ড্যারেন স্যামি তাহলে ঠিকই বলেছিলেন!

ঈশ্বরই চেয়েছেন, ওই দুজনের বিদায়টা যেন স্মরণীয় হয়।

আলো ঝলমল মিরপুরে হাজার ওয়াটের হাসি ছড়িয়ে ওই দুজন যখন সতীর্থদের কাঁধে চড়ে ল্যাপ অব অনার দিচ্ছেন, সেন্ট লুসিয়ার বাড়িতে টেলিভিশনের সামনে বসা স্যামি হয়তো বলছেন, ‘আমি তো বলেই ছিলাম!’

বৃষ্টি আইনে শ্রীলঙ্কার কাছে সেমিফাইনাল হারার পর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অধিনায়কের ওই কথাটা কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনেরও কানে গিয়েছে। বুকের দুরু দুরু তাতে একটুও কমেনি। দুই বন্ধুই ঈশ্বরে প্রবল বিশ্বাসী। কিন্তু কে বলতে পারে, আবারও তিনি তাঁদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠবেন না! সাঙ্গা-জয়া যেন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের অভিশপ্ত দুই রাজকুমার। একের পর এক ফাইনাল খেলবেন এবং উপহার পাবেন অগণ্য বিনিদ্র রজনী! 

এর আগে ৫০ ওভার ও ২০ ওভারের চার-চারটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ঘুরেফিরে সেই একই গল্প। কী আশ্চর্য, এর দুটিতে জয়াবর্ধনে অধিনায়ক, দুটিতে সাঙ্গাকারা। কাল অশ্বিনকে ছক্কা মেরে থিসারা পেরেরা ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার পরই পুরো শ্রীলঙ্কা দল ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল মাঠের দিকে। জয়াবর্ধনের ছোটখাটো শরীরটা যেন হাওয়ায় উড়ছে! সেটি শুধুই বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে নয়। তাতে মিশে থাকল শাপমোচনের স্বস্তি।


সেই শাপমোচনের কাজটাতেও অগ্রণী ভূমিকায় তাঁরা দুজন। ফাইনালের আগে এই বিশ্বকাপে সাঙ্গাকারার এমন দুর্দশা যে, উইকেটকিপিংটা না করলে তাঁর নির্ঘাত বাদ পড়ার কথা। অধিনায়ককেই যেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৪ ইনিংসে ১৯ রান করার পর সাঙ্গাকারার রেয়াত পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

ফ্লাডলাইটের আলোতে সবকিছুই একটু মায়াবী মায়াবী লাগে। সেই আলোতে সাঙ্গা-জয়ার এমন শেষ একটু রূপকথা রূপকথা তো মনে হবেই।

সেই সাঙ্গাকারাই আসল সময়ে জ্বলে উঠে ফাইনালের নায়ক। ৩৫ বলে অপরাজিত ৫২ রানের ইনিংসে ম্যাচসেরা। থিসারার ১৪ বলে ২৩ রানের টর্নেডোর বড় অবদান এই জয়ে। কিন্তু সংখ্যার বিচারে আসুন, শ্রীলঙ্কান ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান জয়াবর্ধনের ২৪। ঈশ্বর আসলেই চেয়েছিলেন!

এই বিশ্বকাপের আগেই টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। বিদায়বেলায় তাঁদের হাতে এত বছর ধরে বুকে বয়ে বেড়ানো পাষাণভার নামানো বিশ্বকাপ ট্রফি! ফ্লাডলাইটের আলোতে সবকিছুই একটু মায়াবী মায়াবী লাগে। সেই আলোতে সাঙ্গা-জয়ার এমন শেষ একটু রূপকথা রূপকথা তো মনে হবেই।

মাঠে যখন শ্রীলঙ্কানদের বাঁধভাঙা উল্লাস, টেলিভিশন ক্যামেরা ক্লোজ-আপে ধরল যুবরাজ সিংকে। একা একা হেঁটে যাচ্ছেন ড্রেসিংরুমের দিকে। রিক্ত, নিঃস্ব, সব হারানো এক মানুষের মতো। মুখটা দেখে মনে হলো, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুবরাজ থেকে রাজ্যপাটে অভিষিক্ত হওয়ার কথা ছিল, বদলে যেতে হচ্ছে বনবাসে!

পুরো ভারতীয় দল থেকে যুবরাজ সিংকে আলাদা করা কেন? খেলা দেখে থাকলে প্রশ্নটাই আপনার কাছে অকারণ মনে হওয়ার কথা। যেকোনো ম্যাচ শেষেই টার্নিং পয়েন্ট নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়। এখানে সেটির কোনো প্রয়োজনই পড়ছে না। অনায়াসে বলে দেওয়া যাচ্ছে, ভারত হারল যুবরাজের কারণে। টি-টোয়েন্টির এক ওভারে ছয় ছক্কা মারার রেকর্ড যাঁর, সেই যুবরাজের কাছেই কাল বলে ব্যাট লাগানো যেন পৃথিবীর কঠিনতম কাজ! 

