বিতর্ক, অশান্তি, অনিশ্চয়তা।

এবার শব্দগুলোকে বদলে দিন।

আনন্দ, উৎসব, উন্মাদনা।

প্রথমটি বিশ্বকাপের আগের ব্রাজিল।

আর দ্বিতীয়টি বিশ্বকাপের সময়কার ব্রাজিল।

এমন বিতর্ক, অশান্তি আর অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে আর কোনো বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে কি না সন্দেহ। ফুটবলের তীথর্ভূমিতে বিশ্বকাপের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেল সাধারণ মানুষ। রাস্তায় বিক্ষোভ-জ্বালাও-পোড়াও। প্রস্তুতি নিয়ে হাজারো সন্দেহ। উদ্বোধনের কয়েক দিন আগেও উদ্বোধনী ম্যাচের স্টেডিয়াম সময়মতো তৈরি হওয়া নিয়ে সংশয়। সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এল দুরু দুরু বুকে। চুরি-ডাকাতির ভয়, রাস্তায় বেরোলেই নির্ঘাত পড়তে হবে ছিনতাইকারীর কবলে। এরই মধ্যে কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে কেলেঙ্কারিতে টালমাটাল ফিফা। বিশ্বকাপ কোথায় উদ্‌যাপনের উপলক্ষ হবে, উল্টো এটা তো হতে যাচ্ছে ‘অশান্তির বিশ্বকাপ’!

সেই বিশ্বকাপ যখন শেষ হলো, ‘অশান্তি’র কোনো চিহ্নই তাতে নেই। বরং সবাই খুব দ্রুতই একমত হয়ে যাচ্ছেন, এটাই স্মরণকালের সেরা বিশ্বকাপ। যেমন মাঠের খেলায়, তেমনি মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনাতেও। সবার মনে উৎসবের রং ছড়িয়ে দেওয়াতেও। বিশ্বকাপ শুরুর কিছুদিন আগেও এক জরিপ বলছিল, ব্রাজিলের বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপক্ষে। বিশ্বকাপের বাঁশি বাজতেই ভোজবাজির মতো বদলে গেল সব। ব্রাজিলিয়ানরা বিশ্বকাপকে শুধু বরণ করেই নিল না, রাঙিয়ে তুলল বর্ণিল রঙে।


বিশ্বকাপে জিয়নকাঠি ছোঁয়ানোর কাজটাও ফুটবলই করল। দারুণ সব ম্যাচ হয়েছে, দুর্দান্ত সব গোল। ফাইনালের আগেই ২০১০ বিশ্বকাপের চেয়ে ২৫টি গোল বেশি হয়ে গেছে। গতবারের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম কার্ড বের করতে হয়েছে রেফারিকে, মাঠে সত্যিকার খেলার সময় বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ রূপ নিয়েছে সত্যিকার এক ফুটবল মহোৎসবে।

ফুটবলাকাশের তারাদের বেশির ভাগই জ্বলে উঠেছেন। লিওনেল মেসি, নেইমার, আরিয়েন রোবেন, টমাস মুলার আগে আসবেন, এর বাইরেও তো কত উজ্জ্বল নাম! টমাস মুলার একটা নতুন কীর্তিও গড়ে ফেলেছেন। মুলারের আগে গোল্ডেন বুটজয়ী কোনো ফুটবলার পরের বিশ্বকাপে আগের বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা ছুঁতে পারেননি।

দেখা মিলেছে নতুন তারারও, আধুনিক সময়ের বিশ্বকাপ যেটি প্রায় ভুলতেই বসেছিল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের আগে পেলেকে ব্রাজিলের বাইরে বলতে গেলে দেখেইনি। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ফুটবলারদের কারও আর অজানা-অচেনা হয়ে থাকার উপায় নেই। হামেস রদ্রিগেজও সেই অর্থে একেবারে অজানা-অচেনা কেউ ছিলেন না। তবে কলম্বিয়ান তরুণ এই বিশ্বকাপে যে রূপে দেখা দিলেন, সেটি কারও কল্পনায়ও আঁকা ছিল বলে মনে হয় না।


অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, গোল বাড়ার পরও এই বিশ্বকাপকে অনায়াসে ‘গোলকিপারদের বিশ্বকাপ’ বলে ফেলা যায়। মেক্সিকোর গির্লেমো ওচোয়া, যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড, কোস্টারিকার কেইলার নাভাস, জার্মানির ম্যানুয়েল নয়্যার গোল ঠেকানোর নীরস কাজটাকেও শিল্পিত রূপ দিয়ে ফেলেছেন এই বিশ্বকাপে।

নাটকও তো কম হয়নি। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কামড় দিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। লুইস সুয়ারেজ যদি এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত নাম হন, সবচেয়ে বিয়োগান্ত গল্পটা নেইমারের। এই বিশ্বকাপের পোস্টার বয়, খেলছিলেনও সেটিকে যথার্থ প্রমাণ করার মতোই। সেই নেইমারের জন্য কী এক দুঃস্বপ্নই না হয়ে রইল দেশের মাটির বিশ্বকাপ!

কোস্টারিকার বিদায় কোনো ম্যাচ না হেরেই। পাঁচ ম্যাচের তিনটিতে প্রতিপক্ষ তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, আরেকটিতে তিনবারের রানার্সআপ। কোস্টারিকাই এই বিশ্বকাপের সুন্দরতম গল্প।

ওই ম্যাচটির আগ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপে ‘বিস্ময়’ বলতে অবশ্য কোস্টারিকাকেই বোঝাত। বিশ্বকাপ আপসেট অনেক দেখেছে। কিন্তু কোস্টারিকা যা করেছে, সেটির তুলনা নেই। পরপর দুই ম্যাচে উরুগুয়ে ও ইতালির মতো দলকে হারিয়ে দেওয়ার পর কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হার, যেটি রেকর্ড বইয়ে ড্র বলেই লেখা থাকবে। যার অর্থ, কোস্টারিকার বিদায় কোনো ম্যাচ না হেরেই। পাঁচ ম্যাচের তিনটিতে প্রতিপক্ষ তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, আরেকটিতে তিনবারের রানার্সআপ। কোস্টারিকাই এই বিশ্বকাপের সুন্দরতম গল্প।

মাঠে যা করার ছিল, ফুটবলাররা তা করেছেন। গ্যালারি আর মাঠের বাইরে যা করার ছিল, সেটিও এর চেয়ে ভালোভাবে করতে পারত না ব্রাজিলিয়ানরা। ফুটবল যে এই দেশে শুধুই একটা খেলা নয়, বরং জীবনাচরণের অংশ, সেটি বাকি বিশ্বকে আবার বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটাও করেছে এই বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের ম্যাচের দিন দেখার মতো হতো দেশটা। সবার গায়ে হলুদ জার্সি, মাথায় হলুদ পরচুলা, বারের টেবিলের রং পর্যন্ত হলুদ। ম্যাচের সময় রাস্তাঘাট সব ফাঁকা, ম্যাচ শুরুর আগে ঘরে ফেরার তাড়ায় রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। 

বিশ্বকাপ শুরুর পরও বিক্ষোভ চলে কি না, ভয় ছিল। ব্রাজিলের অমন শোচনীয় হারের পর তো আরও। সবই অমূলক বলে প্রমাণিত। একই কথা খাটে যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও। কত রকম কথাই না শোনা যাচ্ছিল বিশ্বকাপের আগে। বিমানবন্দর ছোট, এয়ারলাইনসগুলোর টাইম টেবিলের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মানুষ এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে যেতেই পারবে না। যেসবের অসারতা বোঝাতে এই প্রতিবেদকের নিজের অভিজ্ঞতার কথাই যথেষ্ট। ব্রাজিলে অভ্যন্তরীণ যে ১১টি ফ্লাইটে উড়তে হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র একটিই সময়মতো আকাশে ওড়েনি। সেই ‘লেট’ও মাত্র মিনিট বিশেক। 

মাঠের খেলা, মাঠের বাইরের উৎসব—সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ ছিল সত্যিকার অর্থেই এক আনন্দযজ্ঞ।