমাদের জৈব সুরক্ষা বলয়ে থাকতে হলে, যেখানে মাঠ-হোটেল ছাড়া যাবার আর কোনো জায়গা নেই, এমনকি হোটেলেও নির্দিষ্ট পরিধির বাইরে পা ফেলা যায় না, নিউজিল্যান্ডের ১৪ দিনের কঠোর কোয়ারেন্টিন বিধিনিষেধই যখন আমরা পালন করতে পেরেছি, তখন বাদবাকি জায়গাতেও তা ঠিকঠাক মেনে চলতে পারব।
 
শেষের দিকে এসে আমরা প্রায় সবাই-ই মোটামুটি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম ওই দিনটার জন্য, যেদিন আমরা কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী জীবনটা ফেরত পাব, আমাদের আর মাস্ক পড়তে হবে না, আমরা যেকোনো জায়গায় যেতে পারব, ঘুরতে পারব, গল্প করতে পারব, এমনকি হাত মেলাতে পারব, মহামারী শুরুর পর থেকে যা বিরলই হয়ে গিয়েছে। শেষের দিকে এসে আমরা সবাই তাই আরও বেশি সতর্ক হয়ে গিয়েছিলাম, যেন এই শেষ মুহূর্তে এসে কেউ নিয়মভঙ্গ করে না ফেলি। কারণ এই সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনটা আমরা অনেকদিন ধরে মিস করছিলাম, আমরা চাইছিলাম না অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা যেন সীমিত হয়ে পড়ে, আমরা প্রত্যাশা করছিলাম এই বন্দি জীবনের যেন এখানেই ইতি ঘটে।
 
সত্যি কথা বলতে, আমরা সবাই বেশ সুশৃঙ্খল ছিলাম, সব নিয়ম-কানুনই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি বলে ১৪ দিনেই কোয়ারেন্টিন থেকে বেরোতে পেরেছি। নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য বিভাগের যারা আমাদের কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনা করেছেন, তারাও পরে বলেছেন যে, এরকম সুশৃঙ্খল স্পোর্টস টিম তারা আগে কখনো দেখেননি।
 
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে পারাতেই এমন আনন্দ! সেই আনন্দে তাসকিন আহমেদের সেলফি
১৩তম দিন-রাতটা আসলে সবার মনেই একটু ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল। সে অনুভূতির বর্ণনা দেওয়াটা আসলে খুব মুশকিল। সে রাতে বোধহয় কেউই ঘুমায়নি, কাল থেকে আমরা মুক্ত, আমরা মাস্ক খুলে বেরোতে পারব ভেবে। আর আমাদের বলা হয়েছিল, 'কাল থেকে তোমাদের আর মাস্ক পরতে হবে না। মাস্ক রেখেই তোমরা বেরিয়ে যাবে রুম থেকে।' কিন্তু আমরা অনেকেই সেদিন মাস্ক পরে বেরিয়েছি। কারণ মাস্কে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে মাস্ক ছাড়াও যে ঘোরাঘুরি করা যায়, তা-ই ভুলে গিয়েছিলাম। কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে বেরিয়ে ক্রাইস্টচার্চেরই আরেক হোটেলে যখন আমরা উঠলাম, এমনও হয়েছে, কাউকে হয়তো জিজ্ঞাস করেছি, 'তোমার মাস্ক কোথায়?' ও সাথে সাথে খুঁজতে আরম্ভ করে দিয়েছে। এরকম মজার ভুল কিন্তু কয়েকবারই হয়েছে। আর এতদিনের অভ্যাস হঠাৎ করেই ছেড়ে দিয়ে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা যেন নেই, মুখটা যেন খালি খালি লাগছে!
 
তবে সত্যি কথাটা বলেই বলি, বিভীষিকাময় ছিল সেই ১৪টা দিন। লিখে হয়তোবা বোঝানো যাচ্ছে না, তবে সত্যিই খুব কঠিন ছিল সময়টা। জেলে যাবার দুর্ভাগ্য কখনো হয়নি, তবে অনুমান করছি, জেলের জীবনটা এরকমই হয়। এমনই ঘরে বন্দি থাকতে হয় সারাদিন, হয়তো কিছু সময়ের জন্যে বাইরে যাওয়ার সুযোগ মেলে।
দুর্বিষহ সময় শেষে কেউ যদি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে চায়, কুইন্সটাউনের চেয়ে আদর্শ জায়গা আর হয় না
আর এই দুর্বিষহ সময় শেষে কেউ যদি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে চায়, তো কুইন্সটাউনের চেয়ে আদর্শ জায়গা আর হয় না। নিউজিল্যান্ড কিন্তু এখন আমাদের সেখানেই এনেছে। এমনিতেই কুইন্সটাউনকে আমি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গার স্বীকৃতি দিই। পাহাড়, লেক, সবুজ মিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর এক শহর। মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়ানোর জন্য এর চাইতে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। এখানে এসে আমরা সবাই বেশ খুশি, অনুশীলনটাও বেশ ভালো হচ্ছে, আমরা ঘুরে বেড়াতে পারছি খোলা মনে, রেস্টুরেন্টে খেতে পারছি, সময়টা খুব ভালো কাটছে।
 
১৪ দিনের ওই সময়টাকে সুদূর অতীত বলেই মনে হচ্ছে।