২১ বলে ১১ রান, চার-ছয় তো নেই-ই, সেই সম্ভাবনাই জাগেনি কখনো। ১৯তম ওভারের প্রথম বলে যখন আউট হলেন, ভারতীয় সমর্থকদের মধ্যে একটা হর্ষধ্বনি উঠল। অনেকক্ষণ ধরেই ডাগআউটে প্যাড পরে বসে থাকা ধোনি আর রায়নাকে দেখাচ্ছিল। রায়নার অস্থিরতা বোঝা যাচ্ছিল পরিষ্কার, ধোনি বরাবরের মতোই নিষ্কম্প। ধোনি নেমেও ইনিংসের শেষ ১১ বলে ১১ রানের বেশি ব্যবস্থা করতে পারলেন না।

১০ ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে ১ উইকেটে ৬৪ এই বিশ্বকাপের ধারা অনুযায়ী ২০ ওভার শেষে অন্তত ১৫০-১৬০ হওয়ার কথা। ইনিংস শেষে বিস্ময় হয়ে দেখা দিল স্কোরবোর্ডটা। ভারতের মতো স্ট্রোক প্লেয়ার সমৃদ্ধ দল মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে ১৩০ রান কীভাবে করে! ৪ উইকেটও তো আসলে নয়, ইনিংসের শেষ বলে অসম্ভব দ্বিতীয় রান নিতে গিয়েই না রানআউট হলেন বিরাট কোহলি। সব বিস্ময়ের জবাব ওই যুবরাজের ওই ভুতুড়ে ইনিংসে। 

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা অবশ্য কোহলিই পেলেন। ফাইনালে ৫৮ বলে ৭৭ রানের এই ইনিংসটির আগেই যেটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং গত শনিবার সকালে জুরিবোর্ডের সভায় দ্বিতীয় কোনো নাম আলোচনাতেই আসেনি।

দিল্লির তরুণ এখন এমনই এক রান-মেশিনে পরিণত যে, ভারত মানেই যেন বিরাট কোহলি। টসে জিতে মালিঙ্গার প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্তেও যেমন কোহলিকে খুঁজে পেলেন অনেকে। বৃষ্টির কারণে ৪০ মিনিট দেরিতে শুরু ম্যাচে টসজয়ী অধিনায়কের প্রথমে বোলিং করার সুযোগ নেওয়ারই কথা। টসে জিতলে যে তিনিও প্রথমে বোলিং করতেন, ধোনি তা জানিয়েও দিলেন। তার পরও মালিঙ্গার সিদ্ধান্তের আশ্চর্য একটা ব্যাখ্যা শোনা গেল, এটির কারণ নাকি বিরাট কোহলি যেন রান তাড়া করার সুযোগ না পান!

এই ম্যাচের আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে কোহলির ৭টি ফিফটির মাত্র ২টিই প্রথমে ব্যাটিং করে। কিন্তু কোহলির এখন এমন সময়, আগে-পরে ব্যাটিং করায় কিচ্ছু যায় আসে না। বোলিং বা উইকেটেও না।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে হার্শেল গিবস ক্যাচ ফেলে দেওয়ার পর স্টিভ ওয়াহ নাকি বলেছিলেন, ‘তুমি তো বিশ্বকাপটাই হাত থেকে ফেলে দিলে হে!’ স্টিভ ওয়াহ পরে জানান, আদতে তিনি তা বলেননি। কিন্তু গল্পটা এমনই ভালো যে, স্টিভের কথায় কান না দিয়ে এরপর অসংখ্য ম্যাচে এটির ব্যবহার হয়েছে। কাল কুলাসেকারার বলে মালিঙ্গা যখন মিড উইকেটে ক্যাচটা ফেললেন, প্রেসবক্স থেকে বিরাট কোহলির লিপ রিডিংয়ের চেষ্টা হলো। স্টিভ ওয়াহর কথিত উক্তিটা বলার জন্য এর চেয়ে ভালো উপলক্ষ আর হয় নাকি! মালিঙ্গাকে কোহলিও কি এমন কিছু বলছেন?

শ্রীলঙ্কা হারলে নিশ্চিতভাবেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো মালিঙ্গাকে। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনের সামনেও অপরাধীর মতো। কিন্তু এদিন যে শ্রীলঙ্কার কোনো ভুলেই কিছু আসবে-যাবে না। মালিঙ্গা কোহলির ক্যাচ ফেলবেন, যুবরাজ ভৌতিক এক ইনিংস খেলে মূল্যহীন করে দেবেন নতুন জীবনে কোহলির ৬৬ রান!

ঈশ্বর যে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, এটি হবে শাপগ্রস্ত দুই রাজকুমারের শাপমুক্তির রাত!