‘শচীন, শচীন’ চিৎকারটাকে তখন আর ‘আওয়াজ’ বলে বোঝানো যাচ্ছে না। দু-তিন কিলোমিটার দূরত্বের আরব সাগর কি মাঝখানের সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে ওয়াংখেড়েতে এসে উপস্থিত! জলকল্লোলের মতো সেই গর্জন ছাপিয়েও কী শোনা যাচ্ছে ওটা! শঙ্খের আওয়াজ না! 

শঙ্খই! বুকে-পিঠে তেরঙ্গায় ‘টেন্ডুলকার’ সেজে একটা মূর্তি মিছিলটার সামনে পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে এগোচ্ছে আর একটু পরপর ফুঁ দিচ্ছে শঙ্খে। দুপুরের খররোদে চোখের সামনেই ঘটছে সব। তার পরও কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে। ওই গর্জনের সঙ্গে শঙ্খের ফুঁ মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটায় কেমন যেন একটা আধিদৈবিক ব্যাপার আছে! 

তা কাল দুপুরে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে যা যা হলো, তা তো আধিদৈবিকই। এত বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে কত ক্রিকেটার এল-গেল, এমন কিছু কে দেখেছে কবে! তিনি সুধীর গৌতম; যাঁর শয়নে-স্বপনে, নিদ্রায়-জাগরণে টেন্ডুলকার ছাড়া কিছু নেই, সেই কত বছর ধরে যেখানে টেন্ডুলকার, সেখানেই সারা গায়ে রং মেখে শঙ্খ নিয়ে হাজির...বিদায়বেলায় তাঁর অমন রূপ একদমই অবাক করার মতো নয়। যেটি ক্রিকেটের ‘অবাক গল্প’ হয়ে থাকবে, তা হলো দল ছাপিয়ে শুধুই ওই ব্যক্তিপূজা। না, ক্রিকেট এমন কিছু আগে দেখেনি। আর দেখবেও না কোনো দিন।

খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঘণ্টা খানেক চলে গেছে, গ্যালারি থেকে একটা লোকও বেরিয়ে যায়নি—এতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ক্রিকেট মহানায়কের বিদায়লগ্নটার সাক্ষী হয়ে থাকবেন বলেই তো এসেছেন মাঠে। প্রথম দুই দিনেই প্রায় মীমাংসা হয়ে যাওয়া এই মরা ম্যাচ তো উপলক্ষমাত্র। সেই দর্শকেরা ‘শচীন, শচীন’ বলে চিৎকার করছে। অনেকেরই গলা ভাঙা। সেটি শুধু টানা চিৎকারের কারণে নয়, কান্নাভেজা গলায় চিত্কারটা অমনই শোনায়।

না, এতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। শচীন টেন্ডুলকারের বিদায় তো শুধুই একজন ক্রিকেটারের চলে যাওয়া নয়। একটা সুখস্বপ্নের সমাপ্তি। সমাপ্তি অমর এক প্রেমকাহিনির, দুই যুগ আগে ১৬ বছরের এক কিশোরের সঙ্গে যেটির শুরু ভারতের কোটি জনতার। যেটি অবাক হওয়ার মতো, এত আগে থেকে জানার পরও আসল সময়টা যখন এল, সমবেত জনতার অমন ভেঙে পড়া।