ক্রিকেটের বাইরেও তাঁর একটা পরিচয় আছে। চোখের ডাক্তার। একবার আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁর চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে গভীর মনোযোগে পাওয়ার ঠিক আছে কি না দেখার ভান করেছিলেন। শুধু এ কারণে তো আর জিওফ লসন ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে নেই। বোলার হিসাবেও যথেষ্টই ভালো ছিলেন। ৪৬ টেস্টে ১৮০ উইকেট যেটির সাক্ষ্য দেয়। একবার ইনিংসে ৮ উইকেটও নিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে অ্যাডিলেডের সেই টেস্টে পরাক্রান্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসেও নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। ম্যাচে লসনের ১১ উইকেটও অবশ্য জেতাতে পারেনি অস্ট্রেলিয়াকে।

এটা তো আর তাঁর দোষ নয়। তাঁর এমন একটা পারফরম্যান্সের পরও পরাজয়ের স্বাদ পেতে হয়েছে বলে লসন বরং সতীর্থদের দোষ দিতেই পারতেন। লসন নিয়ে আরও অনেক গল্প বলার আছে। আপাতত করাচির ওই প্রেস কনফারেন্সেই থাকি। এটা অবশ্য ক্রিকেটার জিওফ লসনের প্রেস কনফারেন্স নয়, কোচ জিওফ লসনের প্রেস কনফারেন্স। 

জীবনে বিচিত্র অনেক প্রেস কনফারেন্সে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যার একটি উপহার এই জিওফ লসনের উপহার। ২০০৮ এশিয়া কাপে তিনি পাকিস্তানের কোচ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে পাকিস্তানের বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। অধিনায়ক শোয়েব মালিক হয়তো এ কারণেই প্রেস কনফারেন্সে আসতে রাজি হননি। এসেছেন জিওফ লসন এবং এসেই খুবই রুঢ় ভঙিতে সাংবাদিকদের কী করা যাবে, কী করা যাবে না বয়ান করার পর প্রশ্ন করার নিয়মকানুন জানিয়ে দিয়েছেন। সেখানেই শেষ নয়। পাকিস্তানের এক সিনিয়র সাংবাদিকের প্রথম প্রশ্নেই তাঁর ইংরেজি নিয়ে অপমানসূচক মন্তব্য করে বসলেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে রেগেমেগে প্রেস কনফারেন্স থেকে বেরিয়ে যাবেন বলে হাঁটা শুরু করে দিলেন। অর্ধেক পথ গিয়ে কী ভেবে যেন ফিরেও এলেন আবার। এবার ফুঁসে উঠলেন সাংবাদিকেরা। লসন চেয়ারে ফিরে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে বললেন। এক সিনিয়র পাকিস্তানি সাংবাদিক 'বহুত হোয়া-টোয়া' বলে নিজে উঠে দাঁড়িয়ে বাকিদেরও বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বাণ জানালেন। সাংবাদিকেরাও দল বেঁধে প্রেস কনফারেন্স বয়কট করে বেরিয়ে গেলেন। বাক্যটা একটু ঘুরিয়ে তাতে 'গেলেন' না লিখে 'গেলাম' লেখাই ভালো হতো। কারণ আমিও ছিলাম ওই দলে।

প্রেসবক্সে ফেরার পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, শুধু প্রেস কনফারেন্স বয়কটি প্রতিবাদ হিসাবে যথেষ্ট নয়, লসনকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আন্দোলন।

পরদিন কোন কোন দলের ম্যাচ ছিল, মনে নেই। প্রেসবক্সে ঢুকতেই একজন কালো একটা আর্মব্যান্ড ধরিয়ে দিলেন হাতে। তাকিয়ে দেখি, বাকি সবাই ততক্ষণে কালো আর্মব্যান্ড সজ্জিত। লসনের আচরণের প্রতিবাদ এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবির যুগল প্রতীক ওই কালো আর্মব্যান্ড। আমরা সবাই সেই আর্মব্যান্ড বেঁধেই ম্যাচ কাভার করলাম। নীরব প্রতিবাদের সঙ্গে সরব প্রতিবাদও প্রয়োজন। এ কারণেই দুই ইনিংসের বিরতির সময় প্রেসবক্স থেকে নেমে স্টেডিয়ামের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করার সিদ্ধান্ত।

