শিম্পলি শুপার্ব!

বানান ভুল হয়নি।

রিচি বেনো এভাবেই বলতেন। অননুকরণীয় উচ্চারণের সেই কণ্ঠ গত কিছুদিন শোনা যায়নি। আর যাবেও না কোনো দিন। রিচি বেনো আর নেই।

বছর দেড়েক আগে গলফ খেলে সিডনির উপকণ্ঠে সমুদ্রতীরের বাড়িতে ফেরার সময় গাড়ি দুর্ঘটনার জের বয়ে বেড়াচ্ছিলেন শরীরে। সঙ্গে আততায়ী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ত্বকের ক্যানসার। দুইয়ে মিলে গত পরশু রাতে সিডনিতে শেষ হয়ে গেল বেনোর জীবনের ইনিংস। যেটির স্থায়িত্ব ছিল ৮৪ বছর।

একদমই আকস্মিক বলা যাবে না এই দুঃসংবাদকে। বরং যেকোনো সময় এটি শোনার মানসিক প্রস্তুতি ছিল সবারই। তাতেও কি শোকের মাত্রা কমে! রিচি বেনোর প্রয়াণে অদৃশ্য শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে ক্রিকেট-বিশ্ব। এটি যে শুধুই একজন ক্রিকেটার আর ধারাভাষ্যকারের চলে যাওয়া নয়। আক্ষরিক অর্থেই একটি যুগের অবসান।

সেই ‘যুগ’ও তো কম দীর্ঘ নয়। বছরের হিসাবে প্রায় ৫ যুগ। ১৯৫২ সালে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু, শেষ ১৯৬৪ সালে। টেস্ট খেলেছেন ৬৩টি। ২২০১ রানের সঙ্গে লেগ স্পিনে ২৪৮ উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটে ২০০০ রান ও ২০০ উইকেটের ‘ডাবল ডাবল’ অর্জনের প্রথম কীর্তি তাঁর। মাত্র ২৮টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাতেই অস্ট্রেলিয়ার সবর্কালের সেরা অধিনায়কদের একেবারে সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও তাঁকে না রেখে উপায় নেই। শুধু পরিসংখ্যানকে সম্বল মানলে অবশ্য মনে একটু প্রশ্ন জাগবেই। কোনো সিরিজ হারেননি ঠিক আছে, কিন্তু জয় তো মাত্র ১২টি টেস্টে। যার অর্থ সাফল্যের হার ৫০ শতাংশও নয়। তবে পরিসংখ্যানে তো এটা লেখা নেই, বেনোর আক্রমণাত্মক অধিনায়কত্ব পরবর্তী কয়েক প্রজন্মকে কেমন প্রভাবিত করেছে!



