এখন যদি বলি, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমি বলেছিলাম, সাকিব আল হাসান এবার দারুণ কিছু করবেন; জানি, অনেকেই তা বিশ্বাস করবেন না। তবে প্রমাণ চাইলে সেটি দিতে পারব। অনেককেই তো কথাটা বলেছি। কেউ আমার দাবি সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করলে তাঁরা সাক্ষ্য দেবেন বলেই আশা করি।

কী কারণে এমন মনে হয়েছিল, সেটির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। তবে কখন মনে হয়েছিল, তা পরিষ্কার স্মরণ করতে পারি। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে অফিশিয়াল টিম ফটোতে সাকিবের অনুপস্থিতি নিয়ে তুমুল বিতর্কের সময়টায়। এত বছর ধরে সাকিবকে দেখার অভিজ্ঞতায় জানি, হাঁস যেমন গা থেকে জল ঝেড়ে ফেলে, বিতর্ককে তিনিও তা-ই। কখনো কখনো বরং অদ্ভুত একটা কথাও মনে হয়েছে, নিজেকে উদ্দীপ্ত করতে মাঝেমধ্যে সাকিব ইচ্ছা করেই বিতর্কের জন্ম দেন।

বিশ্বকাপের জন্য দেশ ছাড়ার রাতে মেসেঞ্জারে সেটি বললামও তাঁকে, ‘নিজেকে মোটিভেট করতেই কি আপনি এমন করেন?’

হাসির ইমো দিয়ে সাকিব জবাব দিলেন, ‘যা হয়েছে, তা ভুল-বোঝাবুঝি।’

আমি আর বিস্তারিত জানতে চাইলাম না। যখন মেসেঞ্জারে এই কথোপকথন, বাংলাদেশ দলের ততক্ষণে প্লেনে উঠে যাওয়ার কথা। সাকিব তখনো ব্যাগ গোছাচ্ছেন জেনে যারপরনাই অবাক। সেটি প্রকাশ করার পর বললেন, ‘আমি তো টিমের সঙ্গে যাচ্ছি না।’

এবার একটা স্বীকারোক্তির সময় হয়েছে। বিশ্বকাপে সাকিব খুব ভালো করবেন জানতাম, কিন্তু সেই ‘খুব ভালো’ যে ‘এত ভালো’—এটা কল্পনাও করিনি। বিশ্বকাপের মাঝপথে গিয়ে সবচেয়ে বেশি রান, ছয় ইনিংসের পাঁচটিতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব স্কোর, যার দুটি আবার সেঞ্চুরি। প্রথম পাঁচ ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার পর ষষ্ঠ ইনিংসেই ৫ উইকেটে এই বিশ্বকাপের সেরা বোলিং, টেলিভিশনের পর্দায় আইসিসির ফ্যান্টাসি গেম ভেসে উঠলেই সবার ওপরে জ্বলজ্বলে সাকিব আল হাসানের নাম—কল্পনা কীভাবে এর নাগাল পাবে!


এর মধ্যে ব্যাটিংটা একটু বিস্ময় হয়েই এসেছে। যতটা না রান, তার চেয়ে বেশি ব্যাটিংয়ের ধরন। ক্যারিয়ারের শুরুতে যখন চার নম্বরে নামতেন, সাকিবের ব্যাটিং দেখতে খুব সুন্দর লাগত। মাঝখানে টি-টোয়েন্টির প্রভাবেই কি না, সেই ব্যাটিংয়ে সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে কার্যকারিতাই বড় হয়ে উঠেছিল। এই বিশ্বকাপে সাকিবের ব্যাটিংয়ে সৌন্দর্য আর কার্যকারিতার মধ্যে কোনো আড়ি নেই। দুটির মেলবন্ধন ঘটিয়ে শুধু বাংলাদেশ দলেরই নয়, এই বিশ্বকাপেরই সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। অথচ মনে করে দেখুন, গত কয়েক বছর বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে সাকিবের নাম কখনো আলোচিত হয়েছে কি না। কখনো এই স্বীকৃতি পেয়েছেন তামিম ইকবাল, কখনোবা মুশফিকুর রহিম।

আরেকটি যে কীর্তি, সেটিই বরং সাকিবের অলরাউন্ডার সত্তার সত্যিকার জয়গান। এক বিশ্বকাপে আর কারও ৪০০ রান আর ১০ উইকেটের যুগলবন্দী নেই।

