ব্যাকলিফট–এই শব্দটার সঙ্গে আমার পরিচয় আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে কোলকাতা ক্রিকেট লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। কে  জানত, হতচ্ছাড়া শব্দটা যে ক্রিকেট মাঠ থেকে লেখার ডেস্ক অবধি জীবনভর ভুগিয়েই যাবে।

তখন ক্রিকেট খেলে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ভ্রমাত্মক চেষ্টায় ব্রতী। একদিন এমন ম্যাচ, ক্রিকেট আসোসিয়েশন অব বেঙ্গল থেকে পর্যবেক্ষক এসেছেন। রান পাওয়া খুব জরুরি। আর ঠিক সেদিনই  তৃতীয় বলে বোল্ড হয়ে  মাথা নিচু করে ফিরছি। ড্রেসিংরুমের মুখে দেখা হলো আমাদের টিম ওপেনারের  সঙ্গে। রোজ রান করেন। আজও  করেছেন। ‘কী  ভুল হলো’ জিজ্ঞেস করায় তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে বলেছিলেন, "তেমন  কিছুই না। ব্যাটটা স্বর্গে তুলেছিলে। যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। আচ্ছা, ব্যাকলিফট শব্দটা কখনো শুনেছ ?"

ক্রিকেট-ব্যাটের পৃথিবী থেকে স্বাভাবিক বিদায়  নেওয়ার পর সাংবাদিকতায় এসে দেখলাম, এখানেও অদৃশ্যভাবে শব্দটা  বিরাজমান। ব্যাট ঠিক  সময়ে না নামলে যেমন স্টাম্প নিয়ে চলে যাবে, তেমন লেখার নিয়মিত হোমওয়ার্ক না থাকলে পাঠক হাসানো অবশ্যম্ভাবী। সেই ব্যাকলিফট ঠিকঠাক করার চিন্তা পরের আটত্রিশ বছর ধরে আজও ভুগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে মন সেই সব পেশাদারকে দেখে চমৎকৃত  হয়েছে, যারা এই বস্তুটার আপাত সাহায্য ছাড়াও অবলীলায় সফল হয়ে যান ।

উৎপল শুভ্রকে আমার মনোনীত সেই  তালিকায় আমি এক নম্বরে রাখতে চাই। ক্রিকেটের ভাষায় মিনিমাম ব্যাকলিফটে বড় বড় সব ইনিংস খেলে। আর  এক-আধ বছর নয়, বছরের পর বছর। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে। নানা ধরনের তাপমাত্রায়। কোথাও হয়তো ম্যানচেস্টারের বৃষ্টি। কোথাও ব্রাজিলের গরম। কোথাও রাশিয়ার ঠান্ডা। পাঠকেরা স্বাভাবিকভাবে প্লেয়ারদের মানসিকতার খবর রাখতেই উৎসাহী। এদের চিরকালীনভাবে অজানাই থেকে গেল খবরগুলো যারা সযত্নে তাদের সামনে  বুফে ব্রেকফাস্টের মতো সাজিয়ে দেয়, সেই সাংবাদিকদেরও  যে গাড়ি  সারাক্ষণ নিউট্রাল-এ রাখার  মতো করে নিজেদের অন্তর্লীন তাপমাত্রাকে  একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিতে হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সে এবার আবেগের অ্যাডজাস্টমেন্ট করে। কমায়, বাড়ায়।

