ইতিহাস কখনো-কখনো কাউকে নতুন ইতিহাস গড়ার রূপকার হওয়ার সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেমন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এ দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টারকে। কাজী সালাউদ্দিন আপত্তি করতে পারেন। বলতে পারেন, তাঁর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি হওয়াটা ইতিহাসের দৈব-দুর্বিপাকে নয়। এটা তাঁর নিজের অর্জন, অনেক দিনের প্রাণান্ত চেষ্টায় বহু কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ।

কথাটা ঠিক। তবে যে নির্বাহী কমিটি পেলেন, সেটি তো আর স্বনির্বাচিত নয়। তাঁর সঙ্গীসাথী, নির্বাচনের ঝাঁঝের কথা মনে রেখে যাদেরকে‘সহযোদ্ধা’ বলাই ভালো, তাঁদের অনেকেই বৈতরণী পার হতে পারেননি। তাঁদের জন্য সালাউদ্দিনের খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষের রঙিন চশমাটা চোখ থেকে খুলে তাকালে তাঁকেও মানতে হবে, প্রায় মৃত এ দেশের ফুটবলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন পূরণে এর চেয়ে যোগ্য সঙ্গীসাথী তিনি আর পেতে পারতেন না। দেশের টালমাটাল সন্ধিক্ষণে বাফুফে নির্বাচন যেন ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করল গণতন্ত্রের জয়জয়কার। ভোটারদের কত রকমফের, চিন্তাভাবনায় কত রকম পার্থক্য, অথচ শেষ পর্যন্ত তাদের ভোটে যে কমিটিটা হলো, ফুটবলের মঙ্গলকামী কাউকে মনোনয়নের দায়িত্ব দিলে তিনিও হয়তো এই লোকগুলোকেই বেছে নিতেন। বড়জোর দু-একটি নাম এদিক-ওদিক হতো।

ইতিহাস সালাউদ্দিনকে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে—কথাটা এ কারণেই বলা।‘সুযোগ’ কথাটা শুধুই বাংলাদেশের ফুটবলকে জাগিয়ে তোলার, ব্যর্থ হওয়ার কোনো‘সুযোগ’ই তাঁর নেই। কারণ গত নয়-দশ বছরে প্রশাসক-কর্মকর্তাদের চিন্তাভাবনার অন্তঃসারশূন্যতা ফুটবলকে যেখানে নিয়ে গেছে, তাতে সালাউদ্দিনের এই বাফুফেকেই ধরতে হবে শেষ সুযোগ বলে। এবারও যদি বাংলাদেশের ফুটবলের কিছু না হয়, তাহলে ধরে নিতে পারেন, আর কোনো দিনই হবে না।

‘হওয়া’ বলতে কী বোঝায়, সেটিও বোধহয় পরিষ্কার হওয়া উচিত। বিশ্ব ফুটবল নিয়ে ভাবাটা তো পাপের পর্যায়েই পড়ে, এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভাবাটাও বাড়াবাড়ি, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বও বাংলাদেশের খুব সহজসাধ্য লক্ষ্য নয়। এসব বলছিই বা কেন, খেলা মানে কি শুধুই আন্তর্জাতিক সাফল্য? তা হলে আমরা যে সত্তর-আশি-নব্বই দশককে বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলে হারানো দিনের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, সেটি কেন? বাংলাদেশের ফুটবল তখনই বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন কি হাতিঘোড়া মেরেছে! তার পরও আমরা আফসোস করি, কারণ তখন ফুটবল আমাদের সামাজিক জীবনের একটা অচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ছিল, ফুটবল ছিল সবচেয়ে বড় বিনোদনের নাম।

বাণিজ্যিকীকরণ যতই ছায়া ফেলুক, শেষ পর্যন্ত খেলাধুলার আসল উদ্দেশ্য তো ওই বিনোদনই। বাংলাদেশে এই কথাটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। অনেককেই বলতে শুনি, ‘ওই খেলাটা খেলে লাভ কী? এতে কি আমরা কিছু করতে পারব?’‘কিছু করা’ বলতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের কথাই বলা হয়, কিন্তু সেটাই কি সব? খেলা হবে খেলার আনন্দের জন্য। খেলোয়াড়েরা খেলবেন, তা দেখে বিনোদিত হবেন হাজার হাজার দর্শক। সেই বিনোদনের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রাই বা বেঁধে দেবেন কীভাবে? এখন যে আমরা আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে ইউরোপিয়ান লিগের খেলা দেখি, সরাসরি দেখি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল, নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখে এর চেয়ে কোনো অংশে কম আনন্দ পেতাম? আমাদের কৈশোরে-যৌবনে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের দিন দু ভাগ হয়ে যেত দেশ, যেকোনো কিশোর-তরুণ-যুবক এমনকি বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেও নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যেত তিনি হয় আবাহনী নয় মোহামেডান। ফুটবল তখন শুধু ফুটবল ছিল না, ছিল প্রতিদিনের জীবনাচরণের অংশ। শুধু ক্রিকেটের সদর্প আবির্ভাবের মধ্যে তা হারিয়ে যাওয়ার কারণ খোঁজাটা হবে বোকামি বা দায় এড়ানোর কৌশল, বাফুফের গত দুটি কমিটি যেটির চর্চা নিরন্তরই করে গেছে।