এমনই ব্যাটিং করছেন যে বিশেষজ্ঞরাও দেখছি বলছেন, সাকিব যত ভালো বোলার, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো ব্যাটসম্যান। অথচ মাঝখানে লম্বা একটা সময় আমরা কি উল্টোটাই জেনে আসিনি! কখনো মনে হবে ব্যাটিংয়ের চেয়ে বোলিং ভালো, কখনোবা বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিং—একজন অলরাউন্ডারের জন্য সর্বোচ্চ স্বীকৃতি তো এটাই। সাকিব ভালো, সবাই জানতেন। কতটা ভালো, তা বুঝিয়ে দিতে যেন পরিকল্পনা করেই ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চটাকে বেছে নিয়েছেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি আর ৫ উইকেটের কীর্তিতে যুবরাজ সিংয়ের অংশীদারত্ব আছে। যদিও সবাই জানেন ব্যাটসম্যান যুবরাজের সঙ্গে বোলার যুবরাজের কোনো তুলনাই চলে না। এই ম্যাচের পর আরেকটি যে কীর্তি, সেটিই বরং সাকিবের অলরাউন্ডার সত্তার সত্যিকার জয়গান। এক বিশ্বকাপে আর কারও ৪০০ রান আর ১০ উইকেটের যুগলবন্দী নেই। কীর্তিটা কত বড়, তা বোঝাতে মনে করিয়ে দিই, গ্যারি সোবার্স ছাড়া ক্রিকেট ইতিহাসের বিখ্যাত সব অলরাউন্ডারই বিশ্বকাপ খেলেছেন। একই সময়ের ইমরান খান, কপিল দেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হ্যাডলির মতো এঁদের উত্তরসূরি জ্যাক ক্যালিসও ক্যারিয়ারের সেরা সময়েই।

বিথ্যাত সেই স্যালুট! বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর এক ছবিও। তবে বেন স্টোকসের তা ভালো লেগেছে বলে মনে হয় না। ছবি: মোহাম্মদ মানিক

বর্তমান এবং সাম্প্রতিক অতীত ছাড়িয়ে সাকিবের মাহাত্ম্য যে আরও অনেক দূর বিস্তৃত, এটি এর একটা প্রমাণ। এর চেয়েও বড় একটা প্রমাণ আমি বের করেছিলাম আমার এগারো বইয়ে সাকিবকে নিয়ে লিখতে গিয়ে। কৌতূহল, নিছকই কৌতূহল থেকে দেখতে চেয়েছিলাম, ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ছয়জন অলরাউন্ডারের তুলনায় সাকিব কোথায় থাকেন। বাহন অবশ্যই পরিসংখ্যান। তখন পর্যন্ত সাকিব খেলেছিলেন ৫৫টি টেস্ট ও ১৯৫টি ওয়ানডে। টেস্টের ক্ষেত্রে ৫৫ টেস্ট শেষে বাকিদের রান-উইকেটের সঙ্গে সাকিবের রান-উইকেটের তুলনাই যথেষ্ট ছিল। ওয়ানডেতে একটু সমস্যায় পড়লাম। সোবার্স মাত্র একটিই ওয়ানডে খেলেছেন বলে তিনি না হয় বাদ। বাকিদের মধ্যেও যে কপিল আর ক্যালিস ছাড়া আর কেউ ১৯৫টি ওয়ানডে খেলেননি। এই দুজনের সঙ্গে সরাসরি তুলনা হলো। বাকিদের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ—ইমরান (১৭৫), বোথাম (১১৬), হ্যাডলির (১১৫) সমান ম্যাচ খেলার পর সাকিব কোথায় ছিলেন। তা করতে গিয়েই বিষম চমক। সাকিব তো দেখছি কারও চেয়ে কম নন! কেউ রানে এগিয়ে থাকলে সাকিব উইকেটে এগিয়ে, কারও ক্ষেত্রে বা উল্টোটা। যেটির সরল সমীকরণ—সাকিব শুধু বর্তমান সময়েরই নয়, ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। যা নিয়ে কখনোই সেভাবে আলোচনা হয় না। এই ক্রিকেট বিশ্বকাপের পর হয়তো হবে।

আপাতত একটা কাজ তো আমরা করতেই পারি। ২০১৬ সালে ঢাকা টেস্টে বেন স্টোকসকে আউট করে সাকিবের স্যালুট দেওয়ার যে দৃশ্যটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর ছবি হয়ে আছে, চলুন, সেই স্যালুটটাই দিয়ে দিই সাকিবকে।

স্যালুট, সাকিব!