যুক্তি বলছিল, নোভাক জোকোভিচ। কিন্তু হৃদয় কি আর সব সময় যুক্তি মেনে চলতে চায়! সেটি তাই কোরাস তুলেই যাচ্ছিল—রজার ফেদেরার! রজার ফেদেরার!!

খেলা দেখতে টেলিভিশনের সামনে যখন বসছি, রীতিমতো ভ্রুকুটি হানছিল রেকর্ড-পরিসংখ্যান-ইতিহাস...। এই ম্যাচের আগে গ্র্যান্ড স্লামে টেনিস ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এই দ্বৈরথের ফল জোকোভিচের অনুকূলে ১০-৬। এর চেয়েও ভয়ংকর তথ্য, সর্বশেষ ৫টি ম্যাচেরই শেষ ফেদেরারের পরাজয়ে। এর সঙ্গে যদি যোগ করেন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমিফাইনাল বা ফাইনালে পরাজয় কাকে বলে, জোকোভিচের তা জানাই নেই—ফেদেরারের জয় কামনা করে এই ম্যাচ দেখতে বসাটাই ছিল বোকামি।

কিন্তু ওই যে হৃদয় যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিজস্ব নিয়মে চলে। সেটিকে কেউ বোকামি বলল কি বলল না, তাতে তার থোড়াই কেয়ার। প্রথম সেটে ৪-১ গেমে এগিয়ে থাকা ফেদেরার ষষ্ঠ গেমে যখন ৪০-০, সেই ‘বোকামি’রই জয় হতে যাচ্ছে ভেবে তাই রীতিমতো রোমাঞ্চিত। সেই রোমাঞ্চ ম্যাচ শুরুর ৬৩ মিনিটের মাথায় বিষাদে রূপান্তরিত। প্রথম সেট টাইব্রেকারে নিয়ে গিয়ে সেখানে রীতিমতো অদম্য জোকোভিচ। বাকিটুকু বিস্তারিত বলে আর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না-ই বাড়াই।

২০২০ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল শেষে নোভাক জোকোভিচ ও রজার ফেদেরার

গত বছর উইম্বলডন ফাইনালে গ্র্যান্ড স্লামে এই দুজনের সর্বশেষ ম্যাচটি সর্বকালের সেরা কি না, এই আলোচনা হয়। ১৪ জুলাই, ২০১৯—একই দিনে দুটি স্পোর্টিং ক্লাসিকের সাক্ষী লন্ডন। লর্ডসে ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ ফাইনাল আর উইম্বলডনে জোকোভিচ-ফেদেরার মহাকাব্য, মাত্র তিন মিনিটের জন্য যেটির আয়ু পাঁচ ঘণ্টা ছোঁয়নি। আর এদিন রড লেভার অ্যারেনায় এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ম্যাচ কিনা ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিটেই শেষ!

অথচ এই ম্যাচটা ছিল আর দশটা ম্যাচের চেয়ে আলাদা। পেশাদার টেনিসে দুজনের ৫০তম ম্যাচ। দুজনেরই এই বিশেষ উপলক্ষটা জানা না থাকার কোনো কারণ নেই। তাঁদের মনে না থাকলেও সাংবাদিকেরা নিশ্চয়ই তা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ‘উইম্বলডন ফাইনাল’ তো আর প্রতিদিন হয় না, কিন্তু উপলক্ষটা রাঙাতে তার কাছাকাছি কিছুর প্রত্যাশা তো ছিলই। অথচ যা হলো, সেটি আধুনিক টেনিসের দুই মহাতারকার (সংখ্যাটা আসলে তিন। আরেকজন, রাফায়েল নাদাল বিদায় নিয়েছেন আগের দিন।) সবচেয়ে একতরফা ম্যাচগুলোর একটি।

প্রত্যাশার অপর পিঠে আশঙ্কাও ছিল। আগের পাঁচটি ম্যাচ জিততে ফেদেরারকে কোর্টে থাকতে হয়েছে ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট।  সর্বশেষ দুই রাউন্ডেই জিততে হয়েছে মরণপণ লড়াই করে। কোয়ার্টার ফাইনালে টেনিস স্যান্ডগ্রেনের বিপক্ষে সাত-সাতটি ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে জয়ে রূপকথা লেখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জোকোভিচের বিপক্ষে এমন প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণের বীজটাও বোনা হয়ে গেছে সেদিনই। বিদ্রোহ করে বসেছে ফেদেরারের সাড়ে আটত্রিশ বছর বয়সী কুঁচকি।

