আনন্দ তো আছেই,  কিন্তু খেলার মহিমা তো এতেই শেষ নয়। খেলা আমাদের জীবনে এগিয়ে চলার পাথেয় হিসাবে কতকিছুই না জুগিয়ে যায়! খেলা শৃঙ্খলা শেখায়, একতাবদ্ধতা শেখায়, ভেতরে জাগায় প্রতিকূলতা জয় করার লড়াই। আজ আপনি জিতে গেলেন, পৃথিবীতে আপনার চেয়ে সুখী মানুষ আর কেউ নাই। পরদিন আপনি হেরে গেলেন, কখনো শুরু থেকেই পিছিয়ে থেকে, কখনো বা জিততে জিততে; মন খারাপের সাগরে আপনার হাবুডুবু। একটু ভেবে দেখুন তো, জীবনও কি এমনই নয়! কখনো আপনি জিতবেন, কখনো হারবেন, হেরে যাওয়ার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞায় শাণিত করবেন নিজেকে। খেলা তো আসলে জীবনেরই মিনিয়েচার। জীবনের দীর্ঘ গল্পকে ঠেসেঠুসে এক ঘণ্টা-দুই ঘণ্টায় নিয়ে আসা। 

খেলা পরাজয় মেনে নিতে শেখায়, জিতে যাওয়ার পরও বিনয়ী হতে শেখায়। নেতৃত্ব দিতে শেখায়, নেতৃত্ব মানতে শেখায়। কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের বাংলা যদি বিরোধ নিষ্পত্তির দক্ষতা করি, তা-ও কি শেখায় না? খেলতে খেলতেই হয়তো তুমুল মারামারি লেগে গেল, দেখবেন, শিশু-কিশোরদেরই কেউ মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাবে। দাঁড়িয়ে বলবে, অনেক হয়েছে, চল্, আবার খেলা শুরু করি। জীবনের বাঁকে বাঁকেও কি এই দক্ষতাটা লাগে না?

পাঠ্য বইয়ের রচনায় আমরা যা পড়ার জন্য পড়ি, কিন্তু চর্চা করি না, সে সব তো এখনো বললামই না।  শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও তো দরকার খেলার ধুলা গায়ে লাগানো। সুস্থ দেহে সুস্থ মন---কথাটা তো আর এমনি এমনি বলা হয় না!  

এই অস্থির সময়ে খেলাধুলার এর চেয়েও বড় উপযোগিতা বলে মানতে হবে—তারুণ্যকে খেলার মাঠে ফেরালে তারা বাঁচবে মাদকের রাহুগ্রাস থেকে। পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের পরিবর্তে গড়ে উঠবে ক্লাব। চাঁদা তুলে শুধু ফাস্ট ফুডের দোকানে যাওয়ার পরিকল্পনাই হবে না, তা দিয়ে ফুটবল কেনা হবে, কেনা হবে ব্যাট-বল। আমরা যেমন কিনেছি।

মাঠ কোথায়—এই প্রশ্ন করবেন তো! ঢাকার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন হয়তো খুবই প্রাসঙ্গিক। সারা দেশের জন্য অবশ্যই নয়। সেখানে মাঠ আছে, খেলা নেই। এমনো অনেক জেলা-উপজেলা আছে, এক সময় যেখানে নিয়ম করে বিভিন্ন খেলার আয়োজন হতো। এখন আর হয় না। আন্তস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলোই বা কোথায় গেল! আমাদের কৈশোরেও তো দেখেছি, স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে সাজ-সাজ রব। ছোট্ট মফস্বল শহরে রীতিমতো উৎসবের আমেজ। সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনা তো তেমন কঠিন কিছু নয়। সারা দেশের কথা বাদই দিলাম, এই ঢাকাতেও তো বেশির ভাগ সরকারি স্কুলেই এখনো বড় বড় মাঠ আছে। খেলাধুলার চর্চা আছে কয়টা স্কুলে? স্কুলে স্কুলে গেম টিচার আছে। যাঁরা শুধু নামেই গেম টিচার। নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই গলদ আছে, স্কুল কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ তো আছেই। ছাত্রদের খেলায় টানার বদলে গেম টিচারদের দিয়ে বাংলা ক্লাস নেওয়াটাই বেশি গুরুত্ব পায়।

স্কুলে স্কুলে খেলার সংস্কৃতি চালু করা যেমন দরকার, তেমনি একটু বোধ হয়  পরিবর্তন দরকার অভিভাবকদের মানসিকতায়ও। ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোচিংয়ে বসে থাকতে রাজি, কিন্তু  এমন তো অহরহই হয়, কোচিং ফেরার পথে ওরা আধঘণ্টা খেলতে চাইলে আমাদের আর মাঠের পাশে বসে থাকার সময় হয় না। হাতে যে কত কাজ! কাজ তো আছেই। কিন্তু আমরা বেশির ভাগ বাবা-মাই একবার ভেবে দেখি না, সন্তানকে শিক্ষিত করতে এই যে এত শ্রম দিচ্ছি, ওই একটু খেলা সেই চেষ্টাকে সফল করার পথে অনেকটাই এগিয়ে দেবে। সহায়ক হবে তাকে পরিপূর্ণ এক মানুষ করে তোলায়। 

এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া এ দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ডাক দিতে হবে এখনই। যে সংস্কৃতির স্লোগান হবে—সবার জন্য খেলা। খেলার জন্য খেলা। শুধুই আনন্দের জন্য খেলা।

আসুন, তাহলে শুরু করে দিই। সবাই মিলে সারা দেশে ছড়িয়ে দিই ওই মন্ত্রটা--সবার জন্য খেলা। খেলার আনন্দে খেলা!র যত্ন নিতে। আর শিশু কিশোররা খেলবে মনের আনন্দে। সময় এসেছে হারিয়ে যেতে বসা সেই খেলার আনন্দে খেলার সময়টা ফিরিয়ে আনার। খেলা বলতে সবাই বুঝবে—খেলার জন্য খেলা। আনন্দের জন্য খেলা। সবার জন্য খেলা।