লসনের আচরণে রাগ আমারও হয়েছিল, তবে তা তো আর পাকিস্তানি সাংবাদিকদের মতো নয়। ওদের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই লসনের ঠোকাঠুকি চলছিল। আমি তাই বিক্ষোভের অংশটা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ওটা আমার লেখা গোছগাছ করার সময়। কিন্তু প্রেসবক্সের পরিবেশ তখন এমনই অগ্নিগর্ভ যে, না-যাওয়াটা নিরাপদ বলে মনে হলো না। লেখা একটু এগিয়ে রাখার বদলে আমাকেও তাই নিচে নামতেই হলো। নিচে নেমে ব্যানার-ট্যানার সহযোগে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হলো। স্লোগান একটাই। 'লসন কো---যানা হোগা', লসন কো---যানা হোগা।' জলদগম্ভীর কণ্ঠের এক পাকিস্তান সাংবাদিক গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিচ্ছেন, "লসন কো", বাকিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাতাসে হাত ছুঁড়ে আমিও গর্জে উঠছি, "যানা হোগা।" সামনে টিভি ক্যামেরা, পত্রিকার ফটোগ্রাফারদের ভিড়।

এশিয়া কাপ কাভার করতে করাচিতে এসে আমি "লসন কো যানা হোগা" দাবিতে শ্লোগান দিচ্ছি ভেবে আমার অবশ্য একটু হাসি পাচ্ছিল। টিভি ক্যামেরা তা সংবরণ করতে বাধ্য করল। এই ছবি টেলিভিশনে দেখানো হবে, পত্রিকায় ছাপা হবে। এমন সিরিয়াস একটা দাবি আদায়ের জন্য বিক্ষোভ করার সময় কাউকে হাসতে দেখলে তা বড়ই বিসদৃশ লাগবে। 

শ্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত করে প্রেসবক্সে ফেরার কিছুক্ষণ পরই লসনের স্বাক্ষরিত একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কপি পৌঁছে গেল সব সাংবাদিকের হাতে হাতে। যাতে লসন আগের দিনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন। তাতে ক্ষোভের আগুন একটু প্রশমিত হলো। আপাতত স্থগিত ঘোষিত হলো "লসন কো যান হোগা" দাবিও। ডেডলাইনের চাপও কিছুটা ভূমিকা রেখেছিল নিশ্চয়ই। 'লসন কো যানা হোগা' স্লোগান দেওয়ার জন্য তো আর বেতন দেওয়া হয় না। সবাকেই তো অফিসে লেখা পাঠাতে হবে।

একরোখা স্বভাবের জিওফ লসন এত তাড়াতাড়ি নতি স্বীকার করে ফেলায় আমি একটু বিস্মিতই হয়েছিলাম। সাংবাদিকদের ক্ষমতা নিয়ে একটু আত্মশ্লাঘাও বোধ করার কথাও স্বীকার করে ফেলাই ভালো। সেই ভুল ভাঙতে সময় লাগল না। ওই দুঃখ প্রকাশ-ক্ষমা চাওয়া কোনোটাই লসনের মন থেকে নয়। তিনি তো তা করতে বাধ্য হয়েছেন পিসিবির চাপে। তা বুঝিয়ে দিতে পরদিনই পাকিস্তান দলের প্র্যাকটিসে লসন বললেন, তিনি মোটেই সবার কাছে ক্ষমা চাননি, ক্ষমা চেয়েছেন প্রেস কনফারেন্স বয়কট না করে যারা বসে ছিলেন, শুধু তাদের কাছে। শুনে আমার মনে হলো, আচ্ছা ত্যাদোড় লোক তো! প্রেস কনফারেন্স বয়কটের সিদ্ধান্ত তো ছিল সর্বসম্মত, সবাই-ই তো বেরিয়ে এসেছেন। "যারা বসে ছিলেন" এমন সাংবাদিক জিওফ লসন কোথায় পেলেন?

"লসন কো, যানা হোগা" শ্লোগান তোলা সাংবাদিকদের ওই বিক্ষোভের ছবি পরদিন পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ওই ছবিতে নিজেকে দেখতে পেয়ে আমি তা যত্ন করে রেখেও দিয়েছিলাম। 'যত্ন করে রেখে দেওয়া' আমার বেশির ভাগ জিনিসের মতো এটাও হারিয়ে গেছে। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে পেয়ে যাব ভেবেছিলাম। না, সেখানেও নেই। তবে ছবি সার্চ দিয়ে একটা লাভই হলো। ছবির বদলে পেয়ে গেলাম ভিডিও! জিওফ লসনের কল্যাণে সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম ওই প্রেস কনফারেন্সের ভিডিওটা যে ইউটিউবে আছে, আমার তা জানাই ছিল না। সেটি শেয়ার করার লোভটা সামলাতে পারলাম না। 

এক মিনিটেরও কম সময়ের ভিডিও, দেখে ফেলুন। 

মজা পাওয়া গ্যারান্টেড।