লিওনেল মেসি কি কাল রাতে ঘুমাতে পেরেছেন? রাত পোহালেই সেই দিন। যে দিনটির স্বপ্ন দেখে এসেছেন সেই শৈশব থেকে। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে ছায়াসঙ্গী সেই স্বপ্নের দরজাটা সামনে হাট করে খোলা, শুধু চৌকাঠটা পেরোলেই হয়। এই উত্তেজনা-রোমাঞ্চ-উদ্বেগ মনে নিয়ে ঘুমানো যায় নাকি!

হয়তো যায়। চ্যাম্পিয়নদের মন কীভাবে কাজ করে, আমরা সাধারণ মনুষ্য তার কতটুকুই বা জানি! ফুটবল মাঠে যা কিছু করা সম্ভব, করেছেন সবই। ফুটবল খেলে যা কিছু পাওয়া সম্ভব, পেয়েছেন সবই। যা কিছু জেতা সম্ভব, জিতেছেন সবই। 

না; সব করা হয়নি, সব পাওয়া হয়নি, সব জেতা হয়নি। একটা অপ্রাপ্তির হাহাকার সব সময়ই ঘিরে থেকেছে তাঁকে। একটা প্রশ্নও। বিশ্বকাপ জিততে না পারলে কীভাবে তুমি পেলে-ম্যারাডোনার পাশে বসবে? সেই হাহাকার, সেই প্রশ্ন, সেই অতৃপ্তি ঘোচানোর মঞ্চ সাজিয়েই কি অপেক্ষা করছে মারাকানা!

তা-ই যদি হয়, নিয়তি কী সুন্দর করেই না ছকটা কেটে রেখেছিল! এই মারাকানাতেই শুরু হয়েছিল মেসির এবারের বিশ্বকাপ। শেষও হচ্ছে সেখানেই। কেমন মিলে যাচ্ছে তিনটি ‘এম’-ও! 

‘এম’ মানে মারাকানা।

‘এম’ মানে মেসি। 

‘এম’ মানে ম্যারাডোনা।

ক্যারিয়ারের প্রতিটি মুহূর্তে যাঁর সঙ্গে তুলনা, জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিনটিতে সেই ম্যারাডোনা সঙ্গেই ছিলেন। এই বিশ্বকাপের শুরুর দিকেই ম্যারাডোনা বলেছেন, এখনো তিনি মেসির কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। কোয়ার্টার ফাইনালে বিশ্বকাপ-স্বপ্ন চার গোলে ভেসে যাওয়ার পর হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন মেসি। ম্যারাডোনা তখন আর্জেন্টিনার কোচ। এটাকেও নিয়তির আশ্চর্য খেয়ালই বলতে হবে, কেপটাউনে মেসিকে কাঁদানো সেই জার্মানিই আজ মেসির স্বপ্ন পূরণের পথে শেষ বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে।

কিন্তু বড় প্রশ্ন তো ওখানেই। মেসিকে মেসির রূপে দেখা যাবে তো? গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেও তাঁকে পরিপূর্ণ মহিমায় দেখা যায়নি। স্বর্গীয় চারটি গোলে সেটি ঢেকে গিয়েছিল। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে গোল নেই। তার পরও সেটিই বোধ হয় এই বিশ্বকাপে মেসির সেরা ম্যাচ। শুধু জয়সূচক গোলটি বানিয়ে দেওয়ার কারণেই নয়, সেই ম্যাচেই তিনি সত্যিকার প্লে-মেকারের ভূমিকায়। তিনজন-চারজন মিলে তাঁকে আটকাতে না পারার সেই পরিচিত দৃশ্যও দেখা গেছে অ্যারেনা করিন্থিয়ানসে। কিন্তু টানা চারটি ম্যান অব দ্য ম্যাচ জেতার পরই যেন হারিয়ে গেলেন মেসি! বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের বিপক্ষে এমনই নিষ্প্রভ হয়ে রইলেন যে, প্রশ্ন উঠছে, মেসি পুরো ফিট তো? এর মধ্যেই ব্রাজিলের এক পত্রিকায় মেসির বাবার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। যাতে জানা যাচ্ছে, মেসি বাবাকে বলেছেন তাঁর পা দুটির ওজন মনে হচ্ছে এক শ কেজি! 

ক্লাব ফুটবলে অর্জনের থালায় অনেক বেশি ফুল। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে গোল সংখ্যায়ও ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে গেছেন এই বিশ্বকাপের আগেই।

সেটি যেন হতে পারেন, এই চাওয়ায় জার্মানি ছাড়া বাকি বিশ্ব যেন এক হয়ে যাচ্ছে। টাইব্রেকারে সেমিফাইনাল হারার পর আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে যাচ্ছেতাই বলা আরিয়েন রোবেন পর্যন্ত এই একটা জায়গায় এসে মিলে যাচ্ছেন। মেসিকে ‘নাম্বার ওয়ান’ ‘সর্বকালের সেরা’ এসব স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপটা ওর প্রাপ্য।’ নেইমারও যে মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চান, সেটি শুধু বার্সেলোনা টিমমেট বলে নয়। সেই চাওয়াটা আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘খেলাটির ইতিহাসে মেসি এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশ্বকাপটা ওর পাওনা হয়ে গেছে।’

যেকোনো খেলোয়াড় সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নটা আসলে সতীর্থ আর প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়-কোচদের কথা থেকেই হয়। আর্সেন ওয়েঙ্গার সেই কবেই মেসিকে ‘প্লেস্টেশন প্লেয়ার’ বলে বিস্ময়াভূত প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে মজার কথাটা বলেছেন মার্কিন গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ড, ‘আমি মেসির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম ও আসলে বাস্তব কি না পরীক্ষা করে দেখতে।’

ক্লাব ফুটবলে অর্জনের থালায় তো অনেক বেশি ফুল। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে গোল সংখ্যায়ও ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে গেছেন এই বিশ্বকাপের আগেই। ৯২ ম্যাচে মেসির গোল এখন ৪২টি। এক ম্যাচ কম খেলে ম্যারাডোনা করেছিলেন ৩৪ গোল। বিশ্বকাপ জিতলে কি ম্যারাডোনা না মেসি তর্কের মীমাংসা হয়ে যাবে? গ্যারি লিনেকার তার পরও ম্যারাডোনাকেই এগিয়ে রাখবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে উল্টো মতেরও নিশ্চয়ই অভাব হবে না।

শুধু ভালো খেলেন বলেই তো মেসি মেসি নন। কোনো ছলাকলায় নেই, মাঠে ডাইভ দেন না, মুখে বড় বড় কথা নেই। মাঠে ও মাঠের বাইরে আদর্শ ক্রীড়াবিদ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই। এখানে তো ম্যারাডোনা ১০-০ গোলে পরাজিত। 

বিশ্বকাপটা মেসির হাতে খুব মানাবে!