একদিক থেকে সালাউদ্দিনের কমিটির কাজটা খুব সহজ। চাওয়াটা তো বেশি কিছু নয়। নিয়মিত যেন খেলা হয়, এই তো! বিশ্বের আর কোনো দেশের ফুটবল ফেডারেশনের কাছে এত সামান্য চাওয়া নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু নিয়মিত লিগ হবে, টুর্নামেন্ট হবে—এটা দাবি করতে হবে কেন? অথচ এই দাবিতে ফুটবলারদের আন্দোলন সম্ভবত শুধু বাংলাদেশেই হয়েছে!

ফুটবল মাঠে দর্শক না হওয়ার কারণও এতেই লুকিয়ে। খেলা দেখতে যাওয়াটাও একটা অভ্যাসের মতো। নিয়মিত খেলা হয় না বলে সেই অভ্যাসটাই হারিয়ে গেছে। যাঁরা আগে মাঠে যেতেন, তাঁদের অভ্যাস হারিয়ে গেছে আর নতুন প্রজন্মের অভ্যাসই গড়ে ওঠেনি। তাহলে দর্শক হবে কোত্থেকে?

দর্শকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আরেকটি বড় কারণ, পাতানো খেলার বিষবাষ্প। একবার বিশ্বাসটা উঠে গেলে গাঁটের পয়সা খরচ করে মানুষ প্রতারিত হতে চাইবে কেন? নিয়মিত খেলা আয়োজনের সঙ্গে সালাউদ্দিনদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য তাই পাতানো খেলা বন্ধ করা। বাংলাদেশের ছোট-বড় এমন কোনো ক্লাব নেই যারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে, পাতানো খেলার কাদা তাদের গায়ে কখনো লাগেনি। বড় ক্লাবগুলো যেকোনো মূল্যে ট্রফি চায়, ছোট ক্লাবগুলো চায় অবনমন এড়াতে। এ জন্য প্রয়োজনে বাঁকা পথে হাঁটার চেষ্টাটা বিশ্বের সব দেশেই হয়। পার্থক্য হলো, অন্য সব দেশে এ জন্য কঠোর শাস্তি হয় এবং সেই শাস্তি দেওয়ার কোনো সময়সীমা নেই। পাতানো খেলাও যুদ্ধাপরাধের মতো, ঘটনার অনেক বছর পর প্রমাণিত হলেও শাস্তি পেতেই হবে। অথচ বাংলাদেশে এটি‘ওপেন সিক্রেট’, ফেডারেশনের চেয়ারে বসেই পাতানো খেলার বন্দোবস্ত করার অবিশ্বাস্য ঘটনাও এখানে নিয়মিতই ঘটেছে।

শর্ষেতে ভূত দূর করার একটাই উপায়—ক্লাব প্রতিনিধিদের বাইরে দৃঢ়চিত্ত, সাহসী লোকদের নিয়ে একটা কমিটি করা। যাঁরা পাতানো খেলার ব্যাপারে কঠোরতম সিদ্ধান্ত নিতেও দুবার ভাববেন না। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পরও অলিম্পিক মার্শেইকে যদি পাতানো খেলার অপরাধে দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যেতে হয়, জুভেন্টাসের মতো ক্লাবকে লিগ শিরোপা বিসর্জন দিয়ে খেলতে হয় সিরি‘বি’তে—বাংলাদেশের ক্লাবগুলো এমন কী শক্তিধর যে, তাদের শাস্তি দেওয়া যাবে না? 

সালাউদ্দিন শুধু বড় ফুটবলারই ছিলেন না, চিন্তাভাবনাতেও আধুনিক। অভিযোগ আছে একটাই—সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারার অক্ষমতা। কথাটা নিন্দুকদের অপপ্রচার হলেই বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ভালো। তাঁর মতোই বড় খেলোয়াড় থেকে প্রশাসকে রূপান্তরিত এক ভদ্রলোকের একটা উক্তি সালাউদ্দিনকে মনে করিয়ে দিই। উয়েফার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মিশেল প্লাতিনি বলেছিলেন, ‘সভাপতি নই, আমি নেতা হতে চাই।’

 সালাউদ্দিনকেও তেমনি নেতা হতে হবে। কমিটির ২১ জন মিলেই অর্কেস্ট্রাটা বাজাতে হবে, তাঁকে হতে হবে সেটির কনডাক্টর। সালাউদ্দিনের মতো বুদ্ধিমান লোকের এটা না বোঝার কথা নয়। এটাও তাঁকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের ফুটবলের যে বিবর্ণ দশা, তিনি ব্যর্থ হলেও সেটির আর হারানোর কিছু নেই। হারানোর আছে শুধু সালাউদ্দিনেরই।