কাজটা মোটেও সহজ নয়। মন ও শরীরের ওপর তা অসম্ভব দাবি আদায় করে নেয়। অথচ শুভ্র হাসিমুখে সাতাশ-আটাশ বছর ধরে অসম্ভব নৈপূণ্যের সঙ্গে সেই কাজটা করে আসছে। ক্রিকেটবিশ্বের সর্বত্র কপি লেখার আগে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ইংল্যান্ডে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে তো আমরা লর্ডস-মুখোমুখি হোটেলে রুমমেট ছিলাম। কপি লেখার আগে বারবার হতাশা প্রকাশ করেছে, কী  লিখবে জানে না। নিজেকে মোটিভেট করতে পারছে না। কৌতূহলবশত পরের দিন একাধিকবার শুভ্রর লেখা নেটে দেখেছি। দেখে আশ্চর্য লেগেছে, এত তিতকুটে মেজাজ নিয়ে লিখতে বসে এত প্রশান্তির সঙ্গে এমন ছন্দবদ্ধ লেখা কী করে লেখে! আর জিনিসটা তো একদিন ঘটছে না। বছরের পর বছর একই ছবি। ক্রমে বুঝতে শিখেছি, শুভ্রর এমন একটা ন্যাচারাল স্কিল আছে যে, লিখতে বসলে ওর স্মৃতিশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং অনুভব মিলিতভাবে মাস্ক, স্যানিটাইজার আর হেড শিল্ড-এর কাজ করে।পুরোটাই স্বতঃস্ফূর্ত। যেখানে আমরা টেনশন করে আর বারবার কেটেকুটে একটা  লেখা খাড়া করানোর চেষ্টা করি, সেখানে শুভ্র প্রায় ব্যাকলিফট ছাড়া একই সঙ্গে অনুভবী এবং সুখপাঠ্য লেখা পরিবেশন করে যায়।

আর একটা কথা শুভ্র সম্পর্কে বলার যে, ইঞ্জিনিয়ারিং ওকে হয়তো একটা বাড়তি বিশ্লেষণী কোষ দিয়েছে। বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকের মুখে আমি সাকিব আল হাসানের মানসিকতার ব্যাখ্যা শুনেছি। ভারতীয় সাংবাদিকেরা যেমন একটা দীর্ঘ সময় ধোনির ডিএনএ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বাংলাদেশিদের একই সমস্যা হয়েছে সাকিবকে নিয়ে। এমন অদ্ভুত  চরিত্র, যার আগে বা পরে কোনো প্রোটোটাইপ নেই। শুভ্র কিন্তু বরাবর সাকিবকে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছে।

আর একটা কথা মনে হয় যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে যদি সর্বকালীনভাবে প্রথম পাঁচজনের কন্ট্রিবিউশন হিসেব করতে হয়, আমার বিচারে সাকিব, মাশরাফি, হাবিবুল, আশরাফুলের সঙ্গে শুভ্র-ও আসবে। এমন একটা সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ও নিয়মিত রিপোর্ট পাঠিয়েছে, যখন বাংলাদেশে ক্রিকেট সম্পর্কে সেভাবে সচেতনতাই তৈরি হয়নি। দেশবিদেশের মিডিয়া বক্সে শুভ্রই থেকেছে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। আজ ঢাকা বা চট্টগ্রামের অনেক তরুণের লেখা পড়ে মনে হয়, কী  জীবন্ত! কী  সাবলীল! কী প্যাশন সম্পন্ন!

কিন্তু এদের পূর্বপুরুষ হলো শুভ্র। আর তথ্যটা বাংলাদেশ ক্রিকেট সাংবাদিকতার বংশ  লতিকায় চিরতরে ঢুকে গিয়েছে। এত বছর ধরে একটা গোটা দেশকে নিজের রিপোর্টিংয়ে আবদ্ধ রাখা ব্যাপক চাপ। সেটা কেমন অনায়াসে  করে গেল ভাবলে ওর প্রতি গভীর ঈর্ষাবোধ করি। বললাম না, ব্যাক লিফটটা ঈশ্বরদত্ত।

পদ্মাপারের  বাসিন্দারা প্লিজ ভাববেন না, উৎপল শুভ্রর  শুধু আপনারাই গুণমুগ্ধ। ইন্টারনেটের যুগে ওর ক্রিকেটের ওপর লেখা গঙ্গাপারেও প্রভূত সমাদৃত। বললাম না, বাংলাদেশ ক্রিকেট রিপোর্টিংয়ের ও-ই প্রথম পুরুষ। আর অলরেডি ইতিহাসে ঢুকে  গিয়েছে।