ছবিতে যাঁকে দেখছেন, এই তরুণের নাম ক্রিস্টিয়ান। পুরো নাম, পুরো নাম...যাহ', একদম ভুলে গেছি। বয়স ২৩। মানে ২০১৪ সালে ২৩ ছিল আর কি! তাহলে তো এত দিনে ৩০ হয়ে গেছে। 

ক্রিস্টিয়ান এখনো এমিরেটসেই চাকরি করেন কি না, জানি না। তবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় এমিরেটসের ফ্লাইটেই। ২০১৪ বিশ্বকাপ কাভার করতে ব্রাজিল যাওয়ার সময়। প্রথম গন্তব্য সাও পাওলো। দুবাই থেকে সাড়ে পনের ঘণ্টার ফ্লাইট। আমার জীবনের দীর্ঘতম উড়ান। সাড়ে পনের ঘণ্টা সময়টাকে একটু কম দীর্ঘ মনে করানোয় এই ক্রিস্টিয়ানের সঙ্গে আড্ডার একটু অবদান ছিল। 

পাশের সিটের যাত্রীরও। জীবনে প্রথমবারের মতো ব্রাজিল যাওয়ার সময় পাশে এক ব্রাজিলিয়ান পেয়ে যাওয়াটাকে আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে। ওই ভদ্রলোকের বাড়িও সাও পাওলোতেই। কাগজের ব্যবসা করেন, সেই কাজেই চীনে এসেছিলেন। সাও পাওলো সম্পর্কে একটা শর্ট কোর্সও হয়ে গেল তাঁর সৌজন্যে। ক্রিস্টিয়ান সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই ভদ্রলোককে টেনে আনার কারণ আছে। ব্রাজিলিয়ান ওই লোকটা সহযাত্রী না হলে ক্রিস্টিয়ানের গল্পটা হয়তো জানাই হতো না। 

ব্রাজিলিয়ান সহযাত্রীর সঙ্গে ক্রিস্টিয়ানকে (বুকের ব্যাজে লেখা ছিল) পর্তুগিজে (অনুমান করে নিয়ে পরে কনফার্ম হয়েছি) কথা বলতে শুনে ওকেও ব্রাজিলিয়ান ভেবেছিলাম। নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করে যা জানলাম, তাতে আহমদ ছফার একটা উপন্যাসের নাম মনে পড়ে গেল। অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী।  

জেন্ডার (বাংলাটা লিখে ডিলিট করে দিলাম, কেমন যেন লাগে) সংক্রান্ত ধাঁধায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই এমন মনে হওয়ার কারণটা জানিয়ে দিই। ক্রিস্টিয়ান অর্ধেক ব্রাজিলিয়ান, অর্ধেক আর্জেন্টিনিয়ান। বাবা ব্রাজিলের সন্তান, মা আর্জেন্টিনার। যা শুনেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, "মাই গড! এ তো ডেডলি কম্বিনেশন!"

ক্রিস্টিয়ান হেসে বললেন, "তা বলতে পারেন। তবে আমি নিজেকে আর্জেন্টিনিয়ান বলেই ভাবি।" 

তা ভাবার কোনো একটা কারণ তো থাকতে হবে। এখানে তা খুব সরল। ক্রিস্টিয়ানের শৈশব-কৈশোর সাও পাওলো ও বুয়েনস এইরেস ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বুয়েনস এইরেসে একটু বেশি সময় কেটেছে, বন্ধুবান্ধবও সেখানে বেশি। ব্রাজিলিয়ান না আর্জেন্টিনিয়ান দ্বন্দ্বের মীমাংসায় নির্ধারকও হয়ে গেছে এটিই। বিশ্বকাপেও ক্রিস্টিয়ান আর্জেন্টিনাকেই সাপোর্ট করবেন।  

তা ক্রিস্টিয়ানের বাকি ভাইবোনদের কী অবস্থা? বোন নেই, ভাই অবশ্য নয় নয় করেও নয়জন! বাকি আটজনও কি নিজেদের আর্জেন্টিনিয়ান ভাবেন?  

না, এখানে "আমরা সবাই ভাই-ভাই" কথাটা খাটছে না। ন্যূনতম ব্যবধানে জয়ী হচ্ছে আর্জেন্টিনা। কারণ ভাইদের পাঁচজন আর্জেন্টিনা ভাবাপন্ন। এই সহজ বিয়োগটা আপনার না পারার কথা নয়, তার পরও আমি করে দিচ্ছি। ব্রাজিল ভাবাপন্ন ভাইয়ের সংখ্যা চার। 

এ তো দেখছি বাংলাদেশের মতো অবস্থা! ক্রিস্টিয়ানকে তা বলতে শুরু করতেই ও থামিয়ে দিল, "আমি জানি।" 

কীভাবে জানেন? 

জানেন চাকরির সুবাদে। ফ্লাইট স্টুয়ার্ডের চাকরি অনেকবারই ঢাকায় নিয়ে গেছে ক্রিস্টিয়ানকে। এই কদিন আগেও একবার ঘুরে এসেছেন। বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আকাশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে যাওয়ার কথা আগেই শুনেছিলেন। এবার নিজের চোখেই দেখেছেন। পরিবার-পরিজনের কাছে সেই গল্পও করেছেন। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশে এই উন্মাদনা নিয়ে বলতে বলতে বেশ কবারই বললেন, "ইটস্ ক্রেজি! রিয়েলি ক্রেজি!"

এমন পরিস্থিতিতে আমার সব সময় ডি এল রায়ের গানের সেই লাইনটি মনে পড়ে যায়। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! 

মুখ থেকে তা বেরিয়েও গেল। দেখা গেল, ক্রিস্টিয়ান বাংলা না বুঝলেও ধ্বনি শুনে তা অনুমান করতে পারেন। নইলে একটু অবাক হয়ে কেন জিজ্ঞেস করবেন, "বাংলায় কি কিছু বললেন?"

"একটা গানের লাইন। দেশাত্মবোধক গান"।

বলার পর লাইনটা একেবারেই আক্ষরিক অনুবাদ করে শোনালাম, "ইউ ক্যান্ট হ্যাভ আ কান্ট্রি লাইক দিস্!"

নিজের কানেই কেমন যেন লাগল। এত সুন্দর কথা আর সুরের একটা লাইন কী পচাই না শোনাচ্ছে! ক্রিস্টিয়ান অবশ্য কথাটার বৃহত্তর রূপ দিয়ে ফেললেন, "এটা তো যেকোনো দেশের মানুষের জন্যই দেশাত্মবোধক গান হতে পারে।"

তা তো পারেই। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তা আপনি কোন দেশের ক্ষেত্রে এই লাইনটা ব্যবহার করবেন---আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল?"

নিজেকে আর্জেন্টিনিয়ান মনে করেন, এটা তো আগেই বলেছেন। প্রশ্নটা অকারণ হয়ে গেল কি না ভাবতে শুরু করতেই ক্রিস্টিয়ান টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো একটা হাসি দিয়ে বললেন, "দুই দেশের ক্ষেত্রেই। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও তাদের মতো করে ক্রেজি।"