গ্রেটনেসের চূড়ান্ত বিচারক নাকি মহাকাল। শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মহাকালের কোনো কাজই থাকছে না!

গ্রেটনেসের প্রশ্নটা মীমাংসা হয়ে গেছে অনেক আগেই। বিদায়বেলায় আলোচনা এসে ঠেকেছে ‘দ্য গ্রেটেস্টে’ এবং সবাই দ্রুত একমত হয়ে যাচ্ছেন, ক্রিকেট নামে মহাপ্রাচীন খেলাটিতে এমন জিনিস আর আবির্ভূত হয়নি। ভবিষ্যতে কোনো দিন হবে বলে দুরাশাও কেউ করছে না।

আরে, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে সবাই ভুলে গেল নাকি! যাঁর ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়কে বলতে হয় পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! আর কোনো মনুষ্য এর ধারেকাছেও যেতে পারেনি। কোনো দিন পারবেও না।

স্যার গ্যারি সোবার্স? সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকার ওপরের দিকেই থাকেন। সঙ্গে বহুমুখী বোলিং দক্ষতা মিলিয়ে বারবাডিয়ান বাঁহাতিকে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন স্বয়ং ব্র্যাডম্যান।

স্যার ভিভ রিচার্ডস? আর কোন ব্যাটসম্যান পেরেছেন বোলারদের শিরদাঁড়ায় অমন ভয়ের কাঁপন ছড়িয়ে দিতে! জন ম্যাকেনরো হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে টেনিস থেকে ক্রিকেটপ্রেমে মজার দিন থেকে স্বয়ং টেন্ডুলকারেরই কৈশোরের নায়ক।

ব্রায়ান লারা? টেস্টে যাঁর ৩৭৫ আর ৪০০ আছে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫০১। ব্যাট হাতে একা ম্যাচ জেতানোর কৃতিত্বে যাঁকে প্রায় সবাই এগিয়ে রাখেন টেন্ডুলকারের চেয়ে। 


ব্র্যাডম্যান-সোবার্স-রিচার্ডস অতীতের গল্প। ব্রায়ান লারার সঙ্গে লড়াইটা সমকালীন। তবে ‘লড়াই’ শব্দটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, যখন প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন নিজেই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করেন। একসময়ের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিদায়ের সাক্ষী হতে এসে ব্রায়ান লারা বলে দিয়েছেন, ‘বক্সিংয়ে যেমন মোহাম্মদ আলী, বাস্কেটবলে মাইকেল জর্ডান, ক্রিকেটে তেমনি শচীন টেন্ডুলকার।’

সৌরভ গাঙ্গুলী এত কাব্যিক না হয়ে প্রায় ধমকের সুরে বলছেন, ‘কেউ ওর ধারেকাছে নেই, ওর সঙ্গে কারও তুলনা করারই প্রশ্ন আসে না। ও সর্বকালের সেরা; পন্টিং না, লারা না, এমনকি স্যার ডন ব্র্যাডম্যানও না, শচীন ইজ সিম্পলি দ্য বেস্ট।’

শুধুই জাতীয়তাবোধ থেকে এমন বলছেন? মহেন্দ্র সিং ধোনি টেন্ডুলকারকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ বলে রায় দেওয়ার সময়ও এমন সন্দেহ হতে পারে আপনার। যুক্তিটা শুনলে যা উবে যেতে বাধ্য, ‘শচীনের ক্যারিয়ারের ২৪ বছরে ক্রিকেটে কত পরিবর্তন এসেছে। টেস্ট ম্যাচ বদলে গেছে, ওয়ানডে ক্রিকেটে অনেক পরিবর্তন এসেছে, টি-টোয়েন্টির আবির্ভাব হয়েছে। এত সব ফরম্যাটের সঙ্গে ওকে মানিয়ে নিতে হয়েছে।’ বড় যুক্তি, তবে আসল যুক্তি এটা নয়। ভারতের মতো এক শ কোটি মানুষের দেশে যেভাবে বছরের পর বছর প্রত্যাশার চাপ সামলে পারফর্ম করেছেন, সেটিই আসলে ধোনির চোখে আলাদা করে দিচ্ছে টেন্ডুলকারকে, ‘অন্য অনেক গ্রেট প্লেয়ারকে খেলার চাপ খুব ভালোভাবে সামলে নিতে দেখেছি। কিন্তু খেলার বাইরে এর চেয়ে অনেক কম চাপে তাদের ভেঙে পড়তেও দেখেছি।’ 

১৬ বছর বয়স থেকে এক শ কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে দুই যুগের যে পথচলা, তা এক অমর মহাকাব্য। ‘ক্যারিয়ার-ফ্যারিয়ার’ জাতীয় শব্দ দিয়ে কি আর তা বোঝানো যায়! সি এল আর জেমসের ‘যারা ক্রিকেট জানে, তারা ক্রিকেটের কী জানে’ কথাটা এখানেও খুব মানিয়ে যায়।

এটাই আসলে সব কথার শেষ কথা। রান-সেঞ্চুরি এসব তো নিছকই সংখ্যা। ভাবীকালে সেই সংখ্যাটাও ক্রিকেট-অনুসারীদের চোখ কপালে তুলে দেবে। কিন্তু সেসব খুব সামান্যই বোঝাতে পারবে টেন্ডুলকার-মাহাত্ম্য।

সেই ১৬ বছর বয়স থেকে এক শ কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে দুই যুগের যে পথচলা, তা এক অমর মহাকাব্য। ‘ক্যারিয়ার-ফ্যারিয়ার’ জাতীয় শব্দ দিয়ে কি আর তা বোঝানো যায়! সি এল আর জেমসের সেই বিখ্যাত লাইন ‘যারা ক্রিকেট জানে, তারা ক্রিকেটের কী জানে’ এখানেও খুব মানিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬৬৪ ম্যাচ, ৩৪৩৫৭ রান, ১০০ সেঞ্চুরি আর ১৬৪ ফিফটি দিয়ে যারা টেন্ডুলকারকে জানবে, তারা টেন্ডুলকারের কী জানবে?