ব্রিসবেনে ‘টাই’ টেস্ট দিয়ে শুরু ১৯৬০-৬১ অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে সিরিজটি টেস্ট ক্রিকেটকে সোনার কাঠির ছোঁয়ায় জাগিয়ে তুলেছিল, তাতে বেনোই ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের মাঝে। দুজনেরই বাঁধনহীন আনন্দময় ক্রিকেট খেলার দর্শন সঞ্জীবনী সুধায় ভরিয়ে দিয়েছিল মৃতপ্রায় টেস্ট ক্রিকেটকে। মাত্র ৪২ বছর বয়সেই লিউকেমিয়ায় অকালমৃত্যু হয়েছে ওরেলের। বেনো পৃথিবীতে থাকলেন ঠিক এর দ্বিগুণ সময়। গেলেন পরিণত বয়সেই। তার পরও তাঁর মৃত্যুতে যে ক্রিকেট-বিশ্বে অসীম শূন্যতার অনুভূতি, সেটির কারণ ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো। কত লক্ষ-কোটি মানুষের কৈশোর-তারুণ্য- যৌবনের অনুষঙ্গ হয়ে ছিল ওই কণ্ঠ! ওই মুখ-ও কি নয়!
ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত কণ্ঠের প্রতিযোগিতায় হয়তো জন আর্লটই জিতবেন। শুধু কণ্ঠই। বিবিসির ‘টেস্ট ম্যাচ স্পেশাল–’ই ছিল আর্লটের চারণক্ষেত্র, টেলিভিশনে ধারাভাষ্য বলতে গেলে দেনইনি। রিচি বেনোরও শুরু বিবিসি রেডিওতেই, তবে তিন বছর পরই চলে আসেন বিবিসি টেলিভিশনে। ক্রমশই হয়ে ওঠেন ক্রিকেট ধারাভাষ্যের মুখ। যে ধারাভাষ্যকার পরিচয় ক্রিকেটার রিচি বেনোকেও আড়াল করে দিয়েছিল, সেই কাজটা শুরু করেছিলেন খেলোয়াড়ি জীবনেই। তখন তো আর ক্রিকেটে এত টাকা নেই। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে খেলা শুরুর সময় থেকেই তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাংবাদিকতায় দীক্ষা নিয়েছেন। সিডনির এক পত্রিকায় প্রথম কাজ শুরু করেন পুলিশ ‘বিট’ দিয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য চলে আসেন ক্রিকেটে। খেলা ছাড়ার আগেই দুটি বই বেরিয়ে যায়। খেলা ছাড়ার পর আরও বেশ কটি। নিজের সম্পর্কে বলতে সব সময়ই অনীহ ছিলেন, যেটির প্রতীকী প্রকাশ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ের নামে—এনিথিং বাট অ্যান অটোবায়োগ্রাফি। নামটি সার্থক। কারণ ২৮৪ পৃষ্ঠার বইটি পড়েও মানুষ বেনোকে আপনি খুব একটা জানতে পারবেন না।
ধারাভাষ্যকার হিসেবে তাঁর কিংবদন্তিতুল্য উচ্চতার মূলেও এই পরিমিতিবোধ। বেনোর ধারাভাষ্যে নীরবতা আসলেই হিরণ্ময় হয়ে উঠত। অধিকাংশ ধারাভাষ্যকারের মতো টেলিভিশনে সবাই যা দেখছে, সেটিরই পুনরাবৃত্তি করাটাকে ‘পাপ’ বলে গণ্য করতেন। নিজের ধারাভাষ্য-দর্শনের কথাও স্পষ্টই জানিয়েছেন অনেকবার—যদি ছবির সঙ্গে কিছু যোগ না করতে পারো, চুপ করে থাকো। কম বলতেন বলেই তাঁর প্রতিটি কথা আরও বেশি মূল্য পেত। শুধু ধারাভাষ্যই কেন; যখন যেখানে ক্রিকেট নিয়ে কিছু বলেছেন, তাতেই ফুটে বেরিয়েছে ক্রিকেট বৈদগ্ধ্য ও বিবেচনাবোধ।
ক্রিকেটকে আমূল বদলে দেওয়া কেরি প্যাকারের রঙিন বিপ্লবের নেপথ্য মস্তিষ্ক হিসেবে ছিলেন। ১৯৭৭ সালে সেই যে চ্যানেল নাইনে ধারাভাষ্য দিতে শুরু করলেন, প্রায় ৩৬ বছর অচ্ছেদ্য ছিল এই বন্ধন। হঠাৎই ধারাভাষ্যকক্ষের বাইরে ছিটকে পড়ায় অস্ট্রেলিয়ান দর্শকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় অবশ্য নেওয়া হয়নি। যা নিয়েছিলেন ব্রিটিশ দর্শকদের কাছ থেকে। ২০০৫ সালে অ্যাশেজ সিরিজ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংলিশ গ্রীষ্মের সঙ্গে প্রায় ৪৫ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করেন। যা ছিল নীরব এক প্রতিবাদও। ওই সিরিজটি দিয়েই ইংল্যান্ডে বিনা পয়সায় টেলিভিশনে টেস্ট ক্রিকেট দেখার দিন ফুরোয়। যেটি মেনে নিতে পারেননি বেনো।
ধারাভাষ্যকার হিসেবে পরিচিতি আর খ্যাতি ক্রিকেটার বেনোকে প্রায় অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রমাণ তিনি নিজেও পেয়েছেন। নিজের লেখা অন রিফ্লেকশন বইয়ে ১৯৮২ সালে এসসিজিতে তাঁর অটোগ্রাফ নেওয়ার পর বছর বারোর এক কিশোরের প্রশ্নের সরস বর্ণনা আছে। ‘আপনি কি কখনো অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ক্রিকেট খেলেছেন, মিস্টার বেনো?’ কাঁদবেন না হাসবেন বুঝতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কোনোটাই না করে বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি ১৯৬৩ সাল (আসলে বেনো শেষ টেস্ট খেলেছেন ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে) পর্যন্ত খেলেছি।’ ওই বালকের উত্তরটাও লিখেছেন বেনো, ‘দ্যাটস গ্রেট! আমি তো মনে করেছিলাম আপনি শুধু ক্রিকেটের একজন ধারাভাষ্যকার।’
রিচি বেনো শুধুই ধারাভাষ্যকার ছিলেন না। শুধুই ক্রিকেটারও নন। এই দুই পরিচয়ের সঙ্গে সাংবাদিক-লেখক সবকিছু যোগ করে রিচি বেনো আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ক্রিকেটে সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম। শোক প্রকাশে নীরবতা পালনের যে প্রথা, সেটিতেই নাহয় শ্রদ্ধা জানানো যাক তাঁকে।
ওই ‘নীরবতা’ই তো ছিল রিচি বেনোর সিগনেচার টোন!