সুইস কিংবদন্তির অনেক কীর্তির মধ্যে এটাও থাকা উচিত যে দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে কোনো ম্যাচ শেষ না করে তিনি কোর্ট ছাড়েননি।

মাঝখানে দুদিনের বিরতি যে সেটিকে বশ বানানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না, তা পরিষ্কারই বোঝা গেছে কোর্টে ফেদেরারের মুভমেন্ট দেখে। প্রথম সেট শেষে মেডিকেল টাইম আউট নিতে হওয়ার পর তো সেটি আর অনুমান করেও বুঝতে হয়নি। অভিজ্ঞতা আর সহজাত প্রতিভায় ভর করে ৪৬টি উইনার মেরেছেন ঠিকই, কিন্তু ৩৫টি আনফোর্সড এররে বড় ভূমিকা ওই কুঁচকির চোটের (জোকোভিচের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা ৩১/১৮)। ম্যাচশেষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জোকোভিচ প্রথমেই তাই শ্রদ্ধা জানালেন ব্যতিক্রমী একটা কারণে। ফেদেরার যে কোর্টে নেমেছেন! নিজে দুর্দান্ত অ্যাথলেট, চোটের সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাসও কম নয়। জোকোভিচের তাই ভালোই জানা, এই সেমিফাইনালে শুধু তিনি একাই ফেদেরারের প্রতিপক্ষ ছিলেন না। ফেদেরারকে চেনেন বলেই হয়তো অবাক হননি। সুইস কিংবদন্তির অনেক কীর্তির মধ্যে এটাও থাকা উচিত যে দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে কোনো ম্যাচ শেষ না করে তিনি কোর্ট ছাড়েননি।

এমন মনেপ্রাণে কেন ফেদেরারের জয় চাইছিলাম, এর ব্যাখ্যা দেওয়ার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? প্রতিপক্ষ ছাড়া প্রায় সবাই-ই কি তা-ই চায় না! ফেদেরারের টেনিস মানেই দৃষ্টির জন্য এক প্রশান্তি। তাঁর জয় মানেই আরও একটি ম্যাচে সেই আনন্দস্রোতে ভেসে যাওয়ার নিশ্চয়তা। যে কারণে গত কিছুদিন ফেদেরার কোর্টে নামলেই মনে হয়, যত দিন আছে, প্রাণভরে দেখে নাও। পাওয়ার টেনিসের এই যুগে এমন কাউকে আর দেখতে পাবে কি না কে জানে!

সেমিফাইনাল শুরুর কিছুক্ষণ পরই মেলবোর্নে সন্ধ্যা নেমেছে। রড লেভার অ্যারেনায় এসে পড়েছে সূর্যাস্তের লালচে আভা। কোর্টে ফেদেরার আর আকাশে সূর্যাস্ত—দুটি মিলে কেমন প্রতীকী হয়ে গেল! শেষের গান তো শোনা যাচ্ছেই। ২০১২ সালে ১৭তম গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের পর প্রায় পাঁচ বছর সংখ্যাটা যখন ‘১৭’-তেই স্থির হয়ে ছিল, ফেদেরার আর গ্র্যান্ড স্লাম জিততে পারবেন কি না, এ নিয়ে তাঁর নিজের মনেও হয়তো তখন সংশয়ের দোলাচল। মাঝখানে তিনটি ফাইনালে এই জোকোভিচের কাছেই হারার পর ২০১৭-তে এসে ‘১৭’-এর গেরো কাটল। সে বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও উইম্বলডন, পরের বছর আবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ে নেটের ওপারে র‍্যাকেট হাতে দাঁড়ানো লোকটিই শুধু ফেদেরারের প্রতিপক্ষ ছিল না, এর চেয়েও বড় প্রতিপক্ষের নাম ছিল ‘বয়স’!

কাল ম্যাচ শেষে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যখন কোর্ট ছেড়ে যাচ্ছেন, এ কারণেই হয়তো মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল—‌আবার ফিরে এসো, রজার!