শচীন টেন্ডুলকারের আসল ‘রেকর্ড’ তো আর এসব সংখ্যায় লেখা নেই। সেটি মাঠের বাইরে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে অকল্পনীয় চাপ সামলে শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও বছরের পর বছর ‘পারফর্ম’ করে যাওয়া! রান আর সেঞ্চুরি রেকর্ড বইয়ে স্থান দিয়েছে, মানুষের হূদয়ে স্থান মিলেছে পুরোটা মিলেই। যে কারণে তাঁর বিদায়কে ঘিরে ওয়াংখেড়ে আর ভারত ছাপিয়ে পুরো ক্রিকেট-বিশ্বেই এমন আবেগের ঢেউ। শচীন টেন্ডুলকার মানে শুদ্ধতার প্রতীক। ফিক্সিং কলঙ্কিত আবিল সময়েও যাঁর সততা সব সময় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থেকেছে। শচীন টেন্ডুলকার একটা জীবনদর্শনও। স্বপ্নকে তাড়া কোরো, কিন্তু কখনো শর্টকাট খুঁজতে যেয়ো না। সফল হওয়ার পরও পা দুটি মাটিতেই রাখো। সবকিছু মিলে টেন্ডুলকার আর শুধুই একজন ক্রিকেটার থাকেন না। কোথায় এসে টেন্ডুলকার, ক্রিকেট, জীবন মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যায়। ক্রিকেট তো শুধুই একটা খেলা নয়, একটা জীবনাচরণও। যে কারণে খেলার বাইরেও অনৈতিক কিছু দেখলে বলা হয়, ‘ইটস নট ক্রিকেট!’ শচীন টেন্ডুলকার নামটাই এখন তাই ক্রিকেটের সমার্থক।

এমট রবিনসন নামে ইয়র্কশায়ারের এক বোলারের নাম ক্রিকেট ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেরই জানার একটাই কারণ। তাঁকে নিয়ে নেভিল কার্ডাসের বিখ্যাত একটা লাইন—‘ঈশ্বর ইয়র্কশায়ারের এক তাল মাটিতে জীবন দিয়ে বললেন, “এমট রবিনসন, যাও ইয়র্কশায়ারের হয়ে প্যাভিলিয়ন প্রান্ত থেকে বল করো।”’

এটাও বোধ হয় দৈবনির্ধারিতই ছিল, ‘টেন্ডুলকারের শেষ’ বললে যেন গত কিছুদিনের বিবর্ণ টেন্ডুলকার চোখে না ভাসেন। চোখে ভাসবে স্ট্রেট ড্রাইভ, ব্যাকফুট কাভার ড্রাইভ। বিখ্যাত ওই ব্যাকফুট পাঞ্চ। শেষ ইনিংসটা খেলার সময় আবার যেন তিনি শিবাজি পার্কের সেই কিশোর। 

নিজের ঘরের মাঠে আড়াই দিনেরও কম সময়ে টেস্ট জিতে বিদায়। তারায় তারায় খচিত কমেন্ট্রিবক্স। গ্যালারিতেও অন্য আকাশের তারাদের মেলা। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে যে মাঠে বলবয় হিসেবে কাজ করে ক্রিকেটের মায়াঞ্জন আরও বেশি করে দুচোখে লাগানো, সেখানে বিদায়ী টেস্টে বলবয় তাঁর ছেলে! ২০০ টেস্ট, ১০০টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি। সংখ্যা দুটি খেয়াল করুন। এখানেও যেন দৈবনির্ধারিত কিছু আছে।

এটাও বোধ হয় দৈবনির্ধারিতই ছিল, ‘টেন্ডুলকারের শেষ’ বললে যেন গত কিছুদিনের বিবর্ণ টেন্ডুলকার চোখে না ভাসেন। চোখে ভাসবে ওই স্ট্রেট ড্রাইভ, ব্যাকফুট কাভার ড্রাইভ। বিখ্যাত ওই ব্যাকফুট পাঞ্চ। জীবনের শেষ ইনিংসটা খেলার সময় আবার যেন তিনি শিবাজি পার্কের সেই কিশোর। শুধুই খেলার আনন্দে খেলে যাওয়া। যে কারণে বেস্টের বাউন্সারে আপার কাট মারতে যান, এমনিতে চিরদিন ব্যাটিংয়ের সময় পুরুষকারের পরাকাষ্ঠা তিনি এখানে চার খাওয়ার পর হাঁটুতে হাত রেখে হতাশ ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ফাস্ট বোলারের কাঁধে গ্লাভস দিয়ে টোকা দিয়ে দুষ্টুমি করেন। সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ ছাপিয়ে ৭৪ রানের এই ইনিংস তাই অন্য একটা মাত্রা পেয়ে যায়।

যে ইনিংসে যাওয়ার আগে আবারও সবাইকে ভাসিয়ে দিয়ে যান আনন্দের প্রস্রবণে। যে আনন্দ দুই যুগ ধরে বিলিয়ে গেছেন শচীন টেন্ডুলকার!